শনিবার, ১৮ মে ২০২৪, ০৩:২৭ অপরাহ্ন

বিহারে ‘অগ্নিপথ’ বিরোধী আন্দোলনের পুরনো ক্ষত সামনে আনলো লোকসভা নির্বাচন

  • Update Time : শনিবার, ১১ মে, ২০২৪, ৮.৩৬ পিএম
অগ্নিপথ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ আন্দোলনে প্রথম থেকেই সামিল ছিল বিহার। এদিনও হিংসাত্মক আন্দোলনের ছবি ধরা পড়েছে রাজ্যের প্রায় সর্বত্র।

সারাক্ষণ ডেস্ক

বিহারে ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে বামপন্থী অল ইন্ডিয়া ইয়ুথ ফেডারেশনের (AIYF) জাতীয় সম্পাদক রওশন কুমার সিনহা (৩৭)  প্রায় ১০ মাস জেলে ছিলেন। আন্দোলনটি ২০২২ সালের ১৭ জুন থেকে ২০ জুন এই তিন দিনের মধ্যিই সহিংস হয়ে উঠেছিল।

ভারতের সশস্ত্র বাহিনীতে সেনা নিয়োগের নতুন প্রকল্প ‘অগ্নিপথ’ নিয়ে উত্তাল হয়ে উঠেছিল দেশটি।/২০২২

মিঃ সিনহা বলেছেন যে তিনি তার সংস্থার পক্ষ থেকে একদিন আগে ফেসবুকে একটি বিবৃতি পোস্ট করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, এআইওয়াইএফ সেনাবাহিনীর “চুক্তিমূলককরণের” বিরোধিতা করবে। ফলাফল হলো-পরের দিন, তার নিজ শহর লক্ষীসরাইতে দুটি ট্রেনে আগুন দেওয়া হয় এবং বিহার পুলিশ এই মামলায় নথিভুক্ত দুটি এফআইআর-এ তার নাম উল্লেখ করে।

২০২৩ সালের মার্চের মধ্যে, কঠোর বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন (UAPA) এর অধীনে আরেকটি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছিল এবং ১৬ মার্চ, ২০২৩-এ তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। ১৩ জানুয়ারী, ২০২৪-এ যখন তিনি জামিনে মুক্তি পান, তখন তিনি আবারও অগ্নিপথের বিরুদ্ধে প্রচারে নেমে পড়েন। এর উদ্দেশ্য ছিল, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার জন্য।

মঙ্গলবার অগ্নিপথ প্রকল্পের ঘোষণার পর থেকেই বিহারে প্রথম এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়৷ পরে তা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন রাজ্যে৷ গত কয়েকদিন বিহারের বিস্তীর্ণ অংশে ট্রেন-বাস জ্বালানো, রাস্তা অবরোধ, পুলিসের সঙ্গে সংঘর্ষের মতো বহু ঘটনা ঘটেছিল।/২০২২

লোকসভা নির্বাচনের মধ্যে, তিনি আবার বিজেপির বিরুদ্ধে তাদের ভোট ব্যবহার করার জন্য সেনাবাহিনী প্রত্যাশীদের দলগুলির সাথে যোগাযোগ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন  এবং তিনি তাদের মনে করিয়ে দেন যে বিরোধী দল ভারত ব্লক অগ্নিপথ বাতিল এবং সেনা নিয়োগের পুরানো ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। “রাজনৈতিক কারণে আমাকে টার্গেট করা হয়েছিল।এতে সব যুব সংগঠন প্রতিবাদ ঘোষণা করেছে।

যে ছাত্ররা সেনাবাহিনীর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল তারা হাজার হাজার বিক্ষোভকারীর সাথে যোগ দেয়। এমনকি এখনও, প্রশাসন এবং পুলিশ যুবকদের ধরে নিয়ে যায় এই বলে যে তারা বিক্ষোভের অংশ ছিল,” মিঃ সিনহা বলেছেন যে অগ্নিপথ বিহারে একটি প্রধান নির্বাচনী সমস্যা।

