সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ১১:২৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
নীলের বিশ্বায়ন – নীল ও ঔপনিবেশিক বাংলায় গোয়েন্দাগিরি (পর্ব-২১) ফেরদৌসের আয়োজনে ‘উচ্ছ্বাসে উৎসবে’ মুগ্ধতা ছড়ালেন তারা ওকে গাইতে দাও (পর্ব-২) বিদেশে শিক্ষা বাণিজ্যে পা রাখার চেষ্টা করছে চায়না সুচিকিৎসা পাচ্ছেন বলেই খালেদা জিয়া এখন পর্য্যন্ত সুস্থ আছেন: আইনমন্ত্রী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরিতে বিসিপিএসকে কার্যকরী ভূমিকা রাখার তাগিদ রাষ্ট্রপতির সরকার বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে বহুমাত্রিক করেছে : প্রধানমন্ত্রী জনগণের সম্মতি ছাড়া রেল চলালচলের চুক্তি মানিনা – ‘এবি পার্টি’ যুদ্ধ এবং ‘এআই’ বরেন্দ্র এলাকায় পানির হাহাকার: মাটির নিচের পানি কোথায় গেলো?

জলবায়ুর ধাক্কার শিকার যে ভোটাররা

  • Update Time : সোমবার, ৩ জুন, ২০২৪, ৪.৩৬ পিএম
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনের ঘোড়ামারা দ্বীপে এক ব্যক্তি পুকুরে মাছ ধরছেন।পাশে তার স্ত্রী দাঁড়িয়ে ।

সারাক্ষণ  ডেস্ক

যখন সারা ভারতে ভোটাররা সাধারণ নির্বাচনে তাদের জীবনযাত্রার খরচ থেকে শুরু করে চাকরি এবং ধর্মের মতো বিষয়গুলিকে সামনে এনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন তখন একটি ক্ষুদ্র, পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল দ্বীপের বাসিন্দাদের একমাত্র উদ্বেগ হলো ‘বেঁচে থাকা’ নিয়ে।

একদিকে বঙ্গোপসাগরের সুন্দরবনের ঘোড়ামারার বাসিন্দারা সমুদ্রপৃষ্ঠের ক্রমবর্ধমান উচ্চতা এবং ক্রমবর্ধমান প্রচণ্ড ঝড়ের মুখে তাদের বাড়িঘর সমুদ্রে বিলীন হওয়া থেকে বাঁচাতে লড়াই করছে অন্যদিকে এই জলবায়ুর পরিবর্তনকে সামনে রেখেই রাজনীতিবিদরা তাদের ভোট জয়ের চেষ্টা করছে।

সুন্দরবন অঞ্চলে প্রায় ৪.৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের  আবাসস্থল। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং এই অঞ্চলটি উষ্ণ হওয়ার সাথে সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের হটস্পট হিসাবে বিবেচিত। সুন্দরবন অঞ্চলের বিস্তার রয়েছে ভারত এবং বাংলাদেশ দুই দেশেই।

 

ভারতের সুন্দরবনের ঘোড়ামারা দ্বীপে স্থানীয় লোকেরা ফেরিতে চড়ে যাতায়াত করে

 

 ভারতের সুন্দরবনের ঘোড়ামারা দ্বীপ: এক ব্যক্তি তার ছাগলগুলিকে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি ফেরিতে তুলছে।

ঘোড়ামারার ৩,৭০০ এরও বেশি নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে একজন বিমল পাত্র (৬০) বলেন, “আমাদের জন্য, দ্বীপের সুরক্ষাই এই নির্বাচনে প্রধান বিষয়।”সাত সপ্তাহ ধরে ভারতে বড় একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মথুরাপুর আসনের অংশ হিসেবে শনিবার ভোটের শেষ দিন ঘোড়ামারার মানুষ ভোট দিতে যান।

