বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ০৪:১৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম :

ভারতে মুসলিম কোটা বিতর্কের হারানো দিক

  • Update Time : রবিবার, ২৬ মে, ২০২৪, ৯.০০ এএম

খালিদ আনিস আনসার

মুসলিম কোটা নিয়ে বিজেপি-কংগ্রেস কলহ ঔপনিবেশিক শাসনামলে স্বাধীনতাপ্রাপ্তি ও দেশভাগের যন্ত্রণাভোগের পূর্ববর্তী সময়কালের এলিট-শ্রেণীর মতৈক্য ও ভিন্নমতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। মুসলিম কোটাকেন্দ্রিক আলোচনা প্রতি নির্বাচনী মৌসুমেই নিয়মমাফিক ফিরে এসে জাতি-বিভক্তির আবেগময় স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। এতে রাজনৈতিক ঘটনাক্রমকে হিন্দু-মুসলিম, সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু, ধর্মনিরপেক্ষ-সাম্প্রদায়িক, এবং ইসলামোফিলিয়া- ইসলামোফোরিয়া- এ দ্বিত্ব শ্রেণীর ফাঁদে আটকে ফেলা হয়। এ ধারণাগত উৎস এক এলিট প্রতিরোধ কৌশল হিসাবে কাজ করে সবধর্মকে অন্তর্ভুক্ত করা, বর্ণ-শ্রেণী দূর করা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার করার ব্যাপকতর প্রশ্নগুলোকে দৃষ্টির বাইরে ঠেলে দেয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে প্রবেশের সময় ঔপনিবেশিক শত্তির ধর্মকে অন্যান্য পরিচয়ের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার বিষয়ে অনেককিছু লেখা হয়েছে। ঔপনিবেশিক যুগের শেষ দিকে ঔপনিবেশিক শাসন কৌশল, স্থানীয় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনবাদ নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সর্বভারতীয় “হিন্দু” ও “মুসলিম” কমিউনিটির উদ্ভব ঘটার পশ্চাতে উৎসাহ যুগিয়েছিল; তাদের বিশেষ সুবিধাভোগী বর্ণ-এলিট, যথা- যথাক্রমে দ্বিজ ও আশরাফরা এক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ধর্মকেন্দ্রিক সূচিত রাজনীতি বর্ণবিরোধী সংগঠনগুলোর সঙ্গে এক উত্তেজনাকর সম্পর্কের জন্ম দেয়। মুসলিমদের ক্ষেত্রে পল ব্রাসের ভাষায়, “মুসলিমদের অধঃপতিত হয়ে পশ্চাত্পদ অবস্থায় চলে যাওয়ার বিশ্বাস” হান্টার কমিশনের রিপোর্টে দেখতে পাওয়া যায়। সে রিপোর্টে বাংলার অবিশ্বাস্য তথ্যের ভিত্তিতে অপ্রামাণিকভাবে সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়কে সুবিধাবঞ্চিত বলে অভিহিত করা হয়েছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ১৮৮১ থেকে ১৯২১ সালের মধ্যে সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের অনুপাত শতকরা ৩৪ দশমিক ৮ ভাগ থেকে শতকরা ৪৭ দশমিক ২ ভাগে উন্নীত হয়, অথচ সেই সময়ে মুসলিম জনসংখ্যা শতকরা ১৯ ভাগ (১৮৮১) থেকে শতকরা ২৩ ভাগের (১৯২১) ভাগের মধ্যে ভিন্ন ভিন্নরূপ থাকে। বর্ণ ও শ্রেণীর মধ্যে জোর পারস্পরিক সম্পর্কের সুবিধাজনক দৃষ্টি থেকে এ উপাত্তের অনুসন্ধান করা হলে দেখা যাবে, প্রান্তিক নিম্নবর্ণের মুসলিমদের ক্ষতির বিনিময়ে সংস্কৃতির বলে মুসলিম আশরাফ এলিট শ্রেণীই ঔপনিবেশিক পৃষ্ঠপোষকতাজনিত সুযোগ-সুবিধা একচেটিয়াভাবে করায়ত্ত করে। মুসলিমরা এক পশ্চাত্পদ সম্প্রদায়- এ বিশ্বাস, অন্যান্য কারণের মধ্যে, নিখিল-ভারত মুসলিম লীগ গঠনে (১৯০৫), মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর বিধান (১৯০৯) করতে, সরকারি চাকরিতে মুসলিমদের জন্য শতকরা ২৫ ভাগ পৃথক কোটা (১৯২৬) আদায় করতে কৌশলগত শক্তি যুগিয়েছিল। এ বিশ্বাসই আবার এক ঐক্যবদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন “মুসলিম সম্প্রদায়” সৃষ্টি করেছিল এবং এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ও এর থেকে লাভবান হয়েছিলেন আশরাফ অভিজাততন্ত্র। এলিট শ্রেণীগুলোর ফেরি-করা “মুসলিম অবরুদ্ধ” বা “মুসলিম তোষণনীতি”র মত স্থায়ীভাবেই পরস্পর-বিরোধী শ্লোগানগুলোর গভীর ঔপনিবেশিক শিকড় রয়েছে। এ শ্লোগানগুলো আজ অবধি প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর সামাজিক ন্যায়বিচারের আশা-আকাঙ্ক্ষার বিনিময়ে হিন্দু-মুসলিম দ্বিধারায় সাজানো রাজনীতিরও পুনর্জন্ম দেয়।

