০৯:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুদ্ধের ছায়ায় রাশিয়া, ভোটের আগে বাড়ছে মানুষের উদ্বেগ

রাশিয়ায় সংসদীয় নির্বাচনের আগে যুদ্ধ নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। আগামী ১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর দেশটিতে সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর এটিই হবে রাশিয়ার প্রথম সংসদীয় নির্বাচন।

রুশ কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে দাবি করে আসছে যে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া এগিয়ে রয়েছে। তবে প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা সংঘাতের প্রভাব এখন দেশটির সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইউক্রেনের ড্রোন হামলা রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে পৌঁছে যাওয়ায় যুদ্ধের আতঙ্কও অনেকের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।

মস্কোর বাসিন্দা ইউরি আগস্টে নিজের নতুন বহুতল ভবনের জানালায় বিস্ফোরণ প্রতিরোধী স্বচ্ছ ফিল্ম লাগিয়েছেন। এর আগে একটি ড্রোন বিস্ফোরণে তার এক বন্ধুর অ্যাপার্টমেন্টের জানালার কাচ ভেঙে ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। এতে কয়েকজন সামান্য আহত হন।

পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই জানালায় এই সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান ইউরি। তার ভাষায়, বর্তমান সময় তাদের জন্য বেশ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

গ্রীষ্মজুড়ে ইউক্রেন রাশিয়ার গভীরে নিয়মিতভাবে শত শত ড্রোন পাঠিয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল তেল শোধনাগার, সরবরাহ ও রসদ সংরক্ষণাগার এবং সামরিক স্থাপনা। ইউক্রেনের উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়িয়ে মস্কোকে যুদ্ধ থামিয়ে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা।

তবে এর বিপরীতে রাশিয়াও কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা আরও জোরদার করেছে। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যেই এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে যুদ্ধ আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় জরিপ সংস্থা নিয়মিত জনমত জরিপ চালাচ্ছে। এসব জরিপে মানুষের উদ্বেগের মাত্রা বেশ উঁচুতে থাকার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। যুদ্ধের প্রভাব এবং নতুন করে সেনা নিয়োগের আশঙ্কায় কিছু রুশ নাগরিক সাময়িকভাবে দেশ ছেড়েছেন বলেও জানা গেছে।

যুদ্ধের প্রভাব থেকে ঘরবাড়ি রক্ষার চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ড্রোন হামলার ক্ষয়ক্ষতি অন্তর্ভুক্ত করে এমন বাড়ির বীমা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে বীমার খরচও বাড়ছে।

রাশিয়ার সোলারটেক নামের একটি প্রতিষ্ঠান বিস্ফোরণের সময় জানালার কাচের টুকরো ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে বিশেষ ধরনের আঠালো সুরক্ষা ফিল্ম তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক পাভেল লেভিত জানান, চলতি বছর তাদের পণ্যের চাহিদা ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

সেন্ট পিটার্সবার্গের কারখানায় দাঁড়িয়ে লেভিত জানান, ব্যক্তিগত বাড়ির মালিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন কোম্পানি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান—সব ধরনের ক্রেতাই এখন এই সুরক্ষা ফিল্ম কিনছে। চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে রাশিয়ার বাজারে এই পণ্যের ঘাটতিও দেখা দিয়েছে।

রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় দেশই বেসামরিক মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করে। তবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার সময় এবং হামলার ফলে আবাসিক ভবন, দোকানপাট ও পরিবহন অবকাঠামো প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের বড় অংশই ইউক্রেনের নাগরিক। তবে চলতি বছর রাশিয়াতেও বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।The Roots of Russian Conduct

নতুন করে সেনা সমাবেশের আশঙ্কা

ইউক্রেনের দীর্ঘপাল্লার ড্রোন হামলার প্রতিক্রিয়ায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অভিযোগ করেছেন, কিয়েভ রাশিয়ার জনগণের মধ্যে ভয় সৃষ্টি এবং সংসদীয় নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। পুতিন বলেছেন, এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে।

তবে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় জনমত জরিপ সংস্থার তথ্য বলছে, গ্রীষ্মজুড়ে ড্রোন হামলার সতর্কতা এবং ইউক্রেনীয় হামলার কারণে বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি সংকট মানুষের মনোবলে চাপ তৈরি করেছে।

