রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রের সীমা আরও বিস্তৃত হচ্ছে। দুই দেশই এখন এমন সব স্থাপনা ও অবকাঠামোতে হামলা চালাচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। এরই একটি বড় উদাহরণ রাশিয়ার সবচেয়ে বড় অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ওয়াইল্ডবেরিজ।
১৮ জুলাই থেকে ইউক্রেন ওয়াইল্ডবেরিজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত ২০টি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেন এসব স্থাপনাকে ‘লজিস্টিক কেন্দ্র’ হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেছে, এগুলো রাশিয়ার সামরিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। তবে মস্কো এবং ওয়াইল্ডবেরিজ—দুই পক্ষই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
‘রাশিয়ার অ্যামাজন’ হিসেবে পরিচিত ওয়াইল্ডবেরিজ দেশটির ভোক্তা অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। রাশিয়াজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির কয়েক ডজন গুদাম রয়েছে। ঘরোয়া পণ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের পণ্য বিক্রির পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষের বিক্রেতাদের জন্যও প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে ওয়াইল্ডবেরিজ। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব আর্থিক শাখা, ডব্লিউবি ব্যাংকও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক চার্লস হেকারের মতে, ওয়াইল্ডবেরিজে হামলা রাশিয়ার সাধারণ ভোক্তাদের ওপরও প্রভাব ফেলছে। তাঁর ভাষায়, ‘ওয়াইল্ডবেরিজে হামলা রুশ ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ফেলে।’ যুদ্ধের প্রভাব সাধারণ রুশ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে কতটা ঢুকে পড়ছে, সেটি বোঝার ক্ষেত্রে এই হামলাগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জুলাইয়ে রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনে ৪৩৭ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যা ২০২২ সালের পর এক মাসে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে ইউক্রেনও ড্রোন হামলার মাধ্যমে রাশিয়ার অবকাঠামো ও সরবরাহ নেটওয়ার্ককে লক্ষ্য করছে। ফলে দুই দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যুদ্ধের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
ওয়াইল্ডবেরিজের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অর্থনৈতিক গুরুত্বও সামনে এসেছে। এটি শুধু একটি অনলাইন কেনাকাটার মাধ্যম নয়; রাশিয়ার অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের সঙ্গেও এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
মে মাসে ওয়াইল্ডবেরিজ রাশিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক ভিটিবির সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব ঘোষণা করে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপীয় কমিশন রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজে ডব্লিউবি ব্যাংককে অন্তর্ভুক্ত করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিলের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটি এমন একটি অর্থনৈতিক খাতে যুক্ত, যা রুশ সরকারের জন্য উল্লেখযোগ্য রাজস্বের উৎস।
ওয়াইল্ডবেরিজ প্রতিষ্ঠা করেন তাতিয়ানা কিম, যিনি আগে তাতিয়ানা বাকালচুক নামে পরিচিত ছিলেন। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি চালুর সময় তিনি ছিলেন ২৮ বছর বয়সী সাবেক ইংরেজি শিক্ষিকা এবং মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলেন। পরে তাঁর তৎকালীন স্বামী ভ্লাদিস্লাভ বাকালচুকও ব্যবসায় যুক্ত হন।
সময়ের সঙ্গে ওয়াইল্ডবেরিজ দ্রুত বড় হতে থাকে এবং কিমের সম্পদও বাড়ে। ফোর্বসের হিসাবে, তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। তিনি রাশিয়ার সবচেয়ে ধনী নারী হিসেবে পরিচিত।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা-বিষয়ক সহযোগী ফেলো চার্লস হেকার বলেন, ওয়াইল্ডবেরিজ ছোট পরিসর থেকে বেড়ে রাশিয়ার দুটি প্রধান অনলাইন বাজারের একটি হয়ে উঠেছে। অন্য বড় প্রতিষ্ঠানটি হলো ওজোন।
ইউক্রেনের দাবি, ওয়াইল্ডবেরিজ রাশিয়ার সামরিক সরবরাহব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হেকারের মতে, ইউক্রেনের পক্ষ থেকে ওয়াইল্ডবেরিজকে লক্ষ্য করার সরকারি ব্যাখ্যা হলো—প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট সামরিক উপকরণ সরবরাহের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে কিয়েভ মনে করে।
তবে রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ওয়াইল্ডবেরিজের প্রতিষ্ঠাতা তাতিয়ানা কিমও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
৩১ জুলাই টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক ভিডিওতে কিম বলেন, ওয়াইল্ডবেরিজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ইউক্রেনের ড্রোন হামলা বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’। ওয়াইল্ডবেরিজে এমন দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য বিক্রি হয়—যেগুলো বেসামরিক ও সামরিক উভয় কাজে ব্যবহার করা সম্ভব—এমন অভিযোগের জবাবে কিম বলেন, এসব পণ্য বিশ্বের বড় অনলাইন বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম যেমন অ্যামাজন বা আলিবাবাতেও পাওয়া যায়।
হামলায় কিছু বিক্রেতার পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ওয়াইল্ডবেরিজ তাদের আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের মতে, ইউক্রেনের এই হামলা ওয়াইল্ডবেরিজ প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল ছোট ও মাঝারি রুশ ব্যবসাগুলোর জন্য যুদ্ধের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে বিশেষ করে শহরাঞ্চলের যেসব রুশ ভোক্তা ওয়াইল্ডবেরিজের সেবা ব্যবহার করেন, তাদের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
এ পরিস্থিতি ২০২২ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দেওয়া আশ্বাসের সঙ্গে বড় ধরনের বৈপরীত্য তৈরি করেছে। পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন অভিযান শুরুর সময় পুতিন বলেছিলেন, যুদ্ধ রাশিয়ার মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলবে না।
কিন্তু এখন সেই দাবি ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। হেকারের মতে, ওয়াইল্ডবেরিজে হামলা সরাসরি রুশ ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাশিয়াজুড়ে মূল্যস্ফীতি এবং বিভিন্ন সময়ে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ বা ব্যাহত হওয়ার ঘটনা।
ফলে যুদ্ধ আর শুধু সীমান্ত, সামরিক ঘাঁটি কিংবা দূরের যুদ্ধক্ষেত্রের বিষয় হয়ে নেই। অনলাইন কেনাকাটা, পণ্য সরবরাহ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের মতো সাধারণ জীবনের অংশেও এর প্রভাব পৌঁছে যাচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই দুই দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন যুদ্ধের বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















