১১:৫৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হরমুজে জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলা, যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে বড় নৌ-সংঘাত নিজের মাটিতে বিশ্বকাপ: মরক্কো কি এবার ফাইনালে উঠতে পারবে? দুই সেট পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, ইউএস ওপেনের সেমিফাইনালে তিয়াফো নিখোঁজ মেয়ের ফোন! ‘লাস্ট সিন’ কেন বছরের অন্যতম সেরা থ্রিলার রক্তস্বল্পতায় ভোগা মায়ের সন্তানদের মস্তিষ্ক ছোট হতে পারে, গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য ১৬ বছরের অভিমান ভেঙে একই মঞ্চে দুই ভাই, ওয়েসিসের প্রত্যাবর্তনে মিলল হারানো সুর গাড়িকেন্দ্রিক শহর বদলে সবুজ জনপরিসর, ইউরোপে স্থাপত্যের নতুন ভাবনা রাশিয়ার হামলায় কিয়েভে খাদ্য সরবরাহে সংকট, খালি হচ্ছে সুপারমার্কেটের তাক দুর্ঘটনায় হারালেন দুই পা ও তিন প্রিয় বন্ধু, তবু জীবনকে নতুন করে বেছে নিলেন রব পাইক রাশিয়ার হামলায় কাঁপছে ইউক্রেনের নারীদের হাত, তবু সন্তানদের নিয়ে থামছে না জীবন

ভেনেজুয়েলার তেলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগ, চীনের সামনে কী সমীকরণ?

ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগ আন্তর্জাতিক জ্বালানি রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দেশটির প্রায় ৬৫০০ কোটি ব্যারেল প্রমাণিত তেলসম্পদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ ও অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার একটি চুক্তি করেছে। এর ফলে শুধু ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতিই বাড়ছে না, একই সঙ্গে চীনের দীর্ঘদিনের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক স্বার্থও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে।

১৭টি তেলক্ষেত্র ঘিরে বড় চুক্তি

চুক্তির আওতায় নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সকে ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্রে ১০০ বছরের জন্য কাজের অধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আনুমানিক ৬৫০০ কোটি ব্যারেল প্রমাণিত তেলসম্পদ রয়েছে, যা ভেনেজুয়েলার মোট প্রমাণিত মজুদের একটি বড় অংশ।

চুক্তির কাঠামোয় মার্কিন সরকার ওই প্রতিষ্ঠানে ৩৫ শতাংশ অংশীদারত্ব পাবে। পাশাপাশি উৎপাদিত তেলের ২০ শতাংশ উৎপাদন ব্যয়ে কেনার সুযোগ এবং বাকি তেলের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতাও রয়েছে এবং পর্ষদের অধিকাংশ সদস্যকে মার্কিন নাগরিক হতে হবে।

ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে এই ব্যবস্থা ভেনেজুয়েলার ধসে পড়া তেলশিল্পে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উৎপাদন বাড়ানোর একটি উপায়। তবে চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি বৈধতা, শর্ত এবং বাস্তবায়ন নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

Venezuelan oil and China: 4 things to know - Nikkei Asia

চীনের স্বার্থে কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে চীনের উপস্থিতি নতুন নয়। দেশটির বেশ কয়েকটি তেলক্ষেত্রে আগে চীনা ও রুশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে। নতুন ব্যবস্থায় এর কিছু অংশ যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাচ্ছে। ফলে ভেনেজুয়েলার তেল খাতে চীনের আগের অবস্থান কিছুটা সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এখানে বিষয়টি শুধু তেল কেনাবেচার নয়। ভেনেজুয়েলার মতো বিশাল তেলসম্পদসমৃদ্ধ একটি দেশে কে বিনিয়োগ করবে, কে উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় থাকবে এবং ভবিষ্যতে কার প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ শৃঙ্খলে জায়গা পাবে—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

লাতিন আমেরিকায় গত দুই দশকে চীন বাণিজ্য, অবকাঠামো, জ্বালানি ও খনিজ খাতে ব্যাপকভাবে নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। তাই ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অবস্থানকে বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার একটি অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

তবে চীনের জন্য তাৎক্ষণিক সংকট কতটা?