দ্বীপের বাসিন্দাদের দুর্দশা, পরিবেশের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং এর জরুরি সমাধানই এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান উদ্বেগ।প্রতাপ দাস, ৫১, একজন জেলে, ভারতের সুন্দরবনের ঘোড়ামারা দ্বীপের হুগলি নদীতে মাছ ধরার জাল ফেলছেন, ১৮ মে, ২০২৪

 

প্রতাপ দাস, ৫১, একজন জেলে, ভারতের সুন্দরবনের ঘোড়ামারা দ্বীপে হুগলি নদীতে মাছ ধরার জাল ফেলছেন, ১৮ মে, ২০২৪।

 

 

একজন জেলে একটি চিংড়ি দেখায় যা তিনি ভাঙ্গন ধরা নদী থেকে ধরেছিলেন। যা উচ্চ জোয়ারের সময় জলে ভরে যায়। ভারতের সুন্দরবনের ঘোড়ামারা দ্বীপ ১৮, ২০২৪।

কলকাতা থেকে ১৫০ কিলোমিটার (৯৪ মাইল) দক্ষিণে অবস্থিত ঘোড়ামারাকে ‘ডুবে যাওয়া দ্বীপ’ বলে অভিহিত করছে গণমাধ্যমগুলো। এটি গত দুই দশকে তার প্রায় অর্ধেক এলাকা ভাঙ্গনের কারনে হারিয়েছে এবং  স্থানীয়রা আশংকা করছেন যে, সমাধান না পাওয়া গেলে আরও কয়েক দশকের মধ্যে দ্বীপটি সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। ২০২০ পর্যন্ত এক দশকে এলাকার জনসংখ্যা ৭,০০০ থেকে প্রায় ৪,০০০-এ নেমে এসেছে।

“আমরা চাই যে তীরগুলিকে পাথরের বোল্ডার দিয়ে শক্তিশালী করা হোক বা আমাদের অন্য কোন জায়গায় পুনর্বাসন করা হোক। সম্ভবত পুনর্বাসনই একমাত্র সমাধান,” পাত্র বলেছিলেন, যার একসময় কয়েক একর জমি ছিল যা এখন সমুদ্রে হারিয়ে গেছে।

পাত্র আরো বলেছিলেন যে, তার বাড়ি এক সময় নদীর ধার থেকে এক কিলোমিটার দূরে ছিল কিন্তু এখন মাত্র ১৫০ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে আছে।

সুকুমার গিরি, একজন ৬১ বছর বয়সী কৃষক, এবং তার স্ত্রী সীতা রানী গিরি, ৫৫, এছাড়াও একজন কৃষক, ভারতের সুন্দরবনের ঘোড়ামারা দ্বীপে তাদের বাড়ির বাইরে ধান গোলায় তোলার কাজ করছেন। ১৮ মে, ২০২৪।

 

সীতা রানী গিরি ১৮ মে, ২০২৪, ভারতের সুন্দরবনের ঘোড়ামারা দ্বীপে তার বাড়িতে যাওয়ার সময় সুকুমার গিরি শুকানোর জন্য রাখা চাল সংগ্রহ করছেন।

জীবনের পথ-

গবেষকরা বলছেন যে জলবায়ু পরিবর্তন সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়াতে বাধ্য করেছে, তাই বঙ্গোপসাগর থেকে আসা মৌসুমি, ঘূর্ণিঝড়গুলি আরও ভয়ঙ্কর এবং ঘন ঘন হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে গত দশকে।

দ্বীপের বাসিন্দারা একসময় প্রধানত কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিল, বেশিরভাগ পরিবারই ধান ও পান চাষ করত। কিন্তু ২০২০ এবং ২০২১ সালের ঘূর্ণিঝড়গুলি লবণাক্ত উচ্চ জলে ক্ষেতগুলিকে প্লাবিত করেছিল, যার ফলে মাটি অনুর্বর হয়ে যায়।

যেহেতু মানুষ দ্বীপ থেকে দূরে চলে গেছে, বিশেষ করে যুবকরা তাই মূল ভূখণ্ডের সাথে পরিবহন যোগাযোগ দিনে মাত্র পাঁচটি ফেরিতে নেমে এসেছে।

