সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ১০:০৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ফেরদৌসের আয়োজনে ‘উচ্ছ্বাসে উৎসবে’ মুগ্ধতা ছড়ালেন তারা ওকে গাইতে দাও (পর্ব-২) বিদেশে শিক্ষা বাণিজ্যে পা রাখার চেষ্টা করছে চায়না সুচিকিৎসা পাচ্ছেন বলেই খালেদা জিয়া এখন পর্য্যন্ত সুস্থ আছেন: আইনমন্ত্রী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরিতে বিসিপিএসকে কার্যকরী ভূমিকা রাখার তাগিদ রাষ্ট্রপতির সরকার বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে বহুমাত্রিক করেছে : প্রধানমন্ত্রী জনগণের সম্মতি ছাড়া রেল চলালচলের চুক্তি মানিনা – ‘এবি পার্টি’ যুদ্ধ এবং ‘এআই’ বরেন্দ্র এলাকায় পানির হাহাকার: মাটির নিচের পানি কোথায় গেলো? চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে স্পেশাল ট্রেন আরও এক মাস সময় বাড়ালো

ইন্টারনেট হাতে পেয়ে পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত আমাজনের আদিবাসী বর্তমান প্রজন্ম

  • Update Time : শুক্রবার, ৭ জুন, ২০২৪, ৭.৪২ পিএম
মারুবো গোত্রের এক নারী আপন মনে ইন্টারনেট ঘাঁটছেন

সারাক্ষণ ডেস্ক

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বনাঞ্চল আমাজন। এর গহীনে বাস করা আদিবাসীদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। সম্প্রতি এই ধারায় পরিবর্তন এনেছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা।

আমাজনের গহীনে থাকা মারুবোস নামের একটি আদিবাসী গোষ্ঠীকে গত বছরের সেপ্টেম্বরে স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেটের আওতায় আনা হয়। আমেরিকান উদ্যোক্তা অ্যালিসন রেনিউ মারুবোস আদিবাসীদের ইন্টারনেটের অ্যান্টেনাগুলো দিয়েছেন।

তাই হরহামেশাই চোখে পড়ছে-কেউ একজন স্ক্রীনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ফেসবুকিং করছে । কিশোরীরা ইনস্টাগ্রামে চালাচ্ছে। কেউ তার বান্ধবীকে মেসেজ করছে। পুরুষরা অনেকে মিলে একটা ফুটবল ম্যাচ দারুন উত্তেজনা নিয়ে উপভোগ করছে ।তবে, এটা এখন বিশ্বের যে কোন প্রান্তেরই খুব স্বাভাবিক দৃশ্য।

বলছিলাম এমন একটি জায়গার কথা যেটি একটি গ্রহের সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন বিশাল প্রত্যন্ত জায়গায় অবস্থিত। এটি একটি আদিবাসি  গ্রাম। আমাজন রেইনফরেস্টের গভীরে ইটুই নদীর ধারে কয়েকশ মাইল পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সাম্প্রদায়িক কুঁড়েঘরে মারুবো লোকেরা দীর্ঘকাল ধরে  বসবাস করে আসছে। তারা তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলে ।  যেখানে বনের আত্মার সাথে তারা তাদের নিজস্ব ভাষা দিয়ে সংযোগ স্থাপন করে। বনের বিভিন্ন পশু পাখি , কীটপতঙ্গ তাদের আত্মার সাথে মিশে আছে।

একটি শিশু তার পোষা প্রাণীকে নিয়ে বসে আছে

অজানা রহস্যে আমাজন অরণ্য। ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটার অববাহিকা পরিবেষ্টিত এই অরণ্যের প্রায় ৫৫ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকাটি মূলত আর্দ্র জলবায়ু দ্বারা প্রভাবিত।

আমাজান অরণ্য আমাজন নদীর অববাহিকায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নিরক্ষীয় বন, যা দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের উত্তরভাগের ৯টি দেশের অন্তর্ভুক্ত। আমাজন অরণ্য ৬০ ভাগ ব্রাজিলে, ১৩ ভাগ পেরুতে এবং বাকি অংশ কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা, ইকুয়েডর, বলিভিয়া,  গায়ানা, সুরিনাম এবং ফ্রেঞ্চ গুয়ানাতে।

