শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ০৪:৫৪ পূর্বাহ্ন

ইতালির রূপকথা (দুপুর)

  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১৬ মে, ২০২৪, ৮.০০ পিএম

মাক্সিম গোর্কি

দুপুরের নীল আকাশে সূর্য অলছে, সবুজ আর মাটির ওপর নেমে আসে গরম রামধনুরজ্ঞা কিরণ। তন্দ্রানু সমুদ্রের নিঃশ্বাসের মতো ভাসে রড-ফাটা এক একটা কুয়াশা, ইস্পাতের মতো চিকচিক করে সমুদ্রের বীব, আর বোনা জলের একটা কড়া গন্ধ ভেসে আসে তীরের দিকে।

ধুসর পাথরগুলোর ওপর ঝঙ্কার তুলে তরঙ্গদ চলে পড়ে আলস্যে, তারপর পিঠের ওপর দিয়ে গড়িয়ে নেমে আসে মর্মরিত মুড়িগুলোর বুকে। এ তরঙ্গ ফেনিল নয়, কাঁচের মতো স্বাচ্ছ ছোটো ছোটো ঢেউ।

পাহাড় ঘিরে একটা উত্তপ্ত রক্তিম আভা। অলিভ গাছের ধুসর পাতাগুলোকে রোদ্দুরে মনে হয় পুরনো রূপোর মতো। পাহাড়ের গা বেয়ে নামা বাগিচার গাঢ় সবুজ মখমলের ওপর কমলা আর লেবু গাছের সোনালী আভা লেগেছে, টুকটুকে হাসিতে ভরে গেছে লাল লাল ডালিম ফুলগুলো। ফুল শুধু ফুল চারিদিকে।

সুর্য সত্যিই ভালোবাসে এই পৃথিবীটাকে…

পাথুরে তটতুমির ওপর দুজন জেলে। একজন বুড়ো, মাথায় স্ট্র হ্যাট, মুখখানা গোল মতো, গালে আর খুতনিতে পাকা পাকা দাড়ি, চোখ দুটো চবির নিচে অর্ধেক চাপা পড়া, নাকটা লালচে, আর হাতগুলো রোদে পুড়ে ব্রোজের মতো। সরু ছিপখানাকে অনেকটা দূর পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়ে ও বসেছে একটা পাথরের ওপর, লোমশ পা দুটো ঝুলিয়ে। সবুজ ঢেউগুলো লাফিয়ে উঠে ওর পা ভিজিয়ে দিয়ে যায়, আর পারের গাঢ় রঙের আঙুল থেকে টপ টপ করে উজ্জ্বল ভারি জলের ফোঁটা ঝরে পড়ে সমুদ্রে।

বুড়ো লোকটার পেছনে, একটা পাথরের ওপর কনুই ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা জোয়ান ছেলে, ময়লা গায়ের রঙ, চোখ দুটো কালো, লম্বা চেঙা, মাথার ওপর একটা লাল টুপি। শক্ত বুকখানার ওপর দিয়ে টান হয়ে নেমে এসেছে একটা শাদা জার্সি। নীল পাজামা দুটো হাঁটু পর্যন্ত গোটানো। ডান হাতের আঙুলে মোচ পাকাতে পাকাতে চিন্তিত মুখে সে তাকিয়ে আছে সমুদ্রের দিকে। সেখানে কালো কালো কুটোর মতো মাছ ধরা নৌকাগুলো জলের ওপর আস্তে আস্তে ওঠানামা করে, আর অনেক দূরে আবছা চোখে পড়ে একটা গতিহীন শাদা পাল মেঘের মতো গলে গলে যাচ্ছে রোদ্দুরে।

ছিপটা তুলে বুড়ো লোকটা জিগ্যেস করে ভাঙা-ভাঙা গলায়, ‘মহিলাটি কি বড়োলোক?’

জোয়ান লোকটা আস্তে করে জবাব দেয়: ‘তাই মনে হয়! একটা মস্ত নীল পাথর বসানো ব্রোহ্ পরেছিল, কানে দুল, তাছাড়া অনেকগুলো আংটি, ঘড়ি… মনে হয় আমেরিকান…”দেখতে সুন্দর?’

