বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ০১:২২ পূর্বাহ্ন

দিবারাত্রির কাব্য: মানিক বন্দোপধ্যায় ( ৮ম কিস্তি )

  • Update Time : শনিবার, ১৬ মার্চ, ২০২৪, ১২.০০ পিএম

রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে আরেকটি নতুন যুগ সৃষ্টি হয়েছিলো। ভাষাকে মানুষের মুখের ভাষার কাছে নিয়ে আসা নয়, সাহিত্যে’র বিষয়ও হয়েছিলো অনেক বিস্তৃত। সাহিত্যে উঠে এসেছিলো পরিবর্তিত মন ও সমাজের নানান প্রাঙ্গন। সময়ের পথ ধরে সে যুগটি এখন নিকট অতীত। আর সে সাহিত্যও চিরায়ত সাহিত্য। দূর অতীত ও নিকট অতীতের সকল চিরায়ত সাহিত্য মানুষকে সব সময়ই পরিপূর্ণ মানুষ হতে সাহায্য করে। চিরায়ত সাহিত্যকে জানা ছাড়া বাস্তবে মানুষ তার নিজেকে সম্পূর্ণ জানতে পারে না।

সারাক্ষণের চিরায়ত সাহিত্য বিভাগে এবারে থাকছে মানিক বন্দোপধ্যায়ের দিবারাত্রির কাব্য।

দিবারাত্রির কাব্যে’র ভূমিকায় মানিক বন্দোপধ্যায় নিজেই যা লিখেছিলেন …..

দিবারাত্রির কাব্য আমার একুশ বছর বয়সের রচনা। শুধু প্রেমকে ভিত্তি করে বই লেখার সাহস ওই বয়সেই থাকে। কয়েক বছর তাকে তোলা ছিল। অনেক পরিবর্তন করে গত বছর বঙ্গশ্রীতে প্রকাশ করি।

দিবারাত্রির কাব্য পড়তে বসে যদি কখনো মনে হয় বইখানা খাপছাড়া, অস্বাভাবিক,- তখন মনে রাখতে হবে এটি গল্পও নয় উপন্যাসও নয়, রূপক কাহিনী। রূপকের এ একটা নূতন রূপ। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পর্ক দিয়ে সীমাবদ্ধ করে নিলে মানুষের কতগুলি অনুভূতি যা দাঁড়ায়, সেইগুলিকেই মানুষের রূপ দেওয়া হয়েছে। চরিত্রগুলি কেউ মানুষ নয়, মানুষের Projection-মানুষের এক এক টুকরো মানসিক অংশ।

দিবা রাত্রির কাব্য

মানিক বন্দোপাধ্যায়

 

মালতী আশা করে আজই শেষ নয়, সে আসা-যাওয়া বজায় রাখবে। ভূমিকাতে তার সামনে নিজের সব দুর্বলতা ধরে দিয়ে মালতী শুধু এই সম্ভাবনাই রহিত করে দিচ্ছে যে ভবিয়াতে তার যেন আবিষ্কার করার কিছু না থাকে। হেরম্বের মনে হল এ যেন একটা আশ্বাস, একটা কাম্য ভবিষ্যৎ। সে বার বার আসবে এবং তাদের সঙ্গে এতদূর ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠবে যে মালতী খাপছাড়া জীবনের সমস্ত দীনতা ও অসঙ্গতি সে জেনে ফেলবে, মালতীর এই প্রত্যাশা নানা সম্ভাবনায় হেরম্বের কাছে বিচিত্র ও মনোহর হয়ে উঠল। মালতীর এই মৌলিক আমন্ত্রণে তার হৃদয় কৃতজ্ঞ ও প্রফুল্ল হয়ে রইল।

‘একথা মিথ্যা নয় মালতী-বৌদি। আমার কাছে কিছুই গোপন করবার দরকার নেই।’

‘গোপন করার কিছু নেই-ও হেরম্ব।’

‘কি থাকবে?’

