শ্রী নিখিলনাথ রায়
ইহার পর ওয়ারেন হেষ্টিংস গবর্ণর জেনেরাল-পদে প্রতিষ্ঠিত হইয়া, খাল্ল্সা বা রাজস্ববিভাগ মুর্শিদাবাদ হইতে স্থানান্তরিত করায়, জগৎশেঠদিগের আয়ের অত্যন্ত লাঘব হয়। দুর্ভাগ্য যখন খোশালচাঁদের জীবনের উপর কালিমাচ্ছায়া বিস্তার করিতে আরম্ভ করে, সেই সময়ে তিনি ওয়ারেন হেষ্টিংসকে এইরূপ লিখিয়া পাঠান যে, তাঁহাদিগের পূর্ব্বপুরুষেরা বরাবরই খালসা বিভাগের তত্ত্বাবধান করি- তেন, এক্ষণে তাঁহাদের সহিত উক্ত বিভাগের সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হওয়ায়, তাঁহাদিগকে অনেক কষ্ট পাইতে হইতেছে। তাঁহার অনুরোধ এই যে, গবর্ণর জেনেরাল অনুগ্রহপূর্ব্বক তাঁহাকে পুনর্ব্বার খালুদা বিভাগের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত করেন। হেষ্টিংস তাহার উত্তরে এই রূপ লিখিয়া ছিলেন যে, তিনি উত্তমরূপে অবগত আছেন যে, জগৎশেঠের পিতা ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যস্থাপনের জন্য বিশিষ্টরূপ সহায়তা করিয়াছেন এবং তিনি কোম্পানীরও যথেষ্ট উপকার করিয়াছেন। উত্তর- পশ্চিম প্রদেশ হইতে প্রত্যাগমনের পর তিনি তাঁহাদিগের প্রার্থনা পূর্ণ করিতে চেষ্টা পাইবেন। কিন্তু হেষ্টিংসের প্রত্যাগমনের পূর্ব্বেই ৩৯ বৎসর বয়সে সহসা কণ্ঠরোধ হইয়া খোশালচাঁদের মৃত্যু হয়।
‘খোশালচাঁদ অমিতব্যয়ী ছিলেন; কিন্তু তাঁহার অধিকাংশ অর্থ সংকার্য্যেই ব্যয়িত হইত। পরেশনাথ পাহাড়ের কতকগুলি জৈনমন্দির খোশালচাদের নির্ম্মিত। তাঁহার পূর্ব্বপুরুষেরা সম্রাট, মহম্মদ শাহার নিকট হইতে পরেশনাথের অনেক ভূভাগ নিষ্কররূপে প্রাপ্ত হইয়া- ছিলেন; সম্রাট্প্রদত্ত ভূভাগের ফার্মান অনেক দিন পর্যন্ত জগৎশেঠদিগের নিকট ছিল; এক্ষণে স্থানান্তরিত হইয়াছে। পরেশনাথ পাহাড়ের মন্দির ও গুমটি অন্তাপি খোশালচাদের নাম কীর্তন করিতেছে। সেই সমস্ত মন্দির এক্ষণে জৈন বণিক্সম্প্রদায়-কর্তৃক রক্ষিত হইয়াছে। খোশালচাঁদের অনেক সংকীর্তির কথা শুনিতে পাওয়া যায়। এরূপ কথিত আছে যে, কোন জগৎশেঠ পত্নীর ধর্মার্থে ১০৮টি পুষ্করিণী খনন করাইয়াছিলেন।
কাহার সময় সে পুষ্করিণীগুলি খনন করা হয়, তাহা ঠিক করিয়া বলা যায় না। আমাদের বিবেচনায় সে সকল খোশালচাঁদেরই কৃত হওয়া সম্ভব। জগৎশেঠদিগের বাচীর নিকট একটি সুন্দর উদ্যান আছে; তাহাও খোশালচাঁদের নির্মিত; সেই জন্য তাহাকে খোশালবাগ কহিয়া থাকে। এইরূপ প্রবাদ আছে যে, খোশালচাঁদের যে সমস্ত অর্থ ছিল, তাহা ভূগর্ভে প্রোথিত থাকার, এবং সহসা তাঁহার মৃত্যু হওয়ায়, তিনি কাহারও নিকট সে কথা প্রকাশ করিয়া যাইতে পারেন নাই; বোধ হয়, সেই জন্য তাঁহার পর হইতে শেঠদিগের ঘোর দুর্দশা উপস্থিত হয়।
খোশালচাঁদ অপুত্রক হওয়ার, ভ্রাতুষ্পুত্র হরকচাঁদকে দত্তকপুত্র গ্রহণ করেন। খোশালচাদের মৃত্যুতে হেষ্টিংস অত্যন্ত দুঃখিত হন। তিনি ১৭৮২ খৃঃ অব্দে বালক হরকচাঁদকে খেলাত ও জগৎশেঠ উপাধি প্রদান করেন। এই সময় হইতে কোম্পানী নিজেই উপাধি প্রদানাদির ক্ষমতা গ্রহণ করিয়াছিলেন। হেষ্টিংস এই কথা ব্যক্ত করেন যে, হরকচাঁদ বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে, খোশালচাঁদের প্রার্থনার বিষয় বিবেচনা করিবেন।
Leave a Reply