বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৫১ অপরাহ্ন

বেইলি রোডের মৃত্যুকূপ গ্রিন কোজি কটেজ

  • Update Time : শুক্রবার, ১ মার্চ, ২০২৪, ৬.১৪ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানী ঢাকার বেইলি রোড়ের রস মিষ্টির দোকানের সেলস ম্যান মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে নয়টা বা নয়টা পয়তাল্লিশের দিকে মিষ্টির রস লেগে যাওয়া হাতখানা ধোবার জন্যে দোকান থেকে বের হয়ে ফুটপাতে হাতে মগের পানি ঢালতে গিয়েই তাকিয়ে দেখেন, সামনের একটি বিল্ডিং থেকে ধোয়া বের হচ্ছে।

বিল্ডিংটির নাম গ্রীন কোজি কটেজ। অবশ্য আনোয়ার হোসেন ওই নামে চেনেন  না। শুধূ আনোয়ার হোসেন নয়,বেইলী রোড সহ দূর দূরান্ত থেকে যারা এখানে আসেন তারা সকলে বিল্ডিংটিকে কাচ্চি ভাই বিল্ডিং রেস্টুরেন্টের বিল্ডিং হিসেবেই চেনেন। ১ তারিখ সকালে আনোয়ার হোসেন যখন তার ধোয়া দেখার বর্ণনা দিচ্ছিলেন সে সময় তিনিও বলেন, তিনি দেখেন কাচ্চি ভাই বিল্ডিং থেকে ধোয়া বের হচ্ছে। তিনি আর হাত না ধুয়ে কোন অন্য কিছু চিন্তা না করে সোজা দৌঁড়ে যান রাস্তার ওপারে, তিনি সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আরো তিন চার জন পৌঁছে যান। আর তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে যান, পাশের কে এফ সি রেস্টুরেন্ট বিল্ডিং এর একটু পাশে রাখা একটা বাশের মই।যেটা সেখানে নানান কাজে সব সময় ব্যবহার হয়।

ওই মই এর দিকে চোখ দিতে তারা বাধ্য হন, কারণ ততক্ষণে দেখতে পান দোতালার জানালার গ্লাস ভেঙ্গে কয়েকজন তাদের বাচ্চাদেরকে বের করে দেবার চেষ্টা করছেন। তাদের ওই চেষ্টা দেখে তাড়াতাড়ি আনোয়ার হোসেন তার সঙ্গীরা বাঁশের মই সেখানে লাগিয়ে উঠে যান। ততক্ষণে আনোয়ার হোসেনের অপর সহকর্মী আহমদ সেখানে চলে গেছেন। তার ভাষায়, ওরা বাচ্চাদের বের করে দিচ্ছে আর আমি তাদেরকে পেছনে যাকে পাচ্ছি তার কাছে দিয়ে দিচ্ছি।

 

এ পর্যন্ত বলে, হঠাৎ সে কেমন যেন থেমে গেলো। তারপরে কিছুটা উদাস হয়ে বললো, আচ্ছা, কাল তো আমি ভিড়ের ভেতর যাকে পেয়েছি, তার কাছেই ওই বাচ্চাদের দিয়ে দিয়েছি। সে বাচ্চারা কি ঠিক মতো তাদের মা বাবার কাছে পৌঁছেছে? ২৯ তারিখ রাত থেকে ১ তারিখ সকালে গিয়ে এ প্রশ্ন তার মনে এসেছে। কারণ, সময়টা তখন এমনই যে মনে প্রশ্ন জাগারও কোন সময় নেই। কত বাচ্চাকে দিতে পেরেছে তার সঠিক হিসাব তারা কেউ বলতে পারে না।

 

এর ভেতর আনোয়ার হোসেন দেখতে পায় ওপরের চার তলা বা পাঁচ তলা থেকে একজন দড়ি নিয়ে লাফ দিচ্ছেন। ভদ্রলোক দড়ি’র সহায়তায় লাফ দিয়েছিলেন ঠিক, কিন্তু শেষ মুহূর্তে এমনভাবে পড়েন যে, পড়তেই নিথর হয়ে যায় তাঁর দেহ।

 

আনোয়ার হোসনে ও তার সহকর্মী কথার ফাঁকে পরস্পরকে বলে, আসলে নিচের ওই ছোট বার্গারের দোকানটি থেকেই আগুনের শুরু হয়।

কীভাবে ছড়িয়ে পড়লো আগুন

 

