সোমবার, ২০ মে ২০২৪, ১২:১২ পূর্বাহ্ন

তীব্র গরমে তাপের সাথে সাপও বাড়ে যে কারণে

  • Update Time : বুধবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৪, ৬.৩৬ পিএম
তীব্র গরমে সাপের আচরণ পরিবর্তন হয় - বলছে গবেষণা

সারাক্ষণ ডেস্ক

আকবর হোসেন

তীব্র গরমে মানুষের মধ্যেই যে কেবল হাঁসফাঁস অবস্থা তৈরি হয়, তা নয়। একই অবস্থা তৈরি হয় সাপের ক্ষেত্রেও। দাবদাহে বিষাক্ত সাপও সক্রিয় হয়ে ওঠে।

সাপ নিয়ে কাজ করে এমন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা স্নেক রেসকিউ টিম বাংলাদেশ বলছে, দেশে বর্তমানে যে দাবদাহ চলছে তাতে সাপের প্রাদুর্ভাব বাড়ার আশংকা রয়েছে। এ সময়ে মানুষকে সতর্ক থাকার কথাও বলছে সংগঠনটি।

সংগঠনটির সহ-সভাপতি মো. জোবাইদুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, তারা বেশ কয়েকবছর যাবত সাপে কাটা নিয়ে সচেতনতা তৈরি এবং সাপ উদ্ধারে কাজ করছেন।

গত বছর অর্থাৎ ২০২৩ এর তুলনায় এবার সাপে কাটার প্রবণতাও বেশি দেখা যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে তারা সাপের কামড়ে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরিবারের কাছ থেকে কল পান। এছাড়া সাপ উদ্ধারের জন্যও তাদের কাছে ফোন আসে।

বাংলাদেশে বন বিভাগের আওতায় যাদের প্রশিক্ষণ ও সনদ রয়েছে তারা বন্যপ্রাণী উদ্ধারের জন্য কাজ করতে পারে।

“গত বছরের তুলনায় এবার আমাদের কাছে আসা এমার্জেন্সি কলের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতিদিন আমরা চার পাঁচটি এমার্জেন্সি কল পাচ্ছি।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণি বিদ্যার অধ্যাপক অধ্যাপক মনিরুল খান বলেন, সাপ ঠাণ্ডা রক্তের প্রাণি। গ্রীষ্মকালে সাপ বেশি সক্রিয় থাকে এবং শীতকালে কম সক্রিয় থাকে।

“আমাদের দেশের কথা চিন্তা করলে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসের কয়েক সপ্তাহ বাদ দিলে, সাপ সাধারণত পুরো বছর সক্রিয় থাকে,” বলেন অধ্যাপক খান।

সাপ ঠান্ডা রক্তের প্রাণি

যুক্তরাষ্ট্রের এমোরি ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক সাপের আচরণের সাথে গরমের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেছেন।

গবেষণায় তারা বলেছেন, তাপমাত্রা শূন্য দশমিক আট ডিগ্রি ফারেনহাইট বাড়লে সাপের কাটার হার ছয় শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

“বাইরের তাপমাত্রা সাপের শরীরের তাপমাত্রাকে প্রভাবিত করে। এর ফলে তাদের আচরণও পরিবর্তন হয়,” গবেষণায় বলা হয়েছে।

গবেষণাটি করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ায়। প্রায় সাত বছর ধরে এই গবেষণা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া এবং কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যে সাপের কামড়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ডিপার্টমেন্ট অব পার্কস এন্ড ওয়াইল্ড-লাইফ বলছে, সাপ হচ্ছে ঠাণ্ডা রক্তের প্রাণি। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে তারা ‘এক্টোর্থামিক’।

সাপ তীব্র ঠাণ্ডাও সহ্য পারেনা। তখন তারা হাইবারনেশনে চলে যায় গর্তের ভেতরে। অন্যদিকে, তীব্র গরমও এড়িয়ে চলে সাপ। তাপমাত্রা যখন তীব্র হয় তখন সাপ খুব ভোরে, সন্ধ্যায় এবং রাতে চলাচল করে। তখন তারা খাবারের জন্য সক্রিয় হয়।

গবেষকরা বলছেন, অতিরিক্ত গরমের সময় সাপ ছায়া, অন্ধকার, আর্দ্রতা ও খাবার খোঁজে। সাপ নিজেকে ঠাণ্ডা রাখার জন্য আর্দ্র পরিবেশ খোঁজে। সেজন্য অনেক সময় তারা মানুষের ঘরের আশপাশে চলে আসতে পারে।

যেসব বাসায় এ ধরণের পরিবেশ থাকে সেখানে সাপের আনাগোনা হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটাই স্বাভাবিক।

