শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ০৫:৩৬ পূর্বাহ্ন

শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড

  • Update Time : মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৪, ৫.২৩ পিএম

শেয়ার বাজার ছাড়া কোন দেশের অর্থনীতিকে চিন্তা করা যায় না। 

শেয়ার বাজার যেমন অর্থ বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ স্থান  তেমনি শেয়ার বজার ঘিরে আছে অসংখ্য রকম জুয়া খেলার মতোই আরেক জুয়া খেলা। পৃথিবীর বহুদেশে শেয়ার বাজারের এই জুয়াড়িদের হাতে পড়ে লাখ লাখ লোক সর্বশান্ত হন। বিশাল ক্ষতির মুখে পড়ে দেশের অর্থনীতি। প্রতি বছর হার্ট ফেল করে এ কারণে মারা যান অনেকে। 

পৃথিবীর এত বড় এই বিষয়টি নিয়ে বাস্তবে বাংলা সাহিত্যে খুব কোন লেখা লেখি নেই। যা আছে তা কোম্পানির কাগজের ( কোম্পানির শেয়ার) দাম কমে যাওয়ায় বা কোম্পানির লাল বাতি জ্বলে যাওযায় বিভিন্ন পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কাহিনী। 

শেয়ার জুয়াড়িদের নিয়ে বাংলা সাহিত্যে শুধু নয় বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ট গল্প পরশুরাম ( রাজ শেখর বসু) এর শ্রী শ্রী সিদ্বেশ্বরী লিমিটেড। 

এ শুধু চিয়ারত সাহিত্য নয়, বর্তমান সময়েরও যেন এক চিত্র। 

সারাক্ষনের অনেক পাঠককে পুনরায় পড়ার জন্য এবং তরুণ প্রজম্ম’র জন্য গল্পটি প্রকাশিত হলো।– সম্পাদক

 

পরশুরাম

মাঘ মাস ১৩২৬ সাল। এই মাত্র আরমানী গির্জার ঘড়িতে বেলা এগারটা বাজিয়াছে। শ্যাম- বাবু চামড়ার ব্যাগ হাতে ঝুলাইয়া জুডাস লেনের একটি তেতলা বাড়িতে প্রবেশ করিলেন। বাড়িটি বহু পুরাতন, ক্রমাগত চুন ও রঙের প্রলেপে লোলচর্ম কলপিত- কেশ বৃদ্ধের দশা প্রাপ্ত হইয়াছে। নীচের তলায় অন্ধকারময় মালের গুদাম। উপরতলায় সম্মুখভাগে অনেকগুলি ব্যবসায়ীর আপিস, পশ্চাতে বিভিন্ন জাতীয় কয়েকটি পরিবার পৃথক পৃথক অংশে বাস করেন। প্রবেশ-দ্বারের সম্মুখেই তেতলা পর্যন্ত বিস্তৃত কাঠের সিড়ি। সিড়ির পাশের দেওয়াল আগাগোড়া তাম্বুলরাগচর্চিত-যদিও নিষেধের নোটিশ লম্বিত আছে। কতিপয় নেংটে ই’দুর ও আরসোলা পরস্পর অহিংসভাবে স্বচ্ছন্দে ইতস্তত বিচরণ করিতেছে। ইহারা আশ্রমমৃগের ন্যায় নিঃশঙ্ক, সিড়ির যাত্রিগণকে গ্রাহ্য করে না। অন্তরাল- বর্তী সিন্ধী-পরিবারের রান্নাঘর হইতে নির্গত হিঙের তীব্র গন্ধের সহিত নরদমার গন্ধ। মিলিত হইয়া সমস্ত স্থান আমোদিত করিয়াছে। আপিস-সমূহের মালিকগণ তুচ্ছ বিষয়ে নির্লিপ্ত থাকিয়া কেনা-বেচা তেজি-মন্দি আদায়-উসুল ইত্যাদি মহৎ ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত: হইয়া দিন যাপন করিতেছেন।

শ্যামবাব, তেতলায় উঠিয়া একটি ঘরের তালা খুলিলেন। ঘরের দরজার পাশে কাষ্ঠফলকে লেখা আছে-ব্রহ্মচারী অ্যান্ড ব্রাদার-ইন-ল, জেনার্ল’ মার্চেন্টস। এই কারবারের স্বত্বাধিকারী স্বয়ং শ্যামবার, (শ্যামলাল গাঙ্গুলী) এবং তাঁহার শ্যালক বিপিন চৌধুরী, বি. এস-সি। ঘরে কয়েকটি পুরাতন টেবিল, চেয়ার, আলমারি, প্রভৃতি আপিস-সরঞ্জাম। টেবিলের উপর নানাপ্রকার খাতা, বিতরণের জন্য ছাপানো বিজ্ঞাপনের স্তূপ, একটি পুরাতন থ্যাকার্স ডিরেক্টরি, একখণ্ড ইন্ডিয়ান কম্পানিজ অ্যাক্ট, কয়েকটি বিভিন্ন কম্পানির নিয়মাবলী বা articles, এবং অন্যবিধ কাগজপত্র। দেওয়ালে সংলগ্ন তাকের উপর কতকগুলি ধূলিধূসর কাগজমোড়া শিশি এবং শূন্যগর্ভ’ মাদুলি। এককালে শ্যামবাবু পেটেন্ট ও স্বম্মাদ্য ঔষধের কারবার করিতেন, এগুলি তাহারই নিদর্শন।
শ্যামবাবুর বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, গাঢ় শ্যামবর্ণ, কাঁচা-পাকা দাড়ি, আকণ্ঠলম্বিত কেশ, স্কুল লোমশ বপু। অল্পবয়স হইতেই তাঁহার স্বাধীন ব্যবসায়ে ঝোঁক, কিন্তু এ পর্যন্ত নানাপ্রকার কারবার করিয়াও বিশেষ সুবিধা করিতে পারেন নাই। ই. বি. রেলওয়ে অডিট আপিসের চাকরিই তাঁহার জীবিকা-নির্বাহের প্রধান উপায়। দেশে কিছু দেবোত্তর সম্পত্তি এবং একটি জীর্ণ’ কালীমন্দির আছে, কিন্তু তাহার আয় সামান্য। চাকরির তাবকাশে ব্যবসায়ের চেষ্টা করেন-এ বিষয়ে শ্যালক বিপিনই তাঁহার প্রধান সহায়। সন্তানাদি নাই, কলিকাতার বাসার পত্নী এবং শ্যালক সহ বাস করেন। ব্যবসায়ের কিছু উন্নতি হইলেই চাকরি ছাড়িয়া দিবেন, এইরূপ সংকল্প আছে। সম্প্রতি ছয় মাসের ছুটি লইয়া নূতন উদ্যমে রহ্মচারী অ্যান্ড ব্রাদার-ইন-ল নামে আপিস প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। শ্যামবাবু ধর্মভীরু, লোক, পঞ্জিকা দেখিয়া জীবনযাত্রা নির্বাহ করেন এবং অবসর-মত তান্ত্রিক সাধনা করিয়া থাকেন। বৃথা-অর্থাৎ ক্ষুধা না থাকিলে মাংসভোজন, এবং অকারণে কারণ পান করেন না। কোন, সন্ন্যাসী সোনা করিতে পারে, কাহার নিকট দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ বা একমুখী রুদ্রাক্ষ আছে, কে পারদ ভস্ম করিতে জানে, এই সকল সন্ধান প্রায়ই লইয়া থাকেন। কয়েক মাস হইতে বাটীতে গৈরিক বাস পরিধান করিতেছেন এবং কতকগুলি অনুরক্ত শিষ্যও সংগ্রহ করিয়াছেন। শ্যামবাবু আজকাল মধ্যে মধ্যে নিজেকে ‘শ্রীমৎ শ্যামানন্দ বৃহ্মচারী’ আখ্যা দিয়া থাকেন, এবং অচিরে এই নামে সর্বত্র পরিচিত হইবেন এরূপ আশা করেন।