ভেনেজুয়েলার তেল খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়লেও এর অর্থ এই নয় যে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধাক্কা খাবে।

চীন বিশ্বের অন্যতম বড় তেল আমদানিকারক এবং তার সরবরাহ ব্যবস্থা বহু দেশের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে বেইজিং তেল সংগ্রহ করে। ফলে ভেনেজুয়েলা থেকে সরবরাহ কমে গেলেও বিকল্প উৎস ব্যবহার করার সুযোগ চীনের রয়েছে।

এ কারণে বেইজিংয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে—যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়।

কারণ বিপুল তেলসম্পদের ওপর অধিকার পাওয়া আর সেই তেল দ্রুত উত্তোলন করে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো এক বিষয় নয়।

China Built a Vast Oil Stake in Venezuela. Now It Risks Getting Muscled Out. - WSJ

তেল আছে, কিন্তু উৎপাদন বাড়ানো সহজ নয়

ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প বহু বছর ধরে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, বিনিয়োগের ঘাটতি, প্রযুক্তিগত সমস্যা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ফলে নতুন চুক্তি হলেই উৎপাদন দ্রুত বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

এখন যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলো সেই উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে শেভরন ভেনেজুয়েলায় বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় ৭০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করে উৎপাদন ২০৩১ সালের মধ্যে দৈনিক প্রায় ৬ লাখ ব্যারেলে নেওয়ার লক্ষ্য জানিয়েছে।

এ ধরনের বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়তে পারে। কিন্তু এর জন্য নতুন কূপ, যন্ত্রপাতি, পাইপলাইন, বিদ্যুৎ, বন্দর ও পরিশোধন অবকাঠামোয় বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখন মূল পরীক্ষা হলো চুক্তির কাগুজে সুবিধাকে বাস্তব উৎপাদনে পরিণত করা।

চীনের জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ

এই জায়গাতেই চীনের কৌশলগত সুবিধা তৈরি হতে পারে।

বেইজিংকে এখনই বড় ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ নিতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প পুনর্গঠন করে, কত বিনিয়োগ আসে এবং উৎপাদন কতটা বাড়ে, তা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ চীনের রয়েছে।

যদি মার্কিন উদ্যোগ সফল হয়, চীন তখন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে। আর যদি প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক বিরোধ, আইনি জটিলতা বা বিনিয়োগ সংকট দেখা দেয়, তাহলে বেইজিংয়ের সামনে নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে।

এই কারণে ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বড় উদ্যোগের জবাবে চীনের নীরবতা দুর্বলতার লক্ষণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের দিক থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাও একটি কার্যকর নীতি হতে পারে।

US warns Venezuela's Maduro of need for free election on Sunday | Reuters

চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়েই বড় প্রশ্ন

চুক্তির ঘোষণার পর থেকেই এর বৈধতা ও বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে এত দীর্ঘ মেয়াদের তেলক্ষেত্রের অধিকার এবং বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে করা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনীতিকদের একাংশও চুক্তির স্বচ্ছতা ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসন বলছে, এই উদ্যোগ ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প পুনরুজ্জীবিত করা এবং দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।

অর্থাৎ একই চুক্তিকে এক পক্ষ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে দেখছে, অন্য পক্ষ দেখছে সার্বভৌমত্ব ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে।

তেলের বাইরে খনিজ সম্পদও গুরুত্বপূর্ণ

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ এখন শুধু তেলেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। দেশটির সোনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদের ক্ষেত্রেও মার্কিন প্রবেশাধিকার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। ওয়াশিংটনের এই উদ্যোগের পেছনে চীনের প্রভাব মোকাবিলা এবং কৌশলগত সম্পদের সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিও রয়েছে।

এ কারণে ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু একটি তেল চুক্তি হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না।

তেল, সোনা, লোহা, নিকেলসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ ভবিষ্যতের শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বৈদ্যুতিক যান, জ্বালানি সঞ্চয়, উন্নত প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য এসব সম্পদের গুরুত্ব বাড়ছে।

ফলে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বাড়ার অর্থ হলো দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি আগ্রহও বাড়ছে।

লাতিন আমেরিকায় প্রভাবের নতুন প্রতিযোগিতা

ভেনেজুয়েলার ঘটনাটি লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বৃহত্তর প্রতিযোগিতার দিকটিও সামনে এনেছে।

China's Role in Africa's Critical Minerals Landscape: Challenges and Key Opportunities | APRI – Africa Policy Research Institute

চীন গত কয়েক দশকে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য, অবকাঠামো, জ্বালানি ও খনিজ খাতে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলকে নিজের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাববলয় হিসেবে দেখে এসেছে।

ভেনেজুয়েলার তেল খাতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অবস্থান তাই শুধু একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন এ অঞ্চলে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করছে—এমন বিশ্লেষণও সামনে এসেছে।

তবে চীনের জন্য পরিস্থিতি পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। বেইজিংয়ের হাতে রয়েছে বিকল্প জ্বালানি উৎস, দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিনিয়োগের সুযোগ।

শেষ পর্যন্ত সমীকরণ কোন দিকে যাবে?

ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর—তেল উৎপাদন কত দ্রুত বাড়ে, কত বিনিয়োগ আসে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কতটা বজায় থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলো কতটা কার্যকর থাকে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারে, তাহলে ওয়াশিংটনের প্রভাব যেমন বাড়বে, তেমনি চীনের জন্য ভেনেজুয়েলার আগের অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

অন্যদিকে উৎপাদন বাড়াতে সময় লাগলে বা রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতা তৈরি হলে চীনের হাতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নতুন কৌশল নেওয়ার আরও সময় থাকবে।

তাই আপাতত ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু কে কত ব্যারেল তেল পাবে—তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, আগামী কয়েক বছরে কে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

এই সমীকরণের উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে লাতিন আমেরিকার জ্বালানি রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পরবর্তী অবস্থান।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজে জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলা, যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে বড় নৌ-সংঘাত

ভেনেজুয়েলার তেলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগ, চীনের সামনে কী সমীকরণ?

১০:৪৭:৪৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগ আন্তর্জাতিক জ্বালানি রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দেশটির প্রায় ৬৫০০ কোটি ব্যারেল প্রমাণিত তেলসম্পদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ ও অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার একটি চুক্তি করেছে। এর ফলে শুধু ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতিই বাড়ছে না, একই সঙ্গে চীনের দীর্ঘদিনের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক স্বার্থও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে।

১৭টি তেলক্ষেত্র ঘিরে বড় চুক্তি

চুক্তির আওতায় নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সকে ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্রে ১০০ বছরের জন্য কাজের অধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আনুমানিক ৬৫০০ কোটি ব্যারেল প্রমাণিত তেলসম্পদ রয়েছে, যা ভেনেজুয়েলার মোট প্রমাণিত মজুদের একটি বড় অংশ।

চুক্তির কাঠামোয় মার্কিন সরকার ওই প্রতিষ্ঠানে ৩৫ শতাংশ অংশীদারত্ব পাবে। পাশাপাশি উৎপাদিত তেলের ২০ শতাংশ উৎপাদন ব্যয়ে কেনার সুযোগ এবং বাকি তেলের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতাও রয়েছে এবং পর্ষদের অধিকাংশ সদস্যকে মার্কিন নাগরিক হতে হবে।

ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে এই ব্যবস্থা ভেনেজুয়েলার ধসে পড়া তেলশিল্পে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উৎপাদন বাড়ানোর একটি উপায়। তবে চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি বৈধতা, শর্ত এবং বাস্তবায়ন নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

Venezuelan oil and China: 4 things to know - Nikkei Asia

চীনের স্বার্থে কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে চীনের উপস্থিতি নতুন নয়। দেশটির বেশ কয়েকটি তেলক্ষেত্রে আগে চীনা ও রুশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে। নতুন ব্যবস্থায় এর কিছু অংশ যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাচ্ছে। ফলে ভেনেজুয়েলার তেল খাতে চীনের আগের অবস্থান কিছুটা সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এখানে বিষয়টি শুধু তেল কেনাবেচার নয়। ভেনেজুয়েলার মতো বিশাল তেলসম্পদসমৃদ্ধ একটি দেশে কে বিনিয়োগ করবে, কে উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় থাকবে এবং ভবিষ্যতে কার প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ শৃঙ্খলে জায়গা পাবে—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

লাতিন আমেরিকায় গত দুই দশকে চীন বাণিজ্য, অবকাঠামো, জ্বালানি ও খনিজ খাতে ব্যাপকভাবে নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। তাই ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অবস্থানকে বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার একটি অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

তবে চীনের জন্য তাৎক্ষণিক সংকট কতটা?

ভেনেজুয়েলার তেল খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়লেও এর অর্থ এই নয় যে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধাক্কা খাবে।

চীন বিশ্বের অন্যতম বড় তেল আমদানিকারক এবং তার সরবরাহ ব্যবস্থা বহু দেশের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে বেইজিং তেল সংগ্রহ করে। ফলে ভেনেজুয়েলা থেকে সরবরাহ কমে গেলেও বিকল্প উৎস ব্যবহার করার সুযোগ চীনের রয়েছে।

এ কারণে বেইজিংয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে—যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়।

কারণ বিপুল তেলসম্পদের ওপর অধিকার পাওয়া আর সেই তেল দ্রুত উত্তোলন করে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো এক বিষয় নয়।

China Built a Vast Oil Stake in Venezuela. Now It Risks Getting Muscled Out. - WSJ

তেল আছে, কিন্তু উৎপাদন বাড়ানো সহজ নয়

ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প বহু বছর ধরে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, বিনিয়োগের ঘাটতি, প্রযুক্তিগত সমস্যা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ফলে নতুন চুক্তি হলেই উৎপাদন দ্রুত বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