এপ্রিলের শেষ দিক থেকে প্রায় প্রতিটি সাপ্তাহিক জরিপেই অর্ধেকের বেশি মানুষ তাদের পরিচিত মহলের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে ‘উদ্বিগ্ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কেবল একটি সপ্তাহের জরিপে এর ব্যতিক্রম দেখা গেছে।

মানুষের উদ্বেগের এই সূচক ২০২২ সালের শেষ দিকে সামরিক সমাবেশের পর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ওই সময় লাখ লাখের কাছাকাছি সামরিক বয়সী রুশ পুরুষের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

এ বছরও নতুন করে সেনা সমাবেশের ঘোষণা আসতে পারে—এমন জল্পনা রাশিয়ায় অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে সংসদীয় নির্বাচনের পর যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি পূরণে নতুন করে সেনা নেওয়া হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।

যদিও পুতিনসহ রুশ কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন, রাশিয়ার হাতে প্রয়োজনীয় জনবল রয়েছে এবং নতুন করে বড় ধরনের সেনা সমাবেশের প্রয়োজন নেই।

তারপরও অনেকে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। মস্কোর একটি ট্রাক মেরামত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২৬ বছর বয়সী প্রকৌশলী ইভান এবং ৩৪ বছর বয়সী নির্মাণ ব্যবস্থাপক রোমান তাদের পরিবার নিয়ে রাশিয়া ছেড়ে গেছেন। তাদের ভাষ্য, নতুন করে সেনা নিয়োগ শুরু হওয়ার আশঙ্কাই তাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। পরিচয় সুরক্ষার জন্য তারা শুধু প্রথম নাম প্রকাশ করেছেন।

যুদ্ধের আতঙ্কে বাড়ছে বীমার চাহিদা

নতুন করে সেনা সমাবেশের আশঙ্কায় ঠিক কত মানুষ রাশিয়া ছেড়েছেন, তার কোনো সরকারি হিসাব নেই। তবে যুদ্ধের ঝুঁকি থেকে নিজেদের সম্পদ ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার চাহিদা যে বাড়ছে, তার বেশ কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

ড্রোন হামলাসহ ইউক্রেনীয় হামলার ক্ষয়ক্ষতি কাভার করে এমন বীমার বিষয়ে গত এক বছরে মানুষের আগ্রহ ব্যাপকভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বীমা ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান সোয়ুজের প্রধান ওলেগ খানিন।

তার মতে, একসময় এই ধরনের বীমার প্রায় কোনো চাহিদাই ছিল না। এখন রাশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গ্রাহকেরা ফোন ও ই-মেইলের মাধ্যমে এ ধরনের বীমা সম্পর্কে জানতে চাইছেন।

রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বাড়িঘরের সম্পত্তি বীমার প্রিমিয়াম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেড়েছে। রাশিয়ার সর্ব-রুশ বীমা সমিতি আগস্টে জানিয়েছে, ড্রোন হামলা বেড়ে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত ঝুঁকি এই ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

খানিনের আশঙ্কা, বীমার চাহিদা এভাবে বাড়তে থাকলে প্রিমিয়াম আরও বেড়ে যেতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে কিছু ক্ষেত্রে যুদ্ধজনিত হামলার বিরুদ্ধে বীমা পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

রাশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থা অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় প্রেসিডেন্ট পুতিনের সমর্থনপুষ্ট ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির সংসদে আধিপত্য ধরে রাখার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা না থাকলেও ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং ভোটের ফলাফল ক্রেমলিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কারণ যুদ্ধ নিয়ে মানুষের উদ্বেগ, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ক্লান্তি এবং দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধের প্রভাব সম্পর্কে ভোটারদের মনোভাব নির্বাচনের মাধ্যমে কিছুটা হলেও বোঝা যাবে।

ড্রোন হামলার কারণে যখন রাশিয়ার শহরগুলোতে জানালায় বিস্ফোরণ প্রতিরোধী ফিল্ম লাগানোর চাহিদা বাড়ছে, বাড়ির বীমার খরচ বাড়ছে এবং নতুন করে সেনা সমাবেশের আশঙ্কায় কেউ কেউ পরিবার নিয়ে দেশ ছাড়ছেন, তখন সেপ্টেম্বরের নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়—রুশ সমাজে যুদ্ধের প্রভাব কতটা গভীর হয়েছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হয়ে উঠতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

