থাইল্যান্ডের জ্বালানি ব্যবস্থার পুরোনো দুর্বলতা আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে বাস্তবতা সামনে এসেছে, তা হলো—দেশটির অর্থনীতি এখনো আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। কয়েক দশক ধরে এই নির্ভরতা শুধু ব্যয়ের চাপ তৈরি করেনি, জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকেও বহির্বিশ্বের অস্থিরতার কাছে ঝুঁকিপূর্ণ করে রেখেছে।
এখন তাই জ্বালানি রূপান্তরকে কেবল পরিবেশ রক্ষার কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ শিল্প প্রতিযোগিতার প্রশ্ন। সংকট সাময়িকভাবে সামাল দেওয়ার পাশাপাশি থাইল্যান্ডকে এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে নির্ভরযোগ্য, নমনীয় এবং সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী।
পরিষ্কার জ্বালানির পথে গতি আছে, কিন্তু যথেষ্ট নয়
থাইল্যান্ডের শিল্প খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ইতিমধ্যে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। শিল্প খাতের বিদ্যুৎ চাহিদা আগামী বছরগুলোতে দ্রুত বাড়বে বলেও বিভিন্ন গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু সেই বাড়তি চাহিদা মেটাতে শুধু উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ালেই হবে না; সঞ্চালন অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সঞ্চয় এবং গ্রিড ব্যবস্থাপনাকেও একই গতিতে আধুনিক করতে হবে।
থাইল্যান্ডের শিল্প অর্থনীতিতে সবুজ জ্বালানির ব্যবহার এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। একটি গবেষণায় দেশটির শিল্প ও উৎপাদন খাতের ৯৬ শতাংশ কোম্পানিকে জরিপ করে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এখনো ২৫ শতাংশের কম সবুজ জ্বালানি ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠান ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের সবুজ জ্বালানির ব্যবহার ৫০ শতাংশের ওপরে নেওয়ার পরিকল্পনা জানিয়েছে। অর্থাৎ চাহিদা তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সরবরাহ ও অবকাঠামো সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে না পারলে প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
এই ব্যবধান থাইল্যান্ডের জন্য অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করছে। বিশ্বজুড়ে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যখন কম কার্বন নির্গমনসম্পন্ন সরবরাহব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে, তখন নির্ভরযোগ্য সবুজ বিদ্যুতের ঘাটতি থাইল্যান্ডকে আঞ্চলিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পিছিয়ে দিতে পারে।
জ্বালানি রূপান্তর মানে মানুষের জীবিকার কথাও ভাবা
তবে জ্বালানি পরিবর্তনের আলোচনায় শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন, কার্বন নিঃসরণ কিংবা প্রযুক্তির হিসাব যথেষ্ট নয়। এই পরিবর্তনের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়-রোজগার জড়িত।
প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বর্তমানে রেয়ংয়ের পূর্বাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক করিডরে এক লাখের বেশি কর্মসংস্থানকে সমর্থন করে। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সেখানে কর্মরত মানুষের ভবিষ্যৎও পরিকল্পনার অংশ হতে হবে।
একটি ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরের অর্থ হলো পুরোনো কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নতুন সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করা। এর জন্য প্রয়োজন স্থানীয় পর্যায়ে নিয়োগের সুযোগ, নতুন দক্ষতার প্রশিক্ষণ এবং ছোট ব্যবসার জন্য সহায়তা। পরিবর্তন যদি মানুষের জীবিকা নিরাপদ না করে, তাহলে তা সামাজিকভাবে টেকসই হবে না।
নতুন বিদ্যুৎ বাজার ছাড়া রূপান্তর অসম্পূর্ণ
থাইল্যান্ডের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—বিদ্যুৎ বাজারের কাঠামো কত দ্রুত পরিবর্তন করা যায়।
বর্তমান ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় একক ক্রেতা মডেলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে এবং তা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজারে প্রবেশ করে। অতীতে এই কাঠামো বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত বিস্তার, নতুন প্রযুক্তি এবং ভোক্তাদের পরিবর্তিত চাহিদার যুগে এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হচ্ছে।
সরকার ইতিমধ্যে সরাসরি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে বেসরকারি উৎপাদকরা বিদ্যমান সঞ্চালন লাইন ব্যবহার করে সরাসরি বিদ্যুৎ ক্রেতাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তৃতীয় পক্ষের প্রবেশাধিকার ব্যবস্থাও ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ বাজারকে আরও উন্মুক্ত করার পথ তৈরি করতে পারে। তবে বর্তমানে এই ব্যবস্থা সীমিত পরিসরে রয়েছে।
এখন প্রয়োজন এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগকে বৃহত্তর বাজার সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখা। বিদ্যুৎ উৎপাদন যত বেশি বিকেন্দ্রীভূত হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ যত বাড়বে, ততই নমনীয় বাজার কাঠামোর প্রয়োজন হবে।
