ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের মধ্যে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি যুব আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক জন্তর মন্তর এলাকায় প্রবেশ করে বিক্ষোভ দেখানোর সময় তাঁদের আটক করা হয়। বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিবাদে চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে তাঁরা এই কর্মসূচি পালন করেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে। বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই সংশোধন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পক্ষে নির্বাচনী পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিজেপিও বিরোধীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
জন্তর মন্তরে ঢুকে আটক আন্দোলনকারীরা
সিজেপির দাবি, দলের সহ-সমন্বয়ক আশুতোষ রাঙ্কা, প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস এবং অজিঙ্কা শিন্ডেসহ প্রায় ২০ জন স্বেচ্ছাসেবক জন্তর মন্তরে প্রবেশের পর আটক হন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবাদের জন্য পরিচিত এই স্থানটি পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে তাঁরা সেখানে প্রবেশ করেছিলেন।
সিজেপির সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিওতে প্রায় এক ডজন স্বেচ্ছাসেবককে ফটক ও ব্যারিকেড টপকে ভেতরে ঢুকতে দেখা যায়। সেখানে তাঁরা ভারতের জাতীয় পতাকা ওড়ান এবং স্লোগান দেন। পরে পুলিশ তাঁদের আটক করে।
এর আগে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছিল, জন্তর মন্তরকে আর আনুষ্ঠানিক বিক্ষোভস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। বিক্ষোভের জন্য বিকল্প তিনটি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও জানায় তারা। তবে মঙ্গলবারের আটকের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
আন্দোলনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, প্রতিরোধের অধিকার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বাতিল করা যায় না।
ভোটার তালিকা থেকে বাদ ১৩ কোটির বেশি নাম
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত গত বছর শুরু হওয়া একটি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গত মাসে জানায়, ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি ও ডিজিটাল ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দুই উপকমিশনার অভ্যন্তরীণভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশোধনের ফলে ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত ব্যক্তি, ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তরিত ব্যক্তি এবং ৩ কোটি এমন ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই বাদ পড়ার ঘটনা মুসলিম ভোটার ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাদের দাবি, এসব জনগোষ্ঠীর বড় অংশ বিজেপিকে সমর্থন করার সম্ভাবনা কম। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি উভয়েই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভুলভাবে বাদ পড়া ভোটাররা পুনরায় নিবন্ধন করতে পারবেন।
মোদির সরকারের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
গত কয়েক মাসে সরকারি স্কুলের অবকাঠামো থেকে শুরু করে কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিক্ষোভ সংগঠিত করেছে সিজেপি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আন্দোলনটিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর দলের জন্য সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে জন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের কয়েক সপ্তাহের অবস্থান কর্মসূচির পর পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সোমবার বিরোধী দলগুলোর আয়োজিত এক বিক্ষোভ মিছিলে হাজারো মানুষ অংশ নেন। এর আগের সপ্তাহান্তে সিজেপির কর্মসূচি পুলিশি বাধায় ব্যাহত হয় এবং দলটির নেতাসহ বহু বিক্ষোভকারী আটক হন।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক, প্রতিবাদস্থল নির্ধারণ এবং আন্দোলনকারীদের আটকের ঘটনা ভারতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও নাগরিক প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।












