ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক হারে ভোটারের নাম বাদ দেওয়া ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে রাজপথে নেমেছে বিরোধী জোট ইন্ডিয়া। সোমবার (১২ অক্টোবর) নয়াদিল্লিতে বিশাল মিছিল নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দিকে এগিয়ে যান জোটের শীর্ষ নেতারা। পরে লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীসহ একাধিক নেতা নির্বাচনী তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন) প্রক্রিয়া নিয়ে আদালতে আবেদন জমা দেন।
কংগ্রেসের দাবি, ‘গণতন্ত্রের জন্য পদযাত্রা’ নামে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ অংশ নেন। তবে এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ এবং সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের আশঙ্কা তুলে ধরে বিরোধীরা নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাব থেকে বেলা দেড়টার দিকে মিছিল শুরু হয়। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঘুরে চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এগিয়ে চলে এই পদযাত্রা। মিছিলের সঙ্গে ছিল নেতাদের বহনকারী একাধিক বাস। পথে বিভিন্ন স্থানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তবে বেশির ভাগ সময় মিছিল এগিয়ে যেতে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েনি অংশগ্রহণকারীরা। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের কাছাকাছি গিয়ে পুলিশ মিছিলটি থামিয়ে দেয়।
মিছিলে রাহুল-প্রিয়াঙ্কাসহ শীর্ষ নেতারা
মিছিলের শেষ পর্যায়ে রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র, রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী যাদব এবং সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবসহ কয়েকজন নেতা একটি গাড়ির ওপর উঠে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংহতি জানান। এ সময় সরকার ও ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন অংশগ্রহণকারীরা।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, দলের সাধারণ সম্পাদক কে সি ভেনুগোপাল এবং শচীন পাইলটসহ কংগ্রেসের একাধিক শীর্ষ নেতাকে মিছিলে দেখা যায়। বিরোধী জোটের অন্য শরিক দলগুলোর নেতারাও অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সমাজবাদী পার্টির ধর্মেন্দ্র যাদব, শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) দলের সঞ্জয় রাউত, তৃণমূল কংগ্রেসের সৌগত রায়, সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, সিপিআইএমএলের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এবং সিপিআই নেতা পি সান্দোষ কুমার।
বামপন্থী ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা), স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (এসএফআই) এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস ফেডারেশনের (এআইএসএফ) কর্মীরাও মিছিলে যোগ দেন। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সব দলকে শুধু জাতীয় পতাকা বহনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। তবে মিছিলে কংগ্রেসের পতাকাই বেশি চোখে পড়ে।
কংগ্রেসের দাবি অনুযায়ী, প্রায় আড়াই লাখ মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সমর্থকেরা দিল্লিতে আসেন। মিছিলের অগ্রভাগে থাকা বাসে বিরোধী জোটের বিভিন্ন দলের নেতাদের পাশাপাশি ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। নেতাদের দেখতে বাসের পাশে পাশে হাঁটেন অনেকে। রাহুল গান্ধী দাঁড়ালেই ভিড়ের মধ্যে উল্লাসধ্বনি ওঠে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দিল্লিতে সমর্থকেরা
ওডিশার কোরাপুট থেকে দিল্লিতে এসেছিলেন সালমা বেগম। দুই সন্তানকে বাড়িতে রেখে জীবনে প্রথমবার রাজধানীতে আসেন তিনি। সকাল থেকেই অপেক্ষা করছিলেন রাহুল গান্ধীকে একনজর দেখার জন্য। নিজের আসার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “আমি রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।”
পাঞ্জাবের জলন্ধর থেকে আসা দাবিন্দর সিং যমরাজের পৌরাণিক সাজে মিছিলে অংশ নেন। তাঁর বক্তব্য, ভোট চুরির অভিযোগের মাধ্যমে তিনি সরকারকে মনে করিয়ে দিতে চান যে একদিন তাদেরও স্রষ্টার মুখোমুখি হতে হবে।
রাজনৈতিক স্লোগান ও নেতাদের ঘিরে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি মিছিলে ছিল কিছু ব্যতিক্রমী দৃশ্যও। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেকে একপর্যায়ে ব্যাটম্যানের মুখোশ পরতে দেখা যায়। ছাত্র আন্দোলনের পরিচিত মুখ আইসার সভাপতি নেহা বোরাকে দেখতে অনেকে ক্যামেরা উঁচিয়ে ছবি তোলেন।