এ ধরণের পরিবেশ না থাকলে সেখানে সাপ আসার সম্ভাবনা খুবই কম। সাপ খোলামেলা জায়গায় এবং উন্মুক্ত অবস্থানে থাকতে খুবই অপছন্দ করে।

সাপে কাটা উপেক্ষিত বিষয়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সারাবিশ্বে অসংক্রামক রোগের মধ্যে সাপের কামড়ে মৃত্যু বিষয়টি এখনো বেশ উপেক্ষিত আছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ৪৫ থেকে ৫৫ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হয়।

এর মধ্যে ৮০ হাজার থেকে ১লাখ ৪০ হাজারের মতো মানুষ মারা যায় বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ধারণা করছে।

প্রতি বছর সারা বিশ্বে সাপের দংশনের শিকার হয় যে ৪৫ লাখ মানুষ, তাদের মধ্যে ২৭ লাখ পুরুষ, নারী এবং শিশু শারীরিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয় বলে জানাচ্ছে বেসরকারি সংস্থা গ্লোবাল স্নেকবাইট ইনিশিয়েটিভ।

সাপের কামড়ের সমস্যা মোকাবেলায় কাজ করছে এই সংস্থা।

“সাপের দংশন যে কতটা ব্যাপক সমস্যা, বহু মানুষই তা বোঝে না,” ব্যাখ্যা করেছেন আমেরিকায় অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যে সংস্থা সাপের বিষ প্রতিরোধী রসায়ন, এর ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা করছে তার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক লেসলি বয়ার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করে, সাপের দংশন কোন কোন সম্প্রদায়ের জন্য বিশাল একটা সমস্যা, এবং সেই বিবেচনা থেকে তারা সম্প্রতি সর্প-দংশনের কারণে মানুষের শরীরে ঘটা বিষক্রিয়াকে উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের একটা উপেক্ষিত রোগ হিসাবে শ্রেণিভুক্ত করেছে।

সাপে কাটাকে এখন বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে উপেক্ষিত একটি স্বাস্থ্য সমস্যা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে – যে সমস্যা বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এখনও অনেকে সাপে কাটার পর রোগীকে আগে ওঝা বা কবিরাজের কাছে যান।

বাংলাদেশ পরিস্থিতি কী?

এর আগে ২০২৩ সালে প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় চার লাখ তিন হাজার মানুষ সর্প দংশনের শিকার হয় এবং তাদের মধ্যে সাত হাজার ৫১১ জন প্রতি বছর মারা যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট এ গবেষণাটি করেছিল।

সাপের কামড়ের সব ঘটনার মধ্যে এক চতুর্থাংশ বিষাক্ত, যার ১০ দশমিক ছয় শতাংশ শারীরিক ও এক দশমিক নয় শতাংশ মানসিক অক্ষমতা দেখা যায়।

সাপের কামড়ের মধ্যে ৯৫ শতাংশ ভুক্তভোগী গ্রামীণ অঞ্চলের এবং নারীদের তুলনায় এক দশমিক চার শতাংশ বেশি পুরুষ সাপের কামড়ের ঝুঁকিতে থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যেসব জনগোষ্ঠী সাপের কামড়ের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে তাদের মধ্যে রয়েছেন গ্রামের দরিদ্র মানুষ, কৃষি শ্রমিক, জেলে।

বাংলাদেশে সাপের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১৫-২০ আগের তুলনায় বেড়েছে কিনা সেটি নিশ্চিত করে কিছু বলা মুশকিল।

“আগে নিউজ এভাবে ছড়াতো না। এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কারণে দ্রুত খবর ছড়িয়ে যাচ্ছে। সবাই বিষয়টা দ্রুত জানতে পারছে। এজন্য মনে হচ্ছে সাপে কামড়ের ঘটনা বেড়েছে,” বলছিলেন অধ্যাপক খান।

সাপ সাধারণত দীর্ঘজীবী হয়। ছোট সাপ ১২ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। বড় সাপ ৪০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।

গবেষকরা বলছেন, সাপের মধ্যে নিরামিষভোজী নেই। সাপ নিশ্চিতভাবে মাংস খায়।

যেসব সাপ শিকার করে বিভিন্ন ধরণের পোকামাকড়, মাছ ও অন্যান্য সরীসৃপ প্রাণি তাদের খাদ্যের অন্তর্ভুক্ত।

কিছু কিছু সাপ ডিমও পছন্দ করে। যেসব সাপ শিকার করে তারা সাধারণত শিকার সরাসরি গিলে ফেলে।