‘অক্ষর বৈকি। একটু রোগা বটে, কিন্তু চোখ দুটো ফুলের মতো; ছোটো ধাঁ-করা একটু মুখ…।

‘ঐ রকম মুখ হয় সতীমেয়েদের, জীবনে যারা একবারের বেশি সুধার ভালোবাসে না।’

‘আমারও তাই মনে হয়…’

বুড়ো লোকটা ছিপে যাই যেবে শূন্য বড়শিটার দিকে চোখ কুঁচকে তাকায়, তারপর ঘোঁৎ যোঁৎ করে মন্তব্য করে একটু হেসে।

‘মাছগুলো আমাদের চেয়েও বুজু…’উবু হয়ে বসে জোয়ান লোকটা বলে, ‘তরা দুপুরে কে আবার আসে মাছ ধরতে?’

‘আমি আসি।’ জবাব দেয় বুড়োটা, তারপর বড়শিতে টোপ গেঁথে অনেকাল দূর দিয়ে ছিপ ফেলে। জিগ্যেস করে: ‘সকাল পর্যন্ত নৌকা বেয়েছিলি, বলছিস?’

‘হ্যাঁ, আমরা যখন পারে এলাম তখন সূর্য উঠে গেছে।’ ও বলে একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে।

‘কুড়ি বিরা?’

‘আরো বেশি দেওয়া উচিত ছিল মহিলাটির।’ ‘ছিল বৈকি…’

‘তোদের আলাপ হল কি বিষয়ে?’

জোয়ান লোকটা মাথা নোয়ায় বিষণ্ণভাবে।

‘গোটা দশেক ইতালিয়ান শব্দ ছাড়া ও কিছুই জানত না। তাই কথা না কয়েই কাটাতে হল…’বুড়ো লোকটা ওর দিকে চেয়ে দরাজভাবে হাসে শাদা শাদা দাঁতগুলো অনাবৃত করে। বলে, ‘সাঁচ্চা ভালোবাসা বুকে এসে বেঁধে একেবারে বিদ্যুতের ঝিলিকের মতো। আর বিদ্যুতের মতোই তা চুপচাপ, তা তো জানিস?’

একটা বড়োমতো পাথর তুলে নিয়ে জোয়ান লোকটা সমুদ্রের মধ্যে ছুঁড়ে মারতে গিয়ে কি ভেবে ঘাড় ফিরিয়ে ফেলে দেয় পেছনে। বলে: ‘মাঝে মাঝে অবাক লাগে, দুনিয়ায় এতোগুলো ভাষার দরকার কি।’

বুড়োটা একটু থেমে বলে, ‘লোকে বলে, একদিন এসব বদলে যাবে।’

সমুদ্রের দূর নীলাঞ্চলের শাদাটে কুজঝটির মধ্যে নিঃশব্দে ভেসে যায় একটা শাদা স্টিমার। মনে হয় যেন মেঘেরই একটা ছায়া।

সেই দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বুড়োটা বলে, ‘সিসিলি চলল।’ কোথা থেকে একটা লম্বা, কর্কশ, কালো চুরুট বার করে বুড়োটা। চুরুটটা ভেঙে দুখানা করে একটা টুকরো ঘাড় ফিরিয়ে বাড়িয়ে দেয় জোয়ান লোকটার দিকে।

‘মহিলাটির সঙ্গে নৌকোয় বসে বসে তখন কি ভাবছিলি তুই?’

‘মানুষ চিরকাল সুখের কথাই তো ভাবে…’ ‘সেই জন্যেই তো মানুষ চিরকালই বোকা রয়ে গেল।’ বুড়োটা বলে শান্ত গলায়।

চুরুট ধরার ওরা। নীলাভ ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাথর বেয়ে ভেসে যায় স্তব্ধ বাতাসে। সে বাতাসে উর্বর মাটি আর শান্ত জলের সোঁদা গন্ধ। ‘আমি গান গেয়ে শুনিয়েছিলাম। আমার দিকে চেয়ে ও হেসেছিল…’ ‘আর তারপর?’

‘মানে, তুমি তো জানো, তেমন কিছু আমি গাইতে পারি না।’ ‘তা ঠিক, গাইতে তুই জানিস না।’

‘আমি তাই দাঁড় বাওয়া বন্ধ করে ওর দিকে চেয়ে ছিলাম।’

‘সত্যি?’

