বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২:২৭ পূর্বাহ্ন

মুর্শিদাবাদ-কাহিনী (পর্ব-৩)

  • Update Time : শনিবার, ২৩ মার্চ, ২০২৪, ১১.০০ পিএম

শ্রী নিখিলনাথ রায়


সাধ্যানুসারে কিরীটেশ্বরীর দেবার যত্ন করিতেন। তাহার পর যখন মুর্শিদাবাদ রাজধানীর গৌরব অন্তর্হিত হইয়া, বৃটিশ সাম্রাজ্য স্থাপিত হয়, যে সময় পলাশীর সমরক্ষেত্রে মুসলমান রাজলক্ষ্মীর কিরীট স্খলিত হইয়া ভূতলে পতিত হয়, সেই সময় হইতে কিরীটেশ্বরীরও কিরীট শিথিল হইতে আরত হয়। পরিশেষে বঙ্গাধিকারিগণের দুর্দশা উপস্থিত হওয়ায়, তাঁহারও গৌরবের হ্রাস হইতে আরম্ভ হইয়াছে।

এইরূপে ক্রমে ক্রমে কিরীটেশ্বরীর গৌরব লোপ পাইতে পাইতে অধুনা তাঁহার নামটিকে বহুকালশ্রুত প্রবাদবাক্যের গ্লায় করিয়া তুলিয়াছে। যত দিন মুর্শিদাবাদ বাঙ্গলার রাজধানী ছিল, তত- দিন কিরীটেশ্বরীর গৌরবের সীমা ছিল না; বাঙ্গলার রাজা-মহারাজ- গণ, বণিক-মহাজনবৃন্দ রাজধানীতে সমাগত হইলেই কিরীটেশ্বরী- দর্শনে গমন করিতেন। তৎকালে কিরীটেশ্বরী এতদঞ্চলে মহাতীর্থভূমি ছিল। এক্ষণে কলিকাতা ভারতসাম্রাজ্যের রাজধানী বলিয়া, কালী- ঘাটে যেরূপ অবিরত উৎসব হইয়া থাকে মুর্শিদাবাদের গৌরবের সময় ‘কিরীটেশ্বরীও তদ্রূপ নিত্যোৎসবময়ী ছিলেন।

তখন রাজ- ধানীর নহরতাদি বাস্তধ্বনি কিরীটেশ্বরীর শঙ্খঘন্টারোলের সহিত বিমিশ্রিত হইয়া প্রসন্নসলিলা ভাগীরথীকে তালে তালে নৃত্য করাইত। যেমন মুর্শিদাবাদে উপস্থিত হইলে, লোকে আনন্দ-উৎসাহে পূর্ণ হইয়া উঠিত, সেইরূপ কিরীটেশ্বরীর দর্শনমাত্র তাহাদিগের হৃদয় শাস্ত ভাবে ভরিয়া যাইত। এক দিকে যেমন রাজকর্মচারিগণ কার্য্যব্যপদেশে • প্রতিনিয়ত নগরমধ্যে গতায়াত করিতেন, সেইরূপ অপর দিকে দেবীর পাণ্ডাগণ যাত্রীর অন্বেষণ ও মায়ের সেবার আয়োজনে বহির্গত হইতেন। এইরূপ ঘোরকোলাহলময়, উমময়, উৎসাহময় নগরের নিকটে কিরীটেশ্বরী অবস্থিতি করায়, তাহার মধ্যে ধৰ্ম্মভাব ও শান্তভাব অনু প্রাণিত করিয়া মুশিদাবাদকে মধুর করিয়া তুলিতেন। মুর্শিদাবাদের নবাবগণের নিকটও কিরীটেশ্বরীর মহিমা অবিদিত ছিল না।

নবাক জাফর আলি খাঁ তাঁহার প্রিয় ও বিশ্বাসী মন্ত্রী মহারাজ নন্দকুমারের অনু- রোধে অন্তিম সময়ে কিরীটেশ্বরীর চরণামৃত পান করিয়া, চিরদিনের জন্য নরন মুদ্রিত করিয়াছিলেন। এখন আর সেদিন নাই, মুশিদাবাদের সঙ্গে সঙ্গে তাঁহারও মহিমা যেন বিলীন হইতে চলিয়াছে। ভবানীর প্রিয়পুত্র নাটোররাজ রামকৃষ্ণ যে সময়ে রাজকার্য্যোপলক্ষে মুশিদাবাদে উপস্থিত হইতেন, সেই সময়ে তিনি সাধনার জন্য কিরীটেশ্বরীতে গমন করিতেন। এই সময়ে বঙ্গাধিকারিগণের অবস্থা হীন হইতে আরম্ভ হওয়ায়, তিনি মন্দিরাদির সংস্কার করিয়া দেন।

বৈদ্ধরাজ রাজবল্লভের স্থাপিত দুইটি শিবমন্দির এখনও বিস্তমান আছে। কিন্তু কিরীটেশ্বরীর মন্দিরগুলি যেরূপ জীর্ণ হইয়াছে, তাহাতে যে সে সমস্ত অচিরাং ভগ্নস্তূপে পরিণত হইবে, সে বিষয় বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। বর্তমান সময়ে বঙ্গাধিকারিগণের অবস্থা শোচনীয় হইয়া উঠিয়াছে; বিশেষতঃ কিরীটেশ্বরী এক্ষণে তাঁহাদের হস্তে নাই। ইহার আর সংস্কার হইবে কিনা জানিনা ।। যদি কখনও মুর্শিদাবাদ পূর্ব্বগৌরবের ছায়ামাত্র প্রাপ্ত হয়, আবার যদি শিল্পবাণিজ্যে তাহার গৌরবজ্যোতিঃ দেশবিদেশে বিকীর্ণ হইতে থাকে, তাহা হইলে কিরীটেশ্বরীর কিরীটভ্রষ্ট রত্ন পুনঃস্থাপিত হইলেও হইতে পারে, কিন্তু সে আশা সুদূরপরাহত।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024