এখন যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলো সেই উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে শেভরন ভেনেজুয়েলায় বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় ৭০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করে উৎপাদন ২০৩১ সালের মধ্যে দৈনিক প্রায় ৬ লাখ ব্যারেলে নেওয়ার লক্ষ্য জানিয়েছে।

এ ধরনের বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়তে পারে। কিন্তু এর জন্য নতুন কূপ, যন্ত্রপাতি, পাইপলাইন, বিদ্যুৎ, বন্দর ও পরিশোধন অবকাঠামোয় বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখন মূল পরীক্ষা হলো চুক্তির কাগুজে সুবিধাকে বাস্তব উৎপাদনে পরিণত করা।

চীনের জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ

এই জায়গাতেই চীনের কৌশলগত সুবিধা তৈরি হতে পারে।

বেইজিংকে এখনই বড় ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ নিতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প পুনর্গঠন করে, কত বিনিয়োগ আসে এবং উৎপাদন কতটা বাড়ে, তা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ চীনের রয়েছে।

যদি মার্কিন উদ্যোগ সফল হয়, চীন তখন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে। আর যদি প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক বিরোধ, আইনি জটিলতা বা বিনিয়োগ সংকট দেখা দেয়, তাহলে বেইজিংয়ের সামনে নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে।

এই কারণে ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বড় উদ্যোগের জবাবে চীনের নীরবতা দুর্বলতার লক্ষণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের দিক থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাও একটি কার্যকর নীতি হতে পারে।

US warns Venezuela's Maduro of need for free election on Sunday | Reuters

চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়েই বড় প্রশ্ন

চুক্তির ঘোষণার পর থেকেই এর বৈধতা ও বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে এত দীর্ঘ মেয়াদের তেলক্ষেত্রের অধিকার এবং বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে করা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনীতিকদের একাংশও চুক্তির স্বচ্ছতা ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসন বলছে, এই উদ্যোগ ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প পুনরুজ্জীবিত করা এবং দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।

অর্থাৎ একই চুক্তিকে এক পক্ষ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে দেখছে, অন্য পক্ষ দেখছে সার্বভৌমত্ব ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে।

তেলের বাইরে খনিজ সম্পদও গুরুত্বপূর্ণ

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ এখন শুধু তেলেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। দেশটির সোনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদের ক্ষেত্রেও মার্কিন প্রবেশাধিকার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। ওয়াশিংটনের এই উদ্যোগের পেছনে চীনের প্রভাব মোকাবিলা এবং কৌশলগত সম্পদের সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিও রয়েছে।

এ কারণে ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু একটি তেল চুক্তি হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না।

তেল, সোনা, লোহা, নিকেলসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ ভবিষ্যতের শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বৈদ্যুতিক যান, জ্বালানি সঞ্চয়, উন্নত প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য এসব সম্পদের গুরুত্ব বাড়ছে।

ফলে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বাড়ার অর্থ হলো দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি আগ্রহও বাড়ছে।

লাতিন আমেরিকায় প্রভাবের নতুন প্রতিযোগিতা

ভেনেজুয়েলার ঘটনাটি লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বৃহত্তর প্রতিযোগিতার দিকটিও সামনে এনেছে।

China's Role in Africa's Critical Minerals Landscape: Challenges and Key Opportunities | APRI – Africa Policy Research Institute

চীন গত কয়েক দশকে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য, অবকাঠামো, জ্বালানি ও খনিজ খাতে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলকে নিজের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাববলয় হিসেবে দেখে এসেছে।

ভেনেজুয়েলার তেল খাতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অবস্থান তাই শুধু একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন এ অঞ্চলে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করছে—এমন বিশ্লেষণও সামনে এসেছে।

তবে চীনের জন্য পরিস্থিতি পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। বেইজিংয়ের হাতে রয়েছে বিকল্প জ্বালানি উৎস, দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিনিয়োগের সুযোগ।

শেষ পর্যন্ত সমীকরণ কোন দিকে যাবে?

ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর—তেল উৎপাদন কত দ্রুত বাড়ে, কত বিনিয়োগ আসে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কতটা বজায় থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলো কতটা কার্যকর থাকে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারে, তাহলে ওয়াশিংটনের প্রভাব যেমন বাড়বে, তেমনি চীনের জন্য ভেনেজুয়েলার আগের অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

অন্যদিকে উৎপাদন বাড়াতে সময় লাগলে বা রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতা তৈরি হলে চীনের হাতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নতুন কৌশল নেওয়ার আরও সময় থাকবে।

তাই আপাতত ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু কে কত ব্যারেল তেল পাবে—তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, আগামী কয়েক বছরে কে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

এই সমীকরণের উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে লাতিন আমেরিকার জ্বালানি রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পরবর্তী অবস্থান।