 

বাবাসাহেব আম্বেদকর সংখ্যালঘুদের জন্য প্রতিনিধিত্বমূলক/পুনর্বণ্টনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক মুসলিম প্রথম দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে সব সময়েই হতাশ ছিলেন। তেমনই হতাশ ছিলেন নিম্নবর্ণের মুসলিম সংগঠন মোমিন কনফারেন্সের নেতা আবদুল কাইয়ুম আনসারি। তিনি ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিক থেকে সংগঠনের নেতৃত্ব দেন। মোমিন কনফারেন্স মুসলিম লীগকে এক আশরাফ মুসলিম দল হিসাবে অভিহিত করেছিলেন এবং কংগ্রেস দলের সঙ্গে মৈত্রীসূত্রে আবদ্ধ হয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব ও পাকিস্তান দাবির বিরোধিতা করেছিলেন। ১৯৩৯ সালে মোমিন কনফারেন্স সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার এবং নিম্নবর্ণের মুসলিমদের জন্য এক পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী দাবি করে। সংগঠনটি নিম্নবর্ণের মুসলিমদের প্রচলিত পৃথক মুসলিম নির্বাচকমণ্ডলীতে অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধী ছিল। সম্পত্তি, কর-পরিশোধ ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে সীমিত ভোটাধিকার উচ্চশ্রেণীর মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষা করেছিল, আর তাদের প্রতিনিধি ছিল মুসলিম লীগ।

কিন্তু দেশভাগের বিয়োগাত্মক ঘটনা এড়ানো যায় নি, কারণ ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ভোটাধিকার সীমিত ছিল- সেখানে শতকরা মাত্র ১০ ভাগ থেকে ১৩ ভাগ মুসলিমের, প্রধানত আশরাফ সেকশনগুলোর ভোটাধিকার ছিল। সে নির্বাচনে মুসলিম লীগ চমৎকারভাবে জয়ী হওয়ায় সেটিকে পাকিস্তানের উপর গণভোট হিসাবেও অভিনন্দিত করা হয়। অধিকাংশ প্রান্তিক নিম্নবর্ণের মুসলিমের ভোটের ভাল-মন্দও পর্যন্ত যাচাই করা হয় নি। কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলির কার্যধারা চলাকালে জটিল আলোচনায় ধর্মভিত্তিক নির্বাচকমণ্ডলী ও কোটার ঔপনিবেশিক রীতিকে অগ্রাহ্য করা হয়, কারণ দেশবিভাগের কারণে ধর্মই এক সন্দেহভাজন শ্রেণীতে নীত হয়।