“তাই বলছি। কিছুই নেই।’

একটা যেন চুক্তি হয়ে গেল। মালতী স্বীকার করল সে কারণ পান করে, লোক-ঠকানো পয়সায় জীবিকা নির্বাহ করে। হেরম্ব ঘোষণা করল, তাতে কিছু এসে যায় না।

জীবন মালতীকে অনেক শিক্ষা দিয়েছে। হয়তো সে শিক্ষা হৃদয়-সংক্রান্ত নয়। কিন্তু তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে সন্দেহ করা চলে না।

কিন্তু আনন্দ?

আনন্দের হৃদয় কি প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও মার্জনা পায়নি? ওর জমকালো বাইরের রূপ তো ওর হৃদয়কে ছাপিয়ে নেই ?-হেরম্ব এই কথা ভাবে। মালতী যে মেয়েকে কুশিক্ষা দেবে তার এ আশঙ্কা কমে এসেছিল। সে ভেবে দেখেছে, মালতী ও আনন্দের জীবন এক নয়। সে সব কারণ মালতীকে ভেঙেছে, আনন্দের জীবনে তার অস্তিত্ব হয়তো নেই। তাছাড়া ওদিকে আছে অনাথ। মেয়েরা মা’র চেয়ে পিতাকেই নকল করে বেশী, পিতার শিক্ষাই মেয়েদের জীবনে বেশী কার্যকরী হয়। অনাথের প্রভাব আনন্দের জীবনে তুচ্ছ হতে পারে না। মালতীর সঙ্গে পরিচয় করে মানুষ যে আজকাল খুশী হতে পারে না, অনাথ সমুদ্রতীরে একথা স্বীকার করেছে। অনাথের যদি এই জ্ঞান জন্মে থাকে, মেয়ের সম্বন্ধে সে কি সাবধান হয়নি?

অনাথ ওস্তাদ কারিগর, হৃদয়ের প্রতিভাবান শিল্পী। আনন্দ হয়তো তারই হাতে গড়া মেয়ে। হয়তো মালতীর বিরুদ্ধ প্রভাবকে অনাথের সাহায্যে জয় করে তার হৃদয়-মনের বিকাশ আরও বিচিত্র, আরও অনুপম হয়েছে। ঘরে বসে হৃদয়ের দলগুলি মেলবার উপায় মানুষের নেই, মনের সামঞ্জস্ত ঘরে সঞ্চয় করা যায় না। মন্দের সম্পর্কে না এলে ভালো হওয়া

কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। জীবনের রুক্ষ কঠোর আঘাত না পেলে মানুষ জীবনে পঙ্গু হয়ে থাকে, তরল পদার্থের মতো তার কোন নিজস্ব গঠন থাকে -না। আনন্দ হয়তো মালতীর ভিতর দিয়ে পৃথিবীর পরিচয় পেতে সম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। টবের নিস্তেজ অসুস্থ চারাগাছ হয়ে থাকার বদলে মালতীর সাহায্যেই হয়তো সে পৃথিবীর মাটিতে আশ্রয় নেবার সুযোগ পেয়েছে, রোদ বৃষ্টি গায়ে লাগিয়ে আগাছার সঙ্গে লড়াই করে ও মাটির রস আকর্ষণ করে বেড়ে ওঠা তরুর মতো সতেজ, সজীব জীবন আহরণ করতে পেরেছে।

কিছুক্ষণের জন্ম তিনজনেই নির্বাক হয়ে গিয়েছিল। অনাথের কিছু দরকার আছে কিনা দেখতে গিয়ে আনন্দ সমস্ত মুখ ভাল করে ধুয়ে এসেছে। হেরম্বের দৃষ্টিকে চোখে না দেখেও তার মুখে যে অল্প অল্প রক্তের ঝাঁজ ও রঙ সঞ্চারিত হচ্ছিল বোধহয় সেইজন্যই। তবে আনন্দের সম্বন্ধে কোন বিষয়ে নিঃসন্দেহ হবার সাহস হেরম্বের ছিল না। তার যতটুকু বোধগম্য হয় আনন্দের প্রত্যেকটি কথা ও কাজের যেন তারও অতিরিক্ত অনেক অর্থ আছে।

আনন্দ বলল, ‘আজ আরতি হবে না মা?’