এই অঞ্চলের মানুষ সত্যিই বিচিত্র। তারা সভ্য জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেও শত শত বছর ধরে এই জীবনযাত্রাকে টিকিয়ে রেখেছে। কিছু গ্রামেতো  পৌঁছাতে এক সপ্তাহেরও বেশী  সময় লেগে যায়। কিন্তু গত সেপ্টেম্বর থেকেই এই বিচ্ছিন্ন মারুবো পাচ্ছে উচ্চ-গতির ইন্টারনেট । তাও  এলন মাস্কের কল্যানে। তাই তাকে একটা  ধন্যবাদ দেওয়াই যায়।

মিস্টার মাস্কের  ব্যক্তিগত মহাকাশ সংস্থা স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট-ইন্টারনেট পরিষেবার ভেলকিতে প্রায় ২০০০-সদস্যের ব্রাজিরের এই উপজাতিটি  হঠাৎ স্টারলিঙ্কের সাথে যুক্ত হয়েছে ৷ ২০২২ সালে ব্রাজিলে প্রবেশের পর থেকে, Starlink বিশ্বের বৃহত্তম রেইনফরেস্ট জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

আমাজনের গহীন জঙ্গলে ইন্টারনেটের এন্টেনা

নিউ ইয়র্ক টাইমস আমাজনের গভীরে প্রবেশ করে মারুবোদের গ্রামগুলি দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলো। তারা জানতে চাইলো একটি ক্ষুদ্র, বিচ্ছিন্ন সভ্যতা হঠাৎ করে বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত হলে কী ঘটে তা বোঝার জন্য।

সায়নামা মারুবো, ৭৩ একজন বয়োবৃদ্ধা বলেন, “যখন ইন্টারনেট আসলো সবাই খুশি ছিল।” ইন্টারনেট সুস্পষ্ট সুবিধা নিয়ে এসেছে, যেমন দূরের প্রিয়জনের সাথে ভিডিওতে দেখা যায় কথা বলা যায় এবং জরুরী পরিস্থিতিতে সাহায্যের জন্য যোগাযোগ করা যায়। এটি সত্যিই আমাদের জন্যে সত্যিই আশির্বাদস্বরুপ। বলছিলেন মারুবো।

তিনি আবার আক্ষেপ করে বলেন, ” এখন জিনিসগুলি আরও খারাপ হয়েছে” । আগে তারা তাদের কালো শরীরে রং তৈরি করতে জেনিপাপো বেরি গুঁড়া, শামুকের খোলস থেকে তৈরি গয়নাগুলির দড়ি পরতে পারতেন কিন্তু ইদানীং তরুণরা এ ধরনের রং ও গয়না তৈরির প্রতি কম আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

এনোক মারুবো, ৪০, আদিবাসী নেতা

তিনি জানান, “তরুণরা ইন্টারনেটের কারণে অলস হয়ে পড়েছে, তারা সাদা মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।” তারপর তিনি থামলেন এবং আবার বলতে লাগলেন, “কিন্তু দয়া করে আমাদের ইন্টারনেট কেড়ে নেবেন না।”

স্টারলিঙ্কের সাথে মাত্র নয় মাস পরে, মারুবো ইতিমধ্যেই একই চ্যালেঞ্জগুলির সাথে লড়াই করছে যা বছরের পর বছর ধরে আমেরিকান পরিবারগুলিতে করেছে: কিশোররা ফোনের সাথে আটকে আছে; গসিপ পূর্ণ গ্রুপ চ্যাট; আসক্তিমূলক সামাজিক নেটওয়ার্ক; অনলাইন অপরিচিত; হিংস্র ভিডিও গেম; কেলেঙ্কারি ভুল তথ্য; এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের পর্নোগ্রাফি দেখা। এসব এখন এখানে নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আধুনিক সমাজ কয়েক দশক ধরে এই সমস্যাগুলির সাথে মোকাবিলা করেছে, কারণ ইন্টারনেট তার নিরলস অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। মারুবো এবং অন্যান্য আদিবাসী উপজাতি, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আধুনিকতা থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখেছিল তারা এখন ইন্টারনেটের সম্ভাব্যতা এবং বিপদের মুখোমুখি হচ্ছে, তাদের পরিচয় এবং সংস্কৃতির জন্য এর অর্থ কী তা নিয়ে বিতর্কতেও জড়িয়ে পরছেন।

