রবিবার, ১৯ মে ২০২৪, ১০:৩৮ অপরাহ্ন

সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ও গণতন্ত্রের সমস্যা

  • Update Time : সোমবার, ১৩ মে, ২০২৪, ৬.০৬ পিএম

ওয়াং সন-তায়েক

২০২৪ সালের বিশ্ব সংবাদপত্র স্বাধীনতা-সূচীতে (World Press Freedom Index) কোরিয়ার গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে এক কঠোর সতর্কবাণী দেওয়া হয়েছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দিকে দৃষ্টি রেখে থাকেন এমন এক আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টারস উইথআউট বর্ডারস (French: Reporters sans frontières; RSF) সম্প্রতি প্রকাশিত সূচীতে এ সতর্কবাণী দেন। ২০২৩ সালের মিডিয়া পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটিয়ে প্রকাশিত সূচীটিতে সমীক্ষাধীন ১৮০টি দেশের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার স্থান ৬২তম। এবারই কোরিয়া ২০০৯ সালের সূচীতে ৬৯তম এবং ২০১৬ সালের সূচীতে ৭০তম স্থানে অবনমিত হওয়ার পর এর নিকৃষ্টতম রিপোর্ট কার্ড পেল। ২০২২ সালে যখন সূচী-নির্ধারণের পদ্ধতি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পরিবর্তন করা হয়, তখন দেশটির স্থান ছিল ৪৩তম, কিন্তু ২০২৩ সালের সূচীতে দেশটি ৪৭তম স্থানে নেমে আসে এবং তারপর দু’ বছরের মধ্যে এর স্থান ১৯ ধাপ নেমে আসে।

অধিকন্তু, কোরিয়াকে পাঁচটি শ্রেণীর মধ্যে তৃতীয় “সমস্যাবহুল” শ্রেণীতে অবনমিত করা হয়েছে, যদিও একে সচরাচর দ্বিতীয় “সন্তোষজনক” শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বিস্তারিত দিকগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিলে আরও দুঃখ পেতে হয়। পাঁচটি ক্ষেত্রের মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মাপকাঠিতে কোরিয়ার স্থান ছিল ৭৭তম। সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এর স্থান ছিল ৮৯তম। এই সূচী তখন আরও ভয়ের কারণ হয় যখন আমরা স্মরণ করি যে, সুইডেনের গোটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্র্যাসি (ভি-ডেম) ইনস্টিটিউটের প্রস্তুত-করা বার্ষিক গণতন্ত্র প্রতিবেদন সূচীতে কোরিয়ার স্থান পাঁচ বছরে ১৩তম থেকে ৪৭তমে নেমে গিয়েছিল। গণতন্ত্র-সূচীটিকে দক্ষিণ কোরিয়ার গণতন্ত্রের জন্য প্রথম বিপদ-সংকেত ছিল বলে যদি আমরা মনে করি, তবে এ সময়টিকে গণতন্ত্রের ভিত্তিস্তম্ভ হিসাবে দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য দ্বিতীয় বিপদ-সংকেত হিসাবে দেখা উচিত।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সূচীতে কোরিয়ার অবস্থান মাত্র বছর দুয়েকের মধ্যে শীর্ষ শ্রেণী থেকে মধ্যম পর্যায়ে অবনমিত হতে দেখতে পাওয়া বেদনাদায়ক। অবশ্য এতে এক ইতিবাচক দিকও রয়েছে: সমস্যাদির উদ্ঘাটন এদের সমাধানের সুযোগ বয়ে আনে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা-সূচীর বিশ্লেষণ তিনটি বিষয় উদ্ঘাটন করতে পারে: মিডিয়া সম্পর্কে প্রেসিডেন্টের অনুভূতি, সাংবাদিকতার প্রতি দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাংবাদিকদের উপর সামাজিক বাধানিষেধ। বিশ্ব সংবাদপত্র স্বাধীনতা-সূচী থেকে দেখা যায় যে, দক্ষিণ কোরীয় সরকার গত এক বা দু’ বছর সংবাদপত্রের স্বাধীনতা যথেষ্ট পরিমাণে রক্ষা করে নি। এটি তৎপরিবর্তে প্রেসিডেন্ট বা সরকারের সমালোচনামুখর হয়েছে এমন মিডিয়া কোম্পানিগুলোর প্রতি আক্রমণমুখী হওয়ার দায়ে ক্ষমতাসীন দলেরই সমালোচনা করেছে।

