১২:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
‘ক্লিন ব্রেক’ থেকে অন্তহীন যুদ্ধ: প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ কীভাবে বদলে দিচ্ছে নিরাপত্তা নীতি চার প্রদেশ নিয়েই অখণ্ড থাকবে পাকিস্তান, নতুন প্রদেশের প্রস্তাব নাকচ সিন্ধুর মুখ্যমন্ত্রীর নিউইয়র্কে বসছে ভোগ বিজনেসের বৈশ্বিক সম্মেলন, টিকিট বিক্রি শুরু ‘ক্লিন গার্ল’ যুগের বিদায়, বসন্ত-গ্রীষ্ম ২০২৭-এ আসছে নতুন ফ্যাশন ধারা দামি গয়না খোঁজার নতুন ঠিকানা কি টিকটক? বদলে যাওয়া শরীরের জন্য বিলাসবহুল ফ্যাশন, নতুন বাজার তৈরি করছে ওয়েলডান আমেরিকা কতটা সমাজতন্ত্র গ্রহণ করতে প্রস্তুত? কারখানার মেঝেতেই জাপানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আসল লড়াই ২৫ বছরেই শেষ ৫ লাখ ডলারের ক্যারিয়ার, ই-স্পোর্টসে বাড়ছে চোটের ভয়াবহতা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এশিয়ার দিকে কানাডার নতুন বাণিজ্যযাত্রা

খুলনার আইনজীবী, পরিচয়ে আরেক সফল আমচাষি: রেকর্ড ফলনের অপেক্ষায় শাহাদাত

খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার মানুষ শাহাদাত হোসেনকে শুধু একজন আইনজীবী হিসেবেই চেনেন না, বরং একজন সফল ও নিবেদিতপ্রাণ আমচাষি হিসেবেও জানেন। প্রায় চার দশক ধরে নিজের যত্নে গড়ে তোলা বিশাল একটি জৈব আমবাগান এখন এলাকায় বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে।

দেবনগর মৌজায় ৩৯ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা এই বাগান স্থানীয়দের কাছে ‘ম্যাঙ্গো হ্যাভেন’ নামে পরিচিত। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমিকে তিনি ধীরে ধীরে একটি সফল কৃষিভিত্তিক উদ্যোগে পরিণত করেছেন।

এ বছর রেকর্ড ফলনের আশা

চলতি মৌসুমে বাগানের প্রায় ১,২০০টি আমগাছেই প্রচুর ফল ধরেছে। অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে এবং কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না এলে শাহাদাতের আশা, এ বছর প্রায় ১,০০০ মণ আম সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। এতে প্রায় ২০ লাখ টাকার বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।

বাগানে হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, মল্লিকা, বারি-৪, কলা আম ও কাটিমনসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় জাতের আম রয়েছে। বৈচিত্র্যময় জাতের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে আম সংগ্রহ ও বিক্রি করা সম্ভব হয়।

শৈশবের আগ্রহ থেকে পেশাদার চাষ

শাহাদাত জানান, ছোটবেলা থেকেই কৃষির প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। এসএসসি পরীক্ষার পর তিনি পারিবারিক জমিতে গাছ লাগানো শুরু করেন। পরে উচ্চমাধ্যমিকের পর আমচাষের প্রতি আরও বেশি আকৃষ্ট হন। ভালো মানের আমের আঁটি সংগ্রহ করে চারা তৈরি, কলম করা এবং সেগুলো রোপণের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে বাগান সম্প্রসারণ করেন।

গত ৪০ বছরে তিনি ১,২০০টির বেশি আমগাছ লাগিয়েছেন, যেগুলোর সবই এখন ফল দিচ্ছে। ব্যক্তিগত শখ হিসেবে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে এটি তার অন্যতম প্রধান পেশায় পরিণত হয়েছে।

তার ভাষায়, আমচাষের মাধ্যমে তিনি অন্যদেরও কৃষিকাজ ও বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করতে চান।

আমচাষি

জাতীয় স্বীকৃতি ও জৈব চাষের সাফল্য

কৃষিতে বিশেষ অবদানের জন্য শাহাদাত জাতীয় পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছেন। ১৯৮৯ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি কৃষি পুরস্কার এবং ২০১১ সালে বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর পুরস্কার লাভ করেন।

তার সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হলো জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ। তিনি অপরিপক্ব অবস্থায় আম সংগ্রহ করেন না। ফল পাকতে শুরু করেছে কি না, তা নির্ধারণে তিনি প্রকৃতির একটি সহজ সংকেত অনুসরণ করেন।

