শনিবার, ১৮ মে ২০২৪, ১১:১৮ অপরাহ্ন

সূর্য গ্রহণ চন্দ্রগ্রহণ

  • Update Time : শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪, ৮.৩০ এএম

নাদিরা মজুমদার

পৃথিবী নামক বাড়িতে বাস করতে গিয়ে আমরা কাকতালীয় ঘটনার মুখোমুখি হই তার একটি অসাধারণ  উদাহরণ হলো: সূর্য ও চাঁদ-কে নিয়ে, মাথার ওপরে আকাশে তাকালে –  বস্তুদুটিকে প্রায় সমান সাইজের বলে মনে হয়। অথচ ব্যাসের হিসেব করলে, সূর্যের ব্যাস চাঁদের ব্যাসের তুলনায় প্রায় চারশো (৪০০) গুণ বৃহত্তর; তাছাড়াও, এই দুই দিব্যবস্তু পরস্পরের কাছ থেকে প্রায় চারশো (৪০০) গুণ দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান করছে; তাই সূর্য ও চাঁদের ’কৌণিক সাইজ’-ও একই, পরিমানে প্রায় ’অর্ধ ডিগ্রী’। পৃথিবী থেকে চাঁদের দিকে আমরা যখন তাকাই, মনে মনে হয়তো ভাবি যে এই চাঁদ সূর্যকে অনায়াসে ঢেকে ফেলতে তো পারে? ঢেকে যদি ফেলে তো কেমন চমৎকার হৃদয়গ্রাহী ঘটনার অবতারণা হবে!

সৌর মণ্ডলের কেন্দ্রে বসে রয়েছে সূর্য, এবং তাকে ঘিরে গ্রহ, চাঁদ ইত্যাদিসহ যেসব কঠিণ বস্তু রয়েছে তারা সবাই গতিশীল সূর্যকে ঘিরে সদাই গতিশীল অবস্থায় রয়েছে। অজস্র আলোর অধিকারি সূর্য তাদের সবার প্রতি সে অকৃপণ আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাই সৌর মণ্ডলের যেকোনো কঠিণ বস্তু তার পেছন দিক থেকে আগত সৌর আলো-কে আড়াল করে দিয়ে ছায়ার/প্রচ্ছায়ার সৃষ্টি করতে পারে। করে থাকেও। এই ছায়া দৃশ্যমান হয় তখনই, যখন আরেকটি কঠিণ বস্তু (ঘটনাস্থলে) চলে আসে। আমাদের সূর্য এবং পৃথিবী-চাঁদ সিস্টেমে, পৃথিবী ও চাঁদ সূর্যের আলো-কে প্রতিরুদ্ধ করে ছায়ার সৃষ্টি করতে পারে, করে থাকে। সাধারণভাবে, যেমন, যখনই পৃথিবীর অথবা চাঁদের কোনো অংশ –  অন্যের ছায়া’র মধ্যে চলে আসে, আমরা বলি ’গ্রহণ’ হয়েছে বা ঘটেছে। তার মানে, ধরা যাক : চাঁদের ছায়া যখন পৃথিবীতে এসে পরে, সেই ছায়ার মধ্যে বিদ্যমান মানুষ তখন দেখেন যে সূর্যকে চাঁদ নিদেনপক্ষে আংশিকভাবে ঢেকে ফেলেছে; অর্থাৎ পৃথিবীর সেই ছায়া ঢাকা অঞ্চলের মানুষ ’সূর্য গ্রহণ’-য়ের সাক্ষী হন। আবার, চাঁদ যখন পৃথিবীর ছায়ার মধ্যে চলে আসে, সে সময়ে পৃথিবীর যে অংশে রাত্রিকাল সেখানকার মানুষ চাঁদকে অন্ধকার দেখেন; একে ’চন্দ্র গ্রহণ’ বলা হয়। গ্রহণের সময় ছায়া/প্রচ্ছায়া-র খেলাখেলি দেখি আমরা।

(পৃথিবী এবং চাঁদ যে ছায়া সৃষ্টি করে, তার দুটো অংশ রয়েছে : মোচাকৃতির ছায়ার ভেতরকার আঁধারঘন ছায়া, যাকে বলা হয় ’প্রচ্ছায়া’ (umbra) ও বাইরের দিককার হালকাপাতলা অন্ধকার ছায়া, যাকে বলা হয় ’উপছায়া’ (penumbra)।

গ্রহণ’ কেনো হয় –  দেখা যাক

আকাশে চাঁদ যে পথ ধরে ঘুরছে তার সেই পথটি যদি ঠিক ঠিক হুবহু সূর্যের পথের মতো হতো, মন্দ হতো না কিন্তু !