গবেষকরা বলছেন, সাপ সাধারণত নিভৃতচারী প্রাণি। তারা দলবদ্ধ হয়ে চলাফেরা করেনা।

বর্ষাকালও বিপজ্জনক

বাংলাদেশে বর্ষাকাল এলেই গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে আতঙ্কের বিষয় হয়ে ওঠে সাপের দংশন। বিষধর সাপের দংশনে হরহামেশাই মানুষের মৃত্যু হয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২২ সালের সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় চার লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হয়, যার ফলে সাড়ে সাত হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যায়।

বাংলাদেশে সর্প দংশনের হার বর্ষাকালে বাড়ে।

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে অর্থাৎ মে, জুন এবং জুলাই – এই তিন মাস সাপের কামড় এবং তার কারণে মৃত্যুর ঘটনা বেশি দেখা যায়।

কেননা অতি বৃষ্টিপাতের কারণে সাপের আবাসস্থল বা গর্তগুলো ডুবে যায়। তখন তারা কোন উঁচু জায়গায়, অনেক সময় মানুষের বসতবাড়ির আশেপাশে বিচরণ করে।

ফলে একটু অসাবধানে থাকলেই সাপে কাটার ঝুঁকি এসময় অনেক বেড়ে যায়।

যে কোনো বিষধর সাপ কাটার পর অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ জরুরি হয়ে যায়। অন্যথায় রোগীর মৃত্যু ঝুঁকি বেশি।

রোগীর শরীরে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ সবচেয়ে জরুরি হলেও বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে এখনও অত্যাবশ্যকীয় এই ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই।

অ্যান্টিভেনম বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় এসেনশিয়াল ড্রাগ বা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকাভুক্ত হলেও, বাংলাদেশে সাপের কামড়ের বিষয়টি এখনও অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর বা বিষ নিষ্ক্রিয় করতে পারে এমন উপাদানকে অ্যান্টিভেনম বলা হয়।

অ্যান্টিভেনম জরুরী

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ টক্সিকোলজি সোসাইটির সভাপতি এম এ ফয়েজ সাপের দংশন ও এর চিকিৎসা নিয়ে বই লিখেছেন।

সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, গোখরো সাপের দংশনের গড়ে আট ঘণ্টা পর, কেউটে সাপের দংশনের গড় ১৮ ঘণ্টা পর এবং চন্দ্রবোড়া সাপের দংশনের গড় ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন পর রোগীর মৃত্যু হতে পারে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই সময়সীমার মধ্যে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা জরুরি।

সাপের কামড় বা দংশনের পরে, দ্রুত অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন দিলে, অ্যান্টিভেনমের অ্যান্টিবডিগুলি বিষকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে। যার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বেঁচে যায়।

সাপ কামড়ানোর পর একজন রোগীকে ১০টি করে অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন দিতে হয়। এতে ১০টি ভায়াল মিলে একটি ডোজ হয়ে থাকে।

বিষের পরিমাণ এবং বিষাক্ততার মাত্রা বেশী হলে সাপে কামড়ানো ব্যক্তির উপর এক বা একাধিক ডোজ অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করার প্রয়োজন হতে পারে।

চিকিৎসকরা মূলত রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে তার বিভিন্ন লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।

এসব লক্ষণের মধ্যে রয়েছে, শরীর অসাড় হয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরানো, বুক ধরফর করা, শ্বাসকষ্ট, অসংগত ব্যবহার, ক্ষণিকের জন্য রক্তচাপ কমা।

বিষধর সাপের অ্যান্টিভেনম সাপ ভেদে যেমন আলাদা হয়ে থাকে, তেমনি একই অ্যান্টিভেনমে কয়েক ধরণের বিষধর সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করা যায়।

বাংলাদেশ টক্সিকোলজি সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে যে অ্যান্টিভেনম আনা হয়, সেটি মূলত চারটি সাপের বিষের একটি ‘ককটেল’ বা মিশ্রণ, যা কিছু সাপের দংশন নিরাময়ে কাজ করে। বাকি ক্ষেত্রে সেগুলো আংশিক কাজ করে।

অনেক সময় সাপের কামড়ের ধরণ দেখে, আবার রক্ত পরীক্ষা করে চিকিৎসকরা বুঝতে পারেন যে এটি বিষাক্ত সাপে কামড়েছে নাকি বিষহীন সাপে কামড়।

তারপরও সাপে কামড়ানোর সময় সেটি কী প্রজাতির সাপ বা সেটি দেখতে কেমন – তা লক্ষ্য করতে বা ছবি তুলে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

সাপের এই বর্ণনা পরবর্তীতে চিকিৎসা পরিকল্পনায় সাহায্য করতে পারে বলে তাদের মত।

বিবিসি নিউজ বাংলা

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024