তার মতে, যখন পাখি ও অন্যান্য প্রাণী প্রায় ১০ শতাংশ ফল খেতে শুরু করে, তখন বোঝা যায় আম পরিপক্ব হয়েছে। এরপরই বাজারজাতকরণের জন্য আম সংগ্রহ করা হয়।

চার দশকের পরিশ্রমে গড়া বাগান

৩৯ বিঘার এই প্রকল্পে বসতবাড়ি, পুকুর, বাঁশঝাড় ও অন্যান্য ফলের বাগানও রয়েছে। বাগানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৬০ বছর বয়সী দুটি গাছ—একটি হিমসাগর ও একটি ল্যাংড়া।

শাহাদাত জানান, প্রতিবছর এই দুটি গাছ থেকেই প্রায় ২০ মণ করে আম পাওয়া যায়।

তার দাবি, চলতি মৌসুমটি বাগানের ইতিহাসে সবচেয়ে ফলনশীল বছর হতে যাচ্ছে। গত ৪০ বছরে তিনি এত বেশি ফলন আগে কখনও দেখেননি। গাছগুলোর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাগানটিকে অঞ্চলের অন্যতম উৎপাদনশীল ব্যক্তিমালিকানাধীন আমবাগানে পরিণত করেছে।

খুলনার আমের বিশেষ বৈশিষ্ট্য

বাংলাদেশে সাধারণত উত্তরাঞ্চল আম উৎপাদনের জন্য বেশি পরিচিত হলেও শাহাদাত মনে করেন, খুলনা অঞ্চলের আমেরও আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

তার মতে, এই অঞ্চলের আমের মিষ্টতা তুলনামূলক বেশি এবং বিশেষ করে হিমসাগর আম স্বাদ ও সুবাসে অনন্য।

পরিবারের অনুপ্রেরণা

শাহাদাত তার এই দীর্ঘ যাত্রায় প্রয়াত স্ত্রীর অবদানের কথাও স্মরণ করেন। খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ছিলেন তার স্ত্রী। তিনি সবসময় তাকে উৎসাহ ও প্রেরণা দিয়েছেন বলে শাহাদাত জানান।

বর্তমানে আমের মৌসুমের ব্যস্ত সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতা, ব্যবসায়ী ও দর্শনার্থীরা বাগানটি দেখতে আসছেন। শাহাদাতের বাগান প্রমাণ করছে, ধৈর্য, নিষ্ঠা এবং প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা থাকলে কৃষিকাজ শুধু আর্থিক সাফল্যই নয়, জাতীয় স্বীকৃতিও এনে দিতে পারে।

১,০০০ মণ আম উৎপাদন এবং প্রায় ২০ লাখ টাকার বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে শাহাদাত হোসেন আশাবাদী, চলতি মৌসুম তার চার দশকের আমচাষের যাত্রায় নতুন এক মাইলফলক হয়ে থাকবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

‘ক্লিন ব্রেক’ থেকে অন্তহীন যুদ্ধ: প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ কীভাবে বদলে দিচ্ছে নিরাপত্তা নীতি

খুলনার আইনজীবী, পরিচয়ে আরেক সফল আমচাষি: রেকর্ড ফলনের অপেক্ষায় শাহাদাত

১০:০৯:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬

খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার মানুষ শাহাদাত হোসেনকে শুধু একজন আইনজীবী হিসেবেই চেনেন না, বরং একজন সফল ও নিবেদিতপ্রাণ আমচাষি হিসেবেও জানেন। প্রায় চার দশক ধরে নিজের যত্নে গড়ে তোলা বিশাল একটি জৈব আমবাগান এখন এলাকায় বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে।

দেবনগর মৌজায় ৩৯ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা এই বাগান স্থানীয়দের কাছে ‘ম্যাঙ্গো হ্যাভেন’ নামে পরিচিত। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমিকে তিনি ধীরে ধীরে একটি সফল কৃষিভিত্তিক উদ্যোগে পরিণত করেছেন।

এ বছর রেকর্ড ফলনের আশা

চলতি মৌসুমে বাগানের প্রায় ১,২০০টি আমগাছেই প্রচুর ফল ধরেছে। অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে এবং কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না এলে শাহাদাতের আশা, এ বছর প্রায় ১,০০০ মণ আম সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। এতে প্রায় ২০ লাখ টাকার বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।

বাগানে হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, মল্লিকা, বারি-৪, কলা আম ও কাটিমনসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় জাতের আম রয়েছে। বৈচিত্র্যময় জাতের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে আম সংগ্রহ ও বিক্রি করা সম্ভব হয়।

