সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ০৪:১৮ অপরাহ্ন

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা: পাবলিক থেকে প্রাইভেট

  • Update Time : বুধবার, ১৩ মার্চ, ২০২৪, ১১.০০ এএম

বুলবুল সিদ্দিকী

 

বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষার ইতিহাস একশ বছরের পুরনো। ২০২১ সাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ-ঐতিহ্য উদ্যাপনের বছর। আমাদের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত, কেননা এটি ছিল আমাদের দেশে অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব বাংলার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় যেমন প্রশিক্ষিত ছাত্রছাত্রী তৈরি করে পাশাপাশি সমাজ পরিবর্তনের এক-একটি হাতিয়ার হিসেবে তার ছাত্রছাত্রীকে গড়ে তোলে। তাই সভ্যতার বিকাশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবদান অনস্বীকার্য।

এর সাথে আমরা যদি একটি দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ার দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, উন্নয়নের সাথে শিক্ষার একটি নিবিড় যোগাযোগ লক্ষণীয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবার পর পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে আমাদের দেশে একে একে আরো অনেক রাষ্ট্রীয় বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। ১৯৫২-এর ভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকের পুরোটা জুড়ে বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে সরাসরি ভূমিকা রাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা। এর মধ্য দিয়ে একটি নতুন দেশের গোড়াপত্তনের সাথে ছাত্রছাত্রীদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ও প্রভাব রয়েছে।

 

এছাড়া বাঙালি জাতির মনন ও মানসিকতা গঠনেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। একই সাথে একটি ‘চাকুরে’ বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণী গঠনেও এর অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে, যেখানে চাকরি করাকে যোগ্যতার একটি বিশেষ মাপকাঠি হিসেবে দেখা হতো। যে- কারণে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ব্যবসা বা উদ্যোক্তা হবার প্রবণতা কম ছিল একটা সময় এবং উদ্যোক্তাদেরও দেখা হতো ভিন্নচোখে। পরবর্তী সময়ে আরো কিছু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হয়। এ প্রসঙ্গে বুয়েট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে আমাদের উচ্চশিক্ষার নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে শুরু করে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মতো একটি অধিক জনগোষ্ঠীসমৃদ্ধ দেশের তরুণ সমাজকে যথাযথভাবে মানবসম্পদে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া সহজ হয়, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

ব্যক্তির জীবনে উচ্চশিক্ষা অভাবনীয় প্রভাব রাখে। আমাদের জীবনের এই সময়টা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, আমাদের মন-মানসিকতার পরিপূর্ণ বিকাশের মধ্য দিয়ে যথার্থ শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে আমাদের বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। পাশাপাশি একটি সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কীভাবে জীবনযাপন করতে হবে, তার প্রতিটি দিকনির্দেশনা আমরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়ে থাকি। সেটি যেমন ক্লাসরুমে হয়, তেমনি বাইরেও হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের নানা বাড়তি কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ছাত্রছাত্রী তার মন-মানসিকতার পরিচর্যার মাধ্যমে এক নতুন উৎকর্ষ অর্জন করে।

 

ব্যক্তিজীবনের পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাসের বাইরেও শিক্ষা মানুষকে একটি সমাজে নানাভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করে। সাথে শিক্ষা মানুষের সামাজিক অবস্থান বা শ্রেণী পরিবর্তনের জন্য নানাভাবে ভূমিকা পালন করে, যাকে আমরা সমাজবিজ্ঞানে ‘আপওয়ার্ড মোবিলিটি’ বলে থাকি। এ-প্রসঙ্গে আমরা ফরাসি তাত্ত্বিক পিয়েরে বুর্দোর ‘ক্যাপিটাল’-এর ধারণার, বিশেষ করে ‘কালচারাল ক্যাপিটাল’ ধারণাটির, অবতারণা করতে পারি। এখানে কালচারাল ক্যাপিটালের উদাহরণ হিসেবে পিয়েরে বুর্দো শিক্ষাকে বুঝেছেন। পিয়েরে বুর্দো ও প্যাসারসনের আলোচনায় যদিও ক্যাপিটালের আরো দুটি ধরনের কথা এসেছে কিন্তু আমাদের এই আলোচনায় তার একটি ধরন অর্থাৎ শিক্ষাকে একটি উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করছি। যেখানে শিক্ষাকে দেখা হয় ব্যক্তির নিজস্ব একটি প্রাপ্তি হিসেবে, যা তাকে অন্যান্য দক্ষতা অর্জনে নানাভাবে সাহায্য করে; যেখানে ব্যক্তি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয় (Buerdeu and Passerson, 1990)।