সেই বিতর্ক এখন এসেছে স্টারলিংকের কারণে, যেটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে একসময় অকল্পনীয় সেবা প্রদান করে বিশ্বব্যাপী স্যাটেলাইট-ইন্টারনেট বাজারে দ্রুত আধিপত্য বিস্তার করেছে। স্পেসএক্স সাহারা, মঙ্গোলীয় তৃণভূমি এবং ক্ষুদ্র প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ সহ পৃথিবীর যেকোন স্থানে অনেক হোম ইন্টারনেট সংযোগের চেয়ে দ্রুত গতি সরবরাহ করতে ৬,০০০টিরও কম কক্ষপথে থাকা স্টারলিংক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে  যা সমস্ত সক্রিয় মহাকাশযানের প্রায় ৬০ শতাংশ।

তরুনীরা ব্যস্ত ফেসবুক, হোয়াটসআপ আর ইন্সটাগ্রামে

মাস্কের ব্যবসা বাড়ছে। মিঃ মাস্ক সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন যে স্টারলিংক ৯৯টি দেশে তিন মিলিয়ন গ্রাহককে ইতোমধ্যেই ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা অনুমান করেছেন যে বার্ষিক বিক্রয় গত বছরের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়ে প্রায় $৬.৬ বিলিয়ন হয়েছে। স্টারলিংকের উত্থান মিস্টার মাস্ককে এমন একটি প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ দিয়েছে যা বিশ্বের অনেক অংশে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে।

এটি ইউক্রেনের সৈন্যরা, সুদানের আধাসামরিক বাহিনী, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা, গাজার একটি হাসপাতাল এবং বিশ্বজুড়ে জরুরি কাজে নিয়োজিতরা ব্যবহার করছে। তবে সম্ভবত স্টারলিংকের সবচেয়ে রূপান্তরমূলক প্রভাবটি আমাজনের মতো ইন্টারনেটের নাগালের বাইরে থাকা অঞ্চলগুলিতে উল্লেখযোগ্যভাবে সবার নজর কেড়েছে। ব্রাজিলিয়ান অ্যামাজনে এখন ৬৬,০০০ চুক্তি  সক্রিয় আছে।

যা নতুন চাকরি ও শিক্ষার সুযোগ খুলে দিয়েছে। এটি অ্যামাজনে অবৈধ লগার এবং খনি শ্রমিকদের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ এবং এড়ানোর জন্য একটি নতুন হাতিয়ার দিয়েছে। একজন মারুবো নেতা, ৪০, এনোক মারুবো (সমস্ত মারুবো একই উপাধি ব্যবহার করেন) বলেছেন, তিনি অবিলম্বে স্টারলিংকের সম্ভাব্যতা দেখেছেন। বনের বাইরে বছরের পর বছর কাটানোর পর, তিনি বিশ্বাস করেন ইন্টারনেট তার মানুষকে নতুন স্বায়ত্তশাসন দিতে পারে। এটির সাহায্যে, তারা আরও ভাল যোগাযোগ করতে পারে, নিজেদেরকে জানাতে পারে এবং তাদের নিজস্ব গল্প বলতে পারে।