(আকাশে সূর্যের পরিক্রমণপথকে ’গ্রহণরেখা’ বা ’ইক্লিপটিক’ বলা হয়। গ্রহণ সব সময় গ্রহণরেখা বরাবর ঘটে থাকে। এবং সূর্যের এই গ্রহণরেখা/ ইক্লিপটিক-কে ধারণ করে আছে কল্পিত ’ক্ষেত্র/প্লেইন; বলা হয় ’গ্রহণরেখীয় ক্ষেত্র বা ’ইক্লিপটিক প্লেইন’)।
চাঁদ যদি সূর্যের ’গ্রহণরেখীয় ক্ষেত্র বা ’ইক্লিপটিক প্লেইন’-য়ে থাকত তবে প্রতি মাসে চাঁদ যখনই সূর্যের সামনে চলে আসত অথবা পৃথিবীর আড়ালে পেছনে চলে যেতো, সূর্য অথবা চন্দ্র ’গ্রহণ’ হতো। কিন্তু পৃথিবীর ক্ষেত্রের সাপেক্ষে চাঁদ প্রায় পাঁচ ডিগ্রী পরিমাণ কাত হয়ে আছে। সূর্যকে চারদিক থেকে ঘিরে থাকা পৃথিবীর কক্ষপথটি কল্পিত ’গ্রহণরেখীয় ক্ষেত্র বা ’ইক্লিপটিক প্লেইন’-য়ে বিদ্যমান; অর্থাৎ পৃথিবী সূর্যের ’গ্রহণরেখীয় ক্ষেত্র বা ’ইক্লিপটিক প্লেইন’-য়ে থেকে সূর্যকে পরিক্রমণ করছে, কিন্তু চাঁদ যথার্থ অর্থে একই ক্ষেত্র বা প্লেইনে থেকে পরিক্রমণ করছে না। ফলস্বরূপ, বছরের অধিকাংশ মাসগুলোতে চাঁদ হয় ’গ্রহণরেখীয় ক্ষেত্র বা ’ইক্লিপটিক প্লেইন’-য়ের পর্যাপ্ত উপরে অথবা পর্যাপ্ত পরিমাণে নীচে থাকে, তাই ’গ্রহণ’ হতে পারে না। কিšতু যখনই দুই পথ পার হয়, সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী সারিবদ্ধ হয় –  তখন কিন্তু সূর্য গ্রহণ হয়ে থাকে, সেটি আংশিক গ্রহণ হতে পারে আবার পূর্ণ গ্রহণও হতে পারে, নির্ভর করে এই তিন দিব্যব¯তু কিভাবে সারিবদ্ধ হয়েছে তার উপরে। এই সারিবদ্ধ হওয়াকে বলা হয় ’গ্রহণ মৌসুম’ (ইকলিপস সিজন), এবং বছরে দুইবার এরকম হয়ে থাকে। মেরু-ঊষার মতো ’গ্রহণ’ মাত্রই সূর্য অথবা চাঁদের অনন্য অদ্বিতীয় চমক নিয়ে আসে, খুলে মেলে ধরে, আমাদের উপলব্ধিকে আন্দোলিত করে!

সূর্য গ্রহণ

পৃথিবী থেকে সূর্য ও চাঁদের দূরত্ব মাঝে মধ্যে যৎসামান্য কমবেশি হয় বলে সূর্য ও চাঁদের কৌণিক সাইজেরও (অর্থাৎ কৌণিক দূরত্ব) পরিবর্তন ঘটে। অধিকাংশ সময়েই চাঁদকে সূর্যের চেয়ে সামান্য ছোটো দেখায় এবং সূর্যকে সম্পূর্ণভাবে ঢেকে ফেলতে পারে না; এমনকি তারা যদি নিখুঁতভাবে একই লাইনে সারিবদ্ধ থাকেও চাঁদ তবুও সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢাকতে পারে না। এমতাবস্থায়, অন্ধকার গোলাকার চাঁদের তথা অমাবস্যার অদৃশ্য চাঁদের চারদিকে, শারির পাড়ের মতো আলোর আংটি সৃষ্টি হয়। এই টাইপের গ্রহণ-কে ’বলায়াকার গ্রহণ’ (অ্যানিউলার ইক্লিপস) বলা হয়। কেউ কেউবা ’রিং অব লাইট’ও বলেন।
’বলায়াকার গ্রহণ’ আসলে অসাধারণ টাইপের সূর্য গ্রহণ; যেমন : পৃথিবীকে পরিক্রমণরত চাঁদের কক্ষপথের যেকোনো বিন্দুতে সাধারণত পূর্ণ সূর্য গ্রহণ হতে পারে, কিšতু বলায়াকার গ্রহণ ঘটে থাকে তখনই যখন চাঁদ তার দূরতম অবস্থানে (অ্যাপজী) থাকে। গড়ে তিন থেকে পাঁচ বছর অন্তন অন্তর বলায়াকার গ্রহণ হয়, এবং সাধারণত বিষুব অঞ্চলের চেয়ে সুমেরু ও কুমেরু অঞ্চলে হয়ে থাকে।