 

পিয়েরে বুর্দোর আলোচনা থেকে আমরা শিক্ষাকে ব্যক্তির এক সামাজিক অবস্থান থেকে অন্য সামাজিক অবস্থানে রূপান্তরের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে পারি। যে-কারণে আমরা দেখি, বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর ব্যক্তি তার সামাজিক অবস্থান নানাভাবে পরিবর্তিত করতে পারে। এর নানা উদাহরণ আমরা আমাদের সমাজে দেখতে পাই। এর মধ্যে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির নাম আমরা উল্লেখ করতে পারি যাঁরা কেবল শিক্ষার মাধ্যমে তাঁদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অর্থাৎ শ্রেণীর পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। এই সময়ে ছাত্রছাত্রীদের বিসিএসের চাকরির প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষার কথাও আমরা এখানে নিয়ে আসতে পারি, কেননা এর মাধ্যমে ব্যক্তি এক নতুন সামাজিক মর্যাদা অর্জন করে থাকে। এর মাধ্যমে ব্যক্তি তার সামাজিক পরিসরে নতুন পরিচয়ে পরিচিত হতে থাকে, যা তার সামাজিক মর্যাদা ও সমাজে তার গ্রহণযোগ্যতাকে বৃদ্ধি করে বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। এই সামাজিক পরিবর্তনকে আপওয়ার্ড মোবিলিটির একটি প্রক্রিয়া হিসেবে আমরা দেখতে পারি।

যদিও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে অনেক ধরনের বিষয় যুক্ত থাকতে পারে, যেমন কোনো ব্যক্তি উচ্চশিক্ষা অর্জন না করেও কেবল ব্যবসা কিংবা পারিবারিক সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে তার শ্রেণীর পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষা বিশেষ করে স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা এবং তার সনদ ব্যক্তিকে নানাভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করে। আর এরই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখতে পাই যে, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া একটা বড় অংশের মধ্যেই নিশ্চিত চাকরির দিকে ধাবিত হওয়ার প্রবণতা। এই প্রবণতা থেকেই আমরা লক্ষ্য করি যে, সরকারি চাকরির, বিশেষ করে বিসিএসের, প্রতি ছাত্রছাত্রীদের বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের প্রথম বর্ষ থেকেই এক অদম্য আগ্রহ। যদিও অনেকেই ছাত্রছাত্রীদের এই বিসিএসমুখী হবার কারণে অনেক সমালোচনা করে থাকেন; কিন্তু আমরা যদি সামাজিক কিংবা এর দীর্ঘস্থায়ী একটি প্রভাব লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাই যে, বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরি যেমন একাধারে ব্যক্তিকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করে এবং একই সাথে অর্থনৈতিকভাবে এক নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে অবস্থান করতে সক্ষম হয় সে।

 

এখন যদি আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, একটা সময় পর্যন্ত আমাদের সমাজে পাবলিক বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এক অবিচ্ছেদ্য আধিপত্য ও বিস্তার ছিল। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে দেশ পুনর্গঠন ও স্বতন্ত্র একটি উন্নয়ন প্রক্রিয়ার জন্য দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে একটি নবজাগরণ লক্ষ করা যায়। এর সাথে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে একটি বোঝা হিসেবে না দেখে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার একটি জাতীয় প্রচেষ্টা স্বাধীনতার শুরু থেকেই ছিল। যে- কারণে তরুণ সমাজের মধ্যে উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। এখনো বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রাথমিক লক্ষ্য থাকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হওয়া। এখানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ, যে-কারণে দেশের বিভিন্ন শ্রেণী ও সামাজিক স্তর থেকে তরুণরা অত্যন্ত কম খরচে লেখাপড়ার সুযোগ পেয়ে থাকে, যেখানে একটি ব্যাপক প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থান করে নিতে হয়। দেশে মোট ছাত্রছাত্রীর চাহিদার তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার আসনসংখ্যা অনেক সীমিত থাকার কারণে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার তীব্র প্রতিযোগিতা বর্তমান সময়ে আমরা দেখতে পাই। স্বাধীনতা- পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় তরুণ সমাজের একটি বড় অংশকে সুযোগ করে দিতে না পারার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন, শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে নানাবিধ বিতর্ক এবং সর্বোপরি শিক্ষার রাজনীতিকীকরণের কারণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হতে শুরু হয়; বাঙালি মধ্যবিত্তের মননে যা স্বপ্নভঙ্গের একটি কষ্টকর চিত্রকল্প তৈরি করে।