যুদ্ধের ছায়ায় রাশিয়া, ভোটের আগে বাড়ছে মানুষের উদ্বেগ

০৮:০৫:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাশিয়ায় সংসদীয় নির্বাচনের আগে যুদ্ধ নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। আগামী ১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর দেশটিতে সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর এটিই হবে রাশিয়ার প্রথম সংসদীয় নির্বাচন।

রুশ কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে দাবি করে আসছে যে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া এগিয়ে রয়েছে। তবে প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা সংঘাতের প্রভাব এখন দেশটির সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইউক্রেনের ড্রোন হামলা রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে পৌঁছে যাওয়ায় যুদ্ধের আতঙ্কও অনেকের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।

মস্কোর বাসিন্দা ইউরি আগস্টে নিজের নতুন বহুতল ভবনের জানালায় বিস্ফোরণ প্রতিরোধী স্বচ্ছ ফিল্ম লাগিয়েছেন। এর আগে একটি ড্রোন বিস্ফোরণে তার এক বন্ধুর অ্যাপার্টমেন্টের জানালার কাচ ভেঙে ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। এতে কয়েকজন সামান্য আহত হন।

পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই জানালায় এই সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান ইউরি। তার ভাষায়, বর্তমান সময় তাদের জন্য বেশ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

গ্রীষ্মজুড়ে ইউক্রেন রাশিয়ার গভীরে নিয়মিতভাবে শত শত ড্রোন পাঠিয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল তেল শোধনাগার, সরবরাহ ও রসদ সংরক্ষণাগার এবং সামরিক স্থাপনা। ইউক্রেনের উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়িয়ে মস্কোকে যুদ্ধ থামিয়ে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা।

তবে এর বিপরীতে রাশিয়াও কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা আরও জোরদার করেছে। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যেই এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে যুদ্ধ আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় জরিপ সংস্থা নিয়মিত জনমত জরিপ চালাচ্ছে। এসব জরিপে মানুষের উদ্বেগের মাত্রা বেশ উঁচুতে থাকার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। যুদ্ধের প্রভাব এবং নতুন করে সেনা নিয়োগের আশঙ্কায় কিছু রুশ নাগরিক সাময়িকভাবে দেশ ছেড়েছেন বলেও জানা গেছে।

যুদ্ধের প্রভাব থেকে ঘরবাড়ি রক্ষার চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ড্রোন হামলার ক্ষয়ক্ষতি অন্তর্ভুক্ত করে এমন বাড়ির বীমা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে বীমার খরচও বাড়ছে।

রাশিয়ার সোলারটেক নামের একটি প্রতিষ্ঠান বিস্ফোরণের সময় জানালার কাচের টুকরো ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে বিশেষ ধরনের আঠালো সুরক্ষা ফিল্ম তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক পাভেল লেভিত জানান, চলতি বছর তাদের পণ্যের চাহিদা ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

সেন্ট পিটার্সবার্গের কারখানায় দাঁড়িয়ে লেভিত জানান, ব্যক্তিগত বাড়ির মালিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন কোম্পানি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান—সব ধরনের ক্রেতাই এখন এই সুরক্ষা ফিল্ম কিনছে। চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে রাশিয়ার বাজারে এই পণ্যের ঘাটতিও দেখা দিয়েছে।

রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় দেশই বেসামরিক মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করে। তবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার সময় এবং হামলার ফলে আবাসিক ভবন, দোকানপাট ও পরিবহন অবকাঠামো প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের বড় অংশই ইউক্রেনের নাগরিক। তবে চলতি বছর রাশিয়াতেও বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।The Roots of Russian Conduct

নতুন করে সেনা সমাবেশের আশঙ্কা

ইউক্রেনের দীর্ঘপাল্লার ড্রোন হামলার প্রতিক্রিয়ায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অভিযোগ করেছেন, কিয়েভ রাশিয়ার জনগণের মধ্যে ভয় সৃষ্টি এবং সংসদীয় নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। পুতিন বলেছেন, এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে।

তবে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় জনমত জরিপ সংস্থার তথ্য বলছে, গ্রীষ্মজুড়ে ড্রোন হামলার সতর্কতা এবং ইউক্রেনীয় হামলার কারণে বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি সংকট মানুষের মনোবলে চাপ তৈরি করেছে।