শ্যামবাবু তাঁহার আপিস-ঘরে প্রবেশ করিয়া একটি সার্ধ-ত্রিপাদ ইজিচেয়ারে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করিয়া ডাকিলেন-‘বাঞ্ছা, ওরে বাঞ্ছা।’ বাঞ্ছা শ্যামবাবুর আপিসের বেয়ারা-এতক্ষণ পাশের গলিতে টুলে বসিয়া ঢুলিতেছিল-প্রভুর ডাকে তাড়াতাড়ি উঠিয়া আসিল। শ্যামবাব, বলিলেন-‘গঙ্গাজলের বোতলটা আন, আর খাতাপত্রগুলো একটু ঝেড়ে-মুছে রাখ, যা খুলো হয়েছে।’ বাঞ্ছা একটা তামার কুপি আনিয়া দিল। শ্যামবাবু তাহা হইতে কিঞ্চিৎ গঙ্গোদ’ক লইয়া মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক গৃহমধ্যে ছিটাইয়া দিলেন। তার পর টেবিলের দেরাজ হইতে একটি সিন্দুর-চর্চিত রবার স্ট্যাম্পের সাহায্যে ১০৮ বার দুর্গানাম লিখিলেন। স্ট্যাম্পে ১২ লাইন ‘শ্রীশ্রীদুর্গা’ খোদিত আছে, সুতরাং ৯ বার ছাপিলেই কার্থোদ্ধার হয়। এই শ্রমহারক যন্ত্রটির আবিষ্কর্তা শ্রীমান বিপিন। তিনি ইহার নাম দিয়াছেন-‘দি অটোম্যাটিক শ্রীদুর্গাগ্রাফ’ এবং পেটেন্ট লইবার চেষ্টায় আছেন।
উত্তপ্রকার নিত্যক্রিয়া সমাধা করিয়া শ্যামবাবু প্রসন্নচিত্তে ব্যাগ হইতে ছাপাখানার একটি ভিজা প্রুফ বাহির করিয়া লইয়া সংশোধন করিত লাগিলেন। কিছুক্ষণ পরে জুতার মশমশ শব্দ করিতে করিতে অটলবাবু ঘরে আসিয়া বলিলেন-‘এই যে শ্যাম-দা, অনেকক্ষণ এসেছেন বৃকি? বড় দেরি হয়ে গেল, কিছু মনে করবেন না-হাইকোর্টে একটা মোশন ছিল। রাদার- ইন-ল কোথায়?”
শ্যামবাবু। বিপিন গেছে বাগবাজারে তিনকড়ি বাঁড়জ্যের কাছে। আজ পাকা কথা নিয়ে আসবে। এই এল ব’লে।
যে অটলবাবু চাপকান-চোগা-ধারী সদ্যোজাত অ্যাটর্নি, পিতার আপিসে সম্প্রতি জুনিয়ার পার্টনার-রূপে যোগ দিয়াছেন। গৌরবর্ণ, সুপুরুষ, বিপিনের বালাবন্ধ। বয়সে নিয়ার এইলেও চাতুর্যে’ পরিপক্ক। জিজ্ঞাসা করিলেন-‘বুড়ো রাজী হ’ল? আচ্ছা, কনে রবীন ?’
কি ক’রে শ্যাম। আরে তিনকড়িবাবু হলেন গে শরতের খুড়শ্বশুর। বিপিনের মান্ডুতো ভাই গরং। ঐ শরতের সঙ্গে গিয়ে তিনকড়িবাবুকে ধরি। সহজে কী রাজী হয়? বুড়ো যেমই হুজুস তেমনি সন্দিগ্ধ। বলে-আমি হলুম রায়সাহেব, রিটায়ার্ড ডেপুটি, গভরমেন্টর কোরে কৃত মান। কোম্পানির ডিরেক্টর হয়ে কি শেষে পেনশন খোয়াব? তখন নজির দিয়ে বৌ কাছে কত রিটায়ার্ড বড় বড় অফিসার তো ডিরেক্টরি করছেন, আপনার কিসের ভয়? শেষে যখন দুনলে যে, প্রতি মিটিংএ ৩২ টাকা ফী পাবে, তখন একটু, ভিজল।
অটল। কত টাকার শেয়ার নেবে।
শ্যাম। তাতে বড় হংশিয়ার। বলে তোমার ব্রহ্মচারী কোম্পানি যে লুট করবে না, তার জামিন কে? তোমরা শালা-ভগ্নীপতি মিলে ম্যানেজিং এজেন্ট হয়ে কোম্পানিকে ফেল করলে আমার টাকা কোথায় থাকবে? বললুম-মশায় আপনার মত বিচক্ষণ সাবধানী ডিরেক্টর থাকতে কার সাধ্য লুঠ করে। খরচপত্র তো আপনার চোখের সামনেই হবে। ফেল হ’তে দেবেন কেন? মন্দটা যেমন ভাবছেন, ভালর দিকটাও দেখুন। কি রকম লাভের ব্যবসা! খুব কম করেও যদি ৫০ পারসেন্ট ডিভিডেন্ড পান তবে দু-বছরের মধ্যেই তো আপনার ঘরের টাকা ঘরে ফিরে এল। শেষে অনেক তর্কাতর্কির পর বললে-আচ্ছা, আমি শেয়ার নেব, কিন্তু বেশী নয়, ডিরেক্টর হ’তে হ’লে যে টাকা দেওয়া দরকার তার বেশী নেব না। আজ মত স্থির ক’রে জানাবেন, তাই বিপিনকে পাঠিয়েছি।
অটল। অমন খুতখুতে লোক নিয়ে ভাল করলেন না শ্যাম-দা। আচ্ছা মহারাজাকে ধরলেন না কেন?
শ্যাম। মহারাজাকে ধরতে বড়-শিকারী চাই, তোমার আমার কর্ম নয়। তা ছাড়া পাঁচ
ভূতে তাঁকে শুষে নিয়েছে, কিছু আর পদার্থ রাখে নি।
অটল। খোট্টাটি ঠিক আছে তো? আসবে কখন?
শ্যাম। সে ঠিক আছে, এই রকম দাঁও মারতেই তো সে চায়। এতক্ষণ তার আসা উচিত ছিল। প্রসপেক্টসটা তোমাদের শুনিয়ে আজই ছাপাতে দিতে চাই। তিনকড়িবাবুকে আসতে বলেছিলুম, বাতে ভুগছেন, আসতে পারবেন না জানিয়েছেন।
‘রাম রাম বাবু,সাহেব
আগন্তুক মধ্যবয়স্ক, শ্যামবর্ণ, পরিধানে সাদা ধুতি, লম্বা কাল বনাতের কোট, পায়ে সার্নিশ-করা জুতা, মাথায় হলদে রঙের ভাঁজ-করা মলমলের পাগড়ি, হাতে অনেকগুলি
আংটি, কানে পান্নার মাকড়ি, কপালে ফোঁটা।
‘শ্যামবাবু, বলিলেন-‘আসুন, আসুন-ওরে বাঞ্ছা, আর একটা চেয়ার দে। এই ইনি
হচ্ছেন অলবার, আমাদের সলিসিটর দত্ত কোম্পানির পার্টনার। আর ইনি হলেন আমার বিশেষ বন্দ,-বাব, গঞ্জেরিরাম বাটপারিয়া।” গস্তোঁর। নোমে ক্ষার, আপনের নাম শুনা আছে, জান-পহচান হয়ে বড় খুশ হ’ল।
আটল। নমস্কার, এই আপনার জন্যই আমরা ব’সে আছি। আপনার মত লোক যখন আমাদের সহায়, তখন কোম্পানির আর ভাবনা কি? গুপ্তেরি। হো হে’, সোকোলি ভগবানের হিক্কা। হামি একেলা কি করতে পারি? কৃছ, ना।
রাম রাম বাবুসাহেব
শ্যাম। ঠিক, ঠিক। যা করেন মা তারা দীনতারিণী। দেখ অটল, গন্ডেরিবাবু, যে কেবল
পাকা ব্যবসাদার তা মনে করো না। ইংরেজী ভাল না জানলেও ইনি বেশ শিক্ষিত লোক,
আর শাস্ত্রেও বেশ দখল আছে।
অটল। বাঃ, আপনার মত লোকের সঙ্গে আলাপ হওয়ায় বড় সুখী হলুম। আচ্ছা মশার, আপনি এমন সুন্দর বাংলা বলতে শিখলেন কি ক’রে?