 

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট-১৯৯২-এর মাধ্যমে তৎকালীন সরকার বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতি প্রদান করে। সেই ধারাবাহিকতায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে একে একে শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিতি দেখতে পাই। একটা সময় পর্যন্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল ঢাকা শহরকেন্দ্রিক ছিল; কিন্তু বর্তমান সময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ঢাকার বাইরের বড় বড় শহরে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায়, যেমন চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, অর্থাৎ আমাদের দেশের বড় বড় শহর ও বিভাগীয় শহরেও রয়েছে এক বা একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।

 

উচ্চশিক্ষায় অধিকসংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে সুযোগ করে দেবার লক্ষ্যে সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার অনুমতি দিয়েছিল। এর মাধ্যমে আমাদের দেশের ক্রমবর্ধমান বেসরকারি খাতের এক বিশাল শ্রমবাজারের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ সনদপ্রাপ্ত গ্র্যাজুয়েটদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে আমাদের শ্রমবাজারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এক বড় অবদান আমরা দেখতে পাই। বিগত কয়েক দশকে আমাদের অর্থনীতির অভাবনীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পেছনে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সাথে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

 

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা সময়কালের সিংহভাগ জুড়েই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যাপক অবদান দৃশ্যমান। গত শতাব্দীর বিশের দশক থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত পুরোটাই ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকারে বা দখলে। নব্বইয়ের দশক বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়ায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে। সে-সময় প্রবর্তিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্টের মাধ্যমে আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার বেসরকারিকরণ শুরু হয় এবং এর শুরুটা হয়েছিল নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে। শুরুতে যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের এক ধরনের বিরূপ আচরণ ও সন্তানদের ভর্তি করার ক্ষেত্রে অনীহা দেখা যেত; কিন্তু সময়ের সাথে সাথে শিক্ষাক্ষেত্রে যথোপযুক্ত অবদান রাখার মধ্য দিয়ে অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছু কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বেশ সুনাম অর্জন করে। এছাড়া যুগ ও শিল্পের চাহিদা অনুসারে বিশেষ বিশেষ বিভাগ অনুমোদনের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীকে বিশেষভাবে তৈরি করার মধ্য দিয়ে শ্রমবাজারে প্রথম সারির অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে একটি ভালো ধারণা তৈরি হয়।

 

যদিও শিক্ষা বলতে সাধারণত মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে বুঝে থাকে, তবে শিক্ষার ব্যাপ্তি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে আরো ব্যাপক। এ-কারণেই শিক্ষাকে যদি আমরা একটু ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করি, অর্থাৎ বৃহত্তর জ্ঞানার্জনের সাথে শিক্ষাকে দেখি তাহলে বলা যায়, শিক্ষাপ্রক্রিয়া মূলত সমগ্র জীবনজুড়েই থাকে, যাকে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বেড়াজালে আবদ্ধ করে রাখা সমীচীন নয়। কেননা কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যক্তির জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। যে-কারণে মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, ‘I never let my schooling get in the way of my education’ (‘Cited in Giddens’, 2009)। যার সার কথাই ছিল, তিনি শিক্ষা অর্জনের প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানকে একটি সহায়ক মাধ্যম হিসেবে কখনোই বিবেচনা করেননি, বরং জ্ঞানার্জন বা বৃহত্তর অর্থে শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থাকে শিক্ষার এক বড় অন্তরায় হিসেবে দেখতেন। তাঁর মতে, প্রকৃত ও জীবননির্ভর শিক্ষা মূলত প্রতিষ্ঠানের বাইরে, প্রাত্যহিক জীবন থেকেই অর্জন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সমাজে বসবাসকারী বয়স্ক ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের কাছ থেকে জ্ঞানার্জনের বিষয়টিও যুক্ত। মার্ক টোয়েনের দৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠানকে প্রকৃত শিক্ষার অন্তরায় হিসেবে দেখার প্রক্রিয়া যদিও একটি সর্বজনীন বিষয় নয়, তার পরেও আমরা অনেক বড় বড় মনীষীকে দেখি যাঁরা প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকেই তাঁদের প্রকৃত শিক্ষাচর্চা চালিয়ে আসছেন।