বার্গারে দোকানে আগুন লাগলেও কীভাবে ছড়িয়ে পড়লো এই আগুন তার একটি কারণ বললেন, গ্রীন কোজি কটেজের ঠিক অপর পাশে বেইলি স্টারের বাসিন্দা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জনাব স্বপন। তিনি বলেন, আসলে গোটা বিল্ডিংটিতে অনেকগুলো রেস্টুরেস্ট। তাই শুধু কিচেনে নয়, সিড়িতেও সেখানে রাখা ছিলো অনেক গ্যাস সিলিন্ডার। জনাব স্বপন একজন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতা হবার কারণে তিনি গোটা সময়টা জুড়ে ফায়ার ব্রিগেডের কর্মী ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি জানালেন, তারা দেখতে পান একটা আগুন নেভাতেই আরেকটা আগুন জ্বলে উঠছে। এ অবস্থা দেখে ফায়ার ব্রিগেড কর্মীরা কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখেন, একটার পর একটা গ্যাস সিলিন্ডার গরম হচ্ছে আর ব্লাস্ট করছে। নতুন করে একটা গ্যাস সিলল্ডিার ব্লাস্ট করে তো আবার গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে নতুন আগুনের শিখা লেলিহান হয়ে ওঠে।

 

 

সিড়ি কোন কাজে লাগেনি কেন?

 

জনাব স্বপন নয়, ওই বিল্ডিং এর ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা বাহাদুর, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতা, সুজিত নন্দী, বাবলু সহ অনেকেই তখনও সেখানে কাজ করছিলেন, তাদের সকলেরই একই বক্তব্য,  প্রথমত ওই বিল্ডিং এর সিড়ি খুবই সরু। বিপদে যে মানুষ নামবে ওইভাবে সিড়িটি তৈরি করা হয়নি। তার ওপর পুরো সিড়ি জুড়ে রাখা ছিলো গ্যাস সিলিন্ডার। আর একটার পর একটা গ্যাস সিলিন্ডার ফেঁটে শুধু যে একের পর এক আগুন ছড়িয়েছে তা নয়, মানুষের জন্যে সিড়ি দিয়ে নামার অর্থ্ ছিলো আগুনে ঝাঁপ দেয়া।

 

 

আশে পাশের বাড়ির পানির ট্যাঙ্কি

 

 

আগুন নেভানোর মূল উপাদান ফায়ার ব্রিগেডের জন্যে প্রয়োজন পানির। এর আগে বসুন্ধরা শপিং মলে আগুন লাগলে তাদেরকে সোনারগাও হোটেলের সু্ইমিং পুল থেকেও পানি নিতে হয়েছিলো। এখানে তাদের প্রথম পানির উৎস ছিলো আশে পাশের অ্যাপার্টমৈন্টগুলোর পানির ট্যাঙ্ক, অপর পাশের বেইলি হাইটস, বেইলি স্টারের সিকিউরিটি গার্ড শফি, হায়দার ওদের প্রত্যেকের বক্তব্য হলো, তারা সকলে মিলে ফায়ার ব্রিগেডের লোকদের পানির পাইপ টেনেছে। তাদের ভাষায়, এক একটি পানির ট্যাংকে পাইপ ভরে টান দিতেই মুহূর্তে ট্যাঙ্ক খালি হয়ে যায়। অথচ ওদিকে আবার বোমার মতো শব্দ হয়ে জ্বলে ওঠে নতুন আগুন।

 

একটি পুকুর ও অনেক জীবন

 

আশে পাশের অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে যে পানি ছিলো তাতে কোন মতেই ওই আগুনকে শুধু গ্রীন কোজি কটেজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যেতো না। আশের পাশের বিল্ডিং শুধু নয় রাস্তার এপারের অনেক বিল্ডিং- এ ছড়িয়ে পড়তো ওই আগুন। সে ক্ষেত্রে আর্শীবাদ ও ত্রাতা হিসেবে দেখা দিয়েছে ‘নও রতন কলোনির’ভেতরের বেইলি স্টারের সঙ্গে থাকা পুকুরটি। ১ তারিখ সকালে গিয়ে দেখা গেলো বিশাল আকারের এ পুকুরটির পানি ( পুকুরটির মোট আয়তন প্রায় ৫০ শতাংশের মত হবে) দেড় থেকে দুই ফুট নিচে নেমে গেছে। গতকাল ভোর রাত অবধি পানি নেয়া হয়েছে তাই সকালেও পূর্বের পানির উচ্চতার ভিজে রেখাটি তখনও পুকুরের কাধির সঙ্গে স্পষ্ট। এই বিপুল পরিমাপের পানি পাওয়া গিয়েছিলো বলেই আগুন শুধু গ্রীন কোজি কটেজে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হয়। কারণ ফায়ার ব্রিগ্রেড সুযোগ পায় অনান্য বিল্ডিং এর ছাদগুলো, দেয়াল গুলো পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিতে। অনেকে নিজের চেষ্টাও যে যতটা পারে সে কাজ করেছিলো। তাই সকলের বক্তব্য, এই পুকুরটি না থাকলে আরো কত মানুষ যে মারা যেতো!

