সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ০৩:৪২ পূর্বাহ্ন

দ্রুত নগরায়ন এবং নৈতিকতার অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে ঢাকা – ভূমিকম্প ঝুঁকি হ্রাস নিয়ে আন্তর্জাতিক সেমিনারে বক্তারা

  • Update Time : শনিবার, ১ জুন, ২০২৪, ৫.৩০ পিএম

সারাক্ষণ ডেস্ক

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী র.আ.ম. উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী বলেছেন, দ্রুত নগরায়ান, নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং নৈতিকতার অভাবজনিত কারণে ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের বেশ কয়েকটি জেলা শহর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাবে শহরের উন্মুক্ত বেদখল হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, নির্মানের মান নিয়ন্ত্রণ, বিল্ডিং কোড এবং অন্যান্য স্ট্যান্ডার্টসমূহ মেনে চলার জন্য যে প্রক্রিয়া আবশ্যক বর্তমান বাস্তবতায় তা অপর্যাপ্ত বলে মনে করা হয়।

শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে রাজউক আয়োজিত “ইন্টারন্যাশনাল সেমিনার অন আরবান আর্থকোয়েক রেজিলিয়েন্স” শীর্ষক ২ দিনব্যাপী সেমিনারের প্রথম দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী ও আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের পরিচালক ড. আবদুল লতিফ হেলালী।

সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: নবীরুল ইসলাম, রাজউকের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সিদ্দিকুর রহমান সরকার, আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের আন্তর্জাতিক দলনেতা ড. এসকে ঘোষ, জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কিমিরিও মেগুরো, বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদী আহমদ আনসারী এবং রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. সুলতান আহমেদ প্রমুখ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেমিনারে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী র.আ.ম. উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়ছে। বিদ্যমান দুর্বলতাকে কাটিয়ে সরকার দুর্যোগ ঝুঁকি এড়াতে কাজ করে যাচ্ছে। ভবনের তদারকির সঙ্গে সঙ্গে নিয়ম চাপিয়ে না দিয়ে জনগণকে ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি বলেন, দ্রুত নগরায়ান, নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং নৈতিকতার অভাবজনিত কারণে ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের বেশ কয়েকটি জেলা শহর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাবে শহরের উন্মুক্ত বেদখল হয়ে যাচ্ছে। নির্মানের মান নিয়ন্ত্রণ, বিল্ডিং কোড এবং অন্যান্য স্ট্যান্ডার্টসমূহ মেনে চলার জন্য যে প্রক্রিয়া আবশ্যক বর্তমান বাস্তবতায় তা অপর্যাপ্ত বলে মনে করা হয়।

ঢাকার দ্রুত বৃদ্ধি এবং অভিবাসনের ফলে ভূমিকম্প এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপদের ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। ঝুঁকি সংবেদনশীল ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন নীতি ও কৌশলসমূহ প্রয়োগের মাধ্যমে বিদ্যামান দুর্বলতাকে কাটিয়ে একটি স্থায়ী ও ঝুঁকিমুক্ত শহর গড়ে তোলা যেতে পারে।

মন্ত্রী আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বড় কোনো ভূমিকম্পের ঘটনার অনুপস্থিতির কারণে শহরে ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং এই ধরণের ঘটনার প্রভাব প্রশমিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কৌশলসমূহের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবনের ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকারের আরও সমন্বিত পদ্ধতি প্রণয়ন প্রয়োজন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (২০২১-২০২৫) ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এবং জাতীয় ভূমিকম্প কন্টিনজেন্সি প্ল্যান ইতোমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। এই পরিকল্পনাসমূহ দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের দায়িত্ব ও কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করেছে। তথাপি, প্রণীত পরিকল্পনাসমূহে জাতীয় ভূমিকম্প কৌশলের ব্যাপক এবং সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গের অভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়। এছাড়াও শহরে ভূমিকম্পের ঝুঁকি মতো কঠিন সমস্যা মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারগনের মধ্যে কার্যক্রম পরিচালনায় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব রয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিশেষ করে শহরে ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবেলায় সমন্বিত কোনো জাতীয় নীতি নেই। যদিও একটি ঝুঁকিমুক্ত ও নিরাপদ শহর নির্মাণে এ ধরনের একটি সমন্বিত জাতীয় নীতি প্রণয়ন আবশ্যক। ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য বর্তমানে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে বিদ্যমান স্কুল-কলেজসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক বিল্ডিং এবং জননিরাপত্তাজনিত বিষয়সমূহের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠার ক্ষেত্রে কোন বিস্তারিত ধারণাপত্র তৈরি করা হয়নি। ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরসমূহের ভূমিকম্পের ঝুঁকি প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য বিদ্যমান দুর্বলতাসমূহ চিহ্নিত করা, মূল্যামান করা এবং সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সেমিনারের গেস্ট অব অনার প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, বর্তমানের দূরদর্শি পরিকল্পনাই ভবিষ্যতের ঢাকাকে গড়ে তুলবে। ১২৫ বছর ধরে বড় কোনো ভূমিকম্প হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলেন সহসাই একটি বড় ভূমিকম্প হতে পারে। তাই এ বিষয়ে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করছে সরকার। যত দ্রুত সম্ভব এ কাজটি করতে হবে।

সেমিনারে আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের পরিচালক ড. আবদুল লতিফ হেলালী বিষয়ভিত্তিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বলেন, বিগত ১০ বছরের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞগনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কারিগরি ও দক্ষ জনবল এবং সংগ্রহকৃত আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং ল্যাবরেটরি পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ভূমিকম্প ও দুর্যোগ থেকে দেশের সম্পদ ও জনগনের জান-মালের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য যে বিপুল সামর্থ সৃষ্টি হয়েছে, তা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ প্রয়োগ ও পরিচালনা করা প্রয়োজন। উল্লিখিত সামর্থ টেকসইভাবে প্রয়োগের জন্য একটি বিশেষায়িত কারিগরি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা আবশ্যক।

