ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্কে রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা ধীরে ধীরে আরও তীব্র হচ্ছে। সামনে আসছে কয়েক মাসের কঠিন লড়াই। আর এই যুদ্ধই হতে যাচ্ছে ইউক্রেনের নতুন সামরিক নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি।
রাশিয়ার মূল লক্ষ্য পুরো দোনেৎস্ক দখল করা। অন্যদিকে, ইউক্রেন নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল ছেড়ে দিতে রাজি নয়। ফলে দোনেৎস্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সামনে আরও ভয়াবহ সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্কের দিকে রুশ অগ্রযাত্রা
রুশ বাহিনী এখন দোনেৎস্কের গুরুত্বপূর্ণ দুটি শহর স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্কের দিকে এগিয়ে আসছে। শহর দুটি ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রুশ বাহিনী এই দুই শহর দখল করতে পারলে পুরো শিল্পাঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পথে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করবে।
বর্তমানে রুশ বাহিনী শহর দুটির ১৫ কিলোমিটারেরও কম দূরে অবস্থান করছে। রুশ হামলায় ইতিমধ্যে সেখানে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। আকাশ থেকে হামলাকারী চালকবিহীন উড়োজাহাজ ও নিয়ন্ত্রিত বোমার আঘাতে সাধারণ মানুষের জীবনও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইউক্রেনের সামরিক সহায়তাকারী একটি দাতব্য সংস্থার কর্মকর্তা আন্দ্রি দেরুন বলেন, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে শহরগুলো সমৃদ্ধ জনপদ থেকে এমন জায়গায় পরিণত হয়েছে, যেখানে রাস্তায় হাঁটতেও মানুষ ভয় পাচ্ছে।
শীতের আগে বাড়তে পারে সংঘর্ষ
সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে এই বছরের সবচেয়ে তীব্র লড়াই হতে পারে। শীত ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়া নতুন করে যান্ত্রিক বাহিনীর বড় আক্রমণের চেষ্টা করতে পারে।
কারণ আবহাওয়া খারাপ হলে চালকবিহীন উড়োজাহাজের কার্যকারিতা কমে যায়। আর এমন পরিস্থিতিতে রুশ বাহিনী আবারও স্থলভিত্তিক দ্রুত অভিযান চালানোর সুযোগ খুঁজতে পারে।
তবে ইউক্রেন ইতিমধ্যে এ ধরনের আক্রমণ ঠেকাতে শক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। দোব্রোপিলিয়ার কাছে জুলাইয়ের একটি রুশ হামলা ব্যর্থ হওয়ার ঘটনাকে এর উদাহরণ হিসেবে দেখছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।
নতুন নেতৃত্বের হাতে দোনেৎস্কের প্রতিরক্ষা
দোনেৎস্কের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব এখন ইউক্রেনের পরিচিত ও অভিজ্ঞ দুই সামরিক কমান্ডারের হাতে। তারা হলেন তৃতীয় সেনা কোরের আন্দ্রি বিলেতস্কি এবং জাতীয় রক্ষীবাহিনীর প্রথম কোর আজভের দেনিস প্রকোপেঙ্কো।
দুই কমান্ডারই শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার জন্য পরিচিত। তাদের অধীনে থাকা বাহিনীতে হাজার হাজার সেনা রয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে বিলেতস্কির বাহিনী স্লোভিয়ানস্কের কাছে যুদ্ধক্ষেত্রের একটি অংশ স্থিতিশীল করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে প্রকোপেঙ্কোর আজভ বাহিনী ২০২৫ সালে দোব্রোপিলিয়ার কাছে রুশ বাহিনীর বড় ধরনের আক্রমণ প্রতিহত করেছিল।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সামরিক উপদেষ্টা পাভলো পালিসা মনে করেন, এই দুই কমান্ডারকে দায়িত্ব দেওয়া যুক্তিসঙ্গত। কারণ তারা যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন এবং সেনাদের মধ্যে তাদের যথেষ্ট সম্মান ও কর্তৃত্ব রয়েছে।
ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের পথে নতুন সামরিক নেতৃত্ব
