মধ্যপ্রাচ্যের ছয় মাসের যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা মঙ্গলবার সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের চারটি শহর ও জ্বালানি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব হামলায় নারী ও শিশুসহ ৭৩ জন আহত হয়েছেন। কয়েকটি স্থাপনায় আগুনও ছড়িয়ে পড়ে।
চার শহরে একযোগে হামলা
হুথিরা জানিয়েছে, সৌদি ভূখণ্ডের গভীরে তারা বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়েছে। খামিস মুশাইত শহরের একটি সৌদি বিমানঘাঁটি এবং কাছাকাছি আভা শহরে দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
এ ছাড়া ইয়েমেন সীমান্তবর্তী নাজরান এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী জাজানেও হামলা হয়েছে। জাজানে একটি বড় তেল শোধনাগার ও বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ হামলার পর কয়েকটি স্থানে আগুন লাগার কথা জানিয়েছে। আহতের সংখ্যা ৭৩ হওয়ায় এটিকে চলমান যুদ্ধে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের অন্যতম বড় হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন শঙ্কা
হুথিদের এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালির বাইরে সৌদি আরবের মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশের স্থাপনাগুলোও যদি যুদ্ধের আওতায় চলে আসে, তাহলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে পড়েছে। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। সংঘাতের কারণে অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানির সংকটও তীব্র হয়েছে।
সৌদি জোটের পাল্টা ব্যবস্থা
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি বলেছেন, হুথিদের মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি অভিযোগ করেছেন, ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলার মাধ্যমেই রিয়াদ সংঘাত আরও বাড়িয়েছে। এর জবাব দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।
হুথি-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম পরে জানিয়েছে, সৌদি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের রাজধানী সানার পূর্বে জুবাহ এলাকায় চারটি বিমান হামলা চালিয়েছে।
হরমুজ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা
এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতও নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ও বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। একই সময়ে ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করতে অবরোধ আরোপ করেছে ওয়াশিংটন।
ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরজুড়ে একটি নতুন ‘সমুদ্র বর্জন অঞ্চল’ তৈরির পরিকল্পনা করছে তারা। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাব দিতে ইরান তার সামরিক অবস্থান পুনর্বিন্যাস করেছে।
ইরানের হাতে এখনও এমন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে, যেগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজ এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দাম বেড়েছে। দেশটিতে ডিজেলের গড় খুচরা দাম প্রতি গ্যালন ৫ দশমিক ৯০ ডলারের বেশি হয়েছে, যা নতুন রেকর্ড।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হলে তেলের দাম দ্রুত কমে যাবে। তার প্রত্যাশা, শেষ পর্যন্ত জ্বালানির দাম প্রতি গ্যালন ২ ডলারের নিচেও নেমে আসতে পারে।
এদিকে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে গত তিন দিনের সংঘর্ষে ১৮ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা। ফলে সৌদি আরবে নতুন হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনেও সংঘাত তীব্র হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















