০৯:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের একশ দিনে সাফল্য ও বিতর্ক পাশাপাশি

পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার একশ দিন পূর্ণ করেছে এবং এই সময়ে সরকার একাধিক বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা প্রশংসা ও সমালোচনা দুটোই কুড়িয়েছে। চলতি বছরের নয়ই মে পাঁচজন মন্ত্রী নিয়ে শপথ নেওয়া সরকার ইতিমধ্যে একটি প্রতিরোধমূলক আটক আইন প্রস্তাব করেছে, যা রাজ্যপালের সম্মতি পেলেও এখনো কার্যকর হয়নি। একইসঙ্গে সরকার অনগ্রসর শ্রেণির সংরক্ষণ কোটা সতেরো শতাংশ থেকে কমিয়ে সাত শতাংশে নামিয়ে এনেছে এবং একশ তেরোটি সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল।

একইসঙ্গে সরকার অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে এবং রাজ্যে আয়ুষ্মান ভারত স্বাস্থ্য প্রকল্প চালু করেছে, যা আগের তৃণমূল সরকার গ্রহণ করেনি। তৃণমূলের লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের বিকল্প হিসেবে অন্নপূর্ণা প্রকল্প চালু করা হয়েছে এবং এক লাখ শূন্যপদ পূরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে পঞ্চাশ হাজার শিক্ষা খাতে এবং বিশ হাজার পুলিশে। তবে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়সীমা পার করেও শেষ হয়নি, যা সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কল্যাণ প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের একাংশ অর্থ প্রাপ্তিতে বিলম্ব ও অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন।

সরকারের একশ দিনে বিতর্কও কম হয়নি। স্কুলের মিড-ডে মিলে ডিম বাদ দেওয়া নিয়ে বিতর্কের জেরে বীরভূমে চারজন বিজেপি নেতা ভূমি সংস্কার কর্মকর্তার দিকে ডিম ছোড়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে দলীয় নেতাদের বিতর্কিত মন্তব্যও তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যেই রাজ্যের তদন্ত সংস্থা সিআইডি তৃণমূল সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জির ব্যক্তিগত সহকারী সুমিত রায়কে শালবনি জমি কেলেঙ্কারি মামলায় আটক করেছে, সুপ্রিম কোর্ট তার আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করার পরপরই। এর আগে শীর্ষ আদালত তার গ্রেপ্তারে স্থগিতাদেশ দিয়ে তদন্তে সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছিল, তবে বারবার তলবের পরও তিনি হাজির না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এই আটকের ঘটনা ঘটে। প্রস্তাবিত প্রতিরোধমূলক আটক আইনের ব্যাপক সংজ্ঞা যেকোনো ব্যক্তিকে ইচ্ছেমতো গুন্ডা আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে সমালোচনা করেছে বামপন্থী সিপিআইএম।

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার এই পালাবদল এবং তার পরবর্তী নীতিগত পরিবর্তনগুলো বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতিবেশী রাজ্যে সংখ্যালঘু নীতি ও সীমান্ত সংক্রান্ত অবস্থানের পরিবর্তন সরাসরি দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে। ওবিসি তালিকা থেকে মুসলিম সম্প্রদায় বাদ পড়ার প্রবণতা বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য একটি বিষয়, কারণ এটি রাজ্যের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

একশ দিনের এই মূল্যায়ন দেখায় যে নতুন সরকার দ্রুত নীতিগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হলেও, প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ উভয় ক্ষেত্রেই বিতর্ক অব্যাহত থাকছে। আগামী দিনগুলোতে কল্যাণ প্রকল্পের প্রকৃত বাস্তবায়ন এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে এই সরকারের প্রকৃত সাফল্য। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে এই একশ দিনের কর্মকাণ্ডের প্রকৃত রাজনৈতিক মূল্যায়ন হবে। নীতি ও রাজনীতির এই টানাপোড়েন আগামী দিনে রাজ্যের শাসনব্যবস্থার গতিপথ কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়েও পর্যবেক্ষকদের আগ্রহ বাড়ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের একশ দিনে সাফল্য ও বিতর্ক পাশাপাশি