ইউক্রেনের নতুন সেনাপ্রধান মিখাইলো দ্রাপাতিই জুলাইয়ে ওলেকসান্দর সিরস্কির স্থলাভিষিক্ত হন। নতুন নেতৃত্বের অধীনে যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতিতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রাপাতিই মাঠপর্যায়ের কমান্ডারদের হাতে আগের তুলনায় বেশি ক্ষমতা দিচ্ছেন। এর ফলে বিভিন্ন সামরিক ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় বাড়তে পারে এবং পূর্বাঞ্চলের প্রতিরক্ষা আরও সুসংগঠিত হতে পারে।
এর আগে সিরস্কির বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রাণহানি মেনে নেওয়া এবং সামনের সারির ছোট ছোট অংশেও অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছিল।
নতুন নেতৃত্ব সেই পদ্ধতি থেকে সরে এসে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞ কমান্ডারদের বেশি স্বাধীনতা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
পাল্টা আক্রমণেও কিছু সাফল্য ইউক্রেনের
রুশ অগ্রযাত্রার মধ্যেও ইউক্রেন চলতি বছরে কিছু সীমিত সাফল্য অর্জন করেছে। দেশটির দাবি, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে কয়েক মাস ধরে পরিচালিত একটি নির্ভুল পাল্টা অভিযানে তারা ৭০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা পুনর্দখল করেছে।
সামরিক বিশ্লেষকেরা লিমান শহরের কাছেও ইউক্রেনীয় বাহিনীর কিছু অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে বিলেতস্কির বাহিনী রুশ সেনাদের একটি অগ্রবর্তী অবস্থান বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে।
তবে এসব সাফল্য এখনো যুদ্ধের সামগ্রিক চিত্র বদলে দেওয়ার মতো নয়।
সবচেয়ে বড় দুর্বলতা জনবল সংকট
ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি এখনো সেনা সংকট। বড় আকারের পাল্টা আক্রমণ চালানোর মতো পর্যাপ্ত জনবল দেশটির হাতে নেই।
এর পাশাপাশি সেনা নিয়োগ ব্যবস্থাতেও দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার সমস্যা রয়েছে। নতুন সেনাপ্রধান দ্রাপাতিই এবং নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়েভহেনি খমারা—দুজনের জন্যই এই নিয়োগব্যবস্থা সংস্কার করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করেছেন, রাশিয়াই যুদ্ধে জয়ী হচ্ছে এবং ইউক্রেনীয় বাহিনী শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়বে।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন অনেক বেশি সতর্ক। তাদের মতে, রাশিয়া এখনো ইউক্রেনের চালকবিহীন উড়োজাহাজনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকর মোকাবিলার পথ খুঁজে পায়নি। ফলে রুশ বাহিনীর পক্ষে কৌশলগত পর্যায়ের বড় সাফল্য অর্জন করা এখনো কঠিন।
দোনেৎস্কই হতে পারে যুদ্ধের পরবর্তী মোড়
দোনেৎস্কের বাকি অংশের নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার জন্য শুধু সামরিক নয়, বড় রাজনৈতিক অর্জনও হবে। আর ইউক্রেনের জন্য অঞ্চলটি ধরে রাখা মানে পূর্বাঞ্চলের প্রতিরক্ষার মূল কাঠামো রক্ষা করা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সাম্প্রতিক কিয়েভ সফরের পর স্থবির হয়ে থাকা শান্তি আলোচনা আবার কিছুটা সক্রিয় হলেও এখন পর্যন্ত বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। জেলেনস্কিও ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুদ্ধ শীতকাল পর্যন্ত গড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে দোনেৎস্ককে ঘিরে আসন্ন লড়াই শুধু আরেকটি যুদ্ধপর্ব নয়; এটি রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ইউক্রেনের নতুন সামরিক নেতৃত্ব কতটা কার্যকর, তারও বড় পরীক্ষা। আগামী কয়েক মাসে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিই নির্ধারণ করতে পারে—দোনেৎস্কে রাশিয়া আরও এগোবে, নাকি ইউক্রেন তার প্রতিরক্ষা ধরে রাখতে সক্ষম হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