গত বছর, তিনি এবং একজন ব্রাজিলিয়ান কর্মী ৫০-সেকেন্ডের একটি ভিডিও রেকর্ড করেছিলেন যাতে সম্ভাব্য উপকারকারীদের কাছ থেকে Starlink পেতে সাহায্য পান। তিনি তার ঐতিহ্যবাহী মারুবো হেডড্রেস পরেছিলেন এবং মালোকায় বসেছিলেন। পশুর দাঁতের মালা গলায় পরা একটি বাচ্চা কাছাকাছি বসেছিল। একদিন পরে, তারা ওকলাহোমা থেকে এক মহিলার কাছ থেকে ফিরতি মেসেজ পান। েএটি একটি বিশেষ আনন্দ তাদের কাছে।

ঐতিহ্যের অংশ, এক নারী তার বডি পেইন্ট করাচ্ছেন

আদিবাসী

জাভারি উপত্যকা আদিবাসী অঞ্চল পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন স্থানগুলির মধ্যে একটি যেটি পর্তুগালের আয়তনের সমান একটি ঘন রেইনফরেস্ট যেখানে কোনো রাস্তাঘাটের অস্তিত্ব নেই। জাভারি উপত্যকার ২৬ টি উপজাতির মধ্যে ১৯টি এখনো পৃথিবীর যে কোন সভ্যতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করে।

১৯ শতকের শেষের দিকে রাবার ট্যাপার না আসা পর্যন্ত মারুবো জাতি একসময় যোগাযোগহীন ছিল। শত শত বছর ধরে এরা বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এটি কয়েক দশক ধরে সহিংসতা এবং রোগের দিকে ধাবিত হচ্ছিল কিন্তু নতুন প্রথা ও প্রযুক্তির আগমনে মারুবোরা কাপড় পরতে আরম্ভ করলো। কেউ কেউ পর্তুগিজ ভাষাও আয়ত্বে নিচ্ছেন।

তারা বন্য শুয়োর শিকার করার জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের ধনুক ব্যবহার করতো। বিশেষ করে একটি পরিবার এই পরিবর্তনকে ঠেলে দিয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে, সেবাস্তিয়াও মারুবো বনের বাইরে বসবাসকারী প্রথম মারুবোদের একজন। তিনি যখন ফিরে আসেন, আরেকটি নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসেন  সেটা হলো নৌকা মোটর বা ইঞ্জিন বোট ।

তার ছেলে এনোক পরবর্তী প্রজন্মের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। তার গোত্রকে ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী। এনোক তার জীবনকে বন এবং শহরের মধ্যে বিভক্ত করেছেন। এক পর্যায়ে কোকা-কোলার গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেছেন। তাই মারুবো নেতারা ইন্টারনেট সংযোগ পেতে আগ্রহী হয়ে উঠলে তারা কীভাবে সেটিপেতে পারেন তা জানতে এনাকের কাছে যান।

এনোক তার উত্তর পেয়েছিলেন যখন মিঃ মাস্ক ব্রাজিল সফর করেছিলেন। ২০২২ সালে, স্পেসএক্সের মালিক মাস্ক এবং সেই সময়ের ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো একটি স্ক্রিনের সামনে স্টারলিংকের আগমনের ঘোষণা করেন, “আমাজন ইন্টারনেটের সংযোগে আসছে।”

এনোক এবং ফ্লোরা দুত্রা, একজন ব্রাজিলিয়ান কর্মী যিনি আদিবাসী উপজাতিদের সাথে কাজ করেন, তারা স্টারলিংকের জন্য কংগ্রেসের ১০০ টিরও বেশি জন সদস্যকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন কিন্তু কারো সাড়া পাননি। তারপরে গত বছরের শুরুতে, মিসেস দুত্রা একজন আমেরিকান মহিলাকে একটি মহাকাশ সম্মেলনে বক্তৃতা করতে দেখেছিলেন। মিসেস দুত্রা মহিলার ফেসবুক পেজ চেক করেছেন এবং স্পেসএক্সের সদর দফতরের বাইরে তাকে পোজ দিতে দেখেছেন।