গণ্ডোর। বহতে বাঙ্গালীর সঙে হামি মিলা মিশা করি। বাংলা কিতাব ভি অনূহেক গুড়েছি। বঙ্কিমচন্দ, রবীন্দরনাথ, আউর ডি সব।
এমন সময় বিপিনবার আসিয়া পৌঁছিলেন। ইনি একটু, সাহেবী মেজাজের লোক, এককালে বিলাত যাইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। পরিধানে সাদা প্যান্ট, কাল পোক নেকটাই হাতে জল শ্যামবর্ণ, ক্ষীণকায়, গোঁফের দুই প্রাণগোট, লাল শিমবার, উদগ্রীব হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন-‘কি হ’ল?
“বিপিন। ডিরেক্টর হবেন বলেছেন, কিন্তু মাত্র দু-হাজার টাকার শেয়ার নেবেন। তোমাকে অটলকে আমাকে পরশু সকালে ভাত খাবার নিমন্ত্রণ করেছেন। এই নাও চিঠি।
অটল। তিনকড়িবাবু, হঠাৎ এত সদয় যে?
শ্যাম। বুঝলুম না। বোধ হয় ফেলো ডিরেক্টরদের একবার বাজিয়ে যাচাই করে নিতে চান। অটল। যাক, এবার কাজ আরম্ভ করুন। আমি মেমোরান্ডম আর আর্টিকসের মুসাবিদা এনেছি। শ্যাম-দা, প্রসপেক্টসটা কি রকম লিখলেন পড়ুন। শ্যাম। হাঁ, সকলে মন দিয়ে শোন। কিছু বদলাতে হয় তো এই বেলা। দুর্গা-দুর্গা-জয় সিদ্ধিদাতা গণেশ ১৯১৩ সালের ৭ আইন অনুসারে রেজিস্ট্রিত শ্রীশ্রীসিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড মূলধন-দশ লক্ষ টাকা, ১০, হিসাবে ১০০,০০০ অংশে বিভক্ত। আবেদনের সঙ্গে অংশ-পিছ, ২. প্রদেয়। বাকী টাকা চার কিস্তিতে তিন মাসের নোটিসে প্রয়োজন-মত দিতে হইবে।
অনুষ্ঠানপত্র
ধর্ম’ই হিন্দুগণের প্রাণস্বরূপ। ধর্মকে বাদ দিয়া এ জাতির কোনও কর্ম’ সম্পন্ন হয় না। অনেকে বলেন-ধর্মের ফল পরলোকে লভ্য। ইহা আংশিক সত্য মাত্র। বস্তুত ধর্মবৃত্তির উপযুক্ত প্রয়োগে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয়বিধ উপকার হইতে পারে। এতদর্থে সদ্য সদ্য চতুর্বর্গ’ লাভের উপায়স্বরূপ এই বিরাট ব্যাপারে দেশবাসীকে আহহ্বান করা হইতেছে। ভারতবর্ষের বিখ্যাত দেবমন্দিরগুলির কিরূপ বিপুল আয় তাহা সাধারণে জ্ঞাত নহেন। রিপোর্ট হইতে জানা গিয়াছে যে বঙ্গদেশের একটি দেবমন্দিরের দৈনিক যাত্রিসংখ্যা গড়ে ১৫ হাজার। যদি লোক-পিছু চার আনা মাত্র আয় ধরা যায়, তাহা হইলে বাৎসরিক আয় প্রায় সাড়ে তের লক্ষ টাকা দাঁড়ায়। খরচ যতই হউক, যথেষ্ট টাকা উদ্‌বৃত্ত থাকে। কিন্তু সাধারণে এই লাভের অংশ হইতে বঞ্চিত।
দেশের এই বৃহৎ অভাব দূরীকরণার্থে ‘শ্রীশ্রীসিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড’ নামে একটি জয়েন্ট- স্টক কোম্পানি স্থাপিত হইতেছে। ধর্মপ্রাণ শেয়ারহোল্ডারগণের অর্থে একটি মহান তীর্থ- ক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠা হইবে, জাগ্রত দেবী সমন্বিত সুবৃহৎ মন্দির নির্মিত হইবে। উপযুক্ত ম্যানেজিং এজেন্টের হস্তে কার্য-নির্বাহের ভার ন্যস্ত হইয়াছে। কোনও প্রকার অপব্যয়ের সম্ভাবনা নাই। শেয়ারহোল্ডারগণ আশাতীত দক্ষিণা বা ডিভিডেন্ড পাইবেন এবং একাধারে ধর্ম অর্থ মোক্ষ লাভ করিয়া ধন্য হইবেন।
ডিরেক্টরগণ।- (১) অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ বিচক্ষণ ডেপুটি-ম্যাজিস্ট্রেট রায়সায়েব শ্রীযুত্ব তিনকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়। (২) বিখ্যাত ব্যবসাদার ও ক্রোরপতি শ্রীযুক্ত গন্ডেরিরাম বাট, পারিয়া। (৩) সলিসিটস’ দত্ত অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার শ্রীযুক্ত অটলবিহারী দত্ত, M. A., B. L. (৪) বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক মিস্টার বি. সি. চৌধুরী, B. Sc., A. S. S (U.S.A.) (৫) কালীপদাশ্রিত সাধক ব্রহ্মচারী শ্রীমৎ শ্যামানন্দ (ex-officio)।
অটলবাবু, বাধা দিয়া বলিলেন-‘বিপিন আবার নতুন টাইটেল পেল কবে?” শ্যাম। আর বল কেন। পঞ্চাশ টাকা খরচ ক’রে আমেরিকা না কামস্কাটকা কোথা থেতে তিনটে হরফ আনিয়েছে।
বিপিন। বা, আমার কোয়ালিফিকেশন না জেনেই বুঝি তারা শুধু শুধু একটা ডিগ্রী দিলে? ডিরেক্টর হাতে গেলে একটা পদবী থাকা ভাল নয়? গন্ধেরি। ঠিক বাত। ভেক বিনা ভিখ মিলে না। শ্যামবাবু, আপনিও এখনসে ধোতি- উতি ছোড়ে লঙোটি পিনহন।
শ্যাম। আমি তো আর নাগা সন্ন্যাসী নই। আমি হলুম শক্তিমন্ত্রের সাধক, পরিধেয় হ’ল রক্তাম্বর। বাড়িতে তো গৈরিকই ধারণ করি। তবে আপিসে প’রে আসি না, কারণ, ব্যাটারা সব হাঁ করে চেয়ে থাকে। আর একটু, লোকের চোখ-সহা হয়ে গেলে সর্বদাই গৈরিক পরব। যাক, পড়ি শোন-মেসার্স ব্রহ্মচারী অ্যান্ড ব্রাদার-ইন-ল এই কোম্পানির ম্যানেজিং এজেন্সি লইতে স্বীকৃত হইয়াছেন-ইহা পরম সৌভাগ্যের বিষয়। তাঁহারা লাভের উপর শতকরা দুই টাকা মাত্র কমিশন লইবেন, এবং যতদিন না-অটলবাবু, বলিলেন-‘কমিশনের রেট অত কম ধরলেন কেন? দশ পার্সেন্ট অনায়াসে ফেলতে পারেন।’
গণ্ডেরি। কুছ দরকার নেই। শ্যামবাবুর পরবস্তি অনেসে হোয়ে যাবে। কমিশনের ইরাদা থোড়াই করেন।
এবং যতদিন না কমিশনে মাসিক ১০০০, টাকা পোষায়, ততদিন শেষোক্ত টাকা অ্যালা- ওয়েন্স রূপে পাইবেন।
গণ্ডোর। শুনেন অটলবাবু, শূনেন। আপনি শ্যামবাবুকে কী শিখাবেন?