উচ্চ বেকারত্ব “অগ্নিপথ” এবং “অগ্নিবীর” হল বক্সার এবং আরাহ অঞ্চলের আলোচনার মূল বিষয়। যে এলাকাগুলি ১ জুন সপ্তম পর্বের নির্বাচনে যাবে৷ উল্লেখ্য, এই জায়গাগুলিতে প্রতিরক্ষা, আধাসামরিক এবং পুলিশে চাকরির জন্য শত শত ছাত্র এবং যুবক প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যেখানে যুবদের মধ্যে বেকারত্ব জাতীয় গড় থেকে বেশি।

‘অগ্নিপথ’ (Agnipath)-এর বিরোধিতায় উত্তাল রয়েছে গোটা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত। অবরোধ ও বিক্ষোভ লেগেই রয়েছে। আর এই পরিস্থিতিতেই এবার এই বিষয় নিয়ে সুর চড়িয়েছিলেন কংগ্রেস (Congress) সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীও (Sonia Gandhi)।/ জুন,২০২২

সর্বশেষ পর্যায়ক্রমিক শ্রমবাহিনী জরিপ (PLFS) অনুসারে বিহারে ১৫-২৯ বছর বয়সী বেকারত্বের হার (UR) হল ১৮.৭%, যখন জাতীয় হার হল ১৬.৫%। রিতেশ শ্রীবাস্তব, একজন আইনজীবী এবং কর্মী যিনি বিক্ষোভকারীদের সাথে আছেন তিনি জানান যে আররাহ, বক্সার এবং সাসারামের মতো এলাকায় অনেক পরিশ্রমী মেয়ে এবং ছেলেরা সরকারি চাকরি প্রত্যাশী।

তারা সরকারের কাছ থেকে যা আশা করে তা হল বেকার সমস্যার সমাধান। কিন্তু তাদের জন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। এমনকি তারা রেলস্টেশনে বসে, কিন্তু সিভিল সার্ভিস সহ সব পরীক্ষায় ফেল করে।  তিনি দু:খ করে বলেন ,প্রায়শই তাদের কঠোর পরিশ্রম বৃথা যায়। যখন অগ্নিপথ ঘোষণা করা হয়েছিল, মিঃ সিনহা এবং মি: শ্রীবাস্তব বলেছিলেন, যে ছেলেরা আর্মি সার্ভিসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল তারা এই প্রকল্পের বিরোধিতা করেছিল।

শ্রীবাস্তব জানান, “ছেলেগুলো প্রশ্ন করেছিল যে আমরা কেন মাত্র চার বছরের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগদান করব? চার বছর পর আমাদের চাকরির কী হবে? সরকারের পক্ষ থেকে কেউই এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি।” এই প্রশ্নগুলো প্রতিটা প্রার্থীদের মনে দাদগ কেটেছে।এভাবেই বিক্ষোভ চলাকালে ধীরে ধীরে তারা সংগঠিত হতে থাকে এবং আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে।

তারা রাস্তায় নেমে ট্রেন অবরোধ করে। বিনয় (নাম পরিবর্তিত) তাদের একজন। শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বক্সার উচ্চ বিদ্যালয়ের ‘দ্য হিন্দুর’ সাথে কথা বলার সময়, যুবকটি বলেছিলেন যে তিনি চার বছরেরও বেশি সময় ধরে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন।

১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি সরকারী স্কুল, আগ্রহীদের জন্য বিনামূল্যে একটি পড়ার ঘর এবং খেলার মাঠ দেয়। এখানে প্রাইভেট লাইব্রেরিও রয়েছে যেগুলো শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করতে পারে। “এখানে, আমরা একটি চেয়ার এবং একটি টেবিল পাই এবং যারা শারীরিক পরীক্ষার জন্য অনুশীলন করে তারা স্কুলের মাঠ ব্যবহার করে।”

২০২২ সালে, নিয়োগ পর্ব শেষ হয়েছিল এবং বিনয় সহ প্রার্থীরা ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। “আমি সেনাবাহিনীতে সেবা করার জন্য উত্সাহী ছিলাম। আমার পরিবার থেকে সেনাবাহিনীতে কেউ ছিল না। আমি শারীরিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। আমি চার বছর ধরে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। আমি জাতীয় ক্যাডেট কর্পস [এনসিসি] এর অংশ ছিলাম।

