ইসরায়েল-ফিলিস্তিন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের অংশ হিসেবে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোতে উৎপাদিত পণ্য কেনাবেচায় নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। মঙ্গলবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড এ বিষয়ে ঘোষণা দিতে পারেন বলে জানা গেছে।
কৃষিপণ্যসহ পণ্য ও সেবায় নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনা
প্রস্তাবিত পদক্ষেপের আওতায় পশ্চিম তীরের অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলো থেকে কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে। তবে শুধু পণ্য নয়, বসতিগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবাকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্রিটিশ সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত কয়েকজন ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য মনে করছেন, এটি হবে ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের বিরুদ্ধে তুলনামূলক বিস্তৃত ব্যবস্থা।
এক ব্রিটিশ মন্ত্রী বলেছেন, এই ঘোষণা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকারের নীতিতে ‘সম্পূর্ণ পুনর্বিন্যাস’ তুলে ধরবে। তাঁর ভাষায়, বিষয়টি শুধু নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এটিকে দেখা হচ্ছে।

ইসরায়েলের পাল্টা পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি
নতুন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলে পাল্টা পদক্ষেপের হুমকি আগেই দিয়েছে ইসরায়েল। ফলে ব্রিটিশ সরকারের এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।
ব্রিটিশ সরকারের পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে সরকারের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতির দ্রুত সম্প্রসারণ ফিলিস্তিনিদের জন্য ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে ক্রমেই দুর্বল করে দিচ্ছে।
বসতি সম্প্রসারণে ক্ষুব্ধ যুক্তরাজ্য
সম্প্রতি ইসরায়েল পশ্চিম তীরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘ই-১’ এলাকায় প্রায় ১ হাজার ২০০টি নতুন বসতি নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে। পূর্ব জেরুজালেমের কাছের এই অঞ্চলটি পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক সংযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতোমধ্যে এই পরিকল্পনাকে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর আশঙ্কা, ওই এলাকায় বসতি নির্মাণ পশ্চিম তীরের কেন্দ্রভাগকে বিভক্ত করে দিতে পারে এবং ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে কার্যত অসম্ভব করে তুলতে পারে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীও সতর্ক করে বলেছেন, ই-১ এলাকায় ইসরায়েলের পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে গুরুতরভাবে বিপন্ন করতে পারে।
দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে গুরুত্ব
প্রস্তাবিত নীতির কেন্দ্রে রয়েছে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন—দুটি পৃথক রাষ্ট্রের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে অস্তিত্বের ধারণা। কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত এই পরিকল্পনায় পশ্চিম তীর, গাজা ও পূর্ব জেরুজালেমকে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গত বছর ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর জানিয়েছিল, ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি জনগণের শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্যের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে।
ব্রিটিশ সরকারের আশঙ্কা, পশ্চিম তীরে দ্রুত বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলে সেই ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
পশ্চিম তীরে বাড়ছে সহিংসতা
১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর ইসরায়েল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে। এরপর সেখানে প্রায় ১৬০টি ইসরায়েলি বসতি গড়ে উঠেছে, যেখানে প্রায় ৭ লাখ ইসরায়েলি বসবাস করেন। একই এলাকায় প্রায় ৩৩ লাখ ফিলিস্তিনিও বসবাস করছেন।
গাজা যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের হাতে ফিলিস্তিনি ও তাঁদের সম্পত্তির ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ব্রিটিশ সরকারের নতুন পদক্ষেপ তাই শুধু বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা হিসেবে নয়, ইসরায়েলের বসতি নীতি ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















