ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে চলমান বিক্ষোভ ঘিরে জনসাধারণের চলাচল, মেট্রো ও ট্রেন পরিষেবা এবং ইন্টারনেট সংযোগ স্বাভাবিক রাখার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে আইনসম্মত প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক না করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তবে জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার স্বার্থে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ থাকবে বলে স্পষ্ট করেছেন বিচারপতিরা।
রোববার (১১ অক্টোবর) বিশেষ শুনানিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ এসব নির্দেশ দেন। আগের দিন বিক্ষোভকারীদের চলাচলে বাধা, মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে আটকের ঘটনায় আদালতের নির্দেশ অমান্য করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে দায়ের করা আবেদনের শুনানি হয়।
আদালত প্রাথমিকভাবে মনে করেছেন, আদালত অবমাননার অভিযোগ বিবেচনার মতো ভিত্তি রয়েছে। এ কারণে কেন্দ্রীয় সরকার, দিল্লি পুলিশ ও দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশনকে (ডিএমআরসি) নোটিশ দিয়েছেন বিচারপতিরা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবের পাশাপাশি আদালতের আগের নির্দেশ বাস্তবায়নের প্রতিবেদন ১৩ অক্টোবরের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে।
মেট্রো, ট্রেন ও ইন্টারনেট চালু রাখার নির্দেশ
আদালত অন্তর্বর্তী নির্দেশে বলেছেন, জনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি বিবেচনায় আইন অনুযায়ী বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন না হলে মেট্রো ও রেল পরিষেবা স্বাভাবিকভাবে চলবে। সংবিধানের ১৯(২) অনুচ্ছেদের আওতায় জনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যেতে পারে। তবে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্বিচারে চলাচল বন্ধ করা যাবে না।
নয়াদিল্লিতে মানুষের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার নির্দেশও দিয়েছেন আদালত। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত ট্রাফিক আইন ও নিয়ম মানতে হবে। শহরের বিভিন্ন স্থানে বসানো ব্যারিকেডের প্রয়োজনীয়তা দ্রুত পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও যান চলাচলের বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
ইন্টারনেট পরিষেবা যেন বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়েও নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতিরা। তবে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের আওতায় আইনসম্মত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনের ক্ষমতা বহাল থাকবে বলে আদালত উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, ইন্টারনেট বন্ধ বা সীমিত করার ক্ষেত্রে আইনগত ভিত্তি ও প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করতে হবে।
শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের আটক নিয়ে উদ্বেগ
শুনানিতে আবেদনকারীদের আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, শনিবার বিক্ষোভের সময় নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের বাইরেও লোকজনকে আটক করা হয়েছে। এমনকি ট্রেন থেকে মানুষকে তুলে নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়। আইনজীবী কপিল সিবাল আদালতকে জানান, জন্তর মন্তরের চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে নির্ধারিত এলাকার বাইরে থেকেও লোকজনকে আটক করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, আদালতের আগের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করা হয়েছিল এবং ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছিল।
শুক্রবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছিলেন, মেট্রো ও ট্রেন চলাচলে যেন সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা না হয় এবং দিল্লির সাধারণ মানুষ যেন অযথা ভোগান্তির শিকার না হন। শনিবারের পরিস্থিতি সেই নির্দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, তা নিয়েই রোববারের শুনানিতে প্রশ্ন ওঠে।
সিনিয়র আইনজীবী শাদান ফারাসাত, যিনি শনিবার আটক হয়েছিলেন বলে আদালতকে জানান, অভিযোগ করেন যে তাঁকে ও অন্যদের মারধর ও দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি শুধু আইনজীবীদের অধিকার নিয়ে নয়; বরং রাজধানীর সাধারণ মানুষের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার সাংবিধানিক অধিকার নিয়েও।
তিনি বলেন, আইনজীবীদের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ অধিকার দাবি করা হচ্ছে না। বরং সব নাগরিকের অধিকার রক্ষার বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার শহরের পরিস্থিতি এমন ছিল যে মানুষকে রাস্তায় দাঁড়াতেও বাধা দেওয়া হয়েছে। তাঁকে একটি চলন্ত বাসে তুলে নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
হাজারো মানুষকে আটকের অভিযোগ
আরেক সিনিয়র আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণ আদালতে আটক ও সংশ্লিষ্ট ঘটনার ভিডিওচিত্রের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর অভিযোগ, শান্তিপূর্ণভাবে চলাচলকারী নিরস্ত্র মানুষ, শিক্ষার্থী ও তরুণদের আটক করা এবং তাঁদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানো অপ্রয়োজনীয় ছিল। তিনি অবিলম্বে স্বাভাবিক চলাচল ফিরিয়ে আনা এবং ব্যারিকেড সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ চান। পুলিশ সদস্যদের একটি অংশের পোশাকে পরিচয়চিহ্ন ছিল না বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি।
