বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা মোকাবিলায় কিছুটা অগ্রগতির খবর পাওয়া গেলেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। জাতিসংঘের ২০২৬ সালের ‘বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বিশ্বের প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মধ্যে দিন কাটিয়েছে। তবে আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ কমেছে। গত এক দশকের মধ্যে এই প্রথম আফ্রিকাতেও ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা কমেছে।
তবে সামগ্রিক অগ্রগতির মধ্যেও অঞ্চলভেদে বড় ধরনের বৈষম্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকাগুলোতে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার হার এখনো বেশি। একই সঙ্গে নারীরা এই সংকটের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। ফলে বিশ্বে ক্ষুধা নির্মূলের লক্ষ্যে সরকার ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
গ্রামীণ এলাকায় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান উপায় হলো বিদ্যমান কৃষিজমিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। তবে এই উৎপাদন বাড়াতে হবে পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই কৃষিপদ্ধতি অনুসরণ করে। বিশ্বের জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যের চাহিদাও বাড়ছে। এই বাড়তি চাহিদা পূরণে নির্বিচারে নতুন কৃষিজমি তৈরি করা হলে বন উজাড়, মাটির অবক্ষয় এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির মতো সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে।
তাই নতুন জমি দখল করে কৃষি সম্প্রসারণের পরিবর্তে বর্তমানে যে কৃষিজমি রয়েছে, সেখানেই বেশি উৎপাদনের ব্যবস্থা করা জরুরি। আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব কৃষিপদ্ধতি, উন্নত বীজ, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও জ্ঞান দেওয়ার মাধ্যমে একই জমি থেকে বেশি খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হতে পারে।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীতে বিনিয়োগের অর্থ শুধু কৃষিতে অর্থ ব্যয় করা নয়। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য যাতে ন্যায্য দামে বাজারে পৌঁছাতে পারে, সে জন্য সড়ক, সংরক্ষণাগার, বাজারব্যবস্থা ও পরিবহন অবকাঠামো উন্নত করাও গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদনের পর বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হয়ে গেলে কৃষি উৎপাদন বাড়িয়েও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র কৃষকদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিশ্বের বহু গ্রামীণ পরিবার ছোট আকারের কৃষিজমির ওপর নির্ভরশীল। তাদের কাছে উন্নত প্রযুক্তি, ঋণ, কৃষি উপকরণ ও বাজারের সুযোগ সীমিত থাকলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো কঠিন হয়। সরকারি সহায়তা ও উন্নয়নমূলক বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব বাধা কমানো গেলে একই সঙ্গে কৃষকের আয় এবং স্থানীয় খাদ্য সরবরাহ—দুটিই বাড়তে পারে।
নারীদের অংশগ্রহণও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও অনেক ক্ষেত্রে জমির মালিকানা, ঋণ, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের সুযোগে তারা পিছিয়ে থাকেন। নারীদের এসব সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে কৃষি উৎপাদন ও পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা—উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ক্ষুধার সংখ্যা কমার যে অগ্রগতি উঠে এসেছে, তা আশাব্যঞ্জক। কিন্তু এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে শুধু সামগ্রিক বৈশ্বিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে হবে না; কোন জনগোষ্ঠী এখনো খাদ্যসংকটে রয়েছে, কোথায় সংকট বেশি এবং কেন তারা পিছিয়ে আছে—এসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে।
বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে খাদ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান, আয় ও স্থানীয় অর্থনীতি একসঙ্গে শক্তিশালী হতে পারে। পরিবেশ রক্ষা করে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং নারী ও ক্ষুদ্র কৃষকদের আরও বেশি সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে ক্ষুধা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।
বিশ্বে ক্ষুধা পুরোপুরি নির্মূল করা সহজ নয়। তবে গ্রামীণ মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো, বিদ্যমান কৃষিজমির টেকসই ব্যবহার এবং কৃষিভিত্তিক অবকাঠামোয় ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