 

তাহলে প্রশ্ন জাগে, সাম্প্রতিক সময়ের এত এত উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যাদের একে অন্যের সাথে ক্রমাগত প্রতিযোগিতা বিদ্যমান এবং কে কার থেকে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেটা প্রমাণ করতে মরিয়া, সকলেই কি তাহলে এক ভ্রান্ত ধারণা দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে? আসলে এভাবেও ভাবার কোনো অবকাশ নেই, কেননা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল ব্যক্তির শিক্ষা অর্জনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষাকেই উন্মোচিত করে, ফলে ব্যক্তি তার শিক্ষা অর্জনের চর্চাকে পরবর্তীকালে আরো বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। সে-বিচারে প্রতিটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মৌলিক অবদানের জায়গা হচ্ছে ব্যক্তির মধ্যে জ্ঞানের পিপাসা তৈরি করা। সেই জ্ঞানের পিপাসা আমাদের বর্তমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটা করতে পারছে সে-প্রশ্ন অবশ্য সরকারি বা বেসরকারি দুই ধারার বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই প্রযোজ্য। বিশেষ করে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে অনেক নেতিবাচক ধারণা যেমন প্রচলিত, ঠিক তেমনি অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার নিম্নমুখী মান সম্পর্কেও নানাবিধ খবর প্রচারিত হতে দেখা যায়। উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনেকের মধ্যে এরূপ হতাশা বিরাজ করলেও আমাদের অনেক ছাত্রছাত্রীর বহির্বিশ্বে অবদানের খবর আমাদের জন্য অনেকটা আশার বাণী হয়ে আসে, যদিও তাদের সংখ্যা প্রত্যাশার তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল।

 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাম্প্রতিক জনপ্রিয়তার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণকে চিহ্নিত করা যায়। এর মধ্যে দুটি কারণ একে অপরের সাথে খুবই সম্পর্কিত বা বলা যায় আংটার মতো যুক্ত। প্রথমত, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতার হাত ধরে দীর্ঘ সেশন জট এবং রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মনে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে এক ধরনের ভীতিকর ধারণা তৈরি হওয়া। যেহেতু একসময় ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের সামনে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা ছিল না ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই অনেককে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়তে হতো। আবার একটা বড় অংশের কাছে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশেষ করে প্রথম সারির কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, ভর্তি হওয়া এক ধরনের স্বপ্নের মতো বিষয় ছিল। তথাকথিত প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাও এর পেছনে বেশ বড় ভূমিকা পালন করত। পাবলিক ডিসকোর্সে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে এরূপ ধারণা নানাবিধ কারণে গড়ে উঠেছে, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে এই ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’-এর ধারণার কনস্ট্রাকশনকে অনেকেই একটি ক্রিটিক্যাল লেন্স দিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন (Hashmi, 2014), যাকে কেবল একটি মিথ হিসেবেই দেখা হয়। অন্যদিকে এ- ধরনের তুলনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মানের প্রতিফলনও প্রকাশিত হয়ে থাকে বলে মনে করা হয়।

 

এই সমস্যার কারণে যারা সামর্থ্যবান তারা মূলত তাদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দিতেন। এখানেও আমরা সামর্থ্যের একটি বিষয় দেখি, যেমন যাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বেশি তারা তাদের সন্তানদের পশ্চিমা দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠাতেন এবং যারা কম সামর্থ্যবান তাদের মধ্যে অনেককেই দেখা যেত আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে উচ্চশিক্ষার জন্য সন্তান-সন্ততিদের পাঠাতে। এতে একটি বড়সড় অর্থনৈতিক লোকসানের মধ্যে জাতি হিসেবে বাংলাদেশকে পড়তে হতো, কারণ তাদের শিক্ষার জন্য একটা বড় অংকের টাকা দেশের বাইরে চলে যেত। নতুন একটি ধারা হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের মালয়েশিয়াতে যাবার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে।

