১১ বছর আগে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মেয়েকে মৃত ধরে নিয়েই জীবন কাটাচ্ছিলেন বাবা। কিন্তু একদিন হঠাৎ তাঁর কাছে আসে একটি ফোন। ওপাশের কণ্ঠ শুনে তাঁর বিশ্বাস হয়, ফোনটি তাঁর সেই নিখোঁজ মেয়ের কাছ থেকেই এসেছে। এরপরই শুরু হয় একের পর এক রহস্য, সন্দেহ আর চমকে ভরা এক দৌড়।
নতুন ধারাবাহিক ‘লাস্ট সিন’ ঠিক এমনই এক শক্তিশালী গল্প নিয়ে হাজির হয়েছে। শুরু থেকেই গল্পটি দর্শককে টেনে রাখে। পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান শভোখের পরিচালনায় তৈরি এই ধারাবাহিকের গতি এতটাই টানটান যে, কয়েকটি পর্ব দেখার পর পর্দা থেকে চোখ সরানো কঠিন।
মেয়ের নিখোঁজ হওয়া বদলে দিয়েছে বাবার জীবন
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ইয়ান। একসময় পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন তিনি। এখন অস্ট্রেলিয়ার জরুরি ফোনসেবায় কাজ করেন। তাঁর মেয়ে ম্যাগি ১১ বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে কোনো সন্ধান না পাওয়ায় তাকে মৃত বলেই ধরে নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু মেয়েকে হারানোর সেই ক্ষত ইয়ানের জীবনে এখনো শুকায়নি। ছয় মাস ধরে মদ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছেন তিনি। সাবেক স্ত্রীর সঙ্গেও তাঁর বিচ্ছেদ হয়েছে। একা একা খাবার খান, সামনে পড়ে থাকে খোলা হয়নি এমন এক বোতল মদ। যেন প্রতিদিন নিজেকেই বোঝান—ইচ্ছে করলেও তিনি আবার সেই জীবনে ফিরবেন না।

মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার জন্য নিজের ওপরও গভীর দায় চাপিয়ে রেখেছেন ইয়ান। অতীত থেকে বেরিয়ে আসতে না পারা এই মানুষটির জীবনই হঠাৎ আবার ওলটপালট হয়ে যায়।
জঙ্গলে শিশুর দেহাবশেষ
গল্পের বড় মোড় আসে ইয়ানের বসবাসের কাছাকাছি ভিক্টোরিয়ার একটি বনাঞ্চলে ছোট একটি শিশুর দেহাবশেষ পাওয়ার পর। স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ হয়, এটি হয়তো ম্যাগির দেহাবশেষ।
ইয়ান দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান। এরপর তিনি নিজেই তদন্তের মধ্যে ঢুকে পড়েন। কিন্তু খুব দ্রুতই পরিষ্কার হয়ে যায়, বিষয়টি যতটা সহজ বলে মনে হচ্ছে, আসলে ততটা নয়।
এরপর গল্পে যুক্ত হয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা—সেই রহস্যময় ফোনকল। ইয়ান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, ওপাশে তাঁর মেয়েই ছিল।
কে ফোন করেছিল? ম্যাগি কি সত্যিই বেঁচে আছে? নাকি ইয়ানের শোক, অপরাধবোধ ও মরিয়া আশা তাঁকে ভুল কিছু বিশ্বাস করাচ্ছে? ধারাবাহিকটি ধীরে ধীরে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে থাকে।
রহস্যের সঙ্গে বাড়ে মানসিক চাপ
‘লাস্ট সিন’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু এর রহস্য নয়, চরিত্রগুলোর ভেতরের টানাপোড়েনও। ইয়ানকে একজন অসাধারণ নায়ক হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং তিনি এমন একজন সাধারণ মানুষ, যিনি ভয়াবহ এক ঘটনার পর সম্পূর্ণ বদলে গেছেন।
মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আশায় তিনি কখনো আবেগপ্রবণ, কখনো মরিয়া, আবার কখনো নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েন। তবু দর্শকের সহানুভূতি তাঁর দিকেই থাকে। কারণ তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে বহু বছরের শোক ও অপরাধবোধ।
ইয়ান চরিত্রে প্যাট্রিক ব্রামালওয়েল অভিনয় করেছেন অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। তাঁর অভিনয়ে একজন ভেঙে পড়া বাবার রাগ, হতাশা, অপরাধবোধ এবং শেষ আশাটুকু একসঙ্গে ফুটে উঠেছে।

