শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ০৫:২৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কলেজ ছাত্র মুরাদ হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা ফের আইটেম গানে প্রিয়া অনন্যা স্মার্ট কর্মক্ষেত্র বুদ্ধিনির্ভর কাজের ক্ষমতা বাড়ায় নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবদুর রশীদের মৃত্যুতে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির শোক প্রকাশ চে গেভারা যেভাবে কিউবার সশস্ত্র বিপ্লবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন ট্রাম্প পুনঃনির্বাচিত হলে ইউয়ানের উপর চাপ ও বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা বাড়তে পারে মিরনজিল্লার হরিজন সম্প্রদায়কে পূনর্বাসন না করে উচ্ছেদ করা যাবে না নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের তিনটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ মারা গেছেন কনসার্টের দর্শকদের নাচানাচিতে সৃষ্টি হলো ভূমিকম্প

ইতালির রূপকথা (জিয়োভান্নি তুবা)

  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ৩০ মে, ২০২৪, ৮.৪৬ পিএম

মাক্সিম গোর্কি

সেই কোন ছেলেবেলা থেকে বুড়ো জিয়োভাগ্নি তুবার মন কেড়েছে সমুদ্র- মন কেড়েছে সেই অসীম নীল, কিশোরী মেয়ের চাউনির মতো যা কখনো শান্ত নম্র, কখনো বা নারী হৃদয়ের কামনা বেগের মতো ঝড়তোলা, সেই আদিগন্ত মরুভূমি, মাছেদের কাছে নিষ্প্রয়োজন সূর্যকিরণ যা টেনে নেয়, আর সোনালী রোদের ছোঁয়ার যার কাছ থেকে শোভা আর উজ্জ্বল দীপ্তি ছাড়া অন্য কিছু আশা করা বৃথা, সেই বেইমান সমুদ্র, যার চিরকালের গান শুনে মনের মধ্যে অদম্য বাসনা জেগে ওঠে পাল তুলে ভেসে যাই তার দূর থেকে সুদূরে। মাটি সে তো বোবা, পাথর ভরা, আকাশ থেকে কতো জল বারিয়েই না তাকে ভিজতে হবে, কতো মেহনতই না করতে হবে মানুষকে, অথচ বদলে পাওয়া যাবে কত অল্পই না সুখ- সেই মাটি থেকে হাতছানি দিয়ে কতো মানুষকেই না ভুলিয়ে নিয়ে গেছে সমুদ্র।

যেই ছেলেবেলার তুবা যখন কাজ করত আঙুর-বাগিচার- পাহাড়ের গা বেয়ে ধুসর পাথরের দেয়াল তোলা থাকে-থাকে গাঁথা সেই আঙুর-বাগিচার ভেতর, ধাতুর পাতের মতো পাতাওয়ালা ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া ভুনুর আর জলপাই গাছগুলোর মধ্যে, ঘনসবুজ কমল। গাছ আর জটপাকানো ডালিম গাছের ডালের নিচে, যখন মাথার ওপরে জ্বলন্ত সূর্য, পায়ের নিচে গরম মাটি আর চারিপাশে ফুলের গন্ধ, সেই তখন থেকেই তুবা তুষিতের মতো তাকিয়ে থাকত সমুদ্রের নীল চোখের দিকে, চাউনি দেখে মনে হত বুঝি ওর পায়ের নিচে উথাল পাথাল করছে মাটি। তাকিয়েই থাকত সে, নোনা বাতাস আকণ্ঠ পান করে উঠত মাতাল হয়ে, মন চলে যেত কোথায়, আলস্য এসে ভর করত ওকে, হুকুম মানত না- সমুদ্রের যাদুতে যারা ধরা পড়ে, সমুদ্রের সঙ্গে পীরিত করে যারা সব ভোলে, তাদের এমনি হয় চিরকালই…

আর ছুটির দিনের সেই ভোর বেলায়, সূর্য যখন সবে উঠেছে, সরেন্টোর ওপরকার আকাশ তখনো এমন গোলাপী যেন খুবানী ফুল দিয়ে বোনা, তখন পাহাড় বেয়ে নেমে আসত বাচ্চা তুবা, রাখালিয়া কুকুরের মতো ধূসর, কাঁধের ওপর মাছ-ধরা ছিপ, লাফাত পাথর থেকে পাথরে, মনে হত ওর শরীরে যেন হাড় নেই আছে শুধু স্প্রিং- এর মতো এক বাণ্ডিল পেশী; তারপর দৌড়ে নামত সমুদ্রের দিকে, আর ফুটি ফুটি ফুলের মিঠে গন্ধের চেয়েও জোরালো ঝাঁঝালো সমুদ্র- গন্ধ যেই ভোরের বাতাসে ভেসে আসত তার দিকে, অমনি তার চওড়া লালচে দাগদাগালি-ভরা মুখখানা বঝলমল করে উঠত এক খুশির হাসিতে, কানে আসত, অনেক নিচে পাথরের ওপর গড়িয়ে পড়া মৃদু তরঙ্গ মর্মর মেয়ের মতো তাকে কাছে ডাকছে…