‘হবে।’

‘এখনো যে মন্দিরের দরজাই খুললে না?’

‘তোর বুঝি খিদে পেয়েছে? প্রসাদের অপেক্ষায় বসে না থেকে কিছু

খেয়ে তো তুই নিতে পারিস আনন্দ?’

‘খিদে পায়নি মা। খিদে পেলেও আজ খাচ্ছে কে?’

মালতী তার মুখের দিকে তাকাল।

‘কেন, খাবি না কেন? নাচবি বুঝি আজ?’

আনন্দ মৃদু হেসে বলল, ‘হ্যা। এখন নয়।

চাঁদ উঠুক, তারপর।’

‘আজ আবার তোর নাচবার সাধ জাগল! করিনি আনন্দ। রোজ রোজ না খেয়ে-‘ তোকে নাচ শিখিয়ে ভাল

আনন্দ নিরতিশয় আগ্রহের সঙ্গে বলল, ‘অনেক রাত্রে আজ চন্দ্রকলা

নাচটা নাচব মা।’

‘তারপর রাত্রে না খেয়ে ঘুমোবি তো?’

‘ঘুমোলাম বা! একরাত না খেলে কি হয়? আজ পূর্ণিমা তা জান?’

মালতী বলল, ‘আজ পূর্ণিমা নাকি? তাই কোমরটা টনটন করছে, গা ভারী ঠেকছে।’

হেরম্ব কৌতূহলের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি নাচতে পার নাকি আনন্দ?’ মালতী বলল, ‘পারবে না? আর কিছু শিখেছে নাকি মেয়ে আমার। গুণের মধ্যে ওই এক গুণ-নাচতে শিখেছেন। দুটি লোকের রান্না করতে দাও-মেয়ে চোথে অন্ধকার দেখবেন!

 

 

মালতী কিন্তু ছাড়ল না।

‘এর মধ্যেই গিলেছি নাকি আজ, এই তো বলছিলি? না গিলিনি! কারণ হল সাধনে বসার জন্য, যখন তখন আমি ওসব গিলি না বাপু।’

হেরম্ব জিজ্ঞাসা করল, ‘কি মালতী-বৌদি? মদ?’

‘মদ নয়। কারণ। ধর্মের জন্ম একটু একটু খাওয়া, এই আর কি! আনন্দ বলল, ‘মদ খাওয়া হল ধর্ম!’

মালতী বলল, ‘নয়? এবার বাবা এলে শুধোস্।’ মালতী হেরম্বর দিকে তাকাল, ‘বাবার আদেশে একটু একটু খাই হেরম্ব। প্রথমে হয়েছিলাম বৈষ্ণব-ভক্তিমার্গ পোষাল না। এবার তাই জোরালো সাধনা ধরেছি। বাবা বলেন-”বাবা কে?’

‘আমার গুরুদেব। শ্রীমৎ স্বামী মশালবাবা!-নাম শোননি? দিবারাত্রি মশাল জ্বেলে সাধন করেন।’ মালতী যুক্ত করে কপালে ঠেকাল।

আনন্দ বলল, ‘কারণ খাওয়া যদি ধর্ম মা, আমি সেদিন একটু থেতে চাইলাম বলে মারতে উঠেছিলে কেন? কাল থেকে আমিও পেট ভরে ধর্ম করব মা।’

হেরম্ব ভাবে: আনন্দ একথা বলল কেন? সে কারণ খায় না আমাকে

একথা শোনাবার জন্যে?

মালতী বলল, ‘করেই দেখিস!’

‘তুমি কর কেন?’

‘আমার ধর্ম করবার বয়স হয়েছে। তুই একরত্তি মেয়ে, তোর ধর্ম আলাদা। আমার মতো বয়স হলে তখন তুই এসব ধর্ম করবি, এখন কি? যে বয়সের যা। তুই নাচিস্, আমি নাচি?’

