বিশ্বজুড়ে সরকারি ঋণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোকে এখনই ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক সরকারি ঋণ শিগগিরই বিশ্ব মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। অথচ ঋণের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থামাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
বুধবার আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে সংস্থাটির রাজস্ববিষয়ক বিভাগের উপপরিচালক এরা ডাবলা-নরিস বলেন, যেসব দেশের ঋণের বোঝা বেশি, তাদের এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিরক্ষা ব্যয়, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য বাড়তি বরাদ্দ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ভবিষ্যৎ ব্যয়ের সুযোগ তৈরি করতে ঋণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
কেন বাড়ছে সরকারি ঋণের চাপ
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, করোনাভাইরাস মহামারি এবং ইউক্রেন ও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের প্রভাবে উন্নত অর্থনীতিগুলোর ঋণ-জিডিপি অনুপাত বেড়েছে। ধারাবাহিক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে সরকারগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে। একই সময়ে সুদের হার ও সরকারি ঋণপত্রের মুনাফার হার বেড়ে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে।
আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে বার্তা সংস্থা এএফপিকে ডাবলা-নরিস জানান, ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে বিভিন্ন মেয়াদের সরকারি ঋণপত্রের মুনাফার হার গড়ে প্রায় ১১০ ভিত্তি পয়েন্ট বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ঋণপত্রে এই বৃদ্ধি বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ১০ ও ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মুনাফার হার ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। জি-৭ গোষ্ঠীর অন্যান্য দেশেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সুদের হারের প্রভাব
ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তীব্র হয়েছে। মূল্যস্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ানোর পথে হাঁটছে। এর প্রভাব পড়ছে সরকারি ঋণপত্রের মুনাফার হারেও।
আইএমএফের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদি ঋণপত্রের ওপর নির্ভরতা বেশি হলে সুদের হারের পরিবর্তন দ্রুত সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে। ঋণের পরিমাণ বেশি থাকা অবস্থায় এই প্রভাব আরও তীব্র হয়। ফলে সরকারের রাজস্বনীতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সুদ পরিশোধে বাড়বে সরকারি ব্যয়
আইএমএফের বুধবার প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে সরকারি সুদ পরিশোধের গড় ব্যয় ২০২১ সালে জিডিপির ২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৩১ সালে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে মহামারির আগে সুদ পরিশোধের ব্যয় জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ থাকলেও ২০৩১ সালে তা ৫ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, তখন এই ব্যয় সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রায় সমান হবে।
নিম্ন আয়ের দেশগুলোর পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। এসব দেশে কর রাজস্বের গড়ে ১৫ শতাংশ ইতিমধ্যে ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে।
ঋণ কমাতে ব্যয় ও রাজস্বনীতিতে পরিবর্তনের তাগিদ
ঋণ পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারগুলোকে এখনই রাজস্ব ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনার উদ্যোগ নিতে বলেছে আইএমএফ। ঋণের অনুপাত স্থিতিশীল রাখতেও আগের তুলনায় বেশি প্রাথমিক বাজেট উদ্বৃত্ত—অর্থাৎ সুদ পরিশোধের আগের আয়-ব্যয়ের হিসাবে উদ্বৃত্ত—তৈরি করতে হবে বলে জানিয়েছেন ডাবলা-নরিস।
উন্নত দেশগুলোর ঋণপত্রের মুনাফার হার বাড়লে তার প্রভাব উদীয়মান অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের শর্ত কঠিন হবে এবং এসব দেশের ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়তে পারে।
তবে ব্যয় সংকোচনের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারগুলোকে জনগণের কাছে তার প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য প্রভাব স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, এখন পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে সরকারগুলোর বাজেট পরিচালনার সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়বে।