সেখানে গোলাপী-ধূসর একটা পাথরের ওপর স্থির হয়ে বসত সে, ঝুলিয়ে দিত ব্রোঞ্জরঙা পা দুখানা, আলুবোখরার মতো বড়ো বড়ো কালো কালো দুই চোখ দিয়ে যে চেয়ে দেখত স্বাচ্ছসবুজ জলের মধ্যে- সমস্ত রূপকথার চেয়েও মোহময় এক আশ্চর্য জগতের সন্ধান পেত সেই তরল কাচের মতো জলের নিচে। সমুদ্রের তলে গালিচায় ঢাকা পাথরের পাশে দুলছে লালচে সোনালী সমুদ্র গুল্ম; যে গুল্মের ঘনবন থেকে ভেসে উঠেছে সমুদ্রের ফুল রঙবালমল ‘ভায়োলি’, মাতালের মতো ঝাপসাচোখ, ডোরা-কাটা নাক, আর পেটের ওপর নীল নীল ফুটকি দেওয়া ‘পার্চে’, সোনালী রঙের ‘সার্পে’, বেপরোয়া ডোরা-কাটা ‘কেনি’, কালো কালো ‘গুয়ারাসিনি’, ভূতিবাজ বিচ্ছর মতো ছিটকে ছিটকে যাওয়া ‘স্পারাগলিয়োনি’ আর রূপোর চাকতির মতো চক্চকে ‘অকিয়েট’, আর আরো কতো সুন্দর সুন্দর মাছ- আর এমন হূর্ত সবাই যে গোল গোল মুখ দিয়ে টোপ গেলবার আগে ক্ষুদে ক্ষুদে দাঁত দিয়ে তা দেখে নেবে ঠুকরে ঠুকরে।

শান্ত স্বচ্ছ এই জলের মধ্যে বাতাসে ভাসা পাখির মতো ভেসে বেড়াত জটাজুটধারী চিংড়ি মাছ; গুহাবাসী কাঁকড়ারা তাদের অলঙ্কৃত খোলসগুলো টানতে টানতে হেঁটে যেতো জলের নিচেকার পাথর নুড়ির ওপর দিয়ে; রক্তের মতো লাল ‘তারা’ মাছগুলো ধীরে ধীরে জল কেটে এগুত; রক্তিম জেলি মাছগুলো দুলত নিঃশব্দে; ধারালো দাঁতওয়ালা মুরায়েনাগুলো হঠাৎ বেরিয়ে আসত পাথরের তল থেকে, ছিটছিট দাগে ভরা লালচে সর্পিল দেহখানা মোচড় খেত এদিক ওদিক, দেখাত ঠিক যেন সেই রূপকথার ডাইনীর মতো শুধু তার চেয়েও আরো কুৎসিত, আরো বীভৎস। তারপর হঠাৎ এক ধূসর অক্টোপাস নোংরা একটুকরো ন্যাকড়ার মতো ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত এগিয়ে যেত কোন একটা শিকারের খোঁজে। খানিক পরেই হয়ত দেখা যেত একটা গলদা চিংড়ি, কঞ্চির ছিপের মতো লম্বা লম্বা মোচ, যেতে যেতে ছটকিয়ে উঠছে। এই সব এবং এমনি আরো অসংখ্য জীব বাস করত সেই স্বচ্ছ জলের মধ্যে, আকাশের তলায়, সে আকাশ সমুদ্রের মতোই পরিষ্কার আর সমুদ্রের চেয়ে অনেক বেশি ফাঁকা ফাঁকা।