২০২২ সালের নবেম্বরে আরএসএফ প্রেসিডেন্টের এক সরকারি পর্যায়ের বিদেশ সফরকালে এমবিসির (Munhwa Broad- casting Corporation) এক রিপোর্টারকে যেভাবে প্রেসিডেন্টের বিমানে উঠতে দেওয়া হয় নি, সেই ঘটনার সমালোচনা করে। সংস্থাটি প্রেসিডেন্ট য়ুন সুক ইয়েওল রিপোর্টারদের কাছে তাঁর প্রাত্যহিক বিফ্রিং একতরফা বন্ধ করে দেওয়া এবং প্রেসিডেন্ট দপ্তরে আসা দর্শনার্থীদের যাতে দেখা না যায় সেজন্য দপ্তর ভবনস্থ প্রেস রুমের সামনে এক দেয়াল দাঁড় করানোর দায়েও তাঁর সমালোচনা করে।

দলীয় রাজনীতিও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বার্ষিক সূচীতে স্বীকৃত হয়। ২০০২ সালে আরএসএফ যখন প্রথম এ সূচী প্রকাশ করে তখন থেকে কোরিয়ার স্থান ছিল ৪০ তমের আশেপাশে। কিন্তু কোরিয়া ২০০৯ সালের সূচীতে ৬৯তম এবং ২০১৫ সালের সূচীতে ৭০তম স্থানে নেমে আসে। এতে কোরিয়াকে এক গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে দেখা কঠিন হয়ে পড়ে। কোরিয়া ২০০৯ সালের সূচীতে যে স্থানে নেমে এসেছিল, তার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট লী মাইউং-বাকের অভিষেক অনুষ্ঠানের পর ওয়াইটিএন ও এমবিসির ইউনিয়ন কর্মীদের বরখাস্ত করার ঘটনার সম্পর্ক ছিল। ২০১৫ সালের সূচীতে কোরিয়ার অবনমন মিডিয়া ও প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন-হাইয়ের মধ্যে সংঘাতেরই পরিণতি। মিডিয়ার সঙ্গে দু’ সাবেক রক্ষণশীল প্রেসিডেন্টের বিরোধের কারণ দলীয় পক্ষপাতিত্ব।

আরএসএফ কোরিয়ার প্রগতিশীল রাজনৈতিক শিবিরেরও সমালোচনা করেছিল। ২০২১ সালে সংস্থাটি মুন জায়ে-ইন সরকারের মিডিয়া আরবিট্রেশন অ্যাক্ট সংশোধন করার চেষ্টার সমালোচনা করে। এ আইনে ভুয়া খবর তৈরি করে এমন মিডিয়া কোম্পানিগুলো যাতে শাস্তিমূলক ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয় সে বিধান করতে চাওয়া হয়েছিল। তবে এসব প্রয়াস ২০২২ সালের সংবাদপত্র স্বাধীনতা সূচীকে সরাসরি প্রভাবিত করেছিল বলে মনে হয় না, কারণ তৎকালীন ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব কোরিয়া পার্লামেন্টারি প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে তাদের সেসব প্রয়াস প্রত্যাহার করে। কোরিয়ার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ৮৯তম স্থানে নেমে আসারও একইভাবে গভীর তাৎপর্য রয়েছে। ২০২৩ সালের সূচীতে কোরিয়ার স্থান ছিল ৫২তম। এর অর্থ দেশটি এক বছরে ৩৭ ধাপ নেমে গেছে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এমন এক পরিমণ্ডলের প্রতি ইঙ্গিত করে, যেখানে সাংবাদিকরা জনসাধারণের সর্বব্যাপ্ত মতামত বা অনুভূতির কারণে মনস্তাত্ত্বিকভাবে বাধানিষেধগ্রস্ত বলে অনুভব করেন। সমস্যার কারণগুলো চিহ্নিত করা গেলে তা সমাধানের কোন পরিকল্পনাও উদ্ভাবন করা যায়। প্রেসিডেন্ট উন সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেবেন এবং সেজন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন এমন এক অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে ব্যক্ত করে মিডিয়াকে দমন করছেন কিনা সেই প্রশ্নের মীমাংসা করতে পারেন।

