২০৩০ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিন দেশই নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিয়েছে। স্পেন ২০২৬ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ ইউরো জিতেছে, পর্তুগাল ২০১৬ ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয়েছে এবং মরক্কো ২০২৫ সালে আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
তবে এই তিন আয়োজকের মধ্যে মরক্কোর গল্পটি আলাদা। নিজেদের দেশে বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ এমন এক দলের সামনে এসেছে, যারা গত দুটি আসরে আফ্রিকান ফুটবলের সম্ভাবনার নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছে। এখন প্রশ্ন, ঘরের দর্শকদের সামনে মরক্কো কি সেই অগ্রযাত্রাকে আরও দূরে নিয়ে যেতে পারবে?
বিশ্বকাপে বদলে গেছে মরক্কোর অবস্থান
২০২২ সালের বিশ্বকাপ ছিল মরক্কোর জন্য একটি ঐতিহাসিক বাঁক। ক্রোয়েশিয়া, বেলজিয়াম ও কানাডার মতো শক্তিশালী দল থাকা সত্ত্বেও তারা গ্রুপের শীর্ষে উঠে যায়। এরপর স্পেন ও পর্তুগালকে হারিয়ে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে যায়।
চার বছর পরও তাদের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিল, স্কটল্যান্ড ও হাইতির সঙ্গে গ্রুপে দ্বিতীয় হয়ে মরক্কো কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয়। সেখানে ফ্রান্সের কাছে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয় তারা। ২০২২ সালের সেমিফাইনালেও একই ফ্রান্সের কাছে হেরেছিল মরক্কো।
এই দুই আসরের অভিজ্ঞতা এখন দলটির প্রত্যাশাকে স্বাভাবিকভাবেই বাড়িয়েছে। ২০৩০ সালে মরক্কোর লক্ষ্য তাই শুধু নকআউট পর্বে ওঠা নয়। তারা এমন কিছু করতে চাইবে, যা কোনো আফ্রিকান দল এখনো পারেনি—বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছানো।

ঘরের মাঠ হতে পারে বড় অস্ত্র
মরক্কোর সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হবে নিজেদের মাঠ। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে প্রায় ১৬ বছর ধরে ঘরের মাঠে অপরাজিত থাকার রেকর্ড দলটির আত্মবিশ্বাসের জন্য বড় ভিত্তি।
নিজেদের দর্শকদের সামনে খেলার সুবিধা ফুটবলে নতুন কিছু নয়। কিন্তু মরক্কোর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ২০২২ সালের সাফল্য দেশটির ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশা বহুগুণ বাড়িয়েছে। বিশ্বকাপ যখন নিজ দেশেই অনুষ্ঠিত হবে, তখন গ্যালারির সমর্থন খেলোয়াড়দের বাড়তি শক্তি দিতে পারে।
অবশ্য একই বিষয় চাপেও পরিণত হতে পারে। ঘরের মাঠে সমর্থকদের প্রত্যাশা যত বেশি হবে, ব্যর্থতার মূল্যও তত বেশি হতে পারে। মরক্কোর খেলোয়াড়দের তাই শুধু প্রতিপক্ষ নয়, নিজেদের ওপর তৈরি হওয়া প্রত্যাশার সঙ্গেও লড়তে হবে।
দলের অভিজ্ঞতা বনাম ভবিষ্যতের প্রশ্ন
মরক্কোর বর্তমান স্কোয়াডে প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের অভাব নেই। আক্রমণভাগে রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাহিম দিয়াজের মতো খেলোয়াড় আছেন। গোলবারে ইয়াসিন বোনোর অভিজ্ঞতাও দলের বড় সম্পদ। পেনাল্টি ঠেকানোর ক্ষেত্রে তার বিশেষ দক্ষতা ইতোমধ্যে তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
তবে ২০৩০ সালের হিসাব করতে গিয়ে বয়সের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বোনোর বর্তমান বয়স ৩৫। চার বছর পরও তিনি একই মানের পারফরম্যান্স দিতে পারবেন কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
অর্থাৎ মরক্কোকে বর্তমান দলটির মূল কাঠামো ধরে রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রজন্ম তৈরি করতে হবে। বর্তমান তারকা ও উদীয়মান খেলোয়াড়দের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করাই হতে পারে তাদের সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি।

বিশ্বকাপের ফাইনাল কোথায়?
২০৩০ বিশ্বকাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ফাইনাল কোথায় অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়ে স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। স্পেন নিজেদের দীর্ঘ ক্রীড়া ঐতিহ্য ও অবকাঠামোকে যুক্তি হিসেবে সামনে রাখছে। মরক্কো অবশ্য বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা করছে।
দেশটি প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে, যার অংশ হিসেবে এল মানসুরিয়ায় ১ লাখ ১৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার গ্র্যান্ড স্টেড হাসান দ্বিতীয় নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
ফাইনাল আয়োজনের সুযোগ শুধু মর্যাদার বিষয় নয়। বিপুলসংখ্যক দর্শকের আগমন, পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির মাধ্যমে আয়োজক দেশ উল্লেখযোগ্য সুবিধা পেতে পারে। আর মরক্কো যদি ফাইনালে পৌঁছায়, নিজেদের দেশে সেই ম্যাচ খেলার সম্ভাব্য সুবিধা হবে আরও বড়।
ছয় শহরে বিশ্বকাপের আয়োজন
মরক্কোতে বিশ্বকাপের ম্যাচ হওয়ার কথা রয়েছে ছয়টি বড় শহরে—কাসাব্লাঙ্কা, রাবাত, তাঞ্জিয়ার, মারাকেশ, আগাদির ও ফেজ। এর ফলে বিশ্বকাপের আবহ শুধু রাজধানী বা একটি নির্দিষ্ট শহরে সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে ফুটবলের উৎসব।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্টেডিয়াম বা দর্শকই মরক্কোর সাফল্য নিশ্চিত করবে না। বড় ম্যাচের চাপ সামলানো, খেলোয়াড়দের ফিট রাখা, অভিজ্ঞদের সঙ্গে নতুনদের সমন্বয় এবং সাম্প্রতিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই হবে আসল পরীক্ষা।
মরক্কো ইতোমধ্যে দেখিয়েছে, তারা বিশ্বকাপে চমক দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ২০২২ সালে সেমিফাইনাল এবং ২০২৬ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা প্রমাণ করেছে, তাদের সাফল্য কোনো একবারের বিস্ময় নয়।
এবার নিজেদের মাটিতে তাদের সামনে আরও বড় সম্ভাবনা। আফ্রিকার কোনো দল এখনো বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেনি। ২০৩০ সালে মরক্কো যদি সেই সীমা অতিক্রম করতে পারে, তাহলে সেটি শুধু একটি জাতীয় দলের সাফল্য হবে না—আফ্রিকান ফুটবলের ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় তৈরি হবে।
অ্যালান স্পেন্সারের বিশ্লেষণের মূল প্রশ্ন তাই শেষ পর্যন্ত এক জায়গাতেই এসে দাঁড়ায়: নিজেদের দর্শকদের সামনে মরক্কো কি আগের দুই বিশ্বকাপের সাফল্যকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছাতে পারবে?
সম্ভাবনাটি এখন আর কল্পনা নয়। তবে সেই সম্ভাবনাকে ইতিহাসে পরিণত করতে হলে মরক্কোকে ঘরের মাঠের সুবিধার পাশাপাশি ঘরের মাঠের চাপও সামলাতে হবে।
অ্যালান স্পেন্সার 


