আমি বেশ কয়েকটি পদক জিতেছি এবং এনসিসির ‘সি’ শংসাপত্রও লাভ করেছিলাম,”কিন্তু অগ্নিপথের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার জন্য তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের হয়েছিল।

তিনি সমস্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এবং সেনাবাহিনীর নিয়োগে শুধুমাত্র স্বাস্থ্য পরীক্ষাই বাকি ছিল কিন্তু অগ্নিপথের কারণে প্রক্রিয়াটি বাতিল করা হয়েছিল। “এখন আমি বয়সসীমা অতিক্রম করে গেছি। এসব ভাবলেই চোখে জল চলে আসে। এটি একটি ব্যক্তিগত ক্ষতি হয়েছে,” মিঃ বিনয় বলেন, তিনি এখন রাজ্য সরকারের কিছু নির্দিষ্ট পদের জন্য পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

তিনি হতাশ যে অগ্নিবীর বিরোধী বিক্ষোভ কৃষকদের বিক্ষোভের মতো সফল হয়নি। আরাহ-এর বক্সার স্কুল বা মহারাজা বাহাদুর রাম রণ বিজয় প্রসাদ সিং কলেজের বেশিরভাগ ছাত্রই দরিদ্র পরিবারের যারা পাটনা বা দিল্লিতে গিয়ে বড় কোচিং সেন্টারে যোগদান করতে পারেনা।

“আমরা সবাই এখানে ভোটার। আমরা বিরোধীদের প্রতিশ্রুতি সম্পর্কেও সচেতন যে অগ্নিপথ বাতিল করা হবে। দরিদ্র লোকেরা যে কোনও কাজের জন্য প্রস্তুত থাকবে এবং চার বছরের সেনাবাহিনীর দায়িত্ব পালন করতে পারে। কিন্তু আমরা এই প্রকল্পের প্রতিবাদ করেছি।কারন আমরা অপরাধী নই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য একজন ছাত্র বলেছেন, প্রশাসন ভেবেছিল আমরা সহিংসতা শুরু করব কিন্তু আমাদের সেরকম কোনো পরিকল্পনা ছিল না। আমরা আশা করি এই স্কিমটি যাবে । বিক্ষোভটি স্বতঃস্ফূর্ত ছিল, তারা বলেছে, প্রশাসন কিছু কোচিং সেন্টারকে দোষারোপ করলেও কেউ ছাত্রদের আমন্ত্রণ জানায়নি বা উস্কে দেয়নি।

“আমরা সেনাবাহিনীতে চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তাই, আমরা ভীত ছিলাম না, কিন্তু আমরা আমাদের পরিবারের সদস্যদের দুর্দশার বিষয়ে উদ্বিগ্ন ছিলাম,” বলেছেন মহেশ (নাম পরিবর্তিত), প্রতিবাদে অংশ নেওয়া অন্য একজন প্রার্থী। এখন বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী সেনাবাহিনীতে যোগদানের স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দিয়েছে।

সুধীর সিং, যিনি কমান্ড্যান্ট একাডেমি নামে একটি কোচিং ইনস্টিটিউট পরিচালনা করেন তিনি বলেন, “এটি দেশের জন্য এবং সেনাবাহিনীর জন্য ভাল নয়।” “আমি ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেনা প্রার্থীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। অগ্নিপথ, সেই যুবকদের প্রতি অবিচার যারা সেনাবাহিনীকে তাদের পেশা হিসেবে বেছে নিতে চেয়েছিলেন। এখানকার মানুষ দেশের সেবা করতে চায়। অগ্নিপথ চালু হওয়ার পর থেকেই তরুণদের আগ্রহ কমে গেছে। যদি তাদের চাকরি চার বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তবে দেশটি উত্সাহী লোকদের পরিষেবা হারাবে।”

আরেকজন প্রার্থী সুভাষ বলেন, অগ্নিপথ বাতিল করার বিরোধীদের প্রতিশ্রুতি স্বাগত জানাই কিন্তু বেকারত্বের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। “আমাদের অপেক্ষা করতে হবে এবং তারা কী করতে যাচ্ছে তা দেখতে হবে,” তিনি সন্দেহজনকভাবে পর্যবেক্ষণ করে কথাগুলো বলছিলেন।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024