 

দ্বিতীয় যে-বিষয়টির কথা এখানে উল্লেখ না করলেই নয় সেটি হলো, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই দুটি বিষয় অর্থাৎ দীর্ঘ সেশন জট এবং রাজনৈতিক সহিংসতা একদমই অনুপস্থিত। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই এক্ষেত্রে একটি সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেয় যে, এখানে কোনো ধরনের ছাত্র-রাজনীতির প্রচলন থাকবে না। যদিও অনেকেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-রাজনীতির অনুপস্থিতির বিষয়টিকে নেতিবাচক একটি বিষয় হিসেবে দেখে থাকেন। সেশন জট না থাকার কারণে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সময় নষ্ট হবার কোনো ধরনের সম্ভাবনা এখানে ছিল না। এই দুটি বিষয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয়তার পেছনে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে আসছে বলে মনে হয়। আরেকটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সেটি হলো, প্রথম সারির বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমণ্ডলীর একটি বড় অংশই বিদেশে প্রশিক্ষিত, এমনকি কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাইরের কোনো ডিগ্রি ব্যতীত কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয় না। এ-বিষয়টি যদিও অনেকে ভালো চোখে দেখেন না; কিন্তু আমার মনে হয়, উচ্চশিক্ষার জন্য এ-ধরনের একটি নিয়ম অনুসরণ গুণগত মান মেনে চলার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমরা যদি উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের যাত্রা শুরু হয় তাঁর পিএইচ.ডি গবেষণার সনদ পাবার পরে। পাশাপাশি তথাকথিত আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থার আদলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত করার প্রচেষ্টা তাদের প্রতিষ্ঠার পেছনে বড় ভূমিকা পালন করে। অপরদিকে সরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক যোগ্যতাই একজন শিক্ষকের প্রধান যোগ্যতা বলে বিবেচিত।

 

যেহেতু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম সরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয় হতে কিছুটা ব্যয়বহুল তাই অনেকের মধ্যে একটি ধারণা ছিল যে, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল তথাকথিত ‘বড়লোকে’র ছেলেমেয়েরাই পড়ালেখা করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টিকে এতটা সরলভাবে দেখা মোটেই উচিত হবে না, কেননা আমরা যদি এই সময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব, ছাত্রছাত্রীদের একটা বড় অংশ এখন মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে আসছে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন। এর মধ্য দিয়ে এটাই প্রতিফলিত হয় যে, ছাত্রছাত্রী

 

এবং তাদের অভিভাবকদের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, একটু কষ্ট করে হলেও তাঁদের সন্তানদের একটি ভালো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পারলে অনেক দ্রুত ও নিরাপদে তাঁদের সন্তান কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারবে। কেননা সেখানে সেশন জট ও রাজনৈতিক হানাহানি নেই। ফলে তাঁরা একটি নিরাপদ পরিবেশে থেকে নির্ধারিত সময়ে তাদের শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারবে। এর সাথে আরো একটি বিষয়ের অবতারণা করা খুব জরুরি, সেটি হলো, আমাদের দেশে এখন প্রায় একশটিরও বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লক্ষ্য করা যায়, এর মধ্যে খুব কমসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ই কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করতে সক্ষম হচ্ছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, কেন এত এত ছাত্রছাত্রী এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আগ্রহী? এর একটি বড় কারণ হলো, এত বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশে যে-পরিমাণ ছাত্রছাত্রী উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বের হয় তাদের উচ্চশিক্ষা প্রদান করার মতো আসনসংখ্যা এখনো আমাদের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। ফলে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তথাকথিত উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হবার তাড়নার জন্য কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের যেতেই হচ্ছে। এখানে সামাজিক মর্যাদার বিষয়টি আবারো চলে আসে, কেননা এই সমাজে কেউ যদি কমপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শ্রেণী সম্পন্ন না করে তাহলে তার জন্য তা একটি আত্মমর্যাদার বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়।

 