আর নিঃশ্বাস নিত সমুদ্র, ওঠানামা করত তার নীল বুক। তুবা যে পাথরটার ওপর বসে থাকত তার গায়ে এসে ভেঙে পড়ত শ্বেতশীর্ষ শ্যামল তরঙ্গ – খুশির ঝঙ্কার তুলে যে তরঙ্গ এ ওর পেছু পেছু ছুটে চেষ্টা করত তুবার পা দুখানা ভিজিয়ে দিতে, কখনো কখনো ভিজিয়েও দিয়ে যেত আর চমকে উঠে হেসে ফেলত তুবা, ঢেউগুলোও হাসত খুশিতে, পাথরটা থেকে ছুটে পালাত যেন ভয় পেয়ে, তারপর ফের ফিরে আসত ঢেউ তুলে। এক ঝলক রোদ এসে সে জলের নিচে, জলের বুকে যেন আলগোছে বিঁধে থাকত যেন একটা উজ্জ্বল আলোর চোঙা। আর তুবার মন হারিয়ে যেত সুখের তন্দ্রার, তাতে না থাকত চিন্তা না কামনা, শুধু চোখে যা পড়েছে তারই এক নিঃশব্দ উপভোগেই সে তৃপ্ত। সমস্ত সত্তায় তার বয়ে যেত উজ্জ্বল তরঙ্গভঙ্গ, মন তার পাখা মেলত সমুদ্রের মতোই এক অসীম মুক্তিতে।

এই করেই ছেলেবেলা কেটেছে তুবার, তারপর কিছু কাল পরে শুধু ছুটির দিনে নয় কাজের দিনেও ডাক পাঠাতে শুরু করলে সমুদ্র, কেননা সমুদ্র যখন কোনো মানুষের মন কেড়ে নেয়, তখন সে লোকটাও হয়ে পড়ে সমুদ্রেরই তেমনি একটা আপন অংশ, মানুষের কাছে যেমন আপন তার হৃদয়। তাই তুবা তার জমিটুকু ভাইয়ের জিম্মায় ছেড়ে দিয়ে চলে গেল সিসিলির উপকূলে প্রবাল ধরার জন্যে, দলে রইল তারই মতো আরো সব লোক, যারা সমুদ্রের প্রেমে পাগল। প্রবাল ধরার কাজটা তোফা, কিন্তু বিপদও ছিল তাতে, কেনন। ডুবে মরার মুখোমুখি হতে হত দিনের মধ্যে বার দশেক করে। কিন্তু যখন নীল জলের মধ্যে থেকে টেনে টেনে তোলা হত লোহার দাঁত লাগানো অর্ধবৃত্তাকার জালখানা তখন কতো আশ্চর্য জিনিসই না দেখেছে তুষা, স্বাধার মধ্যে যেমন ভাবনা, জালের মধ্যে তেমনি কতো রঙের, কতো রকমেরই না প্রাণী- আর ঠিক মাঝখানে, দামী দামী প্রবালের সেই গোলাপী ঝাড়, মানুষের জন্যে যা হল সমুদ্রের উপহার।

আর তাই সমুদ্রের মায়ায় বাঁধা পড়া এই লোকটা চিরকালের মতো খসে গেল মাটি থেকে। মেয়েদেরকেও ভালোবাসত সে, কিন্তু যে যেন শুধু এক স্বপ্নের মধ্যে, অল্প একটুখানির জন্যে, নীরবে-কেননা বলবার মতো কথা তার ছিল শুধু সেই নিয়ে, যা সে জানত-সেই মাছ আর প্রবাল, সেই ঢেউয়ের লীলা খেলা, বাতাসের খেয়ালিপনা, অজানা সাগর পাড়ি দিয়ে চলা সেই সব বড়ো বড়ো জাহাজের কথা। ডাঙ্গার ওপর সে ছিল ভীরু, মাটির ওপর দিয়ে হাঁটত সতর্ক হয়ে, সন্দিপ্তের মতো, লোকের সঙ্গে মেলামেশায় কথা বেরুত না তার মুখ দিয়ে, বেইমান সমুদ্রকে বিশ্বাস না করে তার গভীর তলদেশ সন্ধান করতে যারা অভ্যস্ত, তাদের মতো তীক্ষ্ণ চোখ মেলে কি খুঁজত লোকেদের দিকে চেয়ে। কিন্তু সমুদ্রের ওপর এক শান্ত সুখে ভরে উঠত ওর মন, সঙ্গী সাথীদের দেখা শোনা করত, হাবভাব হয়ে উঠত শুশুকের মতো ক্ষিপ্র।

