ভারতে কথিত ‘ভোট চুরি’র অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের ধারাবাহিক আন্দোলনকে ভগবান শিবের তাণ্ডব নৃত্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি বলেছেন, এই আন্দোলনের জন্য আলাদা কোনো পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই। এটি একটি চলমান প্রতিবাদ, যেখানে যে কেউ যোগ দিতে পারেন। একই সঙ্গে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সরাসরি সতর্ক করে তাঁকে কথিত অনিয়মের বিষয়ে রাজসাক্ষী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১২ অক্টোবর) নয়াদিল্লিতে কংগ্রেসের সদর দপ্তর ইন্দিরা ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন রাহুল গান্ধী। পরে বিরোধী জোট ইন্ডিয়া বা ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স’-এর নেতাকর্মীরা বারাখাম্বা রোডের মোড় থেকে সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করেন। কথিত ভোট চুরির অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রতিবাদ জানানোই ছিল এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য।
আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে চাইলে রাহুল গান্ধী বলেন, ‘এটি তাণ্ডব, ভগবান শিবের নৃত্য। এখানে কোনো পরিকল্পনা নেই।’ তিনি আরও বলেন, এ জন্য আলাদা করে পরিকল্পনা করার প্রয়োজন নেই। ভগবান শিবের বিয়ের শোভাযাত্রায় যেমন যে কেউ যোগ দিতে পারেন, তেমনি এই আন্দোলনেও যে কেউ অংশ নিতে পারেন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে উদ্দেশ করে রাহুল গান্ধী বলেন, তিনি জানেন, নির্বাচন কমিশনপ্রধানের কাছে তাঁর বক্তব্য পৌঁছাচ্ছে। তাঁর দাবি, জ্ঞানেশ কুমার রাতে ঘুমাতে পারছেন না। একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে জ্ঞানেশ কুমার বেশিদিন টিকে থাকতে পারবেন না।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার কখনো তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে রাহুল গান্ধী বলেন, তাঁর কাছে বার্তা আসে এবং তিনি জানেন, জ্ঞানেশ কুমার এই সংবাদ সম্মেলন দেখছেন।
কেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে রাজসাক্ষী হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাহুল গান্ধী বলেন, জ্ঞানেশ কুমার ভুল করেছেন, তবে সেই ভুলের পেছনে তিনিই মূল পরিকল্পনাকারী নন বলে তাঁর ধারণা। রাহুলের ভাষায়, ‘রাজসাক্ষী হয়ে যান। আপনি ভুল করেছেন, কিন্তু এই ভুলের মূল পরিকল্পনাকারী আপনি নন। আপনি যা করেছেন, তার পেছনে যারা রয়েছে, আমরা তাদের খুঁজছি।’
তবে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাহুল গান্ধীর তোলা অভিযোগগুলো সংবাদ সম্মেলনে তাঁর বক্তব্য হিসেবেই উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন কোনো তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের ওপরও গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্য, প্রতিরোধ এক দিনের বিষয় নয়। দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা নিয়েই বিরোধীরা মাঠে রয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা পিছিয়ে যাব না, ক্লান্তও হব না। কারণ, সত্য আমাদের সঙ্গে রয়েছে। যারা মিথ্যাকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে, তারাই ক্লান্ত হয়ে পড়বে।’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ করে রাহুল গান্ধী আরও দাবি করেন, তাঁর সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রায় ২০০ কর্মকর্তা যোগাযোগ রাখছেন এবং বিভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, এসব কর্মকর্তার মধ্যে ভারতের এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি), কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই) এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
রাহুল গান্ধী বলেন, ‘আপনার সরকারে ২০০ কর্মকর্তা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং তথ্য দিচ্ছেন। আপনারা যা খুশি করতে পারেন, সত্য আমাদের সঙ্গে রয়েছে।’ তবে তাঁর এই দাবির পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের আলাদা প্রতিবাদ কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে চাইলে রাহুল গান্ধী বলেন, এগুলো আলাদা কোনো আন্দোলন নয়; বরং একই প্রতিবাদের অংশ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনের লক্ষ্য প্রথমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরানো এবং এরপর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখা।
রাহুল গান্ধী স্পষ্ট করে বলেন, এই আন্দোলন থামানোর কোনো পরিকল্পনা বিরোধীদের নেই। তাঁর বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এবং বিরোধী জোটের ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচি—তিনটি বিষয়ই গুরুত্ব পেয়েছে।
ভারতের রাজনীতিতে কথিত ভোট চুরি নিয়ে বিরোধীদের এই প্রতিবাদ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। তবে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।












