জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (আফডি) বড় জয় পাওয়ার পর দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। এই নির্বাচনী ফলাফল জার্মানির চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ও নীতিতেও কিছুটা পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে আফডি ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে দলটি যে ভোট পেয়েছিল, এবারের ফলাফল তার দ্বিগুণেরও বেশি। এমন বড় জয় জার্মানির রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে এবং চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্জের নেতৃত্বাধীন সরকার ও তাঁর দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) ওপর আরও চাপ বাড়িয়েছে।
বিশেষ করে স্যাক্সনি-আনহাল্টে আফডির উত্থান জার্মানির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অঙ্গরাজ্যটিতে ২০০২ সাল থেকে জোট সরকারে নেতৃত্ব দিয়ে আসা সিডিইউ এবার বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। আগের নির্বাচনে দলটির ভোট ছিল ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ। এবার তা নেমে এসেছে মাত্র ১৭ দশমিক ২ শতাংশে।
এই ফলাফল শুধু একটি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী ফল হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, পূর্ব জার্মানির রাজ্যগুলোতে আফডির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে অর্থনীতি, অভিবাসন, নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারকে আরও বাস্তববাদী অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
চীনের সঙ্গে জার্মানির সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। জার্মানির অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে চীনের বাজার ও বাণিজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ রাখা হবে এবং একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও কৌশলগত ঝুঁকি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে—এটি বার্লিনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আফডির নির্বাচনী সাফল্য এমন সময়ে এসেছে, যখন জার্মানির নতুন সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একদিকে অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও কৌশলগত উদ্বেগের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আফডির শক্তি বাড়লে জার্মানির রাজনৈতিক বিতর্কে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বাস্তববাদী বা অর্থনৈতিক দিকটি আরও গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে জার্মান শিল্প ও ব্যবসায়িক স্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে চীনের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ ধরে রাখার বিষয়ে চাপ বাড়তে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে আফডির নির্বাচনী সাফল্যের কারণে জার্মানির চীননীতি রাতারাতি বদলে যাবে। দেশটির পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে কেন্দ্রীয় সরকার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং জার্মানির অর্থনৈতিক স্বার্থ—সবকিছুরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
চীন ও জার্মানির সম্পর্ক ইতোমধ্যেই নতুন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্জ দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার করার অঙ্গীকার করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে জার্মানির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ভবিষ্যতে বার্লিনের বেইজিং নীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।
স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে আফডির ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পাওয়া অবশ্যই দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক সাফল্য। একই সঙ্গে সিডিইউর ভোট ১৭ দশমিক ২ শতাংশে নেমে যাওয়া মের্জ সরকারের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। আগামী দিনে জার্মানির কেন্দ্রীয় সরকারকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামলে অর্থনৈতিক স্বার্থ, ইউরোপীয় অবস্থান এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয়কে কীভাবে একসঙ্গে পরিচালনা করা যায়, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