গ্রিড ও সঞ্চয় ব্যবস্থায় বিনিয়োগ জরুরি
সূর্য ও বাতাসের মতো নবায়নযোগ্য উৎসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এগুলোর উৎপাদন সব সময় একই রকম থাকে না। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে উৎপাদনের ওঠানামা সামাল দিয়েও সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বজায় থাকে।
এ ক্ষেত্রে ব্যাটারি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ সঞ্চয় ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন জরুরি। শিল্পাঞ্চল, তথ্যকেন্দ্র এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে থাকলে বর্তমান অবকাঠামো দিয়ে ভবিষ্যতের প্রয়োজন মেটানো কঠিন হবে।
তাই পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রিড, সঞ্চয় এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগকে একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। নইলে নতুন উৎপাদন ক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা থেকে যেতে পারে।
শিল্প খাতের চাপও বাড়ছে
বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তন থাইল্যান্ডের শিল্প খাতকেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন সীমান্ত সমন্বয় ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি উৎপাদনকারীদের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে। অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা এখন তাদের সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও কম কার্বন নির্গমনসম্পন্ন উৎপাদন প্রত্যাশা করছে।
ফলে নির্ভরযোগ্য নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে প্রবেশাধিকার আর কেবল করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়। এটি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতার শর্তে পরিণত হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় বিদ্যুৎ বাজারকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করা, বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো এবং উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি বিদ্যুৎ লেনদেনের পথ সহজ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সংস্কার এমন হতে হবে, যাতে অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়।
একটি সমন্বিত সংস্কার কাঠামো দরকার
থাইল্যান্ডের বিদ্যুৎ খাতের সংস্কারকে শুধু একটি বাজার সংস্কার হিসেবে দেখা ভুল হবে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে বিদ্যুতের উৎপাদন, বিতরণ, সঞ্চালন, ডিজিটাল প্রযুক্তি, কার্বন নিঃসরণ কমানো, বিকেন্দ্রীভূত উৎপাদন এবং বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর মতো একাধিক বিষয়।
সরকারের ২০২৬-২০৫০ সালের বিদ্যুৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা এই পরিবর্তনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা ৫০ শতাংশের ওপরে নেওয়া এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন ও তথ্যকেন্দ্রের বাড়তি চাহিদা সামলানোর প্রস্তুতি সেই পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হয়েছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো পরিকল্পনাকে বাস্তব সংস্কারে রূপ দেওয়া।
এর জন্য নীতিতে ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দিতে হবে, বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের পথে অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ কমাতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই
পরিষ্কার জ্বালানিতে রূপান্তর থাইল্যান্ডের জন্য আর দূরবর্তী কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নয়। শিল্প খাতের পরিবর্তিত চাহিদা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন নিয়ম এবং জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি—সবকিছু মিলিয়ে এই পরিবর্তন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
প্রশ্ন হলো, থাইল্যান্ড সেই পরিবর্তনকে পরিকল্পিতভাবে নেতৃত্ব দেবে, নাকি বৈশ্বিক পরিস্থিতির চাপে ধীরে ধীরে পিছিয়ে থেকে প্রতিক্রিয়া জানাবে।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি নতুন সংকট যদি থাইল্যান্ডের জ্বালানি আমদানির দুর্বলতা আবারও সামনে আনে, তাহলে সমস্যার সমাধান শুধু জরুরি মজুত বা স্বল্পমেয়াদি মূল্য নিয়ন্ত্রণে খোঁজা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, যা দেশীয় পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে দ্রুত গ্রহণ করতে পারে, শিল্পের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে পারে এবং মানুষের বিদ্যুৎ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখে।
শেষ পর্যন্ত এটি পরিবেশ বনাম অর্থনীতির কোনো দ্বন্দ্ব নয়। থাইল্যান্ডের জন্য পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ জ্বালানি ব্যবস্থাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে পুরোনো নিয়ম ও বাজার কাঠামোকে সাহসের সঙ্গে পুনর্বিবেচনা করার সময় এখনই।
পাসিনী রের্কপিবুন 


