বলায়াকার সূর্য গ্রহণ বা রিং অব লাইট; সৌজন্যে : উইকিপিডিয়া

 

তাছাড়াও, হাইব্রিড সূর্য গ্রহণ নামে আরেক ধরনের সূর্য গ্রহণ হয়ে থাকে। যেহেতু, দৃশ্যমান চাঁদের সাইজ নির্ভর করে পৃথিবীর কোন এলাকা থেকে চাঁদের দিকে তাকাই আমরা তার উপরে, তাই –  কোনো এলাকায় ঘটমান একক একটি পূর্ণ সূর্য গ্রহণ অন্য এক বা একাধিক এলাকায় ’বলায়াকার সূর্য গ্রহণ’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই ধরনের সূর্য গ্রহণকে বলা হয় ’হাইব্রিড সূর্য গ্রহণ’।

আবার, সূর্য গ্রহণ ঘটার সময় চাঁদ যদি তার গড় দূরত্বের কাছাকাছিতে থাকে, তবে চাঁদ কিšতু সূর্যকে সম্পূর্ণভাবে ঢেকে ফেলে ও পূর্ণ সূর্য গ্রহণের অবতারণা হয়। অন্যভাবে বলতে পারি যে চাঁদের ভেতরের দিকের ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন ত্রিকোণাকার ছায়া/প্রচ্ছায়া (আমব্রা) পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশে যখন এসে পরে তখনই পূর্ণ সূর্য গ্রহণ হয়। অর্থাৎ চাঁদের ছায়া (আমব্রা) সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলে। এভাবে, পৃথিবীর যে অঞ্চলের ছোট্ট এক চিলতে এলাকা পূর্ণ সূর্য গ্রহণের অন্ধকারে ঢেকে যায় সেই এলাকার মানুষ ও প্রাণিজগত কয়েক মিনিটের জন্য সূর্যকে দেখতে পায় না। এক ধরনের রহস্যময় অন্ধকার নেমে আসে; সহসা প্রকৃতিও নিরব স্তব্ধ হতে পারে, তাপমাত্রা কমে ক্ষণিকের জন্য শীতলতা নেমে আসে। মৌমাছি তার গুঞ্জন থামিয়ে দিতে পারে, পাখিরা তাদের গান গাওয়া থামিয়ে দিতে পারে, পতঙ্গরা তাদের ভনভন গুঞ্জন থামিয়ে দিতে পারে; আকাশে নক্ষত্ররা দৃশ্যমান হয়, অন্ধকারে আরো উজ্জ্বল রূপ ধারন করে।

সূর্য গ্রহণের জ্যামিতি; সৌজন্যে :  লিউমেন লার্ণিং

 