হুগলী জেলার অন্তঃপাতী গোবিন্দপুর গ্রামে সিদ্ধেশ্বরী দেবী বহু শতাব্দী যাবৎ প্রতিষ্ঠিত আছেন। দেবীমন্দির ও তৎসংলগ্ন দেবত্র সম্পত্তির স্বত্বাধিকারিণী শ্রীমতী নিস্তারিণী দেবী সম্প্রতি স্বপ্নাদেশ পাইয়াছেন যে উত্ত গোবিন্দপুর গ্রামে অধুনা সর্ব- পীঠের সমন্বয় হইয়াছে এবং মাতা তাঁহার মাহাত্মোর উপযোগী সুবৃহৎ মন্দিরে বাস করিতে ইচ্ছা করেন। শ্রীমতী নিস্তারিণী দেবী অবলা বিধায় এবং উক্ত দৈবাদেশ স্বয়ং পালন করিতে অপারগ বিধায়, উক্ত দেবত্র সম্পত্তি মায় মন্দির বিগ্রহ জমি আওলাত আদি এই লিমিটেড কোম্পানিকে সমর্পণ করিতেছেন। আল। নিস্তারিণী দেবী আবার কোথা থেকে এলেন? সম্পত্তি তো আপনার বালেই “শ্যাম। উনি আমার স্ত্রী। সেদিন তাঁর নামেই সব লেখাপড়া ক’রে দিয়েছি। আমি এসব জানতুম। বৈহয়িক ব্যাপারে লিপ্ত থাকতে চাই না।
প্রশ্মেরি। ভালা বন্দোবস্ত, কিয়েছেন। আপনেকো কোই দুসবে না। নিস্তাণী দেবীকো কোন পহচানে। দাম কেতো লিচ্ছেন?
অতঃপর তীর্থ প্রতিষ্ঠা, মন্দিরনির্মাণ, দেবসেবাদি কোম্পানি কর্তৃক সম্পন্ন হইবে এবং এতদর্থে কোম্পানি মাত্র ১৫,০০০, টাকা পণে সমস্ত সম্পত্তি খরিদার্থে বায়না করিয়াছেন।
গন্ধেরি। হন্দু, কিয়া শ্যামবাবু। জঙ্গল কি ভিতর, পুরানা মন্দিল, উম্মে দো-চার শও এছন্দর, ছটাক ভর জমীন, উস্ত্পর দো-চার বাঁশ ঝাড়-বস্, ইসিকা দাম পন্দ্র হজার।
শ্যাম। কেন, অন্যায়টা কি হ’ল? স্বপ্নাদেশ, একান্ন পাঁঠ এক ঠাঁই, জাগ্রত দেবী-এসব বুঝি কিছু নয়? গুড-উইল হিসেবে পনের হাজার টাকা খুবই কম। গণ্ডোর। আচ্ছা। যদি কোই শেয়ারহোল্ডার হাইকোট মে দরখাস্ত পেশ করে-স্বপন- উপন সব ঝুট, ছকুলায়কে রূপয়া লিয়া-তব্?
অটল। সে একটা কথা বটে, কিন্তু এই সব আধিদৈবিক ব্যাপার বোধ হয় অরিজিনাল – সাইডের জুরিসডিকশনে পড়ে না।-আইন বলে-caveat emptor, অর্থাৎ ক্রেতা সাবধান! সম্পত্তি কেনবার সময় যাচাই কর নি কেন? যা হোক, একবার expert opinion নেব।
শীঘ্রই নতেন দেবালয় আরম্ভ হইবে। তৎসংলগ্ন প্রশস্ত নাটমন্দির, নহবতখান্য, ভোগশালা, ভাণ্ডার প্রভৃতি আনুষঙ্গিক গৃহাদিও থাকিবে। আপাততঃ দশ হাজার যাত্রীর উপযুক্ত অতিথিশালা নির্মিত হইবে। শেয়ারহোল্ডারগণ বিনা খরচায় সেখানে সপরিবারে বাস করিতে পারিবেন। হাট বাজার যাত্রা থিয়েটার বায়োস্কোপ ও অন্যান্য আমোদ-প্রমোদের আয়োজন যথেষ্ট থাকিবে। যাঁহারা দৈবাদেশ বা ঔষধ-প্রাপ্তির জন্য হত্যা দিবেন তাঁহাদের জন্য বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা থাকিবে। মোট কথা, তীর্থযাত্রী আকর্ষণ করিবার সর্বপ্রকার উপায়ই অবলম্বিত হইবে। স্বয়ং শ্রীমৎ শ্যামানন্দ ব্রহ্মচারী সেবার ভার লইবেন।
যাত্রিগণের নিকট হইতে যে দর্শনী ও প্রণামী আদায় হইবে, তাহা ভিন্ন আরও নানা উপায়ে অর্থাগম হইবে। দোকান হাট বাজার অতিথিশালা মহাপ্রসাদ বিক্রয় প্রভৃতি হইতে প্রচুর আয় হইবে। এতদ্ভিন্ন by-product recoveryর ব্যবস্থা থাকিবে। ‘সেবার ফুল হইতে সুগন্ধি তৈল প্রস্তুত হইবে এবং প্রসাদী বিল্বপত্র মাদুলীতে ভরিয়া বিক্রীত হইবে। চরণামৃতও বোতলে প্যাক করা হইবে। বলির জন্য নিহত ছাগলসমূহের চর্ম ট্যান করিয়া উৎকৃষ্ট কিড-স্কিন প্রস্তুত হইবে এবং বহুমূল্যে বিলাতে চালান যাইবে। হাড় হইতে বোতাম হইবে। কিছুই ফেলা যাইবে না।
দিন। গল্ডেরি। বকড়ি মারবেন? হামি ইসুমে নেহি, রামজী কিরিয়া। হামার নাম কাটিয়ে শ্যাম। আপনি তো আর নিজে বলি দিচ্ছেন না। আচ্ছা, না হয় কুমড়ো-বলির ব্যবস্থা করা যাবে।
ঐসী গতি সসারমে
অটল। কুমড়োর চামড়া তো ট্যান হবে না। আয় ক’মে যাবে। কিহে বৈজ্ঞানিক, কুমড়োর খোসার একটা গতি করতে পার?