দিবাকর দাস, ৬৩। ভারতের সুন্দরবনের ঘোড়ামারা দ্বীপে চলমান সাধারণ নির্বাচনের জন্য একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় প্রতীক সমন্বিত দেয়ালের জানালা দিয়ে দেখছেন, ১৩ এপ্রিল, ২০২৪।

বিমল পাত্র একা থাকেন। তার স্ত্রী কলকাতায় সেবিকা হিসেবে কাজ করে, তার দুই মেয়ে, যারা বিবাহিত, এবং তার শিক্ষক ছেলে মূল ভূখণ্ডে থাকে মানে দ্বীপের বাইরে থাকে।

সুগত হাজরা, কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওশানোগ্রাফিক স্টাডিজের প্রাক্তন প্রধান  বলেন, “এই গ্রামীণ এলাকার লোকেরা এই সমস্যাটিকে (পরিবেশ) অগ্রাধিকার দিচ্ছে দেখে এটি উৎসাহব্যঞ্জক, পাশাপাশি এটি দুর্ভাগ্যজনক যে কেউ তাদের কথা শুনছে না।”

“ভারতের শহরগুলিতে এখন পানীয় জলের ঘাটতিতে ভূগছে মানুষ। তাদের (শহুরে বাসিন্দাদের) পরিবেশ সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়া উচিত এবং অর্থনীতি এবং চাকরির পাশাপাশি এটিকে একটি প্রাথমিক সমস্যা মনে করা উচিত।”

অপর্ণা মাইতি, ২৬, ভারতের সুন্দরবনের ঘোড়ামারা দ্বীপে, ১৬ মে,২০২৪ গরমের দিনে একটি ইন্টিগ্রেটেড চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস (ICDS) কেন্দ্রে হিটস্ট্রোকের কারনে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। চিকিৎসার পর তাকে রিকশায় করে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

ঘোড়ামারার কতিপয় বাসিন্দা ম্যানগ্রোভের চারা রোপণ করেছে জলাধারের ক্ষয় কমানোর জন্য। ইতোমধ্যে স্থানীয় প্রশাসন দ্বীপ জুড়ে একক-ব্যবহারের প্লাস্টিক এবং পলিস্টাইরিন নিষিদ্ধ করার নোটিশ প্রদর্শন করেছে। এখানে একটি কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাও স্থাপন করা হয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং মথুরাপুরের জন্য ২০১৯ সালের নির্বাচনে জয়ী তৃণমূল কংগ্রেস পার্টি (টিএমসি) উভয়ের প্রার্থীরা সম্প্রতি দ্বীপটি পরিদর্শন করেছেন।

বিজেপি প্রার্থী অশোক পুরকাইত একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, “আমি তাদের প্রধান সমস্যা সম্পর্কে সচেতন, যা হল ভূমিক্ষয়।”

ভারতের সুন্দরবনের ঘোড়ামারা দ্বীপে বিমল পাত্র একটি ছবির জন্য পোজ দিয়েছেন যখন তিনি তার পুকুর থেকে মাছ ধরেছেন । ১৬ মে, ২০২৪।

TMC-চালিত রাজ্য সরকার সম্প্রতি সুন্দরবনের দ্বীপগুলির বাঁধগুলিকে শক্তিশালী করার জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি প্রকল্প ঘোষণা করেছে।  পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মন্ত্রী বঙ্কিম হাজরা বলেছেন, “আমাদের অগ্রাধিকার পুনর্বাসন কারন মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করে সারা জীবন বাঁচতে পারে না।”

অনেক গ্রামবাসী বিশ্বাস করতে চান না যে এমন যে প্রতিশ্রুতি কার্যকর হবে, কিন্তু বিমল পাত্র আশা ছাড়েননা। “নির্বাচন আমাদের জন্য একটি উৎসব হতে পারে না, তবে এটি এখনও আশা নিয়ে আসে এবং এখানে সবাই সক্রিয়ভাবে ভোটদান প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে,” তিনি বলেছিলেন।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024