০৮:০৯:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার একশ দিন পূর্ণ করেছে এবং এই সময়ে সরকার একাধিক বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা প্রশংসা ও সমালোচনা দুটোই কুড়িয়েছে। চলতি বছরের নয়ই মে পাঁচজন মন্ত্রী নিয়ে শপথ নেওয়া সরকার ইতিমধ্যে একটি প্রতিরোধমূলক আটক আইন প্রস্তাব করেছে, যা রাজ্যপালের সম্মতি পেলেও এখনো কার্যকর হয়নি। একইসঙ্গে সরকার অনগ্রসর শ্রেণির সংরক্ষণ কোটা সতেরো শতাংশ থেকে কমিয়ে সাত শতাংশে নামিয়ে এনেছে এবং একশ তেরোটি সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল।

একইসঙ্গে সরকার অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে এবং রাজ্যে আয়ুষ্মান ভারত স্বাস্থ্য প্রকল্প চালু করেছে, যা আগের তৃণমূল সরকার গ্রহণ করেনি। তৃণমূলের লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের বিকল্প হিসেবে অন্নপূর্ণা প্রকল্প চালু করা হয়েছে এবং এক লাখ শূন্যপদ পূরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে পঞ্চাশ হাজার শিক্ষা খাতে এবং বিশ হাজার পুলিশে। তবে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়সীমা পার করেও শেষ হয়নি, যা সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কল্যাণ প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের একাংশ অর্থ প্রাপ্তিতে বিলম্ব ও অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন।

সরকারের একশ দিনে বিতর্কও কম হয়নি। স্কুলের মিড-ডে মিলে ডিম বাদ দেওয়া নিয়ে বিতর্কের জেরে বীরভূমে চারজন বিজেপি নেতা ভূমি সংস্কার কর্মকর্তার দিকে ডিম ছোড়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে দলীয় নেতাদের বিতর্কিত মন্তব্যও তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যেই রাজ্যের তদন্ত সংস্থা সিআইডি তৃণমূল সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জির ব্যক্তিগত সহকারী সুমিত রায়কে শালবনি জমি কেলেঙ্কারি মামলায় আটক করেছে, সুপ্রিম কোর্ট তার আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করার পরপরই। এর আগে শীর্ষ আদালত তার গ্রেপ্তারে স্থগিতাদেশ দিয়ে তদন্তে সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছিল, তবে বারবার তলবের পরও তিনি হাজির না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এই আটকের ঘটনা ঘটে। প্রস্তাবিত প্রতিরোধমূলক আটক আইনের ব্যাপক সংজ্ঞা যেকোনো ব্যক্তিকে ইচ্ছেমতো গুন্ডা আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে সমালোচনা করেছে বামপন্থী সিপিআইএম।

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার এই পালাবদল এবং তার পরবর্তী নীতিগত পরিবর্তনগুলো বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতিবেশী রাজ্যে সংখ্যালঘু নীতি ও সীমান্ত সংক্রান্ত অবস্থানের পরিবর্তন সরাসরি দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে। ওবিসি তালিকা থেকে মুসলিম সম্প্রদায় বাদ পড়ার প্রবণতা বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য একটি বিষয়, কারণ এটি রাজ্যের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

একশ দিনের এই মূল্যায়ন দেখায় যে নতুন সরকার দ্রুত নীতিগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হলেও, প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ উভয় ক্ষেত্রেই বিতর্ক অব্যাহত থাকছে। আগামী দিনগুলোতে কল্যাণ প্রকল্পের প্রকৃত বাস্তবায়ন এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে এই সরকারের প্রকৃত সাফল্য। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে এই একশ দিনের কর্মকাণ্ডের প্রকৃত রাজনৈতিক মূল্যায়ন হবে। নীতি ও রাজনীতির এই টানাপোড়েন আগামী দিনে রাজ্যের শাসনব্যবস্থার গতিপথ কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়েও পর্যবেক্ষকদের আগ্রহ বাড়ছে।