বিপিন। কস্টিক পটাশ দিয়ে বয়েল করলে বোধ হয় ভেজিটেবল শূ হ’তে পারে। এক্সপেরিমেন্ট ক’রে দেখব।
গন্ডেরি। জো খুশি করো। হমার কি আছে। হামি থোড়া রোজ বাদ আপ্না শেয়ার বিলকুল বেচে দিব।
হিসাব করিয়া দেখা হইয়াছে যে কোম্পানির বাৎসরিক লাভ অন্ততঃ ১২ লক্ষ ঢাকা হইবে এবং অনায়াসে ১০০ পারসেন্ট ডিভিডেন্ট দেওয়া যাইবে। ৩০ হাজার শেয়ারের আবেদন পাইলে অ্যালটমেন্ট হইবে। সত্বর শেয়ারের জন্য আবেদন করুন। বিলম্বে এই সুবর্ণ সুযোগ হইতে বঞ্চিত হইবেন।
গণ্ডোর। লিখে লিন-ঢাই লাখ টাকার শেয়ার বিক্রি হয়ে গেছে। হামি এক লাখ লিব, লাকী দেড় লাখ শ্যামবাবু, বিপিনবাবু, অটলবাবু, সমান হিস্স্সা লিবেন।
শ্যাম। পাগল আর কি! আমি আর বিপিন কোথা থেকে পঞ্চাশ-পঞ্চাশ হাজার বার করব? আপনারা না হয় বড়লোক আছেন।
গন্ডেরি। হামি-শালা রূপয়া জালবো আর তুমি লোগ মৌজ করবে? সো হোবে না। সবকা ঝোঁখি লেনা পড়েগা। শ্যামবাবু মতলব সমঝলেন না? টাকা কোই দিব না। সব হাওলাতী থাকবে। মেনেজিং এজিন্ট মহাজন হোবে।
অটল। বুঝলেন শ্যাম-দা? আমরা সকলে যেন ম্যানেজিং এজেন্টসদের কাছ থেকে কজ’ ক’রে নিজের নিজের শেয়ারের টাকা কোম্পানিকে দিচ্ছি; আবার কোম্পানি ঐ টাকা ম্যানেজিং এরচাইয়ের কাছে গচ্ছিত রাখছে। গাঁট থেকে এক পয়সাও কেউ দিচ্ছেন না, টাকাটা কেবল পাম। তার পর তাল সামলাবে কে? কোম্পানি ফেল হলে আমি মারা যাই আর কি। একাপরে জমা থাকবে।
বর্তী কলের টাকা দেব কোথা থেকে?
বস্ফোর। ভরেন কেনো? শেয়ার পিছ তো অভি দো টাকা দিতে হোবে। ঢাই লাখ টাকার শেহরে সিক’ পচাস হজার দেনা হোয়। প্রিমিয়ম মে সব বেচে দিব-স.বিস্তা হোয় তো ভট্টর ডি শেয়ার ধ’রে রাখবো। বহুত মুনাফা মিলবে। ডিম ডিমল ব্রোকারসে হামি বন্দো- যস্ত কিয়েছি। দো চার দফে হম লোগ আপনা আপনি শেয়ার লেকে খেলবো, হাঁথ বদলাবো, এবে, বাজার গরম হোবে। তখন সব কোই দাম চাবে, কণীয়জী কি বচন শুনিয়ে- শেয়ার মাংবে, দাম কা বিচার করবে না।
ঐসী গতি সসারমে যো গাড়র কি ঠাট এক পড়া যব গাঢ়মে সবে যাত তেহি বাট ॥
জানি হচ্ছে-সন সারের লোক সব যেন ভেড়ার পাল। এক ভেড়া যদি খান্দেমে গির পড়ে তো সব কোই উসিমে ঘুসে।
সামবার, দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়িয়া বলিলেন-‘তারা ব্রহ্মময়ী, তুমিই জান। আমি তো সিমিত মাত্র। তোমার কাজ তুমিই উদ্ধার ক’রে দাও মা-অধম সন্তানকে যেন মেরো না।’ পাল্ডোর। শ্যামবাবু, মন্দিল-উদ্ন্দিলকা কোম্পানি যো করুনা হ্যায় কিজিয়ে। উকি
সাথ ঘই-এর কারবার ভি লাগায় দিন। ঢাকায় টাকা লাভ।
আল। ঘই কি চিজ?
গণ্ডোর। ঘই জানেন না? ঘিউ হচ্ছে আলি চিজ-যো গায় ভ’ইস বকড়িকা দুধসে যান। আউর নলি যো হ্যায় সো ঘই কহলাতা। চর্বি, চীনা-বাদাম তল ওগায়রহ মিলা একর বনায়া যাতা। পর্ সাল হামি ঘই-এর কামে পচিশ হজার লাগাই, সাঢ়ে চৌবিশ হাজার
হনাফা মিলে। অটল। উঃ বিস্তর সাপ মেরেছিলেন বলুন!
গন্ধেরি। আরে সাঁপ কাঁহাসে মিলবে? উ সব ঝুট বাত।
অটল। আচ্ছা গণ্ডারজী-গণ্ডেরি। গণ্ডার নেহি, গন্ডেরি।
অটল। হাঁ, হাঁ, গন্ডেরিজী। বেগ ইওর পার্ডন। আচ্ছা, আপনি তো নিরামিষ খান, ফোঁটা কাটেন, ভজন-পূজনও করেন। গণ্ডোর। কেনো করবো না? হামি হর্ রোজ গীতা আউর রামচরিতমানস পড়ি, রামভজন ডি করি।
অটল। তবে অমন পাপের ব্যবসাটা করলেন কি ব’লে?
গণ্ডেরি। পাঁপ? হামার কেনো পাঁপ হোবে? বেবসা তো করে কাসেম আলি। হামি রহি কলকাত্তা, ঘই বনে হাথরসূমে। হামি ন আঁখসে দেখি, ন নাকসে শুংখি-হল,মানজী কিরিয়া। হামি তো সিফ মহাজন আছি-রূপয়া দে কর খালাস। সুদ লি, মানাফার আধা হিস্সা ভি লি। যদি হামি টাকা না দি, কাসেম আলি দুসরা ধনীসে লিবে। পাঁপ হোবে তো শালা কাসেম আলিকা হোবে। হমার কি? যদি ফিন কুছ দোষ লাগে-জানে রনছোড়জী-হমার পুনভি থোড়া-বহৃত জমা আছে। একাসী, শিউরাত, রামনওমীদে উপবাস, দান-খয়রাত ভি কুছ করি। আট আটঠো ধরমশালা বানোআয়া-লিলয়ামে বালিমে, শেওড়াফলিমে-অটল। লিলুয়ার ধর্মশালা তো আশরফিলাল মুনঠুনওয়ালা করেছে।
গণ্ডোর। কিয়েছে তো কি হইয়েছে? সভি তো ওহি কিয়েছে। লেকিন বানিয়ে দিয়েছে কোন? তদারক কোন কিয়েছে? ঠিকাদার কোন লাগিয়েছে? সব হামি। আশরফি হমার চাচেরা ভাই লাগে। হামি সলাহ দিয়েছি তব না রূপয়া খরচ কিয়েছে। অটল। মন্দ নয়, টাকা ঢাললে আশরাফ, পুণ্য হ’ল গন্ডেরির।
গন্ধেরি। কেনো হোবে না? দো দো লাখ রূপেয়া হর জগেমে খরচ দিয়া। জোড়িয়ে তো কেতনা হোয়। উস পর কমসে কম স’য়কড়া পাঁচ রূপয়া দস্তুরি তো হিসাব কিজিয়ে। হাম তো বিলকুল ছোড় দিয়া। আশরফিলালকা পুন যদি সোলহ লাখকা হোয়, মেরা ভি অসাসি হজার মোতাবেক হোনা চাহ্তা। অটল। চমৎকার ব্যবস্থা! পুণ্যেরও দেখছি দালালি পাওয়া যায়। আমাদের শ্যাম-দাগঞ্জেরি-দা যেন মানিকজোড়। গন্ধেরি। অটলবাবু, আপনি দো চার অংরেজী কিতাব পড়িয়ে হামাকে ধরম কি শিখলাবেন? বঙ্গালী ধরম জানে না। তিস রূপয়ার নোকরি করবে, পাঁচ পইসার হরিলুঠ দিবে। হামার জাত রূপয়া ভি কামায় হিসাবসে, পুন্ ভি করে হিসাবসে। আপনেদের ববীন্দরনাথ কি লিখছেন বৈরাগ সাধন মুক্তি সো হমার নহি।
