১১:৫৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
‘ক্লিন ব্রেক’ থেকে অন্তহীন যুদ্ধ: প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ কীভাবে বদলে দিচ্ছে নিরাপত্তা নীতি চার প্রদেশ নিয়েই অখণ্ড থাকবে পাকিস্তান, নতুন প্রদেশের প্রস্তাব নাকচ সিন্ধুর মুখ্যমন্ত্রীর নিউইয়র্কে বসছে ভোগ বিজনেসের বৈশ্বিক সম্মেলন, টিকিট বিক্রি শুরু ‘ক্লিন গার্ল’ যুগের বিদায়, বসন্ত-গ্রীষ্ম ২০২৭-এ আসছে নতুন ফ্যাশন ধারা দামি গয়না খোঁজার নতুন ঠিকানা কি টিকটক? বদলে যাওয়া শরীরের জন্য বিলাসবহুল ফ্যাশন, নতুন বাজার তৈরি করছে ওয়েলডান আমেরিকা কতটা সমাজতন্ত্র গ্রহণ করতে প্রস্তুত? কারখানার মেঝেতেই জাপানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আসল লড়াই ২৫ বছরেই শেষ ৫ লাখ ডলারের ক্যারিয়ার, ই-স্পোর্টসে বাড়ছে চোটের ভয়াবহতা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এশিয়ার দিকে কানাডার নতুন বাণিজ্যযাত্রা

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-২১৩)

  • Sarakhon Report
  • ১১:০০:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৫
  • 220

শরৎ-সন্নিধানে

উপেনবাবুর নির্দেশ মতো আমরা তাঁহার বাসায় বিচিত্রা-অফিসে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই শরৎচন্দ্র আসিলেন। উপেনবাবু লাল মিঞাকে পরিচিত করাইয়া দিলেন। আমার সহিত শরৎবাবুর পূর্ব পরিচয় আছে মনে করিয়া আমাকে আর পরিচিত করাইলেন না; সতরাং অতি সহজভাবেই আলাপ চলিতে লাগিল।

সভাপতিত্ব করার কথা উঠিলেই প্রথমে শরৎবাবু তাঁর স্বাস্থ্যের কথা বলিলেন। আমি বলিলাম, “আপনি তো আমাদের বাঙলা দেশটা কোনোদিন দেখলেন না। বর্ষায় আমাদের দেশ জলের উপর ভাসে। শীতকালে সমস্ত মাঠ চৈতালি ফসলে ভরে যায়। ফুলের রঙে সমস্ত পূর্ববঙ্গ রঙিন হয়ে উঠে। সেখানে গেলে আপনাকে নৌকার গান শুনাব, মুর্শিদ-ফকিরের সারিন্দা বাজানো শুনাব; আপনি চলুন।” আমার কথা শুনিয়া শরৎচন্দ্র একটু হাসিলেন। উপেনবাবুরও সুযোগ বুঝিয়া আমার অনুরোধের উপর জোর দিলেন। শরৎবাবুর রাজি হইলেন।

কয়েক মিনিট পরে শরৎবাবু বলিলেন, “চল হাওড়া হতে বেড়িয়ে আসি।” আমি ও লাল মিঞা শরৎবাবুর গাড়িতে যাইয়া বসিলাম। বেহালার একটি যুবক সাহিত্যিক সেইদিন আমাদের সাথি হইয়াছিলেন, তাঁহার নামটি মনে নাই। গাড়িতে বসিয়া শরৎচন্দ্র হিন্দু-মুসলমান সমস্যা লইয়া আলোচনা আরম্ভ করিলেন। তিনি বলিলেন, “তোমাদের মতো উদার মুসলমান যদি বাংলার সর্বেসর্বা হয়েও বসেন তাতে আমার কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু সংকীর্ণ মন নিয়ে একদেশদর্শী হয়ে যাঁরা শাসনশক্তি চালনা করবেন, তাঁরা অপর সমাজের তো অকল্যাণ করবেনই, নিজেদেরও কোনো হিত করতে পারবেন না। তাঁদের জন্যই আমার ভয়।”