শৈশবের আগ্রহ থেকে পেশাদার চাষ

শাহাদাত জানান, ছোটবেলা থেকেই কৃষির প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। এসএসসি পরীক্ষার পর তিনি পারিবারিক জমিতে গাছ লাগানো শুরু করেন। পরে উচ্চমাধ্যমিকের পর আমচাষের প্রতি আরও বেশি আকৃষ্ট হন। ভালো মানের আমের আঁটি সংগ্রহ করে চারা তৈরি, কলম করা এবং সেগুলো রোপণের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে বাগান সম্প্রসারণ করেন।

গত ৪০ বছরে তিনি ১,২০০টির বেশি আমগাছ লাগিয়েছেন, যেগুলোর সবই এখন ফল দিচ্ছে। ব্যক্তিগত শখ হিসেবে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে এটি তার অন্যতম প্রধান পেশায় পরিণত হয়েছে।

তার ভাষায়, আমচাষের মাধ্যমে তিনি অন্যদেরও কৃষিকাজ ও বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করতে চান।

আমচাষি

জাতীয় স্বীকৃতি ও জৈব চাষের সাফল্য

কৃষিতে বিশেষ অবদানের জন্য শাহাদাত জাতীয় পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছেন। ১৯৮৯ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি কৃষি পুরস্কার এবং ২০১১ সালে বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর পুরস্কার লাভ করেন।

তার সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হলো জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ। তিনি অপরিপক্ব অবস্থায় আম সংগ্রহ করেন না। ফল পাকতে শুরু করেছে কি না, তা নির্ধারণে তিনি প্রকৃতির একটি সহজ সংকেত অনুসরণ করেন।

তার মতে, যখন পাখি ও অন্যান্য প্রাণী প্রায় ১০ শতাংশ ফল খেতে শুরু করে, তখন বোঝা যায় আম পরিপক্ব হয়েছে। এরপরই বাজারজাতকরণের জন্য আম সংগ্রহ করা হয়।

চার দশকের পরিশ্রমে গড়া বাগান

৩৯ বিঘার এই প্রকল্পে বসতবাড়ি, পুকুর, বাঁশঝাড় ও অন্যান্য ফলের বাগানও রয়েছে। বাগানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৬০ বছর বয়সী দুটি গাছ—একটি হিমসাগর ও একটি ল্যাংড়া।

শাহাদাত জানান, প্রতিবছর এই দুটি গাছ থেকেই প্রায় ২০ মণ করে আম পাওয়া যায়।

তার দাবি, চলতি মৌসুমটি বাগানের ইতিহাসে সবচেয়ে ফলনশীল বছর হতে যাচ্ছে। গত ৪০ বছরে তিনি এত বেশি ফলন আগে কখনও দেখেননি। গাছগুলোর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাগানটিকে অঞ্চলের অন্যতম উৎপাদনশীল ব্যক্তিমালিকানাধীন আমবাগানে পরিণত করেছে।

খুলনার আমের বিশেষ বৈশিষ্ট্য

বাংলাদেশে সাধারণত উত্তরাঞ্চল আম উৎপাদনের জন্য বেশি পরিচিত হলেও শাহাদাত মনে করেন, খুলনা অঞ্চলের আমেরও আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

তার মতে, এই অঞ্চলের আমের মিষ্টতা তুলনামূলক বেশি এবং বিশেষ করে হিমসাগর আম স্বাদ ও সুবাসে অনন্য।

পরিবারের অনুপ্রেরণা

শাহাদাত তার এই দীর্ঘ যাত্রায় প্রয়াত স্ত্রীর অবদানের কথাও স্মরণ করেন। খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ছিলেন তার স্ত্রী। তিনি সবসময় তাকে উৎসাহ ও প্রেরণা দিয়েছেন বলে শাহাদাত জানান।

বর্তমানে আমের মৌসুমের ব্যস্ত সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতা, ব্যবসায়ী ও দর্শনার্থীরা বাগানটি দেখতে আসছেন। শাহাদাতের বাগান প্রমাণ করছে, ধৈর্য, নিষ্ঠা এবং প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা থাকলে কৃষিকাজ শুধু আর্থিক সাফল্যই নয়, জাতীয় স্বীকৃতিও এনে দিতে পারে।

১,০০০ মণ আম উৎপাদন এবং প্রায় ২০ লাখ টাকার বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে শাহাদাত হোসেন আশাবাদী, চলতি মৌসুম তার চার দশকের আমচাষের যাত্রায় নতুন এক মাইলফলক হয়ে থাকবে।