হামি এখন চলছি, রেস খেলনে। কোন্ট্রি গেরিল ঘোড়ে পর্ আজ দো-চারশও লাগিয়ে দিব। অটল। আমিও উঠি শ্যাম-দা। আর্টিকেলের মুসাবিদা রেখে যাচ্ছি, দেখে রাখবেন। প্রসপেক্টস তো দিব্বি হয়েছে। একটু-আধটু, বদলে দেব এখন। পরশ, আবার দেখা হবে। নমস্কার।
বাগবাজারে গলির ভিতর রায়সাহেব তিনকড়িবাবুর বাড়ি। নীচের তলায় রাস্তার সম্মুখে নাতিবৃহৎ বৈঠকখানা-ঘরে গৃহকর্তা এবং নিমন্ত্রিতগণ গল্পে নিরত, অন্দর হইতে কখন ভোজনের ডাক আসিবে তাহারই প্রতীক্ষা করিতেছেন। আজ রবিবার, তাড়া নাই, বেলা অনেক হইয়াছে।
তিনকড়িবাবুর বয়স ষাট বৎসর, ক্ষীণ দেহ, দাড়ি কামানো। শীর্ণ গোঁফে তামাকের ধোঁয়ায় পাকা খেজুরের রং ধরিয়াছে-কথা কহিবার সময় আরসোলার দাড়ার মত নড়ে। তিনি দৈব ব্যাপারে বড় একটা বিশ্বাস করেন না। প্রথম পরিচয়ে শ্যামবাবুকে বুজরুক সাবাস্ত করিয়াছিলেন, কেবল লাভের আশায় কম্পানিতে যোগ দিয়াছেন। কিন্তু আজ কালীঘাট হইতে প্রত্যাগত সদ্যঃস্নাত শ্যামবাবুর অভিনব মূর্তি দেখিয়া কিঞ্চিৎ আকৃষ্ট হইয়াছেন। শ্যামবাবুর পরিধানে লাল চেলী, গেরুয়া রঙের আলোয়ান, পায়ে বাঘের চামড়ার শিং-তোলা জুতা। দাড়ি এবং চুল সাজিমাটি দ্বারা যথাসম্ভব ফাঁপানো, এবং কপালে মস্ত একটি সিন্দুরের ফোঁটা।
তিনকড়িবাব, তামাক-টানার অন্তরালে বলিতেছিলেন-দেখুন স্বামীজী, হিসেবই হ’ল ব্যবসার সব। ডেবিট ক্রেডিট যদি ঠিক থাকে, আর ব্যালান্স যদি মেলে, তবে সে বিজনেসের কোনও ভয় নেই।’ নিশ্যামবাবু। আজ্ঞে, বড় যথার্থ’ কথা বলেছেন। সেইজন্যেই তো আমরা আপনাকে চাই।
আপনাকে আমরা মধ্যে মধ্যে এসে বিরক্ত করব, হিসেব সম্বন্ধে পরামর্শ নেবাপন “পতিনকড়ি। বিলক্ষণ, বিরক্ত হব কেন। আমি সমস্ত হিসেব ঠিক ক’রে দেব। মিটিংগুলো একট, ঘন ঘন করবেন বুঝি নায় ডিরেক্টরস, ফী বাবদ কিছু, বেশী খরচ হবেটিগেলো অডিটার-ফডিটার আমি বুঝি না। আরে বাপ, নিজের জমাখরচ যদি নিজে না বুঝলি তবে বাইরের একটা অর্বাচীন ছোকরা এসে তার কি বুঝবে? ভারী আজকাল সব বলি তবে শিখেছেন! সে কি জানেন-একটা গোলকধাঁধা, কেউ যাতে না বোঝে তারই কেজ কিপিং বুঝি-রোজ কত টাকা এল, কত খরচ হ’ল, আর আমার মজুদ রইল কত। আমি যখন আমড়াগাছি সবডিভিজনের ট্রেজারির চার্জে’, তখন এক নতুন কলেজ-পাস গোঁফকামানো ডেপুটি এলেন আমার কাছে কাজ শিখতে। সে ছোকরা কিছুই বোঝে না, অথচ অহংকারে ভরা। আমার কাজে গলদ ধরবার আস্পর্ধা। শেষে লিখলুম কোল্ডহাম সাহেবকে, যে হজের তোমরা রাজার জাত, দু-ঘা দাও তাও সহ্য হয়, কিন্তু দেশী ব্যাঙাচির লাথি বরদাস্ত করব না। তখন সাহেব নিজে এসে সমস্ত বুঝে নিয়ে আড়ালে ছোকরাকে ধমকালেন। আমাকে পিঠ চাপড়ে হেসে বললেন-ওয়েল তিনকড়িবাবু, তুমি হ’লে কতকালের সিনিয়র অফিসর, একজন ইয়ং চ্যাপ তোমার কদর কি বুঝবে? তার পর দিলেন আমাকে নওগাঁয়ে গাঁজা-গোলার চার্জে বদলি ক’রে। যাক সে কথা। দেখুন, আমি বড় কড়া লোক। জবরদস্ত হাকিম ব’লে আমার নাম ছিল। মন্দির টন্দির আমি বুঝি না, কিন্তু একটি আধলাও কেউ আমাকে ফাঁকি দিতে পারবে না। রক্ত জল করা টাকা আপনার জিম্মায় দিচ্ছি, দেখবেন যেন-
শ্যাম। সে কি কথা! আপনার ঢাকা আপনারই থাকবে আর শতগুণ বাড়বে। এই দেখুন না-আমি আমার যথাসর্বস্ব পৈতৃক পঞ্চাশ হাজার টাকা এতে ফেলেছি। আমি না হয় সর্ব- ত্যাগী সন্ন্যাসী, অর্থে প্রয়োজন নেই, লাভ যা হবে মায়ের সেবাতেই ব্যয় করব। বিপিন আর এই অটল ভায়াও প্রত্যেকে পঞ্চাশ হাজার ফেলেছেন। গন্ডেরি এক লাখ টাকার শেয়ার
নিয়েছে। সে মহা হিসেবী লোক-লাভ নিশ্চিত না জানলে কি নিত? তিনকড়ি। বটে, বটে? শুনে আশ্বাস হচ্ছে। আচ্ছা, ‘একবার কোল্ডহাম সাহেবকে কনসল্ট করলে হয় না? অমন সাহেব আর হয় না।
ঠাঁই হয়েছে’-চাকর আসিয়া খবর দিল।
‘উঠতে আজ্ঞা হ’ক ব্রহ্মচারী মশায়, আসুন অটলবাবু, চল হে বিপিন।’ তিনকড়িবাবু, সকলকে অন্দরের বারান্দায় আনিলেন।
শ্যামবাবু, বলিলেন-‘করেছেন কি রায়সাহেব, এ যে রাজসূয় যজ্ঞ। কই আপনি বসলেন না!’
তিনকড়ি। বাতে ভুগছি, ভাত খাইনে দু-খানা সুজির রুটি বরাদ্দ।
শ্যাম। আমি একটি ফেৎকারিণী-তন্ত্রোক্ত কবচ পাঠিয়ে দেব, ধারণ ক’রে দেখবেন। শাক- ভাজা, কড়াইয়ের ডাল-এটা কি দিয়েছ ঠাকুর, এ’চোড়ের ঘণ্ট? বেশ, বেশ? শোধন করে নিতে হবে। সুপক কদলী আর গব্যঘৃত বাড়িতে হবে কি? আয়ুর্বেদে আছে-পনসে কদলং কদলে ঘতম্। কদলীভক্ষণে পনসের দোষ নষ্ট হয়, আবার ঘৃতের দ্বারা কদলীর শৈত্যগুণ দূর হয়। পুঁটিমাছ ভাজা-বাঃ। রোহিতাদপি রোচকাঃ পুণ্টিকাঃ সদ্যভর্জিতাঃ। ওটা কিসের অম্বল বললে-কামরাঙা? সর্বনাশ, তুলে নিয়ে যাও। গত বৎসর শ্রীক্ষেত্রে গিয়ে ঐ ফলটি জগন্নাথ প্রভুকে দান করেছি। অম্বল জিনিসটা আমার সয়ও না-শ্লেষ্মার ধাত কি না। উত্প, উদ্‌প, উদ্‌প। প্রাণায় আপনায় সোপানায় স্বাহা। শয়নে পদ্মনাভণ্ড ভোজনে তু জনার্দনম্। আরম্ভ কর হে অটল।
অটল। (জনান্তিকে) আরম্ভের ব্যবস্থা যা দেখছি তাতে বাড়ি গিয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে হবে।
তিনকড়ি। আচ্ছা ঠাকুরমশায়, আপনাদের তন্ত্রশাস্ত্রে এমন কোন প্রক্রিয়া নেই যার দ্বারা লোকের-ইয়ে-মানমর্যাদা বৃদ্ধি পেতে পারে?