মিসেস দুত্রা বলেছিলেন যে তিনি সেই দৃষ্টিকোণটি পেয়েছিলেন যখন তিনি গত বছর একজন অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে একটি প্রত্যন্ত আমাজন উপজাতিকে সংযুক্ত করতে সাহায্য করার জন্য একটি ভিডিও পেয়েছিলেন। তিনি কখনই ব্রাজিলে যাননি কিন্তু ভেবেছিলেন বিনিয়োগের উপর রিটার্ন বেশি। এনোক তার গোত্রের জীবন পরিবর্তন করতে ২০টি স্টারলিংক অ্যান্টেনা চেয়েছিলেন, যার দাম প্রায় $১৫,০০০ হবে।

মিসেস রেনিউ বলেছিলেন, “ তিনি এটা ভেবে আশ্চর্য হয়েছিলেন যে, একটি হাতিয়ার একটি সম্প্রদায়ের জীবনের সবকিছু বদলে দেবে !  স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, যোগাযোগ, বন রক্ষা, সব?” তাই , তিনি তার নিজের অর্থ এবং তার সন্তানদের কাছ থেকে অনুদান দিয়ে অ্যান্টেনাগুলি কিনেছিলেন। তারপরে সেগুলি তাদের ডেলিভারি করতে সাহায্য করার জন্য একটি ফ্লাইট বুকিং করেছিলেন।

এরপর শুরু হলো নতুন যাত্রা । অ্যান্টেনাগুলি তখন স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইটগুলিকে গ্রামবাসীদের ফোনে সংযুক্ত করতে শুরু করে। (কিছু মারুবোর কাছে ইতিমধ্যেই ফোন ছিল, প্রায়শই সরকারি কল্যাণ চেক দিয়ে কেনা হয়, কোনো শহরে থাকাকালীন ছবি তোলা এবং যোগাযোগ করার জন্য।)

এনোক স্বীকার করেছেন , ইন্টারনেট একটি অবশ্যই একটি অনুভূতির স্থানে । এটি  তাদের রুটিনকে এতটাই পরিবর্তন করেছে যে এটি ক্ষতিকারক হয়ে উঠেছে। কারন গ্রামে যদি আপনি মাছ শিকার না করেন এবং গাছপালা সংগ্রহ না করেন আপনি কিছু খেতে পারবেননা। নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন যে তাদের এটা ব্যবহারে সীমা থাকা দরকার।তারা সিদ্ধান্ত নিলেন,  ইন্টারনেট শুধুমাত্র সকালে দুই ঘন্টা, সন্ধ্যায় পাঁচ ঘন্টা এবং রবিবার সারাদিন চালু থাকবে।

সেই সময় অনেক মারুবো তাদের ফোনে হেলান দিয়ে থাকে। তারা হোয়াটসঅ্যাপে প্রচুর সময় ব্যয় করে। সেখানে, নেতারা গ্রামের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে এবং স্বাস্থ্য সমস্যা এবং পরিবেশগত ধ্বংসের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে। মারুবো শিক্ষকরা বিভিন্ন গ্রামে শিক্ষার্থীদের সাথে পাঠ ভাগ করে নিতে শুরু করেন। পরিবর্তনের হাওয়ার পালে বাতাস জোরে বইতে শুরু করলো।

এখন প্রত্যেকের দূরবর্তী পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুদের সাথে অনেক ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে রাখছে। এনোকের কাছে, জরুরী পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সুবিধা হয়েছে। একটি বিষধর সাপের কামড় হেলিকপ্টার দ্বারা দ্রুত উদ্ধারের প্রয়োজন হতে পারে। ইন্টারনেটের আগে, মারুবো অপেশাদার রেডিও ব্যবহার করত, কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর জন্য গ্রামের মধ্যে বার্তা বিনিময় করতো।

ইন্টারনেট এই ধরনের কলকে তাৎক্ষণিক করে তুলেছে। “এটি ইতিমধ্যে জীবন বাঁচিয়েছে,” তিনি বলেছিলেন। এপ্রিল মাসে স্টারলিঙ্কের আগমনের সাত মাস পরে, ২০০ জনেরও বেশি মারুবো মিটিং করার জন্য একটি গ্রামে জড়ো হয়েছিল। স্টারলিঙ্ককে গ্রামে আনার বিষয়ে একটি ভিডিও দেখানোর জন্য এনোক একটি প্রজেক্টর নিয়ে এসেছে। কার্যক্রম শুরু হলে দর্শকদের পেছনে কয়েকজন নেতা বক্তব্য রাখেন। সভায় খুবই কম উপস্থিতি দেখে নেতারা ইন্টারনেট বন্ধ রাখার পরামর্শ দেয়।