আমি প্রতি-উত্তরে বলিলাম, “আপনার মতো হিন্দু যদি আজ বাংলার সর্বেসর্বা হয়ে বসত তাতে অনেক মুসলমানেরই কোনো আপত্তি থাকত না। যাঁরা দেশকে ভালোবাসেন না, দেশের জনসাধারণের প্রতি যাঁদের মনের প্রীতি নেই, তাঁরাই আজ দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে কামড়াকামড়ি করছেন।” কথায় কথায় আলোচনা অন্য প্রসঙ্গে চলিয়া গেল। শরৎচন্দ্র বলিলেন, ‘দেখ, সব সময় ভালো সাহিত্য রচনা করা যায় না। নিজেরই ক্ষমতার উপর অবিশ্বাস এসে যায়। সভ-সমিতিতে গেলে লোকে ভালো বলে, প্রশংসা করে; তাতে মনে মনে কিছু উৎসাহ পাই।”

আমি বলিলাম, “আমাদের সব চাইতে বড় দুঃখ আপনি বাঙলা দেশের এতবড় দরদি সাহিত্যিক, আমাদের বিরাট মুসলমান-সমাজের সুখ-দুঃখ আপনার লেখনীতে ভাষা পেল না। সমাজের মিথ্যা সংস্কারের সহস্র পীড়নে যারা পঙ্গু হয়ে ছিল, যাদের দিকে কেহই ফিরে তাকাত না, তাদের কথাও আপনি কত দরদের সঙ্গে লিখেছেন। ‘রামের সুমতি’র রামের প্রতি আমরা টোলের পণ্ডিতমশায়ের মতো বেত্রদণ্ডের ব্যবস্থাই করতাম; ‘বিরাজ বৌ’ গল্পের নীলাম্বরকে আমরা শুধু ঘৃণা করতেই জানতাম। আপনার কাছেই আমরা এদের ভালোবাসতে শিখেছি। অর্ধেক বাঙলা জুড়ে আছি আমরা মুসলমানেরা। আপনি আমাদের কথা লিখলেন না, এ ক্ষোভ আমাদের চিরজীবন থাকবে।” শরৎবাবু বলিলেন, “তোমাদের সমাজের কথা আমি লিখতে পারি। কিন্তু পরমত সহ্য করতে তোমরা বড় অসহিষ্ণু।”

 

চলবে…..

জনপ্রিয় সংবাদ

‘ক্লিন ব্রেক’ থেকে অন্তহীন যুদ্ধ: প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ কীভাবে বদলে দিচ্ছে নিরাপত্তা নীতি

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-২১৩)

১১:০০:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৫

শরৎ-সন্নিধানে

উপেনবাবুর নির্দেশ মতো আমরা তাঁহার বাসায় বিচিত্রা-অফিসে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই শরৎচন্দ্র আসিলেন। উপেনবাবু লাল মিঞাকে পরিচিত করাইয়া দিলেন। আমার সহিত শরৎবাবুর পূর্ব পরিচয় আছে মনে করিয়া আমাকে আর পরিচিত করাইলেন না; সতরাং অতি সহজভাবেই আলাপ চলিতে লাগিল।

সভাপতিত্ব করার কথা উঠিলেই প্রথমে শরৎবাবু তাঁর স্বাস্থ্যের কথা বলিলেন। আমি বলিলাম, “আপনি তো আমাদের বাঙলা দেশটা কোনোদিন দেখলেন না। বর্ষায় আমাদের দেশ জলের উপর ভাসে। শীতকালে সমস্ত মাঠ চৈতালি ফসলে ভরে যায়। ফুলের রঙে সমস্ত পূর্ববঙ্গ রঙিন হয়ে উঠে। সেখানে গেলে আপনাকে নৌকার গান শুনাব, মুর্শিদ-ফকিরের সারিন্দা বাজানো শুনাব; আপনি চলুন।” আমার কথা শুনিয়া শরৎচন্দ্র একটু হাসিলেন। উপেনবাবুরও সুযোগ বুঝিয়া আমার অনুরোধের উপর জোর দিলেন। শরৎবাবুর রাজি হইলেন।