শ্যাম। অবশ্য আছে। যথা কুলাগবে-অমানিনা মানদেন। অর্থাৎ কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রতা হ’লে অমানী ব্যক্তিকেও মান দেন। কেন বলুন তো?
তিনকড়ি। হাঃ হাঃ, সে একটা তুচ্ছ কথা। কি জানেন, কোল্ডহাম সাহেব বলেছিলেন, সুবিধা পেলেই লাট সাহেবকে ধ’রে আমায় বড় খেতাব দেওয়াবেন। বার বার তো রিমাইন্ড করা ভাল দেখায় না তাই ভাবছিলুম যদি তন্ত্রে-মন্ত্রে কিছু হয়। মানিনে যদিও, তবুও-শ্যাম। মানতেই হবে। শাস্ত্র মিথ্যা হতে পারে না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, এ বিষয়ে আমার সমস্ত সাধনা নিয়োজিত ক’রব। তবে সদ্‌গুরু প্রয়োজন, দীক্ষা ভিন্ন এসব কাজ হয় না। গুরুও আবার যে সে হ’লে চলবে না। খরচ-তা আমি যথা সম্ভব অল্পেই নির্বাহ করতে পারব।
তিনকড়ি। হং। দেখা যাবে এখন। আচ্ছা, আপনাদের আপিসে তো বিস্তর লোকজন দরকার হবে, তা-আমার একটি শালীপো আছে, তার একটা হিল্লে লাগিয়ে দিতে পারেন না? বেকার ব’সে ব’সে আমার অন্ন ধ্বংস করছে, লেখাপড়া শিখলে না, কুসঙ্গে মিশে বিগড়ে গেছে। একটা চাকরি জুটলে বড় ভাল হয়। ছোকরা বেশ চটপটে আর স্বভাব-চরিত্রও বড় ভাল।
শ্যাম। আপনার শালীপো? কিছু বলতে হবে না। আমি তাকে মন্দিরের হেড-পাণ্ডা ক’রে দেব। এখনি গোটা-পনর দরখাস্ত এসেছে-তার মধ্যে পাঁচজন গ্রাজুয়েট। তা আপনার আত্মীয়ের ক্রেম সবার ওপর।
তিনকড়ি। আর একটি অনুরোধ। আমার বাড়িতে একটি পুরনো কাঁসর আছে-একট, ফেটে গেছে, কিন্তু আদত খাঁটী কাঁসা। এ জিনিসটা মন্দিরের কাজে লাগানো যায় না?
সস্তায় দেব। শ্যাম। নিশ্চয়ই নেব। ওসব সেকেলে জিনিস কি এখন সহজে মেলে?
গন্ডেরির ভবিষ্যদ্‌‌বাণী সফল হইয়াছে। বিজ্ঞাপনের জোরে এবং প্রতিষ্ঠাঙ্গণের চেষ্টায় সমস্ত শেয়ারই বিলি হইয়া গিয়াছে। লোকে শেয়ার লইবার জন্য অস্থির, বাজারে চড়া দামে বেচা-কেনা হইতেছে।
অটলবাবু বলিলেন-‘আর কেন শ্যাম-দা, এইবার নিজের শেয়ার সব ঝেড়ে দেওয়া যাক।
গন্ডেরি তো খুব একচোট মারলে। আজকে ডবল দর। দু-দিন পরে কেউ ছোঁবেও না।’ শ্যাম। বেচতে হয় বেচ, মোদ্দা কিছু তো হাতে রাখতেই হবে, নইলে ডিরেক্টর হবে কি ক’রে?
অটল। ডিরেক্টরি আপনি করুন গে। আমি আর হাঙ্গামায় থাকতে চাইনে। সিদ্ধেশ্বরীর কৃপায় আপনার তো কার্যসিদ্ধি হয়েছে।
শ্যাম। এই তো সবে আরম্ভ। মন্দির, ঘরদোর, হাট-বাজার সবই তো বাকি। তোমাকে কি এখন ছাড়া যায়?
মরসুমে চলল। আমাদের এইখানে শেষ। পিঠে সয়। এখন তো রাদার-ইন-ল কোম্পানির শ্যাম। আরে বাসত তার বেকন নিয়ে যাত্রায় কি পৃথক ফল হয়? সন্ধ্যেবেলা যাব এখন তোমাদের বাড়িতে, গন্ডেরিকেও যাব।
দেড় বৎসর কাটিয়া গিয়াছে। ব্রহ্মচারী অ্যান্ড ব্রাদার-ইন-ল কোম্পানীর আপিসে ডিরেক্টরগণের সভা বসিয়াছে। সভাপতি তিনকড়িবাবু টেবিলে ঘুষি মারিয়া বলিতেছিলেন চরেই আ-আমি জানতে চাই, টাকা সব গেল কোথা। আমার তো বাড়িতেই টেকা ভাব- সবই এসে তাড়া দিচ্ছে। কয়লাওয়ালা বলে তার প’চিশ হাজার টাকা পাওনা, ইটখোলার ঠিকাদার বলে বারো হাজার, আদালতে ছাপাখানাওলা, শার্পার কোম্পানী, কুণ্ডু মুখুজো, আরও কত কে আছে। বলে আদালতে যাব। মন্দিরের কোথা কি তার ঠিক নেই-এর মধ্যে দু-লাখ টাকা ফ’কে গেল?
আ-আ-আমি জানতে চাই
 সে ভন্ড জোচ্চোরটা গেল কোথা? শুনতে পাই ডাবে মেরে
আছে, আপিসে, বড় একটা আসে না।’
অটল। ব্রহ্মচারী বলেন, মা তাঁকে অন্য কাজে ডাকছেন-এদিকে আর তেমন মন নেই। আজ তো মিটিংএ আসবেন বলেছেন।
বিপিন বলিলেন-‘ব্যস্ত হচ্ছেন কেন সার, এই তো ফর্দ রয়েছে, দেখুন না জমি- এক কেনা, শেয়ারের দালালি, preliminary expense, ইট-তৈরী, establishment, বিজ্ঞাপন, আপিস-খরচ-তিনকড়ি। চোপ রও ছোকরা। চোরের সাক্ষী গাঁটকাটা।
এমন সময় শ্যামবাবু আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বলিলেন-‘ব্যাপার কি?’ তিনকড়ি। ব্যাপার আমার মাথা। আমি হিসেব চাই।
শ্যাম। বেশ তো, দেখুন না হিসেব। বরঞ্চ একদিন গোবিন্দপুরে নিজে গিয়ে কাজকম তদারক ক’রে আসুন।
তিনকড়ি। হ্যাঁ, আমি এই বাতের শরীর নিয়ে তোমার ধ্যাধ্যেড়ে গোবিন্দপুরে গিয়ে মরি আর কি। সে হবে না-আমার টাকা ফেরত দাও। কোম্পানি তো যেতে বসেছে। শেয়ার- হোল্ডাররা মার-মার কাট-কাট করছে।
শ্যামবাবু কপালে যুক্তকর ঠেকাইয়া বলিলেন-‘সকলই জগন্মাতার ইচ্ছা। মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। এতদিন তো মন্দির শেষ হওয়ারই কথা। কতকগুলো অজ্ঞাতপূর্ব কারণে খরচ বেশী হয়ে গিয়ে টাকার অনটন হয়ে পড়ল, তাতে আমাদের আর অপরাধ কি? কিন্তু চিন্তার কোনও কারণ নেই, ক্রমশ সব ঠিক হয়ে যাবে। আর একটা call-এর টাকা তুললেই সমস্ত দেনা শোধ হয়ে যাবে, কাজও এগোবে।’
গণ্ডোর বলিলেন-‘আউর টাকা কোই দিবে না, আপকো ঘোড়াই বিশোআস করবে।’ শ্যাম। বিশ্বাস না করে, নাচার। আমি দায়মুক্ত, মা যেমন ক’রে পারেন নিজের কাজ চালিয়ে নিন। আমাকে বাবা বিশ্বনাথ কাশীতে টানছেন, সেখানেই আশ্রয় নেব।
তিনকড়ি। তবে বলতে চাও, কোম্পানি ডুবল?