‘ওর দিকে চেয়ে ছিলাম আর মনে হচ্ছিল: “এই তো আমি রয়েছি, শক্ত সমর্থ একজন জোয়ান, আর তোমারও জীবনে কিছু ভালো লাগছে না। তাহলে এসো না, আমাকে ভালোবাসো, ভালোভাবে খাঁচি দুজনে!…””

‘ওর কিছুই ভালো লাগছে না জীবনে?’

‘নইলে, মনে সুখ থাকলে কি আর কেউ এমন পরের দেশে যেতে চায় গরিব ছাড়া?’

‘বাহবা!’

‘মনে মনে ভাবছিলাম: “মেরী মায়ের দিব্যি দিয়ে বলছি”, ভাবছিলাম: “আমি তোমার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করব, আমাদের সবাই বেশ সুখে স্বচ্ছন্দে থাকবে…””

‘সাবাস!’ চিৎকার করে বলে বুড়োটা আর মস্তো মাথাখানা পেছনে হেলিয়ে হাসতে থাকে মন খুলে।

‘চিরকাল আমি তোমার কাছে খাঁটি হয়ে থাকব…’ ‘बग्…’

‘ভাবছিলাম: “তা না হয়ত এসো আমরা একসঙ্গে কিছু দিন থাকি। যতো চাও তত ভালোবাসব তোমাকে, তারপর তুমি আমাকে কিছু টাকা দিয়ো একটা নৌকো, জাল, আর কিছু জমি কেনার মতো। দেশে ফিরে সারা জীবন তোমাকে মনে রাখব, কৃতজ্ঞতা জানাব…”‘

‘সেটা মন্দ নয়…’

‘তারপর সকালের দিকে মনে হচ্ছিল, বোধ হয় ও সব কিছু আমার চাই না। টাকা চাই না, অন্তত এক রাতের জন্যে ওকেই চাই…’

‘সেটা অনেক সহজ…’

‘শুধু একটা রাতের জন্যে।…’বুড়োটা বলে, ‘সাবাস!’

‘আমার মনে হয় কি জানো, পেট্রো পুড়ো, খাঁটি সুখ…’ অর সুখই বুড়োটা কিছু বলে না। মোটা ঠোঁট দুটো একবার চেটে নিয়ে তাকিয়ে থাকে সবুজ জলের দিকে। মৃদু করুণ গলায় জোয়ান লোকটা গাইতে শুরু করে: ‘ও সোলে মিরো, ওগো সূর্য, ওগো সূর্য মোর…’

হঠাৎ মাথা নেড়ে বলে বুড়োটা, ‘তা ঠিক, অগ্ন সুখই খাঁটি সুখ, কিন্তু আরো বেশি সুখ আরো ভালে। … গরিব লোকের চেহারা সুন্দর, কিন্তু বড়ো লোকদের ক্ষমতা বেশি… সবেতেই এই।’

ক্ষান্তিহীন মর্মর তুলে চলেছে তরঙ্গ। লোক দুটোর মাথা ঘিরে জ্যোতির মতো হয়ে আছে নীল ধোঁয়ার রেশ। জোয়ান লোকটা গুন গুন করে গাইতে গাইতে ওঠে দাঁড়ায়, ঠোঁটের কোণে চুরুটটা। ধুসর একটা পাথরের গায়ে কাঁধ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বুকের ওপর দুই হাত জড়ো করে ও তাকিয়ে থাকে সমুদ্রের দিকে। দু চোখে স্বপ্নাতুর দৃষ্টি।

বুড়ো লোকটা বসে থাকে নিঝুম হয়ে, মাথাটা নুইয়ে। হয়ত চোলে।

পাহাড়ের লাইলাক ছায়াগুলো মনে হয় যেন আরো ঘন আরো নরম হয়ে উঠেছে।

জোয়ান লোকটা গাইতে থাকে, ‘ও সোলে মিয়ো।’

তোমার চেয়ে অনেক বেশি গো, অনেক বেশি রূপ, অনেক বেশি রূপ ধরে সূর্য। ওগো সূর্য, ওগে। সূর্য মোর! বুকে আমার কিরণ ঢেলে যেয়ো!…

হাসিখুশি সবুজ ঢেউগুলোর বঝঙ্কার বাজতে থাকে সমানে।

 

ইতালির রূপকথা (শহর)

ইতালির রূপকথা (শহর)

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024