কয়েক মিনিট পরে শরৎবাবু বলিলেন, “চল হাওড়া হতে বেড়িয়ে আসি।” আমি ও লাল মিঞা শরৎবাবুর গাড়িতে যাইয়া বসিলাম। বেহালার একটি যুবক সাহিত্যিক সেইদিন আমাদের সাথি হইয়াছিলেন, তাঁহার নামটি মনে নাই। গাড়িতে বসিয়া শরৎচন্দ্র হিন্দু-মুসলমান সমস্যা লইয়া আলোচনা আরম্ভ করিলেন। তিনি বলিলেন, “তোমাদের মতো উদার মুসলমান যদি বাংলার সর্বেসর্বা হয়েও বসেন তাতে আমার কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু সংকীর্ণ মন নিয়ে একদেশদর্শী হয়ে যাঁরা শাসনশক্তি চালনা করবেন, তাঁরা অপর সমাজের তো অকল্যাণ করবেনই, নিজেদেরও কোনো হিত করতে পারবেন না। তাঁদের জন্যই আমার ভয়।”

আমি প্রতি-উত্তরে বলিলাম, “আপনার মতো হিন্দু যদি আজ বাংলার সর্বেসর্বা হয়ে বসত তাতে অনেক মুসলমানেরই কোনো আপত্তি থাকত না। যাঁরা দেশকে ভালোবাসেন না, দেশের জনসাধারণের প্রতি যাঁদের মনের প্রীতি নেই, তাঁরাই আজ দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে কামড়াকামড়ি করছেন।” কথায় কথায় আলোচনা অন্য প্রসঙ্গে চলিয়া গেল। শরৎচন্দ্র বলিলেন, ‘দেখ, সব সময় ভালো সাহিত্য রচনা করা যায় না। নিজেরই ক্ষমতার উপর অবিশ্বাস এসে যায়। সভ-সমিতিতে গেলে লোকে ভালো বলে, প্রশংসা করে; তাতে মনে মনে কিছু উৎসাহ পাই।”

আমি বলিলাম, “আমাদের সব চাইতে বড় দুঃখ আপনি বাঙলা দেশের এতবড় দরদি সাহিত্যিক, আমাদের বিরাট মুসলমান-সমাজের সুখ-দুঃখ আপনার লেখনীতে ভাষা পেল না। সমাজের মিথ্যা সংস্কারের সহস্র পীড়নে যারা পঙ্গু হয়ে ছিল, যাদের দিকে কেহই ফিরে তাকাত না, তাদের কথাও আপনি কত দরদের সঙ্গে লিখেছেন। ‘রামের সুমতি’র রামের প্রতি আমরা টোলের পণ্ডিতমশায়ের মতো বেত্রদণ্ডের ব্যবস্থাই করতাম; ‘বিরাজ বৌ’ গল্পের নীলাম্বরকে আমরা শুধু ঘৃণা করতেই জানতাম। আপনার কাছেই আমরা এদের ভালোবাসতে শিখেছি। অর্ধেক বাঙলা জুড়ে আছি আমরা মুসলমানেরা। আপনি আমাদের কথা লিখলেন না, এ ক্ষোভ আমাদের চিরজীবন থাকবে।” শরৎবাবু বলিলেন, “তোমাদের সমাজের কথা আমি লিখতে পারি। কিন্তু পরমত সহ্য করতে তোমরা বড় অসহিষ্ণু।”

 

চলবে…..