আনন্দ হেসে বলল, ‘নেচো না, নেচো। নাচতে তো বাপু একদিন। এখনও এক একদিন বেশি করে কারণ খেলে যে নাচটাই নাচো’

‘তোর মতো বেয়াদব মেয়ে সংসারে নেই আনন্দ!’

মালতীর পরিবর্তন হেরম্ব বুঝতে পারছিল না। সে মোটা হয়েছে, তার কণ্ঠ কর্কশ, তার কথায় ব্যবহারে কেমন একটা নিলাজ রুক্ষতার ভাব। আনন্দের মধ্যস্থতা না থাকলে মালতীর মধ্যে সত্যবাবুর মেয়ের কোন চিহ্নই খুঁজে না পেয়ে হেরম্ব হয়তো আজ আরও একটু বুড়ো, আরও একটু বিষাদগ্রস্ত হয়ে বাড়ি ফিরত। কুড়ি বছরের পুরানো গৃহত্যাগের ব্যাপারটার উল্লেখ মালতী নিজে থেকেই করেছিল, দ্বিধা করেনি, লজ্জা পায়নি। এটাসে বুঝতে পারে। বুঝতে পারে যে দশ বছরের মধ্যে একদিনের লজ্জাতুরা নববধূ যদি সকলের সামনে স্বামীকে বাজারের ফর্দ দিতে পারে, মালতীর বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসাটা কুড়িবছর পরে তুচ্ছ হয়ে যাওয়া আশ্চর্য নয়। কিন্তু তার পরিচয় পাবার পরেও কারণ না এনে দেবার জন্য অনাথকে সে তো অনুযোগ পর্যন্ত করেছিল। আনন্দের সঙ্গে তর্ক করে মদকে কারণ নাম দিয়ে ধর্মের নামে নিজের সমর্থন করতেও তার বাধেনি। মালতী এভাবে বদলে গিয়েছে কেন? তার ছেলেবেলার রূপকথার অনাথ আজও তেমনি আছে, মালতীকে এভাবে বদলে দিল কিসে?

 

আনন্দ আর একবারও হেরম্বের দিকে তাকায়নি। কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে তাকে না দেখে হেরম্বের উপায় ছিল না। ও সম্বন্ধে একটা আশঙ্কা তার মনে এসেছে যে, মালতীর পরিবর্তন যদি বেশী দিনের হয় আনন্দের চরিত্রে হয়তো ছাপ পড়েছে। আনন্দের কথা শুনে, হাসি দেখে, মালতীর দেহ দিয়ে নিজেকে অর্ধেক আড়াল করে ওর বসবার ভঙ্গী দেখে মনে হয় বটে যে, সত্যবাবুর মেয়ের মধ্যে যেটুকু অপূর্ব ছিল, যতখানি গুণ ছিল, শুধু সেইটুকুই সে নকল করেছে; মালতীর নিজের অর্জিত অমার্জিত রুক্ষতা তাকে স্পর্শ করেনি। কিন্তু সেই সঙ্গে এই কথাটাও ভোলা যায় না যে, যে আবহাওয়া মালতীকে এমন করেছে আনন্দকে তা একেবারে রেহাই দিয়েছে।

 

মালতীর উপর হেরম্বের রাগ হতে থাকে। এমন মেয়ে পেয়েও তার মা হয়ে থাকতে না পারার অপরাধের মার্জনা নেই। মালতী আর যাই করে থাক হেরম্ব বিনা বিচারে তাকে ক্ষমা করতে রাজী আছে, মদ খেয়ে ইতিমধ্যে সে যদি নরহত্যাও করে থাকে সে চোখ-কান বুজে তাও সমর্থন করবে। কিন্তু মা হয়ে আনন্দকে সে যদি মাটি করে দিয়ে থাকে, হেরম্ব কোনদিন তাকে মার্জনা করবে না।

খানিক পরে অনাথ বেরিয়ে এল। স্নান সমাপ্ত করে এসেছে। ‘আমার আসন কোথায় রেখেছ মালতী?’