আরও রহস্যময় চরিত্র
গল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন স্থানীয় বাসিন্দা হ্যারি। তিনি ইয়ানের বন্ধু ডোনাল্ডের ভাই। হ্যারি ও তাঁর স্ত্রী জেনার কিছু অস্বাভাবিক ও বিতর্কিত মতাদর্শ রয়েছে। ধারাবাহিক এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের ঘিরেও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়।
হ্যারি চরিত্রে ব্রেন্ডন কাউয়েলের অভিনয় বিশেষভাবে নজর কাড়ে। তাঁর শান্ত, ভারী উপস্থিতির মধ্যেই যেন লুকিয়ে থাকে কোনো অজানা সত্য। দর্শকের মনে বারবার প্রশ্ন জাগে—এই মানুষটি কি কিছু লুকাচ্ছেন?
জেনা চরিত্রে ম্যাক্সিন পিকও সমানভাবে শক্তিশালী। অল্প কথার মধ্য দিয়েই তিনি চরিত্রটির রহস্য ও দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তুলেছেন।
শুধু চমক নয়, আবেগও আছে
থ্রিলার ধারাবাহিকের ক্ষেত্রে একের পর এক চমক দেখানো সহজ। কিন্তু প্রতিটি চমকের সঙ্গে চরিত্রগুলোর আবেগকে যুক্ত করা অনেক কঠিন। ‘লাস্ট সিন’ এখানেই আলাদা।
গল্পে যখন কোনো নতুন তথ্য সামনে আসে, তখন শুধু রহস্যই বাড়ে না—সেই তথ্য চরিত্রগুলোর জীবনে কী প্রভাব ফেলছে, সেটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে দর্শক শুধু জানতে চান না, এরপর কী ঘটবে; একই সঙ্গে ভাবতে থাকেন, ঘটনার পরিণতিতে ইয়ান বা অন্য চরিত্রগুলোর জীবন কীভাবে বদলে যাবে।

অস্ট্রেলিয়ার আবহে আলাদা স্বাদ
অস্ট্রেলিয়ায় নির্মিত এই ধারাবাহিকের দৃশ্যায়নও বেশ আকর্ষণীয়। ভিক্টোরিয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশ, বনাঞ্চল এবং নির্জনতার ব্যবহার গল্পের রহস্যময় আবহকে আরও ঘন করেছে।
দৃশ্যের চাকচিক্যের চেয়ে এখানে পরিবেশকে গল্পের অংশ হিসেবেই ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে পুরো ধারাবাহিকজুড়ে এক ধরনের চাপা অস্বস্তি কাজ করে।
বছরের অন্যতম আলোচিত ধারাবাহিক
‘লাস্ট সিন’ শুধু নিখোঁজ একটি মেয়েকে খোঁজার গল্প নয়। এটি একজন বাবার দীর্ঘ শোক, অপরাধবোধ, আশা এবং সত্য জানার মরিয়া চেষ্টার গল্প।
গল্প যত এগোয়, রহস্য তত ঘনীভূত হয়। কিন্তু সেই রহস্য কখনো চরিত্রগুলোর আবেগকে আড়াল করে না। বরং প্রতিটি নতুন মোড় তাদের পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে।
এই কারণেই ‘লাস্ট সিন’কে বছরের উল্লেখযোগ্য ধারাবাহিকগুলোর একটি বলা যায়। টানটান রহস্য, শক্তিশালী অভিনয় এবং আবেগঘন গল্প—তিনটি দিক একসঙ্গে ধরে রাখতে পেরেছে এই ধারাবাহিক।
নিখোঁজ সন্তানকে ঘিরে রহস্য ও এক বাবার মরিয়া অনুসন্ধানের গল্প—‘লাস্ট সিন’ শুরু থেকেই দর্শককে আটকে রাখার মতো একটি থ্রিলার।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