আমাদের দেশে এত এত বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও ঠিক কী কারণে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একটি আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃত নয়, তা স্বতন্ত্র আলোচনার দাবি রাখে এবং তা মধ্যবিত্তের স্বপ্নভঙ্গের আরো একটি বড় কারণ। বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক নানাবিধ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়ের মানকেন্দ্রিক বিন্যাস বা র‍্যাংকিংয়ের প্রচলনের মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, আমাদের দেশের অধিকাংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান যথাযথ স্থান করে নিতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা একটি হতাশার বিষয়। এখানে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রকাশিত লেখার স্বল্পতা ও মান নিয়ে যথেষ্ট সংশয় বিদ্যমান, যা আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক সারিতে না- পৌঁছানোর অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

অনেকেই আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার এই বেসরকারিকরণ কিংবা বাণিজ্যিকীকরণের প্রবণতাকে একটি নেতিবাচক বিষয় হিসেবে দেখে থাকেন। তাদের দাবি, উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ করা কোনোভাবেই উচিত নয়, কেননা এটি রাষ্ট্রের একটি দায়িত্ব। কিন্তু সাথে সাথে এটা মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের মতো একটি স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে এত এত নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে পরিচালনা করা হয়তো সম্ভব ছিল না। সেক্ষেত্রে সমাজের অবস্থাপন্ন ফিলাস্ত্রপিস্টদের উদ্যোগের ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ট্রাস্ট উচ্চশিক্ষার অবদানের জন্য যে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে, তাদের অবদান আমরা আমাদের সমাজব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখতে পাই। বিশেষ করে আমরা যদি গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, এই সময়কাল বেসরকারি বিনিয়োগ এবং আমাদের দেশের উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত। সেই সময়ে বিভিন্ন খাতের যে এক অভাবনীয় মানবসম্পদের চাহিদা তৈরি হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবির্ভাব এমনই একটা সময়ে যা সেই সকল মানবসম্পদের চাহিদা পূরণ করতে অনেকটাই সফল হয়। এর সাথে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যেটি আরো একটি বড় সমালোচনা সেটি হলো, কেবল বাজারি কয়েকটি বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয়। যেমন ব্যবসায় প্রশাসন এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভিন্ন বিষয় ছিল মূলত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষার ক্ষেত্র। অপরদিকে তাদের যুক্তি ছিল, এই সকল বিষয়ের চাহিদা অনেক বেশি, তাই এই সকল বিষয় দিয়ে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা যুক্তিযুক্ত। তবে আমরা যদি আজকে প্রায় দুই যুগ পরে আমাদের বেসরকারি খাতের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, খুব কমসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ই এই ‘বাজারি’ শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বের হতে পেরেছে।

 

পরিশেষে এটা বলা খুবই জরুরি যে, আমাদের উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তনের জন্য এই দুই ধারা শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে একধরনের সামঞ্জস্য নিয়ে আসা জরুরি। সাথে সাথে তাদের মধ্যেকার নানাবিধ ব্যবধান ঘুচিয়ে আনার মাধ্যমে একটি সর্বজনীন উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি এই দুই ধারার শিক্ষাব্যবস্থার উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ও তার মান নিরূপণ করার জন্য স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। বহির্বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালে আমরা এমনই এক সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থার দেখা পাই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবেই; কিন্তু সেটি যেন হয় গুণগত ও সম্পূর্ণই শিক্ষাজ্ঞানভিত্তিক। তা হলেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ধীরে ধীরে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। তখন হয়তো প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের মতো তকমা ছাড়াই আমরা আমাদের পরিচয়ে পরিচিত হতে পারব।

 

 

রেফারেন্স

 

Bourdieu, Pierre, and Jean-Claude Passerson. (1990) Reproduction in Education, Society and Culture. 2nd ed. London, Sage. Originally published as La reproduction.

 

Giddens, Anthony (2009) Sociology, 6th Edition, Cambridge: Polity.

 

Hashmi, Taj (2014) Was Dhaka University ever the ‘Oxford of the East?” The Daily Star, 28 December 2014. Retrieved from https://www.thedailystar.net/was-dhaka-university-ever-the- oxford-of-the-east-57343 accessed on 9th July 2020.

 

The Private University Act 1992.

 

লেখক পরিচিতি: বুলবুল সিদ্দিকী

 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃবিজ্ঞানে পড়ালেখা শেষ করে যুক্তরাজ্যের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ এবং কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ.ডি শেষ করে এখন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত লেখালেখির সাথে যুক্ত আছেন।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024