মালতী বলল, ‘জানি না। হ্যাগা, স্নান যদি করলে আরতিটা আজ তুমিই করে ফেল না? বড় আলসেমি লাগছে আমার।’ অনাথ বলল, ‘আমি এখুনি আসনে বসব। আরতির জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারব না।’

 

‘একজনকে বাড়িতে ডেকে এনে এমন নিশ্চিন্ত মনে বলতে পারলে আসনে বসব? কে তোমার অতিথিকে আদর করবে শুনি? স্বার্থপর আর কাকে বলে! সন্ধ্যা হতেই বা আর দেরি কত, এ্যা?’

অনাথ তার কথা কানে তুলল না। এবার আনন্দকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আমার আসন কে সরিয়েছে আনন্দ?’

‘আমি তো জানিনে বাবা?’

অনাথ শান্তভাবেই মালতীকে বলল, ‘আসনটা কোথায় লুকিয়েছ, বার

করে দাও মালতী। আসন কথনো সরাতে নেই এটা তোমার মনে রাখা উচিত ছিল।’

মালতী বলল, ‘তুমি অমন কর কেন বল তো? বোসো না এখানে,-একটু গল্পগুজব কর। এতকাল পরে হেরম্ব এসেছে, দু’দণ্ড বসে কথা না কইলে অপমান করা হবে না?’

হেরম্ব প্রতিবাদ করে বলতে গেল, ‘আমি-‘কিন্তু মালতী তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘আমাদের ঘরোয়া কথায় তুমি কথা কয়ো না হেরম্ব।’ হেরম্ব আহত ও আশ্চর্য হয়ে চুপ করে গেল। অনাথ তার বিষণ্ণ হাসি হেসে বলল, ‘আমি অপমান করব কল্পনা করে তুমি নিজেই যে অপমান করে বসলে মালতী! কিছু মনে কোরো না হেরম্ব। ওর কথাবার্তা আজকাল এরকমই দাঁড়িয়েছে।’

হেরম্ব বলল, ‘মনে করার কি আছে!’

মালতীর মুখ দেখে হেরম্বের মনে হল তাকে সমালোচনা করে এভাবে অতিথিকে মান না দিলেই অনাথ ভাল করত।

অনাথ বলল, ‘আমার চাদরটা কোথায় রে আনন্দ?’

‘আলনায় আছে-মা’র ঘরে! এনে দেব?’

‘থাক। আমিই নিচ্ছি গিয়ে। তোমার সঙ্গে কথাবার্তা বলার সুযোগ হল না বলে অনাদর মনে করে নিও না হেরম্ব। আমার মনটা আজ একটু বিচলিত হয়ে পড়েছে। আসনে না বসলে স্বস্তি পাব না।’

 

হেরম্ব বলল, ‘তা হোক মাস্টারমশায়! আর একদিন কথাবার্তা হবে।’

মালতী মুখ গোঁজ করে বসেছিল। দিয়ে হবে কি?’ এইবার সে জিজ্ঞাসা করল, ‘চাদরঅনাথ বলল, ‘পেতে আসন করব। আসনটা লুকিয়ে তুমি ভালই করেছ মালতী। দশ বছর ধরে ব্যবহার করে আসনটাতে কেমন একটু মায়া বসে গিয়েছে। একটা জড় বস্তুকে মায়া করা থেকে তোমার দয়াতে উদ্ধার পেলাম।’

মালতী নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘যা আনন্দ, আমার বিছানার তলা থেকে আসনটা বার করে দিগে যা।’

অনাথ বলল, ‘থাক, কাজ নেই। ও আসনে আমি আর বসব না।’ মালতী ক্রোধে আরক্ত মুখ তুলে, বলল, ‘তুমি মানুষ নও। জানলে? মানুষ তুমি নও। তুমি ডাকাত! তুমি ছোটলোক।’

‘রেগো না মালতী। রাগতে নেই।’

‘রাগতে নেই, রাগতে নেই! আমার খাবে পরবে, আমাকেই অপমান করবে-রাগতে নেই!’