কার্যকর ব্যবস্থাদির মধ্যে রয়েছে: সরকারী প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে কোরীয় মিডিয়ার সঙ্গে প্রায়ই মতবিনিময় করা, মিডিয়ার প্রশ্নাদির জবাব দিতে রাজনীতিকদের হাজির হওয়ার ব্যবস্থা করা এবং রিপোর্টারদের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা। যে পরিস্থিতিতে দলীয় রাজনীতির প্রভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, সেই পরিস্থিতি নিরসনের জন্য রাজনীতিক ও মিডিয়ার দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া উচিত। রাজনৈতিক মহলের উচিত মিডিয়া আউটলেটগুলোকে এদের রাজনৈতিক মতামতের কারণে হামলার লক্ষ্যে পরিণতকরণ বন্ধ করা। রাজনীতিকরা মিডিয়ার ভুল তথ্য প্রচার বা পক্ষপাতিত্বের প্রতি আপত্তি জানানোর অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন সত্য, কিন্তু চরম-বিপরীতমুখী মতামত তাঁদের আপত্তিকে মিডিয়া কোম্পানিগুলোর উপর রাজনৈতিক আক্রমণ বলে মনে করা হতে পারে। মিডিয়া কমিউনিটির রিপোর্ট ও ভাষ্য উপস্থাপনের সময় সর্বোচ্চ মান বজায় রাখতে সব চেষ্টাই করা উচিত। তাদের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব নিয়ে বা ভুয়া খবর নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কে গা ভাসিয়ে দেওয়া উচিত নয়। দুর্ভাগ্যক্রমে কোন কোন মিডিয়া কোম্পানি নিজেদের রাজনৈতিক গোষ্ঠী বলে গণ্য করে এবং বিকৃত রিপোর্ট ও ভাষ্য তৈরি করে রাজনৈতিক হাওয়াকে তাদের স্বার্থে কাজে লাগানোর অভিপ্রায়কেই উন্মোচিত করে। তাদেরকে মিডিয়ার মুখোশ-পরা রাজনৈতিক মুনাফাখোর হিসাবে দেখা যেতে পারে। তাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে মিডিয়া কমিউনিটির সদস্যদের সম্ভব সব কিছু করা উচিত।

কোরিয়ার সামাজিক-সাংস্কৃতিক পর্যায়ে সংবাদপত্র স্বাধীনতা-সূচী উন্নীত করতে জনগণের সমর্থন প্রয়োজনীয়। সাংবাদিকদের উপর অনুচিত চাপ প্রয়োগ বা তাদের সমালোচনা নিবৃত্ত করা উচিত, কারণ সেসব কারণেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে। সাংবাদিকদের অবমাননা কোরিয়ার মিডিয়া সংস্কৃতির উন্নয়নে আদৌ সহায়ক নয়। লিগ্যাসি মিডিয়ার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত অভিযোগ আনতে থাকা এক ভয়াবহ ভুলই হবে, বিশেষত যখন কোন কোন ইউটিউবার ভুল তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা অর্জন করছেন। নিয়মিত মিডিয়া আউটলেটগুলোকে মিথ্যা রিপোর্ট প্রচারের ক্ষেত্রে তিরস্কার ও সংশোধন করা যেতে পারে বলে স্বীকার করা অপরিহার্য। ইউটিউব কর্মীদের একইভাবে শান্তি দেওয়া যায় না। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা-সূচীতে কোরিয়ার অবস্থানের এত দুঃখজনক অবনমন বিপর্যয়ের ইঙ্গিতবহ। তবুও যদি এ ঘোষণা উন ও তাঁর সরকারের জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করার এক সুযোগ এনে দেয়, তবে তা কোরিয়ায় গণতন্ত্রের উন্নয়ন ঘটাতে ছদ্মবেশে এক আশীর্বাদ রূপে প্রতিপন্ন হতে পারে।

ওয়াং সন-তায়েক সগাং বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন এডজাঙ্কট প্রফেসর। তিনি ইউটিএনয়ের একজন সাবেক কূটনৈতিক সংবাদদাতা ও ইয়েওসিজায়ে একজন সাবেক রিসার্চ এসোসিয়েট ছিলেন। এখানে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব।–সম্পা. দ্য কোরিয়া হেরাল্ড

 

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024