মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ও ঘোষণাগুলো সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশের আগেই অর্থের বিনিময়ে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালের নতুন একটি তথ্যসেবা ঘিরে এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক, রাজনৈতিক সমালোচনা এবং আইনি লড়াই শুরু হয়েছে।
গত ১ আগস্ট চালু হওয়া ‘ট্রুথ এপিআই’ নামের এই সেবার মাধ্যমে অর্থ পরিশোধকারী গ্রাহকেরা জনপ্রিয় কিছু অ্যাকাউন্টের পোস্ট সাধারণ ব্যবহারকারীদের চেয়ে আগেই দেখতে পারবেন। এর মধ্যে ট্রাম্পের অ্যাকাউন্টও রয়েছে। ট্রুথ সোশ্যাল-এ ট্রাম্পের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ।
এই আগাম তথ্য পাওয়ার জন্য গ্রাহকদের মাসে সর্বোচ্চ ১ লাখ ডলার পর্যন্ত দিতে হতে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান তথ্য প্রকাশে সামান্য দেরির কারণেও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে, তাদের লক্ষ্য করেই এই সেবা তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপ বা টিএমটিজি।
টিএমটিজির দাবি, এই বাণিজ্যিক তথ্যসেবা গ্রাহকদের কাছে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট মিলিসেকেন্ডের মধ্যে পৌঁছে দেবে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, ট্রুথ সোশ্যালের পোস্ট ইতিমধ্যেই বাজারে প্রভাব ফেলে। তাই দ্রুততম সময়ে এসব পোস্ট সরবরাহের মাধ্যমে নিজস্ব সম্পদকে অর্থে রূপান্তর করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
কিন্তু এই ব্যবস্থাকে ঘিরে শুরু হয়েছে বড় ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জ। গত ১২ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে দুটি গণমাধ্যম ও সংবাদস্বাধীনতা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ, প্রেসিডেন্টের সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অর্থের বিনিময়ে ধনী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে আগেভাগে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
:max_bytes(150000):strip_icc()/GettyImages-2215972994-4ed8b111b01e40c2ae09e879f6177a65.jpg)
মামলাকারীদের দাবি, এতে অর্থ দিয়ে সেবা নিতে না পারা গণমাধ্যম, সাধারণ বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ জনগণ তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলকভাবে পিছিয়ে পড়বে।
মামলায় বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্টের জনসাধারণের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত, কেবল অর্থ দিতে সক্ষম একটি ছোট গোষ্ঠীর জন্য নয়। মামলাকারীদের আইনজীবী ব্রেন্ডান বালু অভিযোগ করেছেন, এ ধরনের ব্যবস্থা গণতন্ত্রের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের সরকারি দায়িত্ব থেকে ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
মামলায় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আসামি করা হয়েছে। কারণ, একটি প্রত্যাহারযোগ্য ট্রাস্টের মাধ্যমে তিনি টিএমটিজির সবচেয়ে বড় অংশীদার। তবে টিএমটিজি প্রতিষ্ঠান হিসেবে মামলার আসামি নয়। ট্রাম্পের পাশাপাশি হোয়াইট হাউসের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নামও মামলায় রয়েছে।
মামলাকারীদের মূল দাবি, অর্থের বিনিময়ে আগাম তথ্য দেওয়ার এই সেবা যতদিন চালু থাকবে, ততদিন হোয়াইট হাউস যেন সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা কেবল ট্রুথ সোশ্যালের মাধ্যমে প্রকাশ না করে।
এর পেছনে তাদের যুক্তিও রয়েছে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল-এ প্রায় ৯ হাজার থেকে ১১ হাজার পোস্ট ও পুনঃপ্রকাশ করেছেন। অনেক সময় এসব পোস্টের সঙ্গে সঙ্গে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে আলাদা কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ফলে কিছু ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টই সরকারি তথ্য পাওয়ার একমাত্র তাৎক্ষণিক পথ হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি দায়িত্ব পালনরত একজন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের আগাম প্রবেশাধিকার কি ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সুবিধা হিসেবে বিক্রি করা যায়?
