০৯:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৯/১১-এর পরই শুরু হয়েছিল সেই উপন্যাসের গল্প

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনগুলোর একটি। সেই দিনটি শুধু নিউইয়র্কের আকাশে ধোঁয়া আর ধ্বংসের ছবি তৈরি করেনি, বদলে দিয়েছিল অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, চিন্তা ও ভবিষ্যৎও। লেখক ক্লেয়ার মেসুদের জীবনেও দিনটি এমন এক পরিবর্তনের মুহূর্ত হয়ে এসেছিল, যার প্রভাব পরে তাঁর লেখালেখিতেও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

সেপ্টেম্বরের সেই সকালে মেসুদ ছিলেন ম্যাসাচুসেটসের নর্থহ্যাম্পটনে। তখন তিনি অ্যামহার্স্ট কলেজে ভিজিটিং রাইটার হিসেবে দ্বিতীয় বছর শুরু করেছেন। তাঁদের প্রথম সন্তান লিভিয়ার বয়স তখন মাত্র সাত সপ্তাহ। ছোট্ট শিশুকে ঘিরে নতুন বাবা-মায়ের জীবন তখনও পুরোপুরি নতুন ছন্দ খুঁজে নেয়নি।

১১ সেপ্টেম্বর ছিল মঙ্গলবার। সেদিন মেসুদের কোনো ক্লাস ছিল না। সকালে তাঁদের প্রথমবারের মতো একজন শিশুসেবিকা আসার কথা ছিল। তিনি সারা দিন পরিবারের সঙ্গে থাকবেন এবং মেসুদ, তাঁর স্বামী জেমস ও তাঁদের ছোট মেয়েকে চিনে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

সেই সকালে মেসুদ তাঁর স্বামীর আগেই ঘুম থেকে ওঠেন। তবে সেটি খুব ভোরও ছিল না। আগের রাতে শিশুর কারণে তাঁদের ঘুম বারবার ভেঙেছিল। ঘুম থেকে উঠে তিনি রান্নাঘরে যান এবং কফি বানাতে শুরু করেন।

কফি তৈরি করার সময় তিনি রেডিও চালু করেন। তিনি শুনছিলেন এনপিআর। স্থানীয় রেডিও স্টেশনটি প্রায়ই জাতীয় অনুষ্ঠান প্রচারের পরিবর্তে সংগীত সম্প্রচার করত, কারণ সেটি ছিল তুলনামূলকভাবে কম খরচের। তবে সকাল ৯টায় তারা পাঁচ মিনিটের জাতীয় সংবাদ প্রচার করত।

সেই সংবাদেই জানানো হয়, একটি ‘হালকা বিমান’ নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত করেছে। ঘটনাটি অপ্রত্যাশিত ছিল, কারণ সেদিন আকাশ ছিল পরিষ্কার এবং দৃশ্যমানতাও ছিল খুব ভালো। তখনও কেউ জানত না, আসলে কী ঘটেছে।

কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়।

খবর প্রচারের মাঝেই দ্বিতীয় বিমানটি দক্ষিণ টাওয়ারে আঘাত করে। পাঁচ মিনিটের জন্য নির্ধারিত সংবাদ সম্প্রচার আর পাঁচ মিনিটে শেষ হয়নি। সময় বাড়তে থাকে, সংবাদ চলতে থাকে, আর মেসুদের সামনে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে যে এটি কোনো সাধারণ বিমান দুর্ঘটনা নয়।

সেদিনের সেই মুহূর্তে একটি নতুন মা হিসেবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং বিশ্বের ইতিহাস যেন একই বিন্দুতে এসে মিলেছিল। সাত সপ্তাহের শিশুকে নিয়ে যে পরিবারটি স্বাভাবিক একটি দিন শুরু করেছিল, তাদের সামনে হঠাৎ খুলে যায় অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে ভরা এক নতুন বাস্তবতা।

পরে সেই সময়ের স্মৃতি তাঁর লেখালেখির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়। ৯/১১-এর পরের দিনগুলোতেই তিনি এমন একটি উপন্যাসের কাজ শুরু করেন, যার কেন্দ্রে ছিল হামলার আগের পৃথিবী—একটি হারিয়ে যাওয়া সময়, যে সময়কে পরে ফিরে তাকিয়ে আর আগের মতো মনে হয় না।

সেই ‘আগের সময়’-এর স্মৃতি তাই তাঁর কাছে কেবল ইতিহাসের কোনো নির্দিষ্ট অধ্যায় নয়। এটি ব্যক্তিগত জীবনেরও একটি সীমারেখা—একদিকে সন্তান জন্মের পর নতুন পরিবার, অন্যদিকে এমন একটি পৃথিবী, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চিরতরে বদলে যাচ্ছিল।

৯/১১-এর মতো একটি ঐতিহাসিক ঘটনা কীভাবে একজন মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি, পরিবার, মাতৃত্ব এবং সৃষ্টিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—মেসুদের অভিজ্ঞতা তারই এক গভীর উদাহরণ। একটি সাধারণ মঙ্গলবারের সকাল, এক কাপ কফি, রেডিওতে কয়েক মিনিটের সংবাদ এবং মাত্র সাত সপ্তাহ বয়সী একটি শিশু—এই ছোট ছোট ব্যক্তিগত মুহূর্তের মধ্যেই ধরা পড়ে ইতিহাসের এক বিশাল পরিবর্তনের মানবিক চিত্র।

