কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছিল মার্কিন ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ফাইজার। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলবার্ট বুরলা সেই সময় টিকা তৈরির নেতৃত্ব দিয়ে ফাইজারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও টিকা নিয়ে জনপরিসরেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হয়ে ওঠেন। তবে কোভিডের পরের সময়টি ফাইজারের ব্যবসার জন্য এতটা সহজ ছিল না।
মহামারির সময়ের বিপুল সাফল্যের পর ফাইজারকে এখন নতুন প্রবৃদ্ধির পথ খুঁজতে হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ করে ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন ওষুধের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন কমানোর ওষুধের বাজারেও প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পাল্লা দিতে চাইছে ফাইজার।
টাইমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বুরলা বলেন, কোভিড-পরবর্তী সময়ে ফাইজারের ব্যবসায় বড় ধরনের পতন তাকে মানসিকভাবে প্রভাবিত করেছিল। তার ভাষায়, তিনি সবসময়ই বড় অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেন। তাই কোনো একটি ক্ষেত্রে শীর্ষ অবস্থান থেকে নিচের দিকে নেমে যাওয়া তার জন্য সহজ ছিল না। বিশেষ করে শেয়ারবাজারের মূল্যায়নের দিক থেকে ফাইজারের অবস্থানের অবনতি তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
বুরলা বলেন, শুধু তিনি নন, পুরো প্রতিষ্ঠানই এই পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল। এরপর তার প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় নতুন পথ খুঁজে বের করা এবং সেই লক্ষ্যে পুরো সংগঠনকে একত্র করা।
তিনি কর্মীদের বোঝানোর চেষ্টা করেন, কোভিডের সময় যখন প্রায় কেউই মনে করেনি যে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব, তখন ফাইজারের কর্মীরাই এমন কিছু করেছিলেন যা অনেকের কাছে অসম্ভব মনে হয়েছিল। এবার সেই একই ধরনের সাফল্য ক্যানসারের চিকিৎসায় দেখানোর লক্ষ্য নিয়েছেন তারা।
স্থূলতার ওষুধে নতুন কৌশল
স্থূলতা বা ওজন কমানোর চিকিৎসার বাজারে ফাইজার এখনো কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ইনজেকশনের জনপ্রিয়তার বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠেছে।
তবে বুরলার দাবি, ফাইজার এমন একটি স্থূলতার চিকিৎসা বাজারে আনতে চায়, যা সপ্তাহে একবার নয়, মাসে মাত্র একবার নিতে হবে। তার মতে, এই ব্যবধানই ফাইজারের ওষুধকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় আলাদা করে তুলতে পারে।
স্থূলতা নিয়ন্ত্রণের ওষুধের বাজার গত কয়েক বছরে দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। ফলে এই বাজারে ফাইজারের জন্য দ্রুত কার্যকর অবস্থান তৈরি করা এখন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলোর একটি।
রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়রের সঙ্গে সম্পর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়রের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন বুরলা। টিকা নিয়ে দুজনের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে বুরলার মতে, যেসব বিষয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য তুলনামূলক কম, সেসব ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। কোনো ইতিবাচক উদ্যোগে যৌথভাবে কাজ করা গেলে পারস্পরিক আস্থা তৈরি হতে পারে এবং পরে মতপার্থক্যের বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা করা সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।
ফাইজার ও মার্কিন স্বাস্থ্যব্যবস্থার সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওষুধ অনুমোদন, নিরাপত্তা এবং চিকিৎসা গবেষণার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থার সঙ্গে ওষুধ কোম্পানিগুলোর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ প্রয়োজন হয়।
চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্র কি চীনকে বাদ দিয়ে ওষুধের সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে—এমন প্রশ্নেরও মুখোমুখি হন বুরলা।
তিনি বলেন, ওষুধের ক্ষেত্রে চীনের সরবরাহব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভালো বিষয় নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রে আবার ব্যাপকভাবে ওষুধ উৎপাদন ফিরিয়ে আনা সম্ভব কি না, সে প্রশ্নে তিনি বলেন, এটি সম্ভব। কিন্তু এজন্য বাজারে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও নীতিগত প্রণোদনা দিতে হবে।

বুরলার মতে, অতীতে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হওয়া অনেক ওষুধের উৎপাদন দেশের বাইরে চলে যাওয়ার পেছনে অর্থনৈতিক কারণ ছিল। তাই উৎপাদন দেশে ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যথেষ্ট হবে না; প্রয়োজন হবে উপযুক্ত বাজারভিত্তিক প্রণোদনাও।
দ্রুত ওষুধ বাজারে আনার ওপর জোর
ফাইজারে এখন দ্রুততার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে দ্রুত কাজ করতে গিয়ে ওষুধের গবেষণা, পরীক্ষা বা নিরাপত্তার কোনো ধাপ বাদ দেওয়া যাবে না বলে স্পষ্ট করেছেন বুরলা।
তার মতে, দ্রুত কাজ করা এবং কোনো নিয়ম বা নিরাপত্তার ধাপ এড়িয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। ফাইজারের লক্ষ্য হচ্ছে প্রয়োজনীয় সব ধাপ ঠিক রেখে কাজের গতি বাড়ানো।
তিনি বলেন, ক্যানসারে আক্রান্ত একজন রোগীর কাছে একটি কার্যকর ওষুধ কিছুটা আগেই পৌঁছে দেওয়া তার জীবনে বিশাল পার্থক্য তৈরি করতে পারে। সেই ওষুধ যদি একজন বাবাকে সন্তানের বিয়ে দেখার সুযোগ দেয় কিংবা কোনো মাকে সন্তানের স্নাতক হওয়ার অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ করে দেয়, তাহলে সময়ের মূল্য অসীম।
এই কারণেই ফাইজারের ভেতরে একটি কথা গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়—সময়ই জীবন।
কোভিড-১৯-এর সময় অভূতপূর্ব সাফল্যের পর ফাইজার এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন ওষুধ, স্থূলতার চিকিৎসায় নতুন ধরনের ওষুধ এবং ওষুধ উৎপাদনের সরবরাহব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আবারও বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করতে চায়। আর সেই লক্ষ্য পূরণে ফাইজারের নেতৃত্বের মূল বার্তা হলো—নিরাপত্তার সঙ্গে আপস না করে আরও দ্রুত এগিয়ে যাওয়া।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















