২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলা ছিল একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ঘটনাগুলোর একটি। হামলার পর শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতিই বদলায়নি; পরিবর্তিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার রাজনৈতিক গতিপথ, একই সঙ্গে দ্রুত উত্থান ঘটেছে চীনের। এর ধারাবাহিকতায় আজকের বিভক্ত ও সংঘাতপূর্ণ ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম হয়েছে।
সেদিনের ঘটনাকে এখন ২৫ বছর পেছন ফিরে দেখা যায়। তখন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ায় নতুন নেতৃত্বের যুগ শুরু হয়েছিল। শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি। রাশিয়া নব্বইয়ের দশকের অস্থিরতা পেরিয়ে নতুন স্থিতিশীলতার সন্ধানে ছিল। আর চীন তখনও বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্রুত উত্থানশীল শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করছিল।
৯/১১ এই তিন শক্তির পথই অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়।
নিরাপত্তাকে সবকিছুর ওপরে রাখল যুক্তরাষ্ট্র
হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে চলে আসে জাতীয় নিরাপত্তা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ওয়াশিংটন নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেটির বদলে সামরিক সক্ষমতা ও সরাসরি শক্তি প্রয়োগের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে।
২০০১ সালের শেষ দিকে তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ড অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনার উদ্যোগ নেন। উদ্দেশ্য ছিল দেশের জন্য বিস্তৃত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা। পরে আলাস্কা ও ক্যালিফোর্নিয়ায় এ ধরনের ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয় এবং ইউরোপেও তা বিস্তারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
দুর্বল অবস্থায় থাকা রাশিয়া এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। ওয়াশিংটনের সামরিক পদক্ষেপের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় মস্কোও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পুরোনো কাঠামো থেকে সরে যেতে শুরু করে। ফলে শীতল যুদ্ধের পর গড়ে ওঠা পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি আরও দুর্বল হয়।
যুদ্ধের পথ আরও গভীর করল বিভাজন
আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক সমর্থন পেয়েছিল এবং এর আইনি ভিত্তি নিয়েও তুলনামূলকভাবে কম প্রশ্ন ছিল। কিন্তু ইরাক যুদ্ধ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আক্রমণ চালায়।
এই যুদ্ধ ইউরোপের ভেতরেও গভীর রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করে। ফ্রান্স ও জার্মানির মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশ যুদ্ধের বিরোধিতা করে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও পোল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উদ্যোগে সমর্থন দেয়।
পরিণতিতে ইরাক যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি; যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্কের ভেতরেও মতপার্থক্য প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। আফগানিস্তান ও ইরাক—দুই যুদ্ধই শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় ২০০৮ সালের বুখারেস্ট সম্মেলনে জর্জিয়া ও ইউক্রেনকে ভবিষ্যতে ন্যাটোর সদস্য করার প্রতিশ্রুতি। নির্দিষ্ট সময়সূচি বা কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া দেওয়া এই প্রতিশ্রুতি রাশিয়ার উদ্বেগ বাড়ায়, কিন্তু সংশ্লিষ্ট দুই দেশকে তাৎক্ষণিক কোনো সুরক্ষা দিতে পারেনি।
পশ্চিমের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ল রাশিয়ার
ভ্লাদিমির পুতিন ২০০০ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রথম দিকে তাঁর নেতৃত্বকে স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হয়েছিল। ৯/১১-এর পর তিনিই প্রথম দিকের বিশ্বনেতাদের একজন হিসেবে জর্জ ডব্লিউ বুশকে ফোন করে সংহতি জানিয়েছিলেন।
কিন্তু সেই সহযোগিতার পরিবেশ দ্রুত বদলে যায়।
২০০৩ সালে রাশিয়ার বড় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ইউকোসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং এর মালিক মিখাইল খোদোরকভস্কিকে কারাগারে পাঠানো পুতিনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কঠোরতার ইঙ্গিত দেয়। ২০০৬ সালে লন্ডনে সাবেক রুশ গোয়েন্দা আলেক্সান্ডার লিটভিনেঙ্কোর বিষক্রিয়ায় মৃত্যু পশ্চিমের সঙ্গে মস্কোর সম্পর্ককে আরও জটিল করে।
পরের বছর মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে পুতিনের তীব্র ভাষণ পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে। তিনি পশ্চিমের দ্বৈতনীতি এবং বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমালোচনা করেন। কার্যত তখনই বোঝা যায়, শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক গভীর সংকটে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নীতি এবং রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা পুতিনের নেতৃত্বকে আরও জাতীয়তাবাদী ও কর্তৃত্ববাদী করে তোলে। একই সময়ে মস্কো ধীরে ধীরে বেইজিংয়ের কাছাকাছি যেতে থাকে।