জনপ্রিয় সংবাদ

৯/১১-এর পরই শুরু হয়েছিল সেই উপন্যাসের গল্প

০৮:৩১:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনগুলোর একটি। সেই দিনটি শুধু নিউইয়র্কের আকাশে ধোঁয়া আর ধ্বংসের ছবি তৈরি করেনি, বদলে দিয়েছিল অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, চিন্তা ও ভবিষ্যৎও। লেখক ক্লেয়ার মেসুদের জীবনেও দিনটি এমন এক পরিবর্তনের মুহূর্ত হয়ে এসেছিল, যার প্রভাব পরে তাঁর লেখালেখিতেও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

সেপ্টেম্বরের সেই সকালে মেসুদ ছিলেন ম্যাসাচুসেটসের নর্থহ্যাম্পটনে। তখন তিনি অ্যামহার্স্ট কলেজে ভিজিটিং রাইটার হিসেবে দ্বিতীয় বছর শুরু করেছেন। তাঁদের প্রথম সন্তান লিভিয়ার বয়স তখন মাত্র সাত সপ্তাহ। ছোট্ট শিশুকে ঘিরে নতুন বাবা-মায়ের জীবন তখনও পুরোপুরি নতুন ছন্দ খুঁজে নেয়নি।

১১ সেপ্টেম্বর ছিল মঙ্গলবার। সেদিন মেসুদের কোনো ক্লাস ছিল না। সকালে তাঁদের প্রথমবারের মতো একজন শিশুসেবিকা আসার কথা ছিল। তিনি সারা দিন পরিবারের সঙ্গে থাকবেন এবং মেসুদ, তাঁর স্বামী জেমস ও তাঁদের ছোট মেয়েকে চিনে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

সেই সকালে মেসুদ তাঁর স্বামীর আগেই ঘুম থেকে ওঠেন। তবে সেটি খুব ভোরও ছিল না। আগের রাতে শিশুর কারণে তাঁদের ঘুম বারবার ভেঙেছিল। ঘুম থেকে উঠে তিনি রান্নাঘরে যান এবং কফি বানাতে শুরু করেন।

কফি তৈরি করার সময় তিনি রেডিও চালু করেন। তিনি শুনছিলেন এনপিআর। স্থানীয় রেডিও স্টেশনটি প্রায়ই জাতীয় অনুষ্ঠান প্রচারের পরিবর্তে সংগীত সম্প্রচার করত, কারণ সেটি ছিল তুলনামূলকভাবে কম খরচের। তবে সকাল ৯টায় তারা পাঁচ মিনিটের জাতীয় সংবাদ প্রচার করত।

সেই সংবাদেই জানানো হয়, একটি ‘হালকা বিমান’ নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত করেছে। ঘটনাটি অপ্রত্যাশিত ছিল, কারণ সেদিন আকাশ ছিল পরিষ্কার এবং দৃশ্যমানতাও ছিল খুব ভালো। তখনও কেউ জানত না, আসলে কী ঘটেছে।

কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়।

খবর প্রচারের মাঝেই দ্বিতীয় বিমানটি দক্ষিণ টাওয়ারে আঘাত করে। পাঁচ মিনিটের জন্য নির্ধারিত সংবাদ সম্প্রচার আর পাঁচ মিনিটে শেষ হয়নি। সময় বাড়তে থাকে, সংবাদ চলতে থাকে, আর মেসুদের সামনে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে যে এটি কোনো সাধারণ বিমান দুর্ঘটনা নয়।

সেদিনের সেই মুহূর্তে একটি নতুন মা হিসেবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং বিশ্বের ইতিহাস যেন একই বিন্দুতে এসে মিলেছিল। সাত সপ্তাহের শিশুকে নিয়ে যে পরিবারটি স্বাভাবিক একটি দিন শুরু করেছিল, তাদের সামনে হঠাৎ খুলে যায় অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে ভরা এক নতুন বাস্তবতা।

পরে সেই সময়ের স্মৃতি তাঁর লেখালেখির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়। ৯/১১-এর পরের দিনগুলোতেই তিনি এমন একটি উপন্যাসের কাজ শুরু করেন, যার কেন্দ্রে ছিল হামলার আগের পৃথিবী—একটি হারিয়ে যাওয়া সময়, যে সময়কে পরে ফিরে তাকিয়ে আর আগের মতো মনে হয় না।

সেই ‘আগের সময়’-এর স্মৃতি তাই তাঁর কাছে কেবল ইতিহাসের কোনো নির্দিষ্ট অধ্যায় নয়। এটি ব্যক্তিগত জীবনেরও একটি সীমারেখা—একদিকে সন্তান জন্মের পর নতুন পরিবার, অন্যদিকে এমন একটি পৃথিবী, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চিরতরে বদলে যাচ্ছিল।

৯/১১-এর মতো একটি ঐতিহাসিক ঘটনা কীভাবে একজন মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি, পরিবার, মাতৃত্ব এবং সৃষ্টিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—মেসুদের অভিজ্ঞতা তারই এক গভীর উদাহরণ। একটি সাধারণ মঙ্গলবারের সকাল, এক কাপ কফি, রেডিওতে কয়েক মিনিটের সংবাদ এবং মাত্র সাত সপ্তাহ বয়সী একটি শিশু—এই ছোট ছোট ব্যক্তিগত মুহূর্তের মধ্যেই ধরা পড়ে ইতিহাসের এক বিশাল পরিবর্তনের মানবিক চিত্র।