সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:১৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
জিকো এবং জেনি নতুন ট্র্যাক ‘স্পট’-এর জন্য উত্তেজনাপূর্ণ টিজার উন্মোচন করেছে কাতারের আমিরকে স্বাগত জানালেন রাষ্ট্রপতি গরমে শুধু শিশুদের নয়, বয়স্কদেরও ডায়েরিয়া বেড়েছে কিরগিজস্তান বাংলাদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি নিতে চায় : সালমান এফ রহমান সন্তানের অভিভাবকত্ব নির্ধারণের নির্দেশিকা এবং নীতিমালা প্রণয়নে হাইকোর্টের রুল জারি শুভমান গিল অদূর ভবিষ্যতে ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দিবে: রবিন উথাপ্পা মানবজনম জাতীয়তা আইনজীবী ফোরামের কোনো গঠনতন্ত্র নেই : ব্যারিষ্টার খোকন  বাইডেন কি আফ্রিকান-আমেরিকান ভোটার ধরে রাখতে পারবেন? কে-পপ ইলিটের প্রথম গানেই ১০০ মিলিয়ন স্পটিফাই স্ট্রিম

দিবারাত্রির কাব্য: মানিক বন্দোপধ্যায় ( ১০ম কিস্তি )

  • Update Time : সোমবার, ১৮ মার্চ, ২০২৪, ১২.০০ পিএম

রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে আরেকটি নতুন যুগ সৃষ্টি হয়েছিলো। ভাষাকে মানুষের মুখের ভাষার কাছে নিয়ে আসা নয়, সাহিত্যে’র বিষয়ও হয়েছিলো অনেক বিস্তৃত। সাহিত্যে উঠে এসেছিলো পরিবর্তিত মন ও সমাজের নানান প্রাঙ্গন। সময়ের পথ ধরে সে যুগটি এখন নিকট অতীত। আর সে সাহিত্যও চিরায়ত সাহিত্য। দূর অতীত ও নিকট অতীতের সকল চিরায়ত সাহিত্য মানুষকে সব সময়ই পরিপূর্ণ মানুষ হতে সাহায্য করে। চিরায়ত সাহিত্যকে জানা ছাড়া বাস্তবে মানুষ তার নিজেকে সম্পূর্ণ জানতে পারে না।

সারাক্ষণের চিরায়ত সাহিত্য বিভাগে এবারে থাকছে মানিক বন্দোপধ্যায়ের দিবারাত্রির কাব্য।

দিবারাত্রির কাব্যে’র ভূমিকায় মানিক বন্দোপধ্যায় নিজেই যা লিখেছিলেন …..

দিবারাত্রির কাব্য আমার একুশ বছর বয়সের রচনা। শুধু প্রেমকে ভিত্তি করে বই লেখার সাহস ওই বয়সেই থাকে। কয়েক বছর তাকে তোলা ছিল। অনেক পরিবর্তন করে গত বছর বঙ্গশ্রীতে প্রকাশ করি।

দিবারাত্রির কাব্য পড়তে বসে যদি কখনো মনে হয় বইখানা খাপছাড়া, অস্বাভাবিক,- তখন মনে রাখতে হবে এটি গল্পও নয় উপন্যাসও নয়, রূপক কাহিনী। রূপকের এ একটা নূতন রূপ। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পর্ক দিয়ে সীমাবদ্ধ করে নিলে মানুষের কতগুলি অনুভূতি যা দাঁড়ায়, সেইগুলিকেই মানুষের রূপ দেওয়া হয়েছে। চরিত্রগুলি কেউ মানুষ নয়, মানুষের Projection-মানুষের এক এক টুকরো মানসিক অংশ।

দিবা রাত্রির কাব্য

মানিক বন্দোপাধ্যায়

 

 

আনন্দ হেসে বলল, মিথ্যে আমার নিন্দা কোরো না মা! বাবাকে দু’বেলা রোঁধে দেয় কে?

 

যে রান্নাই রেধে দিস, ও তোর বাপ ছাড়া আর কেউ মুখেও করবে না।

 

তা হতে পারে। কিন্তু রাঁধি তো! বসে বসে খাই আর নাচি একথা বলতে হয় না।

 

হেরম্ব বলল, আমি তোমার নাচ দেখতে পারি আনন্দ?

 

খুব। কেন পারবেন না? এতো থিয়েটারের নাচ নয় যে দেখতে পয়সা লাগবে! কিন্তু আপনি কি অতক্ষণ থাকবেন?

 

থাকতে দিলেই থাকব।

 

মালতী বলল, থাকবে বই কি। তুমি আজ এখানেই খাবে হেরম্ব।

 

আনন্দ হেসে বলল, নেমতন্ন তো করলে, ঘরের লোকটিকে খাওয়াবে কি মা?