অপরদিকে, একই সময়ে ’আমব্রা’ বা প্রচ্ছায়ার বাইরের দিককার হালকাপাতলা অন্ধকারাচ্ছন্ন ছায়ায়, যাকে বলা হয় ’উপছায়া’ (পিনামব্রা), ঢাকা এলাকার মানুষ আংশিক সূর্য গ্রহণ দেখতে পায়। তবে, গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো যে সূর্য গ্রহণ হতে হলে ’নতুন চাঁদ তথা অমাবস্যা’র চাঁদকে (অমাবস্যের চাঁদ অলক্ষ্য, আমরা দেখি না) সরাসরি সূর্য ও পৃথিবীর মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হবে।
সূর্য গ্রহণের সময় সূর্যের জ্যোতির্বলয় (করোনা) ও সৌর কর্মকা- মহাউদ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠে। যেমন: বায়ুম-লের আয়োনোস্ফিয়ার; এই স্তরটিতে রয়েছে চার্জযুক্ত কণিকা (আয়োন ও ইলেকট্রন); রেডিও তরঙ্গের প্রতিফলন ও প্রতিসরণ এখানে হয়ে থাকে। সূর্য গ্রহণের সময় তাপমাত্রা কমে যায়, সৌর বিকিরণের পরিমাণ কমে যায় বলে বায়ুম-লের স্তরগুলো শীতলতর হয়। তাপমাত্রার এই পরিবর্তনের দরুণ আয়োনোস্ফিয়ারের তাপগত কাঠামো প্রভাবিত হয় ও আয়োনোস্ফিয়ারের আয়োনাইজেশন প্রক্রিয়ায় ও ইলেকট্রনের ঘনত্ব এবং স্তরের উচ্চতার ব্যাপ্তীতে পরিবর্তন সৃষ্টি করে। ফলস্বরূপ রেডিও যোগাযোগ ও নেভিগেশন সিস্টেমকে (যেমন : জিপিএস) প্রভাবিত করতে পারে, করে।

২০২৪, ৮ এপ্রিলের পূর্ণ সূর্য গ্রহণ, ভেরমন্ট স্টেটে তোলা হয়; সৌজন্যে : ছবি : বি কেনি, ব্যক্তিগত সংগ্রহ

 

আবার, যদিও গ্রহণ মাত্রই অনন্য, চমৎকার ঘটনা, তবে ১৯১৯ সালের মে মাসের ২৯ তারিখে সংঘটিত পূর্ণ সূর্য গ্রহণ আরো বেশি অসাধারণ একটি ঘটনা। এই পূর্ণ সূর্য গ্রহণের মাধ্যমে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের সিদ্ধতা প্রমাণিত হয়। তাঁর আপেক্ষিক তত্ত্ব আধুনিক বিজ্ঞানের দুই স্ত¤েভর  একটিতে পরিণত হয় (আরেকটি স্তম্ভ হলো কোয়ান্টাম বিদ্যা)।

১৯১৫ সালে প্রকাশিত সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের একটি ফলাফল বা বিষয় হলো যে বি-শা-ল ভরের দিব্যবস্তু, যেমন আমাদের সূর্য, নিজের চারদিকে ’স্থান-সময়’-য়ের ফেব্রিক বা কাঠামোকে বাঁকিয়ে দেয় বা বিকৃত করে; অর্থাৎ আইনস্টাইনের অভিকর্ষ আদতে ভরযুক্ত বস্তুদের মধ্যে কোনো আকর্ষণ সর্বস্ব বল নয়; নিউটনীয় অভিকর্ষ হলো একটি বল (ফোর্স) এবং এই বলের কার্যকারিতা নির্ভর করছে বস্তুগুলোর মধ্যকার দূরত্ব ও ভরের উপরে, নিউটনীয় অভিকর্ষ সব সময় বস্তুরা বস্তুদের আকর্ষণ করছে।
আইনস্টাইনের এই সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বটি নিউটনের দেয়া সব ব¯তুই পরস্পরের উপর আকর্ষণ-বল প্রয়োগ করছে  –  থেকে ভিন্ন। আইনস্টাইনের মতে, যে কোনো বি-শা-ল ভর সম্পন্ন বস্তুর কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় ’আলো’ স্থান-সময় বরাবর বিকৃত হয়/বেঁকে যায়; এবং বস্তুর ভর যতো বেশি হবে সেটির চতুর্দিকের ’স্থান/স্পেস’ ও ততো বেশি বিকৃত হবে। অর্থাৎ আইনস্টাইনের অভিকর্ষ অদৃশ্য কোনো বলের ’কাছি টানাটানি’ নয়। বিগত শতাব্দীর তথা বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আইনস্টাইন তাঁর এই আপাত অযৌক্তিক উদ্ভট তত্ত্বের হাতেকলমে প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে পূর্ণ সূর্য গ্রহণ ব্যবহারের প্রস্তাব করেন।
নিজের এই চ্যালেঞ্জটিকে আইনস্টাইন বিন্যাস করেন এভাবে : প্রথমে তিনি, পূর্ণ গ্রহণ চলাকালে সূর্যের কাছাকাছি থাকা নক্ষত্রগুলোর অবস্থান কেমন হবে, তার একটি চার্ট তৈরি করেন, অর্থাৎ যে দুর্লভ, তাই মূল্যবান মুর্হূতগুলোতে চাঁদ যখন সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলবে, সেসময়ে পশ্চাৎপটে বিদ্যমান নক্ষত্রগুলোকে দেখা যাবে। এবং গ্রহণ যখন থাকবে না তখন সেইসব অভিন্ন নক্ষত্রকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব সঠিক হলে –  ঐসব নক্ষত্রের ’গ্রহণ’ চলাকালীন ও ’গ্রহণ’হীন কালে অবস্থানের সামান্য পরিবর্তন হবে –  অবস্থানের পরিবর্তনটি খুব সামান্য, তাই খালি চোখে ধরা পরে না, অবশ্য সূক্ষ্ম মাপজোকের সাহায্যে পরিবর্তনটি সনাক্তযোগ্য। গ্রহণকালীন ও গ্রহণহীনকালে নক্ষত্রের অবস্থানের পরিবর্তন প্রমাণ করে যে আলোর ভ্রমণ পথকে বাস্তবিকই ’স্পেসটাইম’ বিকৃত করে বা বাঁকিয়ে দেয়। এই প্রসঙ্গে আইনস্টাইন আরো বলেন যে বি-শা-ল ভর সম্পন্ন দিব্যব¯তুর আড়ালে পরে যাওয়া দিব্যব¯তু থেকে আগত আলো ’অভিকর্ষীয় লেন্সিং’ সৃষ্টি করবে (দ্রষ্টব্য: মহাশূন্য প্রযুক্তি ও অনুসন্ধানের সন্ধানে, নাদিরা মজুমদার, বাংলা একাডেমি)।                                              ।
১৯১৯ সালেল ২৯ মে-র পূর্ণ সূর্য গ্রহণের সময়, আইনস্টাইনের তত্ত্বের সঠিকতা যাচাইযের জন্য আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে ও ব্রাজিলে দুটো অভিযান পরিচালিত হয়। এই অভিযান দুটোর নেতৃত্বে ছিলেন যথাক্রমে স্যর আর্থার এডিংটন ও ফ্র্যাঙ্ক ডাইসন। তারা প্রমাণ করেন যে আইনস্টাইনের তত্ত্ব সঠিক। পরবর্তীকালে, একাধিক পূর্ণ সূর্য গ্রহণের সময় সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের সঠিকতা যাচাই করা হয়েছে; সর্বশেষ ২০১৭ সালের পূর্ণ সূর্য গ্রহণের সময় যাচাই করা হয়।