এপ্রিলের শেষ দিক থেকে প্রায় প্রতিটি সাপ্তাহিক জরিপেই অর্ধেকের বেশি মানুষ তাদের পরিচিত মহলের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে ‘উদ্বিগ্ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কেবল একটি সপ্তাহের জরিপে এর ব্যতিক্রম দেখা গেছে।

মানুষের উদ্বেগের এই সূচক ২০২২ সালের শেষ দিকে সামরিক সমাবেশের পর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ওই সময় লাখ লাখের কাছাকাছি সামরিক বয়সী রুশ পুরুষের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

এ বছরও নতুন করে সেনা সমাবেশের ঘোষণা আসতে পারে—এমন জল্পনা রাশিয়ায় অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে সংসদীয় নির্বাচনের পর যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি পূরণে নতুন করে সেনা নেওয়া হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।

যদিও পুতিনসহ রুশ কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন, রাশিয়ার হাতে প্রয়োজনীয় জনবল রয়েছে এবং নতুন করে বড় ধরনের সেনা সমাবেশের প্রয়োজন নেই।

তারপরও অনেকে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। মস্কোর একটি ট্রাক মেরামত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২৬ বছর বয়সী প্রকৌশলী ইভান এবং ৩৪ বছর বয়সী নির্মাণ ব্যবস্থাপক রোমান তাদের পরিবার নিয়ে রাশিয়া ছেড়ে গেছেন। তাদের ভাষ্য, নতুন করে সেনা নিয়োগ শুরু হওয়ার আশঙ্কাই তাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। পরিচয় সুরক্ষার জন্য তারা শুধু প্রথম নাম প্রকাশ করেছেন।

যুদ্ধের আতঙ্কে বাড়ছে বীমার চাহিদা

নতুন করে সেনা সমাবেশের আশঙ্কায় ঠিক কত মানুষ রাশিয়া ছেড়েছেন, তার কোনো সরকারি হিসাব নেই। তবে যুদ্ধের ঝুঁকি থেকে নিজেদের সম্পদ ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার চাহিদা যে বাড়ছে, তার বেশ কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

ড্রোন হামলাসহ ইউক্রেনীয় হামলার ক্ষয়ক্ষতি কাভার করে এমন বীমার বিষয়ে গত এক বছরে মানুষের আগ্রহ ব্যাপকভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বীমা ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান সোয়ুজের প্রধান ওলেগ খানিন।

তার মতে, একসময় এই ধরনের বীমার প্রায় কোনো চাহিদাই ছিল না। এখন রাশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গ্রাহকেরা ফোন ও ই-মেইলের মাধ্যমে এ ধরনের বীমা সম্পর্কে জানতে চাইছেন।

রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বাড়িঘরের সম্পত্তি বীমার প্রিমিয়াম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেড়েছে। রাশিয়ার সর্ব-রুশ বীমা সমিতি আগস্টে জানিয়েছে, ড্রোন হামলা বেড়ে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত ঝুঁকি এই ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

খানিনের আশঙ্কা, বীমার চাহিদা এভাবে বাড়তে থাকলে প্রিমিয়াম আরও বেড়ে যেতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে কিছু ক্ষেত্রে যুদ্ধজনিত হামলার বিরুদ্ধে বীমা পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

রাশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থা অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় প্রেসিডেন্ট পুতিনের সমর্থনপুষ্ট ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির সংসদে আধিপত্য ধরে রাখার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা না থাকলেও ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং ভোটের ফলাফল ক্রেমলিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কারণ যুদ্ধ নিয়ে মানুষের উদ্বেগ, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ক্লান্তি এবং দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধের প্রভাব সম্পর্কে ভোটারদের মনোভাব নির্বাচনের মাধ্যমে কিছুটা হলেও বোঝা যাবে।

ড্রোন হামলার কারণে যখন রাশিয়ার শহরগুলোতে জানালায় বিস্ফোরণ প্রতিরোধী ফিল্ম লাগানোর চাহিদা বাড়ছে, বাড়ির বীমার খরচ বাড়ছে এবং নতুন করে সেনা সমাবেশের আশঙ্কায় কেউ কেউ পরিবার নিয়ে দেশ ছাড়ছেন, তখন সেপ্টেম্বরের নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়—রুশ সমাজে যুদ্ধের প্রভাব কতটা গভীর হয়েছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হয়ে উঠতে পারে।