২০০৮ সালে রাশিয়ার জর্জিয়া অভিযান এই নতুন বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। পরবর্তী সময়ে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে ওই ঘটনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়।
চীনকে বদলে দেওয়ার বদলে বিশ্বব্যবস্থাই বদলে গেল
৯/১১-পরবর্তী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটে চীনে। ২০০১ সালের ডিসেম্বরে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ধারণা ছিল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হলে চীনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধীরে ধীরে উদার পুঁজিবাদের কাছাকাছি চলে আসবে।
বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
চীন বৈশ্বিক বাজারের সুবিধা গ্রহণ করলেও রাষ্ট্রনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো ধরে রাখে। বরং রাষ্ট্রের নির্দেশনা, কৌশলগত শিল্পে সরকারি ভূমিকা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে কাজে লাগিয়ে দেশটি এমন একটি অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করে, যা পরবর্তী সময়ে ভূরাজনৈতিক শক্তির অন্যতম উৎস হয়ে ওঠে।
পশ্চিমা অর্থনীতির বহু কোম্পানি যখন নিজেদের স্বার্থে প্রতিযোগিতা করে, চীনা রাষ্ট্র তখন অর্থনৈতিক শক্তিকে জাতীয় কৌশলের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে। ফলে অর্থনীতি শুধু প্রবৃদ্ধির মাধ্যম নয়, আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ারেও পরিণত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতেও আসে পরিবর্তন
চীনের উত্থান পশ্চিমা দেশগুলোকে নিজেদের কৌশল নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র চীনকে বাইরে রেখে দুটি বড় বাণিজ্য উদ্যোগ নেয়।
ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ছাড়াই পরবর্তী সময়ে নতুন কাঠামোয় কার্যকর হয়।
এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে পশ্চিমা মডেলের দিকে নিয়ে যাওয়ার পুরোনো ধারণা আর বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না।
শি জিনপিংয়ের অধীনে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ
২০১২ সালে শি জিনপিং চীনের ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব আরও কেন্দ্রীভূত হয়। ২০১৭ সালে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন কমিউনিস্ট পার্টির সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এক বছর পর জাতীয় গণকংগ্রেস প্রেসিডেন্টের মেয়াদসীমা তুলে দেয়।
চীনের নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগও ক্রমে সীমিত হতে থাকে। ২০১৭ সালে হোয়াটসঅ্যাপ ও স্কাইপ বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সময়ে সরকারি ও সামরিক পর্যায়ে তদন্ত, অপসারণ ও শুদ্ধি অভিযানও ব্যাপক আকার নেয়।
ফলে চীন শুধু একটি অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে একই কৌশলের অধীনে পরিচালনা করা একটি ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ইউরোপের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
৯/১১-এর পর বিশ্ব চাইলে অন্য পথেও এগোতে পারত। কিন্তু প্রধান শক্তিগুলো নিরাপত্তা ও ক্ষমতাকে ক্রমশ সংকীর্ণ দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র বহুপাক্ষিক নেতৃত্ব থেকে সরে গিয়ে শক্তিনির্ভর নীতিতে ঝুঁকেছে। রাশিয়া পশ্চিমা কাঠামো থেকে দূরে সরে সংশোধনবাদী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। চীন তার রাষ্ট্রনির্ভর অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক প্রভাবের হাতিয়ারে রূপ দিয়েছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখন ইউরোপের জন্য।
দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা দেখাচ্ছে, সেই নির্ভরতা আর যথেষ্ট নয়। রাশিয়াকে মোকাবিলা করতে ইউরোপকে নিজস্ব বিশ্বাসযোগ্য সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রনির্ভর অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় নিজেদের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখার কার্যকর নীতিও প্রয়োজন।
ইউরোপ শেষ পর্যন্ত এই পথ বেছে নেবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে ৯/১১-এর ২৫ বছর পর একটি বিষয় পরিষ্কার: সেই হামলার পর যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো শুধু তৎকালীন সংকট মোকাবিলা করেনি; বরং ধীরে ধীরে এমন এক বিশ্ব তৈরি করেছে, যেখানে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে আস্থা কমেছে, নিরাপত্তা প্রতিযোগিতা বেড়েছে এবং পুরোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জায়গায় এসেছে আরও বিভক্ত ও অনিশ্চিত এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা।
জাভিয়ের সোলানা ও আনহেল সাস-কারাঞ্জা 


















