রাজধানীর চকবাজারের মানসুর খান প্লাজায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে ভবনের গুদামে জমে থাকা পণ্য সরিয়ে আগুন পুরোপুরি নেভানোর কাজ চলছে। এ ঘটনায় আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের চার কর্মী আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থলে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, আগুনে ভবনটির ষষ্ঠ তলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সপ্তম তলায় তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতি হয়েছে। পুরো মার্কেটে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে আশপাশের দোকান ও বিপণিবিতানগুলোকে বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করেছেন।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে আগুন লাগার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছয়টি ইউনিট পাঠানো হয়। লালবাগ, সদর দপ্তর ও সিদ্দিকবাজার এবং পলাশী এলাকার ইউনিটগুলো আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। ভবনের ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় পৌঁছে ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা ঘন ধোঁয়া ও প্রচণ্ড তাপের মুখে পড়েন।
আগুন নেভানোর কাজে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় গুদামগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। ষষ্ঠ তলার গুদামগুলো শাটার ও একাধিক তালা দিয়ে বন্ধ ছিল। প্রতিটি গুদামে চার থেকে পাঁচটি তালা লাগানো ছিল। ভেতরের চলাচলের পথেও লোহার ফটক তালাবদ্ধ থাকায় আগুনের উৎসে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয় কর্মীদের। প্রচণ্ড তাপ ও ধোঁয়ার মধ্যে তালা কেটে গুদামে প্রবেশের ব্যবস্থা করতে হয়।
দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও গুদামের ভেতরে থাকা পণ্যের স্তূপের নিচে তাপ ও ধোঁয়া আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে পণ্য সরিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে পানি ছিটিয়ে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা।
কাজী নজমুজ্জামান বলেন, গুদামে থাকা পণ্য সরানো না হলে আগুন সম্পূর্ণ নেভানো কঠিন। পণ্যের নিচে জমে থাকা তাপ থেকে আবার আগুন জ্বলে উঠতে পারে। এ কারণে মঙ্গলবার সকালেও ছয়টি ইউনিট ঘটনাস্থলে কাজ করছিল।
আগুন নেভাতে বাধা যানজট, সরু রাস্তা ও পানির সংকট
চকবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকার ভৌগোলিক পরিস্থিতি আগুন নেভানোর কাজকে আরও কঠিন করে তোলে। তীব্র যানজট এবং সরু রাস্তার কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হয়। পাশাপাশি ভবনের ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় ধোঁয়া বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় আগুন নেভানোর কাজে বাধা সৃষ্টি হয়।
পানির সংকটও ছিল বড় সমস্যা। আশপাশের পানির আধারগুলোতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় কর্মীদের একাধিকবার পাম্প ও পানির উৎস পরিবর্তন করতে হয়। পরে অন্যান্য উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করে আগুন নেভানোর কাজ অব্যাহত রাখা হয়। এ কাজে ঢাকা ওয়াসাও পানি সরবরাহ করে সহযোগিতা করে।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক জানান, আগুন নেভানোর কাজে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন কর্মী অংশ নেন। প্রচণ্ড তাপ ও ঘন ধোঁয়ার কারণে একজন কর্মীকে একটানা দীর্ঘ সময় কাজ করানো সম্ভব হয়নি। তাই ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরপর কর্মীদের পরিবর্তন করে অন্যদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতে কর্মীদের নিরাপত্তা বজায় রেখে উদ্ধার ও নির্বাপণ কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়।
ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা, মার্কেটের স্বেচ্ছাসেবক, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থার সদস্যরাও সহযোগিতা করেন।
ষষ্ঠ তলার সাত থেকে আটটি গুদামে আগুন
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ভবনটির ষষ্ঠ তলায় ১২ থেকে ১৪টি বড় গুদাম রয়েছে। এর মধ্যে সাত থেকে আটটি গুদামে আগুন লাগে। এসব গুদামে ছাতা, প্রসাধনসামগ্রী, সুগন্ধির বোতল, আতরসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য মজুত ছিল।
গুদামগুলো পণ্যে পরিপূর্ণ থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মালামাল বের করা এবং আগুন পুরোপুরি নেভানো সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়েছে। আগুনে কত টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। পণ্য সরিয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়নের পর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানাতে পারবেন বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা।
আগুনের কারণ এখনো অজানা
মানসুর খান প্লাজায় আগুন কীভাবে লেগেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভবনটিতে বৈদ্যুতিক সংযোগ থাকায় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এ পর্যন্ত যাঁদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, তাঁদের কেউই আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি।
কাজী নজমুজ্জামান জানান, আগুন নেভানোর কাজ শেষ হলে এর কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তের পরই অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ জানা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, আগুন পাশের তিন থেকে চারটি সংযুক্ত মার্কেট, আশপাশের ভবন ও দোকানে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছিল। তবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সম্মিলিতভাবে কাজ করে আগুনের বিস্তার ঠেকাতে সক্ষম হন। ফলে পুরো মার্কেট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও ক্ষয়ক্ষতি মূলত ষষ্ঠ তলায় সীমাবদ্ধ থাকে। সপ্তম তলায় তুলনামূলকভাবে সামান্য ক্ষতি হয়েছে।
চকবাজারে অগ্নিনিরাপত্তায় রাস্তা প্রশস্ত ও হাইড্র্যান্ট স্থাপনের তাগিদ
চকবাজারের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও বাণিজ্যিক এলাকায় অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা। তাঁর মতে, সরু রাস্তা ও পর্যাপ্ত পানির উৎসের অভাব জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত আগুন নেভানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি ঢাকা সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে রাস্তা প্রশস্ত করার পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসার মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থানে হাইড্র্যান্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন। এ ব্যবস্থা চালু হলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নির্ধারিত স্থান থেকে দ্রুত পানির সংযোগ নিতে পারবেন। ফলে অগ্নিকাণ্ডের সময় পানির জন্য অপেক্ষা করতে হবে না এবং আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হবে।
আগুন নেভাতে পানি ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা করে কাজী নজমুজ্জামান বলেন, এটি মূলত কঠিন পদার্থে লাগা আগুন বা ‘ক্লাস এ’ ধরনের অগ্নিকাণ্ড। এ ধরনের আগুন নেভাতে পানি সবচেয়ে উপযোগী। অন্যদিকে পেট্রলপাম্প বা জ্বালানিসংশ্লিষ্ট অগ্নিকাণ্ডে পরিস্থিতি অনুযায়ী ফোম ব্যবহার করা হয়।
তিনি বলেন, প্রচণ্ড তাপ ও ধোঁয়ার মধ্যে ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা প্রচলিত অগ্নিনির্বাপণ কৌশল অনুসরণ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করেছেন। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও হতাহতের ঝুঁকি কমিয়ে আগুনের বিস্তার ঠেকানোই ছিল তাঁদের প্রধান লক্ষ্য।