১৯১৯ সালের ২৯ মে-র অবিস্মনণীয় পূর্ণ সূর্য গ্রহণ।
স্যর আর্থার এডিংটনের গ্রহণ অভিযান ফাইলে সংরক্ষিত
নিগেটিভ থেকে পজিটিভ করা হয়।

 

একটি পূর্ণ সূর্য গ্রহণ আইনস্টাইনকে সর্বকালের প্রভাবশালী বিজ্ঞানীর মর্যাদায় নিয়ে আসে, আপেক্ষিক তত্ত্ব না বুঝলেও বিশ্ববাসী চল্লিশ বছর বয়সের হ্যা-সাম বিজ্ঞানীর ফ্যানে পরিণত হন; তিনি সর্বজন পরিচিত আইনস্টাইন-সুপারস্টারে পরিণত হন। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব বিজ্ঞান সম্বন্ধে আমাদের উপলব্ধিকে একেবারে পাল্টে যায়।

চন্দ্র গ্রহণ

চন্দ্র গ্রহণের সময় –  পূর্ণিমার চাঁদ পৃথিবীর সৃষ্ট ছায়া/প্রচ্ছায়ার মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে। চন্দ্র গ্রহণ হতে হলে পৃথিবীকে সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে থাকতে হয়, এবং এই তিন দিব্যবস্তু ’ইকলিপটিক’ নামক একই ক্ষেত্রে/প্লেইনে থাকতে হয়। (সূর্য গ্রহণের সময় আমরা দেখেছি যে পৃথিবীর কক্ষপথ ’ইকলিপটিক’-য়ে থেকে সূর্যকে পরিভ্রমণ করছে)। চন্দ্র গ্রহণের সময় পৃথিবী (সূর্য গ্রহণের ানুরূপ) দুটো ছায়া সৃষ্টি করে এবং তাদের মধ্যে সহজে পার্থক্য করা যায়; একটি হলো ভেতরকার কোণাকার ছায়া/প্রচ্ছায়া বা ’আমব্রা’, এই আমব্রা সূর্যের সবটুকু আলোকে অবরুদ্ধ করে দেয়। আর পৃথিবীর বাইরের দিকের উপছায়া বা ’পিনামব্রা’ কেবলমাত্র আংশিকভাবে আলোকে অবরোধ করে; ফলে, মৃদু অনুজ্জল আলো দেখি আমরা।

