ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) ভূমিকা, ক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদনপত্রে পরিবর্তন, নির্বাচন কর্মকর্তাদের অনলাইন ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার নিয়ে অভিযোগ এবং ভোটারদের নাম গণহারে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ—সব মিলিয়ে কমিশনের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া। সমালোচকদের অভিযোগ, কমিশনের কয়েকটি সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে যাচ্ছে বলে ধারণা তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি কমিশনেরই কয়েকজন নির্বাচন কমিশনার আবেদনপত্রে পরিবর্তন আনার বৈধতা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বিতর্কটি কেবল রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই; বরং কমিশনের আইনগত ক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও আলোচনায় এসেছে।
নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার আরেকটি কারণ হলো ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কমিশনার নিয়োগের পদ্ধতিতে আনা পরিবর্তন। সমালোচকদের মতে, নতুন নিয়োগব্যবস্থা কমিশনারদের নিরপেক্ষতা নিয়ে শুরু থেকেই সন্দেহ তৈরির সুযোগ করে দিয়েছে। এ ছাড়া কমিশন সমালোচনার মুখে পড়লে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বারবার তার অবস্থান সমর্থন করার ঘটনাও প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়িয়েছে।
ভোটার তালিকায় নাম তোলার আবেদন নিয়ে বিতর্ক
ভারতের ভোটার নিবন্ধনসংক্রান্ত ১৯৬০ সালের বিধিমালায় নির্ধারিত ফরম-৬ মূলত প্রথমবার ভোটার হওয়া কিংবা এক নির্বাচনী এলাকা থেকে অন্য এলাকায় স্থানান্তরের কারণে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন। এই ফরমে আবেদনকারীর পরিচয়, জন্মতারিখ ও সাধারণ বাসস্থানের তথ্য দিতে হয়। পাশাপাশি নাগরিকত্ব ও জন্মস্থান সম্পর্কে ঘোষণা দিতে হয়।
আবেদনকারীকে আরও নিশ্চিত করতে হয় যে, অন্য কোনো নির্বাচনী এলাকার ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য তিনি আবেদন করেননি। স্থানান্তরের ক্ষেত্রে আগের নিবন্ধনের তথ্যও দিতে হয়। দেওয়া তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি মিথ্যা তথ্য দিলে জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৩১ ধারায় শাস্তির বিধান রয়েছে—এ বিষয়েও আবেদনকারীকে অবহিত থাকতে হয়।
প্রচলিত বিধিমালায় নির্ধারিত এই তথ্য ও ঘোষণার ভিত্তিতেই ভোটার হওয়ার যোগ্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ২০২৫ সালের ২৪ জুন বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) কার্যক্রমের ঘোষণা দেওয়ার সময় ফরম-৬ অথবা ফরম-৮-এর সঙ্গে অতিরিক্ত একটি ঘোষণাপত্র জমা দেওয়ার বিধান যুক্ত করে। বিজ্ঞপ্তির চতুর্থ ও পঞ্চদশ অনুচ্ছেদে এই ঘোষণাপত্রের উল্লেখ রয়েছে।
অতিরিক্ত ঘোষণাপত্র নিয়ে আইনি প্রশ্ন
নতুন ঘোষণাপত্রে আবেদনকারীদের জন্মতারিখ অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। পাশাপাশি নাগরিকত্ব আইনের বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যোগ্যতা প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার শর্ত রাখা হয়।
সমালোচকদের মতে, এই অতিরিক্ত শর্ত প্রচলিত বিধিমালায় নির্ধারিত ব্যবস্থার বাইরে চলে যেতে পারে। নির্বাচন কমিশনারদের একাংশও ফরম-৬-এ এ ধরনের পরিবর্তনকে ‘অবৈধ ও অননুমোদিত’ বলে অভিহিত করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিবর্তনের কারণে বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রমের আড়ালে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) চালুর চেষ্টা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এটি সমালোচকদের আশঙ্কা; ঘোষণাপত্র যুক্ত করার অর্থই যে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন চালু করা, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
ভারতের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ২৮ ধারায় আইনটির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে নির্বাচন কমিশন সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিলেও বিধিমালায় নির্ধারিত ফরম একতরফাভাবে সংশোধন করার ক্ষমতা তার রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান ও কমিশনের ব্যাখ্যা
২০২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন কমিশন জানায়, বিশেষ নিবিড় সংশোধনের সময় ফরম-৬-এর সঙ্গে একটি ঘোষণাপত্র যুক্ত করা হয়েছিল এবং সেটি সুপ্রিম কোর্টের সমর্থন পেয়েছে বলে কমিশনের বক্তব্য। একই সঙ্গে কমিশন জানায়, বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রমের বাইরে বিধিমালায় নির্ধারিত ফরমই ব্যবহার করা হবে।
তবে ভারতের প্রধান বিচারপতি পরে পর্যবেক্ষণ করেন, সংশোধিত ফরম-৬ আদালত অনুমোদন করেনি। এই বক্তব্য কমিশনের ব্যাখ্যা এবং আদালতের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্যের বিষয়টি সামনে এনেছে।
২০২৬ সালের ১ অক্টোবর সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো চিঠিতে নির্বাচন কমিশন জানায়, যাঁদের নাম এখনো ভোটার তালিকায় ওঠেনি কিংবা যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁরা যেকোনো সময় নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে পারবেন। পাশাপাশি বুথ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের (বিএলও) বর্তমান ভোটার তালিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য তুলনা করে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির সুযোগ বজায় রাখার কথা বলেছে কমিশন। তবে ফরম-৬-এর পরিবর্তন, অতিরিক্ত নথিপত্রের শর্ত এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বিতর্ক পুরোপুরি মিটেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ফরম-৭-এর অপব্যবহারের অভিযোগ
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার আবেদনসংক্রান্ত ফরম-৭-এর ব্যবহার নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পরিচয় প্রকাশ না করা কিছু আপত্তিকারী এই ফরম ব্যবহার করে বৈধভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের নাম গণহারে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে ভোটার তালিকার নির্ভুলতা ও নাগরিকদের ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্নে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। তবে অভিযোগগুলোর ব্যাপ্তি, সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের পরিচয় এবং কতজন ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াকে আইনসম্মত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ রাখা। ভোটার হওয়ার যোগ্যতা যাচাই যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া কোনো নাগরিকের নাম বাদ না পড়াও জরুরি। কমিশনের সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি এবং ভোটারদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া গেলে চলমান বিতর্কের অবসানে সহায়তা হতে পারে।