প্রস্তাবিত এই প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন এবং প্রশিক্ষিত জনবল দ্বারা পরিচালনা করতে হবে বিধায় সরকারের প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও পে-স্কেলে পরিচালনা করা বাস্তব সম্মত নয়। সরকারের সম্পূর্ণ মালিকানায় এবং উপযুক্ত ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে সরকারের আর্থিক সংশ্লেষ ছাড়া স্ব-উপার্জনে টেকসইভাবে পরিচালনলার নজির রয়েছে, যেমন : সিইজিআইএস, আইডব্লিউএম, আইআইএফসি, এসইমি ফাউন্ডেশন, বিআইডিএস ইত্যাদি।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ভূমিকম্প দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের লক্ষ্যে তুরস্কে ইস্তাম্বুল প্রজেক্ট কো-অডিনেশন ইউনিট – ইস্তাম্বুল সেসমিক এন্ড ইমার্জেন্সি প্রিপেয়ারনেস প্রোগ্রাম (আইপিসিইউ-আই.এস.এমইপি), নেপালে ন্যাশনাল সোসাইটি ফর আর্থকোয়েক টেকনোলজি (এনএসইটি)ইন্দোনেশিয়ায়, ইন্দোনেশিয়া সেন্টার ফর হাউজিং এন্ড সেটেলমেন্ট (পিইউএসকেআইএম, যুক্তরাষ্ট্রে পেসিফিক আর্থ ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্স সেন্টার, জাপানে বিল্ডিং রিসার্স ইনস্টিটিউট (বিআরআই) এবং ইরানে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভূমিকম্প দুর্যোগ ঝুঁকির ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক হারে কমানোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের কোনো সংস্থায় ভবনসমূহের ঝুঁকি নিরুপন করার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন প্রক্রিয়ার কোনো অনুসন্ধান ও পরীক্ষার সুযোগ-সুবিধা নেই। বিভিন্ন জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন আনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা ছাড়াও বাংলাদেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি শহর যেমন, সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ইত্যাদি ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। সুতরাং উক্ত নগরসমূহে ভূমিকম্প দুর্যোগ সক্ষমতার জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করা জরুরী। প্রস্তাবিত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের সুফল পাওয়ার জন্য এর কার্যক্রম শুধুমাত্র ঢাকায় সীমাবদ্ধ না রেখে সমগ্র দেশ ব্যাপী বিশেষ করে উল্লেখিত বড় বড় শহরগুলোতে পরিচালনা করাই যুক্তিযুক্ত। প্রকল্প পরিচালক বলেন, বর্তমান প্রচলিত নির্মাণ কাজের অনুমতি প্রদানপত্র (সিপি) পদ্ধতিটি যুগপোযুগী এবং প্রকৌশলগত পদ্ধতিতে না হওয়ায় কাঠামো নকশা পরীক্ষা ও ভবন নির্মাণ তদারকি করা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

ভূমিকম্প প্রকৌশল, নির্মাণ কাজের অনুমতি পত্র (সিপি) প্রদান পদ্ধতির সংস্করণ ও বাস্তবায়ন, বিএনবিসি পরিচালন, অনুসন্ধান ও পরীক্ষণের কাজের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ও জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের অভাব রয়েছে। প্রস্তাবিত বিশেষায়িত সংস্থাটি ঢাকাসহ সারাদেশে যুগপোষী এবং প্রকৌশগত পদ্ধতিতে নির্মাণ কাজের অনুমতি প্রদান ও বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়ন এবং বিএনবিসি পরিপালন, অনুসন্ধান ও পরীক্ষাকরণ কাজে সহায়তা করবে। প্রস্তাবিত বিশেষায়িত সংস্থাটি উল্লিখিত আধুনিক যন্ত্রপাতি, সফটওয়্যার, সিসমিক ল্যাবরেটরি, দক্ষ মানব সম্পদ ইত্যাদি দ্বারা সারা দেশে ভূমিকম্প দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। ফলে সারা দেশে ভূমিকম্প দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রম পরিচালনায় সরকারের অতিরিক্ত আর্থিক সংশ্লেষ প্রয়োজন হবে না। এই সেমিনারে বক্তারা বিল্ডিং কোড এনফোর্সমেন্ট ও আপডেটিং এর বিষয়ে আলোকপাত করেন। কারন, একটি আপডেটেড বিল্ডিং কোড ছাড়া টেকসই ও ভুমিকম্প প্রতিরোধী ইনফ্রাস্টাকচার বা স্মার্ট সিটি ডেভেলপমেন্ট সম্ভব নয়। এ বিষয়ে মি: এস কে ঘোষ তার বক্তব্যে বলেন বাংলাদেশ বিল্ডিং কোড ২০২০ সালের নামে গেজেট হলেও তা আসলে ১৪ বছরের পুরানো। যার ফলে হাই-স্ট্রেন্থ গ্রেড রিবার (যেমন ৮০ বা ১০০ গ্রেড রিবার) থেকে শুরু করে অনেক উন্নত নির্মান পন্য ব্যবহার থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হচ্ছে। এ সকল পন্য টেকসই উন্নয়ন এর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাই বিল্ডিং কোড আপডেটিং এর বিষয়টি প্রতি ৫-৬ বছর পর পর যেন প্রফেশনাল দের মাধ্যমে করা হয় সে বিষয়ে জোর দেন।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024