চন্দ্র গ্রহণের জ্যামিতি; সৌজন্যে : লিউমেন লার্ণিং

 

চাঁদ যখন সম্পূর্ণভাবে পৃথিবীর ’ছায়া বা আমব্রা’র মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে তখন পূর্ণ চন্দ্র গ্রহণ ঘটে, রাতের পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়। কিšতু চাঁদ যখন ’উপছায়া বা পিনামব্রা’র মধ্য দিয়ে যায় তখন আংশিক চন্দ্র গ্রহণ হয়। পৃথিবীর ছায়া যথেষ্ট বড়ো বলে চন্দ্র গ্রহণ কয়েক ঘন্টা স্থায়ী হয়, এবং গ্রহণ চলাকালে পৃথিবীর যেসব অঞ্চল থেকে চাঁদ দেখা যায় সেসব অঞ্চলের মানুষরাও চন্দ্র গ্রহণ দেখতে পায়।

অন্য গ্রহের ’গ্রহণ

আমাদের সৌর মণ্ডলের, কেবলমাত্র সূর্য এবং পৃথিবী-চাঁদ সিস্টেমেই সূর্য গ্রহণ ও চন্দ্র গ্রহণ-য়ের মতো দুর্লভ, অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে থাকে।  গ্রহণ হবে কি হবে না নির্ভর করে –  দূরত্ব এবং যথার্থভাবে সারিবদ্ধ হওয়ার উপরে। যেমন : শুক্র গ্রহ যতোবারই সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখান দিয়ে পরিক্রমণ করে চলে যায় (প্রায় প্রতি ৫৮৪ দিনে একবার ঘটে), আমরা কোনো ’শুক্র গ্রহণ’ দেখি না। একইভাবে, সূর্যের নিকটতম গ্রহ বুধেরও কোনো ’বুধ গ্রহণ’ দেখি না বা খেয়ালই করি না। অবশ্য সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখান দিয়ে দুই গ্রহের পরিক্রমণের স্থায়ীত্ব সময় তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত (কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েকদিন), সাইজেও খুব ছেটো; তদুপরি, তাদের পরিক্রমণ কালে যে ছায়া-র সৃষ্টি হয় –  সেই ছায়ার সাইজ এতোই ছোটো যে সূর্যের আলোকে প্রতিরুদ্ধ করে না এবং বাধাহীন সৌর আলো পৃথিবীতে পতিত হয়। আমাদের জাগতিক বা পার্থিব দৃষ্টিকোণের বিবেচনায় বলি যে শুক্র, চাঁদ, বুধের অবস্থান সূর্যের উপরে অথবা নীচে থাকে।
সৌর ম-লের চতুর্থ (এবং সর্বশেষও বটে) শিলাজ (টিরেস্ট্রিয়াল) গ্রহ মঙ্গল। মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথ পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে দূরে  অবস্থান করছে; কাজেই সূর্য ও পৃথিবীর মাঝ দিয়ে পরিক্রমণ করে না। তবে মঙ্গলে দাঁড়িয়ে কিšতু ২০২৪ সালের পৃথিবীর সর্বশেষ পূর্ণ সূর্য গ্রহণসহ পূর্ববর্তী সবকয়টি সূর্য গ্রহণ দেখা গেছে; পরে যেগুলো হবে সেগুলোও দেখা যাবে। অবশ্য দেখবে ছোট্ট কালো বিন্দুর মতো, এবং মঙ্গলের বাসিন্দাদের যদি সুপার-দূরদর্শণের যন্ত্র থাকে তারা তবে সূর্য-পৃথিবীর মাঝ দিয়ে বুধ ও শুক্রের পরিক্রমণ পথ দেখার রোমাঞ্চকর আনন্দও উপভোগ করবে।

সূর্য ও পৃথিবী-চাঁদ সিস্টেমের ভান্ডারে আ-রো অনেক অনেক চমকপ্রদ অসাধারণ ঘটনা ঘটানোর রসদ রয়েছে। পরে কখনো সেসব কাহিনি বলা যাবে।

লেখক : নাদিরা মজুমদার, সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক, বাংলা ভাষার বিজ্ঞান বিষয়ক লেখার অন্যতম পথিকৃত।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024