বিচিত্র সব দৃশ্য এখন চোখে পড়ে এই এলাকায়। একজন বলছিলেন, “আমি চাই না যে লোকেরা আমার কথাগুলি প্রসঙ্গের বাইরে নিয়ে গ্রুপে পোস্ট করুক।”  মিটিং চলাকালীন, কিশোর-কিশোরীরা চাইনিজ মালিকানাধীন একটি সামাজিক নেটওয়ার্ক কোয়াই-এ ব্যস্ত ছিল। অল্প বয়স্ক ছেলেরা ব্রাজিলিয়ান ফুটবল তারকা নেইমার জুনিয়রের ভিডিও দেখেছে এবং দুটি ১৫ বছর বয়সী মেয়ে বলেছে যে তারা ইনস্টাগ্রামে অপরিচিতদের সাথে চ্যাট করেছে। সবাই ব্যস্ত মোবাইল ফোনে । কেউ কোন ধরনের সামাজিক মিটিং এ আসতে ইচ্ছা প্রকাশ করছেনা।

একজন বলেছিলেন যে, তিনি এখন বিশ্ব ভ্রমণের স্বপ্ন দেখেছেন, অন্যজন সাও পাওলোতে দাঁতের ডাক্তার হতে চান। বহির্বিশ্বের এই নতুন খোলা জানালা উপজাতির অনেককে নতুন জীবনে ফিরিয়ে এনেছে। উপজাতির প্রথম মহিলা নেতা তামাসে মারুবো, ৪২,  “কিছু তরুণ আমাদের ঐতিহ্য বজায় রাখে।” “অন্যরা কেবল তাদের ফোনে পুরো বিকেল কাটাতে চায়।”

আলফ্রেডো মারুবো, গ্রামগুলির একটি মারুবো সমিতির নেতা, ইন্টারনেটের বিপ্লবের পরে উপজাতিদের মধ্যে  সবচেয়ে সোচ্চার সমালোচক হিসাবে কাজ করছেন এখন। আরেকজন, তিন সন্তানের জনক কাইপা মারুবো । তিনি বলেছেন যে, তিনি খুশি যে ইন্টারনেট তার সন্তানদের শিক্ষিত করতে সাহায্য করছে। তবে তিনি তার দুই ছেলে যে ফার্স্ট-পারসন-শুটার ভিডিও গেম খেলেন সে বিষয়েও উদ্বিগ্ন ছিলেন। “আমি উদ্বিগ্ন যে তারা হঠাৎ তাদের নকল করতে চাইবে কিন। ” তিনি গেমগুলি মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পাশাপাশি এটাও সন্দেহ করেছিলেন যে  তার ছেলেদের অন্যান্য লুকানো অ্যাপ  থাকতে পারে।

মারুবোরা তাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে মৌখিকভাবে বর্ণনা করে, এবং তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে বলছেন যে, এতে ধীরে ধীরে জ্ঞান হারিয়ে যাবে।তিনি বলেছিলেন, “প্রত্যেকেই এতে এতটাই আসক্ত হয়ে গেছে যে, কখনও কখনও তারা তাদের নিজের পরিবারের সাথে কথা বলার সময় পাচ্ছেনা।” পর্নোগ্রাফি দেখে তিনি সবচেয়ে বেশি অস্থির হয়ে উঠেছেন। তিনি বলেছিলেন যে যুবকরা গ্রুপ চ্যাটে ভিডিওগুলি শেয়ার করে দেখছে অথচ এটি এমন একটি সংস্কৃতির জন্য একটি অত্যাশ্চর্য পরিবর্তন, যে সমাজে প্রকাশ্যে চুম্বনকেও সহজে নেয়না।