 

আমরা যা খাই তাই খাবে।

 

তার মানে উপোস। আজ পূর্ণিমার রাত, তুমি একটু দুধ খাবে, আমি কিছুই খাব না। অতিথিকে খাওয়াবার বেশ ব্যবস্থাই করলে মা।

 

মালতী বলল, তোর কথার, জানিস আনন্দ, ছিরিছাঁদ নেই। আমরা খাই বা না খাই একটা অতিথির পেট ভরাবার মতো খাবার ঘরে নেই নাকি।

 

আনন্দ মুচকে হেসে বলল, তাই বলো! আমরা যা খাব ওঁকেও তাই খেতে হবে বললে কি না, তাই ভাবলাম ওঁর জন্যেও বুঝি উপোসের ব্যবস্থা হচ্ছে।

 

হেরম্ব ভাবে, মাকে মধ্যস্থ রেখে আমার সঙ্গে আলাপ করা কেন? এতক্ষণ যত কথা বলেছে সব আমাকে শোনাবার জন্য, কিন্তু নিজে থেকে সোজাসুজি আনন্দ আমাকে একটা কথাও বলেনি। আমার প্রশ্নের জবাব দিয়েছে, আমার কথার পিঠে দরকারী কথাও চাপিয়েছে কিন্তু আমাকে এখন পর্যন্ত কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। আমার সম্বন্ধে ওর যে বিন্দুমাত্র কৌতূহল আছে তার নিরীহতম প্রকাশটিকেও অনায়াসে সংযত করে চলেছে। আমাকে এভাবে অবহেলা দেখানোর মানে কি? আমাকে একটা নিজস্ব ছোট্ট প্রশ্ন ওতো অনায়াসে করতে পারে, একটা বাজে অবান্তর প্রশ্ন!

 

আপনি কি ভাবছেন?

 

হেরম্ব চমকে উঠে ভাবল, মনের প্রার্থনা আমি তো উচ্চারণ করে বসিনি। তাকে অত্যন্ত চিন্তিত ও অন্যমনস্ক দেখে আনন্দ এই প্রশ্ন করেছিল, তার অপ্রকাশিত মনোভাবকে অনুমান করে নয়। এর চেয়ে বিস্ময়কর যোগাযোগও পৃথিবীতে ঘটে থাকে। কিন্তু হেরম্বের মনে হল, একটা অঘটন ঘটে গেছে।

 

এই নিয়মচালিত জগতে একটা অত্যাশ্চর্য অনিয়ম। সে খুশী হয়ে বলল, ভাবছি, তুমি আমার মনের কথা জানলে কি করে।’

 

আনন্দ ভ্রূকুঞ্চিত করে বলল, ‘আপনার মনের কথা কখন জানলাম?

 

এইমাত্র।

 

কি বলছেন, বুঝতে পারছি না।

 

মালতী বলল, হেঁয়ালি করছে লো, হেঁয়ালি করছে।

 

হেঁয়ালি করছেন?

 

হেরম্ব অপ্রতিভ হয়ে বলল, না। হেঁয়ালি করিনি।

 

তবে ও কথা বললেন কেন, আপনার মনের কথা জেনেছি?

 

এমনি বলেছি। রহস্য করে।

 

এ কিরকম দুর্বোধ্য রহস্য! আমি ভাবলাম, একটা কিছু মজার কথা

 

বুঝি আপনার মনে হয়েছে, এটা তার ভূমিকা। শেষে ব্যাখ্যা করে আমাদের হাসিয়ে দেবেন।

 

হেরম্ব ইতিমধ্যে আত্মসংবরণ করেছে।

 

তাই মনে ছিল আনন্দ। শেষে ভেবে দেখলাম, ব্যাখ্যা না করেই হাসিয়ে দেওয়া ভাল।

 

এটা এখুনি বানিয়ে বললেন।

 

নিশ্চয়। সঙ্গে সঙ্গে না বানাতে পারলে চলবে কেন? হাসির কথা আধমিনিটে পচে যায়।

 

আর হাসি? হাসি কতক্ষণে পচে যায়? আপনার কথাটা শুনে এমন সব অদ্ভুত কথা মনে হচ্ছে! আচ্ছা, আপনি কখনো ভেবেছেন হাসতে হাসতে মানুষ হঠাৎ কেন থেমে যায়? সিদ্ধি খেয়ে যারা হাসে তাদের কথা বলছি না। যারা হঠাৎ খুশী হয়ে হাসে, মজার কথায় হোক, হাসির ব্যাপারে হোক অথবা আনন্দ পেয়েই হোক। হাসতে আরম্ভ করলেই মানুষের এমন কি কথা মনে পড়ে যায়, যার জন্য আস্তে আস্তে হাসি থেমে আসে? তাছাড়া এমন মজা দেখুন, পাগল না হলে মানুষ একা একা হাসতে পারে না! হাসতে হলে কম করে অন্তত দু’জন লোক থাকা চাই। ঘরের কোণে বসে নিজের মনে যদিই বা কেউ কখনো হাসে তার তখন নিশ্চয়ই এমন একটা কথা মনে পড়েছে যার সঙ্গে অন্য একজন লোকের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ! নিছক নিজের কথা নিয়ে কেউ হাসে না। হাসে?’

 

না।

 

খুব আশ্চর্য না ব্যাপারটা? হাসির কথা পড়লে কিংবা শুনলে মানুষ হাসবে,- কেউ হাসবে তবে! হাসবার মতো কিছু হাতের কাছে না থাকলে কেউ মারলেও হাসতে পারবে না। হাসির উপলক্ষটা সব সময় থাকবে বাইরে।

 

আবার তা থেকে তার নিজেকে বাদ থাকতে হবে। এসব কথা ভাবলে আমি একেবারে আশ্চর্য হয়ে যাই। কেউ নিজে তা তৈরি করতে পারবে না ।হাসি এমন ভাল জিনিস, নিজের জন্য সাধে কি মানুষ দিনরাত মুখ গোঁজ করে থাকে। মাঝে মাঝে একটু একটু না হেসে মানুষ যদি সব সময়ে হাসতে পারতো।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024