সাবকমিটির শিখ প্রতিনিধিদের বাদ দিলে, মুসলিম ও খৃস্টান প্রতিনিধিরা প্রধানত উচ্চবর্ণের ছিলেন এবং তাঁরা তাঁদের সম্প্রদায়ের নিম্নবর্ণের সদস্যদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য ভ্রূক্ষেপ না করে সাংস্কৃতিক অধিকার অর্জন করতেই স্থির করেন। শিখ প্রতিনিধিরা কিছু সংখ্যক শিখ দলিত বর্ণের রাজনৈতিক অধিকারের পক্ষে যুক্তি দেখান। মুসলিম আশরাফ শ্রেণীগুলো দেশভাগের জন্য জিন্নাহর আহ্বান মোটামুটি অনুমোদন করে। অপর দিকে, নিম্নবর্ণের মুসলিমরা একে চ্যালেঞ্জ করেন এবং মহাত্মা গান্ধী ও কংগ্রেসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। তবে স্বাধীন ভারতে এক বিস্ময়কর বিপরীতমুখী পরিবর্তন ঘটে: ইতিপূর্বেকার “সাম্প্রদায়িক” মুসলিম লীগারদের মওলানা আবুল কালাম আজাদের প্রচেষ্টায় “মুসলিমদের মূলধারায় আনয়ন” আলোচনার মাধ্যমে কংগ্রেস দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যথাসময়ে এ আশরাফ নেতৃত্ব কংগ্রেস দলের ভিতর নিম্নতর বর্ণের নেতৃত্ব গড়ে ওঠার বিনিময়ে মুসলিম বিষয়াদিতে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হয়ে দাঁড়ান। অনুতপ্ত ও বশংবদ আশরাফ রাজনীতিকদের স্বদলভুক্ত করে কংগ্রেস ভবিষ্যতে আদৌ কোন সুসংবদ্ধ ও আত্মশক্তিতে উজ্জীবিত মুসলিম নেতৃত্ব গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও রোধ করেছিল। স্বাধীন ভারতে প্রথম (১৯৫৫) ও দ্বিতীয় (১৯৭৯) ব্যাকওয়ার্ড ক্লাস কমিশন, সাধারণ্যে যথাক্রমে কালা কালেলকার কমিশন (Kaka Kalelkar Commission) এবং মণ্ডল কমিশন (Mandal Commission) নামে অভিহিত- উভয় কমিশনই মুসলিমদের এক বড়, সামাজিকভাবে পশ্চাত্পদ সম্প্রদায় হিসাবে গণ্য করা হতে বিরত থাকে এবং তাদের মধ্যকার বিশেষ সুবিধাভোগী বর্ণ/ গোষ্ঠীগুলোকে বাদ দেয়। মণ্ডল কমিশন রিপোর্ট ৮২টি নিম্নতর বর্ণের মুসলিম গোষ্ঠীকে পশ্চাত্পদ হিসাবে তালিকাভুক্ত করে নির্যাতিত বর্ণগুলোর বৃহত্তর সর্বধর্ম সংহতির পথ উন্মুক্ত করে দেয়। আলী আনোয়ারের নেতৃতাধীন পাসমান্দা আন্দোলন (Pasmanda movement) সর্বদাই কোন মুসলিম কোটার দাবির বিরোধিতা করেছে। পাসমান্দা একই অবস্থানে থাকা সবধর্মের পশ্চাত্পদ, দলিত ও আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোকে ধর্মের নীতিকে জড়িত না করে প্রচলিত কোটার ভিতর বিজ্ঞতাপূর্ণ উপায়ে স্থান করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের প্রথমদিকে অধিকাংশ নিম্নতর বর্ণের মুসলিম, ভারতের মুসলিম জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ, কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন রাজ্য ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে সংরক্ষণের সুবিধা এরই মধ্যে ভোগ করছিল। কিন্তু কংগ্রেসের আশরাফ মধ্যস্থতাকারীরা হয় মুসলিম কোটার জন্য দাবি জানিয়ে বা ওবিসি ক্যাটাগরির ভিতর ধর্মের নীতি প্রবর্তন করে পাসমান্দ সেকশনগুলোর পাওয়া ন্যূনতম অধিকারগুলোকে বাধাগ্রস্ত করতে সব সময়েই চেয়েছে।

কংগ্রেসের ম্যানিফেস্টোতে মুসলিম কোটার অন্তর্ভুক্তি (২০০৪), অন্ধ্র প্রদেশের রাজ্য ওবিসি কোটার ভিতর সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়কে শতকরা ৫ ভাগ সংরক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ (২০০৪), কেন্দ্রীয় ওবিসি কোটায় সংখ্যালঘুদের মধ্যে পশ্চাত্পদ সেকশনগুলোর জন্য শতকরা ৪ দশমিক ৫ ভাগ সাব-কোটা ঘোষণা (২০১১) ইত্যাদি এই যুক্তির দৃষ্টান্ত। মুসলিমদের অবস্থা দলিতদের চেয়েও শোচনীয়- এটি সাচার কমিটির (Sachar Committee) রিপোর্টের ধারণা বলে ভুলক্রমে উল্লেখ করা হয়। মুসলিম পশ্চাদপদতার প্রতি এক বর্ণান্ধ দৃষ্টিভঙ্গীর প্রসার ঘটাতে আশরাফ শ্রেণীগুলো ও তাদের বাম-উদারপন্থী মিত্ররা এ ধারণাকে সামনে তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী মোদী মুসলিম কোটার প্রতি এক জটিল দৃষ্টিভঙ্গী অনুসরণের জন্য কংগ্রেসের প্রতি সম্প্রতি জোর আক্রমণ করেন। তবে বিজেপি একে মুসলিম তোষণনীতি বলে অভিহিত করলেও এটি মূলত আশরাফ তোষণনীতি যার দায়ে কংগ্রেস দোষী। কংগ্রেস অতীতে ভুল করেছে বলে রাহুল গান্ধীর রহস্যময় স্বীকারোক্তির অর্থ কি তা স্পষ্ট না হলেও দলটি “হান্টার থেকে সাচার” অবধি মুসলিম পশ্চাদপদতার ইতিহাস সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করলে ভাল করবে। যে ক্ষেত্রে কংগ্রেস কোটা ব্যবস্থায় অনুচিতভাবে ধর্মকে টেনে আনার দায়ে দোষী, সেক্ষেত্রে বিজেপি সিডিউলড কাস্টস (এসসি) কোটায় জন্মসূত্রে দলিত এমন মুসলিম ও খৃস্টানদের অন্তর্ভুক্ত করার তীব্র বিরোধিতা করে ধর্মের ভিত্তিতে অন্যায়ভাবে মানুষকে কোটা থেকে বাদ দেওয়ার দায়ে দোষী। ধর্মনির্বিশেষে নির্যাতিত বর্ণ ও শ্রেণীগুলোর মধ্যে অর্থবহ সংহতি সৃষ্টি করতে হলে বর্ণবিরোধী রাজনীতির কথা অবশ্যই ভাবতে হবে।

লেখক আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটির সোশিওলজির এসোসিয়েট প্রফেসর।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024