এরপর আরেকটি সমস্যা নতুন করে দেখা দিলো যৌন ভিডিও নিয়ে। “আমরা উদ্বিগ্ন তরুণরা এটি চেষ্টা করতে চাইছে,” তিনি ভিডিওগুলিতে চিত্রিত গ্রাফিক যৌনতা সম্পর্কে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে কিছু নেতা তাকে বলেছিলেন, তারা ইতিমধ্যে যুবকদের কাছ থেকে আরও আক্রমণাত্মক যৌন আচরণ লক্ষ্য করছেন।

আলফ্রেডো এবং এনোক, ডুয়েলিং মারুবো অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান হিসাবে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন এখন ইন্টারনেটে তাদের মতবিরোধ একটি তিক্ত বিরোধ তৈরি করেছে।

মিসেস দুত্রা এবং মিসেস রেনিউ অ্যান্টেনা সরবরাহ করার পরে, আলফ্রেডো সুরক্ষিত আদিবাসী অঞ্চলে প্রবেশের জন্য ফেডারেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যথাযথ অনুমতি না পাওয়ার জন্য তাদের রিপোর্ট করেছিলেন। পরিবর্তে, মিসেস দুত্রা সাক্ষাৎকারে আলফ্রেডোর সমালোচনা করেছিলেন, এবং এনোক বলেছিলেন যে তিনি উপজাতীয় সভায় স্বাগত নন। ভবিষ্যত মিস দুত্রার এখন লক্ষ্য রয়েছে স্টারলিংককে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় প্রত্যন্ত উপজাতি ইয়ানোমামি সহ আমাজন জুড়ে আরও শতাধিক আদিবাসী গোষ্ঠীতে নিয়ে আসা। ব্রাজিলের কিছু সরকারি কর্মকর্তা এবং বেসরকারি সংস্থা বলেছেন যে তারা উদ্বিগ্ন যে ইন্টারনেট খুব দ্রুত উপজাতিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, প্রায়শই এর কুফল  সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ছাড়াই।

মিসেস দুত্রা বলেন, আদিবাসী গোষ্ঠী সংযোগ চায় এবং তারা এটার প্রাপ্য। Enoque এবং Ms Dutra বলেছেন যে তারা ইন্টারনেট প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। কোনো Marubo সাক্ষাৎকার নেওয়া মানুষ বলেনি যে তারা এখনও এটি পেয়েছে। এপ্রিল মাসে, মিসেস আবার নিউ বনে ফিরে যান।

এনোকের অনুরোধে, তিনি আরও চারটি অ্যান্টেনা কিনেছিলেন। দুজন কোরুবোর দিকে রওনা হয়েছিল যেখানে ১৫০ জনেরও কম লোকের একটি আদিবাসী যার সাথে প্রথম যোগাযোগ হয়েছিল ১৯৯৬ সালে । কিন্তু এখনও কিছু সদস্য সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। মিস রেনিউ বলেছিলেন যে, তিনি ইন্টারনেটকে “একটি দ্বি-ধারী তলোয়ার” বলে মনে করেন।

এই ইন্টারনেট যে মারুবোস আদিবাসীদের মধ্যে শুধু নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে তা নয়। এর কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এই আদিবাসী গোষ্ঠীর এক সদস্য জানান, আগে কর্তৃপক্ষকে কোনো বার্তা পাঠাতে হলে রেডিওর মাধ্যমে পাঠাতে হতো। এতে অনেক সময় ব্যয় হতো। এখন তাৎক্ষণিক বার্তা পাঠানো যায়। এতে কাউকে বিষাক্ত সাপে কাটলে বা জরুরি অবস্থা হলে দ্রুত খবর পাঠানো যায়।

এই গোষ্ঠীর আরেক সদস্য বলেন, ইন্টারনেট জনগণকে নতুন স্বায়ত্তশাসন দিতে পারে। এটির সাহায্যে, তারা আরও ভালো যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে, নিজেদেরকে জানাতে পারে এবং তাদের নিজস্ব গল্প বলতে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024