বিরোধী নেতাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আগে থেকেই সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছিল। কংগ্রেস সভাপতি খাড়গে বিভিন্ন দলের সংসদ সদস্যদের দুপুর ১টার মধ্যে কনস্টিটিউশন ক্লাবে পৌঁছানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন। নানা সমন্বয়গত জটিলতা থাকলেও একাধিক দলের শীর্ষ নেতার উপস্থিতিতে জোটের সম্মিলিত অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কনস্টিটিউশন ক্লাবে উপস্থিত থাকলেও কলকাতায় ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন থাকায় মিছিলে যোগ দেননি। অন্যদিকে, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব দুপুর ২টার পর দিল্লিতে পৌঁছান। বিকেল ৪টার দিকে তিনি মিছিলের শেষ অংশে যোগ দেন।
রাজনৈতিক দাবির ভিড়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ
মিছিলের মধ্যে রাজনৈতিক স্লোগানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত উদ্বেগও সামনে আসে। বিহারের সীতামারির বাসিন্দা নারায়ণ সাহা সেখানে পাঁপড় বিক্রি করছিলেন। প্রতিটি পাঁপড় ২০ রুপিতে বিক্রি করছিলেন তিনি। মানুষের ভিড়ে দ্রুতই তাঁর ঝুড়ি খালি হয়ে যায়।
তবে ভোটার তালিকার সংশোধন নিয়ে আশপাশের মানুষের মতো তাঁর উদ্বেগ ছিল না। তাঁর নিজের চিন্তা ছিল পরিবারের রেশন কার্ড নিয়ে। নারায়ণ সাহার অভিযোগ, বাড়িতে তাঁর ভাইয়ের নাম রেশন কার্ড থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি মিছিলে অংশ নেওয়া মানুষের রাজনৈতিক উদ্বেগের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের সমস্যার কথাও সামনে আনে। একদিকে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার অভিযোগ, অন্যদিকে সরকারি সুবিধার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার মতো ঘটনা—দুটিই সাধারণ মানুষের অধিকার ও সুযোগপ্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
জন্তর মন্তরে বিক্ষোভের সুযোগ বাতিল, বিরোধীদের সমালোচনা
এদিকে দিল্লির ঐতিহাসিক জন্তর মন্তরকে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সোমবার দিল্লি পুলিশের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বিরোধী দল ও বিভিন্ন যুব সংগঠন। তাদের অভিযোগ, এই পদক্ষেপ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও সমাবেশের সুযোগ সীমিত করতে পারে।
সিদ্ধান্ত ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকা নয়াদিল্লি জেলার উপপুলিশ কমিশনারের কাছে চিঠি দেন। চিঠিতে তাঁরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জন্য তারিখ ও সময় নির্ধারণের অনুরোধ জানান। অনুমতি না পেলে নতুন তারিখে বড় পরিসরে বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও জানায় দলটি।
দিল্লি পুলিশের সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করে সিজেপি। দলটির নেতা সৌরভ দাসের অভিযোগ, জন্তর মন্তরকে বিক্ষোভস্থলের স্বীকৃতি না দেওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এ বিষয়ে ভারতের সাধারণ মানুষের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আলোচনা করেছে কি না।
সৌরভ দাস বলেন, “প্রধানমন্ত্রী শিগগিরই ভারতে গণতন্ত্রকেও নির্দিষ্ট স্থান থেকে সরিয়ে দেবেন।” সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, জন্তর মন্তর কেবল একটি জায়গা নয়, এটি প্রতিবাদের চেতনার প্রতীক।
কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশও এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি একে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ঘিরে ‘চরম আতঙ্কের’ লক্ষণ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর অভিযোগ, ঐতিহাসিক জন্তর মন্তর দীর্ঘদিন ধরে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে কাজ করেছে।
সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবও সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করে একে বিজেপি সরকারের ‘সবচেয়ে বড় পরাজয়’ বলে অভিহিত করেন।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের সুপ্রিম কোর্টমুখী পদযাত্রা এবং জন্তর মন্তরে বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে বিতর্ক—দুটি ঘটনাই ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে নতুন আলোচনা সামনে এনেছে। ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগের চূড়ান্ত মূল্যায়ন নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট নথি, কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং আদালতের পর্যবেক্ষণের ওপর। একইভাবে, বিক্ষোভস্থল-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের আইনি ও প্রশাসনিক ভিত্তিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যার আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।