‘মাথা গরম করা মহাপাপ মালতী।’-মৃদুস্বরে এই কথা বলে অনাথ বাড়ির মধ্যে চলে গেল।

খানিকক্ষণ নিঝুম হয়ে থেকে মালতী হঠাৎ তার শব্দিত হাসি হেসে বলল, ‘দেখলে হেরম্ব? লোকটা কেমন পাগল দেখলে?’

হেরম্ব অস্বস্তি বোধ করছিল। বলল, ‘আমি কি বলব বলুন?’

আনন্দ বলল, ‘বাইরের লোকের সামনেও বাগড়া করে ছাড়লে তো মা?’

মালতী বলল, ‘হেরম্ব বাইরের লোক নয়।’

হেরম্ব এ কথায় সায় দিয়ে বলল, ‘না।’ আমি বাইরের লোক নই আনন্দ।’

আনন্দ বলল, ‘তা জানি! বাইরের লোকের সঙ্গে মা ঠাট্টা-তামাশা করে না। প্রথম থেকে মা আপনার সঙ্গে যেরকম পরিহাস করছিল, তাতে বাইরের লোক হওয়া দূরে থাক, আপনি ঘরের লোকের চেয়ে বেশী প্রমাণ হয়ে গেছেন।’

 

মালতী বলল, ‘ঘরের লোকের সঙ্গে আমি ঠাট্টা-তামাশা করি নারে, আনন্দ? তামাশা করার কত লোক ঘরে! একটা কথা কওয়ার লোক আছে আমার?’

আনন্দ হাতের তালু দিয়ে আস্তে আস্তে তার পিঠ ঘষে দিতে দিতে বলল, ‘ঘরে নাই বা লোক রইল মা, তোমার কাছে বাইরের কত লোক আসে, সমস্ত সকালটা তুমি তাদের সঙ্গে কথা কও।’

পিঠ থেকে মেয়ের হাত সামনে এনে মালতী বলল, ‘তারা হল ভক্ত, লক্ষ্মীছাড়ার দল। ওদের ঠকাতে ঠকাতেই প্রাণটা আমার বেরিয়ে গেল না! খাচ্ছিস্ দাচ্ছিস্, মনের সুখে আছিস্, লোককে ঠকিয়ে পয়সা করতে কেমন লাগে তুই তার কি বুঝবি। সারা সকালটা গম্ভীর হয়ে বসে বসে শুধু ভাব, কি করে কার কাছে দুটো পয়সা বেশী আদায় হবে। আমি মেয়েমানুষ, আমার কি ওসব পোষায়! তোর বাবা একটা পয়সা রোজগার করে? একবার ভাবে, দিন গেলে পোড়া পিণ্ডি কোখা থেকে আসে? তুই ভাবিস?’ আনন্দ অনুযোগ নিয়ে বলল, ‘ওঁর কাছে তুমি সব প্রকাশ করে দিচ্ছ মা!’

এই অভিযোগে মালতী কিছু মাত্র বিচলিত হল না, বলল, ‘তাতে কি, যা করছি জেনে-শুনেই করছি। হেরম্ব লুকোচুরি ভালবাসে না।’

এই ব্যাখ্যা অথবা কৈফিয়ত হেরম্বর মনে লাগল। সে বুঝতে পারল তার মতামতকে অগ্রাহ্য করে বলে নয়, শেষপর্যন্ত তার কাছে কোন কথাই লুকানো থাকবে না বলেই মালতী কোন বিষয়ে লুকোচুরির আশ্রয় গ্রহণ করছে না। নিজের এবং নিজেদের সঠিক পরিচয় আগেই তাকে জানিয়ে রাখছে!

এর মধ্যে আরও একটা বড় কথা ছিল, হেরম্বকে যা পুলকিত করে দিল।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024