বিতর্কটি শুধু গণমাধ্যম বা রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আর্থিক বাজারের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির আইনপ্রণেতারা এরই মধ্যে সেবাটি নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর অ্যাডাম শিফ এবং ম্যাসাচুসেটসের সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন গত ২৮ জুলাই মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাছে তদন্তের আহ্বান জানান। তাদের উদ্বেগ, ট্রাম্পের নীতি বা বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে এমন বক্তব্য সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছানোর আগেই বড় বিনিয়োগকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো জানতে পারলে তা অভ্যন্তরীণ লেনদেন বা বাজার কারসাজির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
দুই সিনেটরের মতে, প্রেসিডেন্টের মতামত বা নীতিগত অবস্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য সাধারণ জনগণ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছে যে গতিতে পৌঁছাবে, অর্থ দিয়ে সেবা নেওয়া ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিষ্ঠান ও ধনী বিনিয়োগকারীরা তার চেয়ে দ্রুত তা জানতে পারবেন। এতে পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসেও তদন্ত শুরু হয়েছে। মেরিল্যান্ডের প্রতিনিধি জেমি রাসকিন ৩০ জুলাই হাউস জুডিশিয়ারি কমিটির সংখ্যালঘু সদস্যদের পক্ষ থেকে তদন্ত শুরুর কথা জানান। তিনি ট্রাম্প মিডিয়ার কাছে সেবাটির বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ, গ্রাহকদের পরিচয়, মূল্য নির্ধারণ, বিপণন উপকরণ, অভ্যন্তরীণ যোগ্যতার নীতি এবং সম্ভাব্য আয়সংক্রান্ত তথ্য চেয়েছেন।
৬ আগস্ট অনুষ্ঠিত একটি শুনানিতেও বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ওই শুনানিতে সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন বিনিয়োগ ও আর্থিক বাজারের চার বিশেষজ্ঞকে প্রশ্ন করেন, প্রেসিডেন্টের বক্তব্য দ্রুত পাওয়ার সুযোগ অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করা বাজারের স্বচ্ছতার জন্য ভালো কি না। চার বিশেষজ্ঞের কেউই এটিকে বাজারের স্বচ্ছতার জন্য ভালো বলে মনে করেননি।

এরই মধ্যে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর সরকারি দায়িত্বের মধ্যে সীমারেখা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ট্রাম্পের সর্বশেষ আর্থিক বিবরণী, যা ৩০ জুন প্রকাশ করা হয়, অনুযায়ী ২০২৫ সালে তিনি ২২০ কোটি ডলার আয় করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ১৪০ কোটি ডলার এসেছে তাঁর পরিবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংক্রান্ত ব্যবসা থেকে।
ট্রুথ সোশ্যালকে ঘিরে মামলার কেন্দ্রীয় প্রশ্নও তাই শুধু প্রযুক্তি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবসা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রেসিডেন্টের সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় তৈরি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থেকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হতে পারেন কি না।
মামলাকারীদের মতে, সরকারি তথ্য সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত থাকা উচিত। বিশেষ করে কোনো তথ্য যদি আর্থিক বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে, তাহলে সেটি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগে অর্থের বিনিময়ে নির্বাচিত কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিলে গণতন্ত্র এবং বাজারব্যবস্থার ওপর আস্থা দুর্বল হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিক কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে ট্রুথ এপিআই এখন শুধু একটি বাণিজ্যিক তথ্যসেবা নয়। এটি প্রেসিডেন্টের সরকারি যোগাযোগ, ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থ, গণমাধ্যমের সমান প্রবেশাধিকার এবং পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে একই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। মামলাটির পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ এবং সম্ভাব্য সরকারি তদন্ত তাই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও আর্থিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