সিনিয়র আইনজীবী শোয়েব আলম দাবি করেন, বিক্ষোভের ঘটনায় সাত থেকে আট হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে আটক করার ঘটনা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে তিনি আদালতকে জানান। তবে আটক ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে আদালতে উত্থাপিত এই দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, বিপুলসংখ্যক আটকের অভিযোগ আদালতের নজরে রয়েছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, সংবিধানের ১৯(২) অনুচ্ছেদ শান্তিপূর্ণ নাগরিক অধিকারকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার বিধান নয়; বরং নির্দিষ্ট শর্তে তা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়।
রাজনৈতিক নেতাদের আটক ও সাংবিধানিক অধিকার
রাজনৈতিক নেতাদের আটকের বিরুদ্ধে আবেদন করা সিনিয়র আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী বলেন, তরুণদের একটি অংশ এমন নির্বাচনী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চায়, যেটিকে তারা অন্যায্য বলে মনে করে। তাঁদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার সাংবিধানিক অধিকার বাধাগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিকে তিনি গুরুতর উদ্বেগ হিসেবে তুলে ধরেন।
তিনি আরও বলেন, নাগরিকের শান্তিপূর্ণভাবে প্রয়োগ করা সাংবিধানিক অধিকার স্থগিত হওয়ার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়ার ঘটনা ভারতের জরুরি অবস্থার সময়কার কিছু মামলার কথা মনে করিয়ে দেয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে দিল্লি পুলিশের পক্ষে আইনজীবী জয় অনন্ত দেহাদরাই দাবি করেন, বিক্ষোভ চলাকালে কয়েকজন পুলিশ সদস্যও হামলা ও দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন। অর্থাৎ, শুনানিতে বিক্ষোভকারীদের অধিকার নিয়ে অভিযোগের পাশাপাশি পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগও উঠে আসে।
বিচারপতি বাগচী বলেন, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা সবার জন্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ—পুলিশ কর্মকর্তা হোন বা সাধারণ নাগরিক। কোনো ব্যক্তি অন্যায়ের শিকার হলে তাঁর পরিচয় বিবেচনা না করে আদালতের দায়িত্ব অধিকার রক্ষা করা। সংশ্লিষ্ট আবেদনগুলো একসঙ্গে শুনে সামগ্রিক নির্দেশ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সরকারের বক্তব্য: পরিষেবা স্বাভাবিক, আটক ব্যক্তিরা মুক্ত
কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানান, ইন্টারনেট পরিষেবা পুনরায় চালু করা হয়েছে এবং মেট্রো ও ট্রেন পরিষেবা সচল রয়েছে। আটক ব্যক্তিদের ইতিমধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
মেহতার বক্তব্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর মেট্রো পরিষেবার মোট পরিচালনায় কোনো হ্রাস ঘটেনি। দিল্লির মোট ৩০৩টি মেট্রো স্টেশনের মধ্যে ৪৫টি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং শনিবার রাত ১০টার মধ্যে সব স্টেশন খুলে দেওয়া হয়। তিনি আরও আশ্বাস দেন, আইনজীবী, সাংবাদিক ও অন্যান্য পেশাজীবীদের কাজ করতে বাধা দেওয়া হবে না।
তবে আবেদনকারীদের অভিযোগ ও সরকারের বক্তব্যের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে পরিষেবা বন্ধ রাখা, চলাচলে বাধা এবং আটকের পরিসর নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য পুরোপুরি এক নয়। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হলফনামা ও আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আইনের সীমার মধ্যে বিধিনিষেধ
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা প্রয়োগ করেছিল বলে শুনানিতে জানানো হয়। এই ধারায় জরুরি পরিস্থিতিতে জনশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাময়িক নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ দিতে পারেন। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েতও নিষিদ্ধ করা সম্ভব।
আবেদনকারীরা আদালতকে জানান, সুপ্রিম কোর্টের আশপাশেও ১৬৩ ধারা জারির কথা উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তি টাঙানো হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতিরা নির্দেশ দেন, বিজ্ঞপ্তিটি আগে সরানো না হয়ে থাকলে তা সরিয়ে ফেলতে হবে। যাতে সুপ্রিম কোর্ট বা অন্য কোনো আদালতে প্রবেশ ও বের হওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেন তাঁরা।
আদালতের নির্দেশে মূলত দুটি বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছে। একদিকে জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় আইনসম্মত নিয়ন্ত্রণ আরোপের সুযোগ রয়েছে, অন্যদিকে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র নাগরিকদের নির্বিচারে আটক করা বা সাধারণ মানুষের চলাচল অকারণে বন্ধ করা যাবে না।
এখন কেন্দ্রীয় সরকার, দিল্লি পুলিশ ও ডিএমআরসির জবাব এবং সম্মতি-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর আদালত পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। রাজধানীতে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি, নাগরিকের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার এবং জনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের ক্ষমতার সীমা—এই তিনটি বিষয়ই পরবর্তী শুনানিতে গুরুত্ব পেতে পারে।