কিন্তু যতোই ভালো জীবন মানুষ খুঁজে পাক না কেন, কয়েক কুড়ি বছরের বেশি তো আর তার মেয়াদ নয়। সমুদ্রের জলে পোড় খেরে খেয়ে বুড়োটা যখন আশী বছর বয়সে পৌঁছল, তখন বাতে বেঁকে যাওয়া হাত দুটো তার আর কাজ করতে চাইলে না- ঢের খেটেছে তারা। গিঠ গিঠ পাগুলোর ওপরে নুয়ে পড়া দেহখানাকে ঠেকা দিয়ে রাখাও তার হল। তাই শেষ কালে তুবা এসে ঠেকল এই দ্বীপখানায়, এসে ঠেকল রোদে জলে পোড় খাওয়া এক বুড়ো- পাহাড় বেয়ে বেয়ে উঠে গেল তার ভাইয়ের কুঁড়ে-ঘরের ভেতরে, আশ্রর নিলে তার ভাইয়ের ছেলেপুলে নাতিপুতির গরিব সংসারে – এত গরিব যে তুবা আর আগের মতো নিয়ে আসতে পারে না বলে তার ওপর নায়াও হয় না কারো। গাদা গাদা সুস্বাদু মাছ এ সংসারের লোকগুলোর মধ্যে তুবার দিন কাটত কষ্টে, বাঁকাচোরা বুড়ো হাত দিয়ে রুটির যে টুকরো সে তুলত তার দন্তহীন মুখের ভেতর, তার দিকে অতি সতর্ক নজর রাখত সবাই। তুরা টের পেলে, এদের মধ্যে তার আর জায়গা নেই। মন তার আঁধার হয়ে এল, বুক মুচড়ে এল যন্ত্রণায়, রোদ পোড়া চামড়ার ওপর গভীর হয়ে ফুটল বলি রেখা আর বুড়ো হাড়গুলোয় নতুন একটা ব্যথা শুরু হল। কুঁড়ের পাশে পাথরের ওপর সে বসে থাকত সকাল থেকে সন্ধে, বুড়ো বুড়ো চোখে চেয়ে দেখত উজ্জ্বল সমুদ্রের দিকে, যেখানে উজাড় করে সে ঢেলে এসেছে তার জীবন, নীল সমুদ্র যেখানে স্বপ্নের মতো সুন্দর হয়ে ঝিকঝিক করছে রোদ্দুরে।

সমুদ্র তার কাছ থেকে এখন অনেক দূরে, সে সমুদ্রের স্কুল পর্যন্ত পৌঁছনো একটা বুড়ো মানুষের পক্ষে সহজ ছিল না। কিন্তু মন ঠিক করে ফেললে তুবা, তারপর এক শান্ত রাতের বেলায় পদদলিত টিকটিকির মতো খোঁচা খোঁচা পাথরগুলোর ওপর ছেঁছড়ে ছেঁছড়ে নামতে শুরু করলে পাহাড় থেকে। ঢেউগুলোর কাছাকাছি পৌঁছতেই তারা সেই পরিচিত কল্লোল তুলে পৃথিবীর মরা পাথরগুলোয় আছাড় খেয়ে অভ্যর্থনা জানাল তাকে মানুষের কথার চেয়ে সে কল্লোল ঢের বেশি কোমল। হাঁটু গেড়ে বসেছিল বুড়ো, লোকেদের তাই ধারণা, আকাশের দিকে তাকিয়ে একটু প্রার্থনা করেছিল সেই সমস্ত মানুষের জন্যে, যারা তার কাছে অনাত্মীয়ের মতো; তারপর যে সব ন্যাতাকানি দিয়ে তার বুড়ো হাড় কখানা ঢাকা ছিল, গায়ের চামড়ার মতো সেই পুরনো জিনিসগুলোকে- তারই-তবু-তার-নয় সেই জিনিসগুলোকে পাথরের ওপর রেখে দিয়ে নেমে গিয়েছিল জলের মধ্যে। শাদা মাথাখানা হেলিয়ে আকাশের দিকে মুখ করে চিত হয়ে তুবা সাঁতার কেটে গেল সেই দূরে যেখানে আকাশের ঘন নীল তার গোলাপী ওড়না দিয়ে স্পর্শ করেছে ঢেউগুলোকে, যেখানে তারাগুলো সমুদ্র তরঙ্গের কালো মখমলের এত কাছে যেন মনে হয় হাত বাড়ালেই ধরা যাবে।

গ্রীষ্মের কোমল রাতগুলোয় শান্ত সমুদ্র যেন সারা দিনের খেলা শেষ করার পর ক্লান্ত এক শিশু-মন। ঘুমোয় সমুদ্র, আবছা নিঃশ্বাস পড়ে তার, আর নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখে রঙীন রঙীন। ঘন নীল জলের মধ্যে রাত্রে সাঁতার কেটে গেলে হাতের নিচে জ্বলে উঠবে নীল নীল ফুলকি, শরীর ঘিরে ছড়িয়ে পড়বে একটা নীল শিখা, আর মায়ের মুখে শোনা গল্পের মতো মৃদু মধুর একটা আভায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে তোমার আত্মা।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024