গণ্ডেরি। বিশ হাঁথ পানি।
শ্যাম। আচ্ছা তিনকড়িবাবু, আমাদের ওপর যখন লোকের এতই আবিশ্বাস, বেশ তো, আমরা না হয় ম্যানেজিং এজেন্সি ছেড়ে দিচ্ছি। আপনার নাম আছে, সভ্রম আছে, লোকেও শ্রদ্ধা করে, আপনিই ম্যানেজিং ডিরেক্টর হয়ে কোম্পানি চালান না?
অটল। এইবার পাকা কথা বলেছেন।
তিনকড়ি। হ্যাঁঃ, আমি বদনামের বোঝা ঘাড়ে নিই, আর ঘরের খেয়ে বুনো মোষ তাড়াই। শ্যাম। বেগার খাটবেন কেন? আমিই এই মিটিংএ প্রস্তাব করছি যে রায়সাহেব শ্রীযুক্ত তিনকড়ি ব্যানার্জি’ মহাশয়কে মাসিক ১০০০ টাকা পারিশ্রমিক দিয়ে কোম্পানি চালাবার ভার অর্পণ করা হোক। এমন উপযুক্ত কর্মদক্ষ লোক আর কোথা? আর, আমরা যদি ভুল- চুক করেই থাকি, তার দায়ী তো আর আপনি হবেন না।
তিনকড়ি। তা-তা-আমি চট্ট ক’রে কথা দিতে পারিনে। ভেবে-চিন্তে দেব।
অটল। আর দ্বিধা করবেন না রায়সাহেব। আপনিই এখন ভরসা।
শ্যাম। যদি অভয় দেন তো আর একটি নিবেদন করি। আমি বেশ বুঝেছি, অর্থ হচ্ছে সাধনের অন্তরায়। আমার সমস্ত সম্পত্তিই বিলিয়ে দিয়েছি, কেবল এই কোম্পানির ষোল শ খানেক শেয়ার আমার হাতে আছে। তাও সৎপাত্রে অর্পণ করতে চাই। আপনিই সেটা নিয়ে নিন। প্রিমিয়ম চাই না-আপনি কেনা-দাম ৩২০০, ঢাকা মাত্র দিন।
তিনকড়ি। হ্যাঁ, ভাল ক’রে আমার ঘাড় ভাঙবার মতলব।
শ্যাম। ছি ছি। আপনার ভালই হবে। না হয় কিছু কম দিন, চব্বিশ শ-দ-হাজার-
হাজার-তিনকড়ি। এক কড়াও নয়।
শ্যাম। দেখুন, ব্রাহ্মণ হ’তে ব্রাহ্মণের দান-প্রতিগ্রহ নিষেধ, নইলে আপনার মত লোককে আমার অমনিই দেবার কথা। আপনি যৎকিঞ্চিৎ মূল্য ধ’রে দিন! ট্রান্সফার ফর্ম আমার প্রস্তুতই আছে-নিয়ে এস তো বিপিন। ধরুন-পাঁচ শ টাকা।
তিনকড়ি। আমি এ-এ-আশি টাকা দিতে পারি। শ্যাম। তথাস্তু। বড়ই লোকসান হ’ল, কিন্তু সকলই মায়ের ইচ্ছা। গন্ডেরি। বাহনা তিনকৌড়িবাবু, বহুত কিফায়ত হয়া!
 কুছভি নহি
তিনকড়িবাবু পকেট হইতে মনিব্যাগ বাহির করিয়া সদাঃপ্রাপ্ত পেনশনের টাকা হইতে আটখানা আনকোরা দশ টাকার নোট সন্তর্পণে গনিয়া দিলেন। শ্যামবাবু পকেটস্থ করিয়া বলিলেন-‘তবে এখন আমি আসি। বাড়িতে সত্যনারায়ণের পূজা আছে। আপনিই কোম্পানির ভার নিলেন এই কথা স্থির। শুভমতু-মা-দশভুজা আপনার মঙ্গল করুন।’
শ্যামবাবু প্রস্থান করিলে তিনকড়িবাবু ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন-‘লোকটা দোষে গুণে মানুষ। এদিকে যদিও হাম্বগ, কিন্তু মেজাজটা দিলদরিয়া। কোম্পানির ঝক্কিটা তো এখন আমার ঘাড়ে পড়ল। ক-মাস বাতে পঙ্গু হয়ে পড়েছিলুম, কিছুই দেখতে পারি নি, নইলে কি কোম্পানির অবস্থা এমন হয়? যা হোক উঠে-প’ড়ে লাগতে হ’ল-আমি লেফাফা-দূরস্ত কাজ চাই, আমার কাছে কারও চালাকি চলবে না।’
গণ্ডোর। অপনের কুছ, তকলিফ করতে হোবে না। কোম্পানি তো ডুব গিয়া।
অকোভি ছুট্টি।
তিনকড়ি। তা হ’লে কি বলতে চাও আমার মাসহারাটা-গণ্ডোর। হাঃ, হাঃ, তুমুভি রূপয়া লেওগে? কাঁহাসে মিলবে বাতলাও। তিনকৌড়ি- যাবু, শ্যামবাবুকা কারবারই নহি সমঝা? নব্বে হজার রূপয়া কম্পানিকা দেনা। দো রোজ বাদ লিকুইডেশন। লিকুইডেন্টর সিঙ্কিন্ড কল আদায় করবে, তবু দেনা শুষবে।
তিনকড়ি। অ্যাঁ, বল কি? আমি আর এক পয়সাও দিচ্ছি না। গঞ্জেরি। আলবত দিবেন। গবরমিন্ট কান পকড়কে আদায় করবে। আইন এইসি
হ্যায়। তিনকড়ি। আরও টাকা যাবে। সে কত?
অটল। আপনার একলার নয়। প্রত্যেক অংশীদারকেই শেয়ার পিছ ফের দু-টাকা দিতে হবে। আপনার পূর্বের ২০০ শেয়ার ছিল, আর শ্যামদার ১৬০০ আজ নিয়েছেন। এই ১৮০০ শেয়ারের ওপর আপনাকে ছত্রিশশ টাকা দিতে হবে। দেনা শোধ, লিকুইডেশনের খরচা-সমস্ত ঢুকে গেলে শেষে সামান্য কিছু ফেরত পেতে পারেন।
তিনকড়ি। তোমাদের কত গেল? গণ্ডোর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ সঞ্চালন করিয়া বলিলেন-‘কুছভি নহি, কুছভি নহি। আরে হামাদের ঝড়তি-পড়তি শেয়ার তো সব শ্যামবাবু, লিয়েছিল-আজ আপনেকে বিকিরি কিয়েছে।’
তিনকড়ি। চোর-চোর-চোর! আমি এখনি বিলেতে কোল্ডহাম সাহেবকে চিঠি লিখছি-অটল। তবে আমরা এখন উঠি। আমাদের তো আর শেয়ার নেই, কাজেই আমরা এখন ডিরেক্টর নই। আপনি কাজ করুন। চল গণ্ডোর। তিনকড়ি। অ্যাঁ-গণ্ডেরি। রাম রাম!

ভারতবর্ষ, মাঘ ১৩২৯ (১৯২২)

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024