 

স্থানীয় অনেকে ধন্যবাদ দিতে থাকে এই পুকুরটি যারা অনেক কষ্ট করে রক্ষা করেছেন সেই সোহাগ সাহেব, পারভেজ সাহেবকে। তাদরে বক্তব্য হলো, সরকারি একটি কলেজ ও একটি অফিস পুকুরটির দুই পাশ থেকে তো অনেকখানি দখল করে নিয়েছে। এমনকি তারা সকলে মিলে না ঠেকালে এতদিনে সবটুকু ভরাট হয়ে যেতো। কথায় কথা বাড়ে, সে কথায় কাজের কথাও আসে। তেমনি এই পুকুরের কথা বলতে গিয়ে সেখানে আসা অনেক প্রকৌশলী, পুলিশ কর্মকর্তা বলছিলেন, চারপাশে শুধু দখল আর দালান তৈরি, কেউ খাল, বিল বা পুকুর রাখার কথা ভাবে না শহরের ভেতরে। অথচ একটা বিপদ এলে তখন বোঝা যায় কতটা গুরুত্ব এই জলাশয় গুলোর। শহর যতই বাড়ুক না কেন, জলাশয় রাখতেই হয়।

 

 

কঙ্কালসার বিল্ডিং

 

কঙ্কালসার গ্রিন কোজি কটেজ এখন বেইলি রোডে একটি মৃতু্কূপের সাক্ষ্মী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। তার চারপাশ ঘিরে রাখা হয়েছে হলুদ নিরাপত্তা টেপ দিয়ে। সামনে উৎসুক মানুষ, স্বজনের খোঁজ আসা মানুষ, মিডিয়া সহ রাজনীতির মানুষেরাও। এই কঙ্কালসার বিল্ডিং থেকে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত লাশ হয়ে বের হয়ে আসা ও দ্বগ্ধ শরীর নিয়ে বের হয়ে আসা মানুষ মিলে মৃতের সংখ্যা ৪৬ দাঁড়িয়েছে।

তবে কাল যারা ফায়ার ব্রিগেড কর্মীদের সঙ্গে ছিলেন, তারা কেউই এ সংখ্যা মানতে রাজী নন। তারা বলেন, আসলে পুড়ে কতজন ছাই হয়ে গেছেন আর ওই হট্টগোলে ডেডবডি কোথায় গেছে সব মিলিয়ে মৃত্যের সংখ্যা ভিন্ন হবে।

 

বাস্তবে মৃতের সংখ্যা মিডিয়ায় প্রকাশ করার আগে অনেক ভেরিফিকেশানের প্রয়োজন পড়ে। তাছাড়া এ ধরনের আগুনের সময় মানুষ ট্রমায় ভোগে, যারা উদ্ধার কাছে থাকেন তারাও হয়ে পড়েন ট্রমাগ্রস্থ। তাই নানান কথা বলেন, তেমনই কথা এখন বেইলি রোডে। যারা উদ্ধার কাজে ছিলেন, তাদের কেউ কেউ বলছে তারা এক ফ্লোরেই ৫০ এর বেশি মৃত দেহ দেখেছেন।  কারো মতে কয়েক’শ মানুষ এখানে মারা গেছে। বাস্তবে গ্রীন কোজি কটেজের এ অগ্নিকান্ড অনেক বড় দুর্ঘটনা। তাই  এখানে উপস্থিত ও প্রত্যক্ষদর্শীরা যা বলছেন, তার কোন কিছুই উড়িয়ে না দেবার দাবী উপস্থিত প্রায় সকলেরই। বুয়েট থেকে এসেছিলেন কয়েক ছাত্র। তাদের সহপাঠি মারা গেছেন আগুনে পুড়ে। তাদের বক্তব্য হলো এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া দরকার।

 

নির্ঘুম রাত

 

গ্রিন কোজি কটেজের রাস্তার দুপাশের নারী , পুরুষ, শিশু সকলেই কাটিয়েছে একটি নির্ঘুম রাত। কারণ, কখন কোন মুহূর্তে আগুন কোথায় ছড়িয়ে পড়ে এই ভয়ে রাস্তার দুপাশে এমনকি সিদ্ধেশ্বরীর গলির ভেতরের অনেক বাড়ির নারী, শিশু, বৃদ্ধ সহ সকলকে বাসা থেকে নামিয়ে রাস্তায় নিয়ে আসা হয়। যদিও আগুনের তেজ বারোটার দিকে কমে আসে কিছুটা তারপরেও আগুন পরিপূর্ণ ভাবে নেভে রাত তিনটার দিকে। তাই সকলেই রাস্তা থেকে বাসায় ফেরে রাত চারটার দিকে। একদিকে সারা রাত জুড়ে ছিলো মৃত্যুর মিছিল অন্যদিকে ছিলো উৎকণ্ঠিত নির্ঘুম মানুষ রাস্তা ও অলি গলি জুড়ে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024