ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর প্রবাস থেকে দেশে ফিরেছেন অনেক মানুষ। কিন্তু বহুজনের সেই বহু প্রতীক্ষিত ঘরে ফেরা পরিণত হয়েছে স্বজন হারানোর গভীর শোকে। সারাক্ষণ রিপোর্ট জানায়, দূর দেশে জীবিকার জন্য থাকা মানুষগুলো এবার ফিরেছেন প্রিয়জনের মরদেহ খুঁজতে, ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে শেষ বিদায় জানাতে।
প্রবাসের স্বপ্ন ভেঙে দিল ভয়াবহ দুর্যোগ
ভেনেজুয়েলার দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকটের কারণে লাখো মানুষ দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। পরিবারের জন্য অর্থ পাঠানো, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়া এবং ভালো জীবনের আশায় তারা দূর দেশে বসবাস করছিলেন। কিন্তু উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্প অনেক পরিবারের সেই দূরত্বের সম্পর্ককে চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে।
যারা বিদেশে ছিলেন, তাদের কেউ কেউ বেঁচে গেছেন শুধু দূরে থাকার কারণে। আবার অনেকের জন্য সেই দূরত্ব হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় কষ্ট। কারণ প্রিয়জন হারানোর সময় তারা পাশে থাকতে পারেননি।
ভিডিও কলে থাকা সম্পর্ক শেষ হলো নীরবতায়
লিলিয়ানা ফিগুয়েরো নামের এক মা ব্রাজিলে থেকে মেয়েকে সহায়তা করতেন। প্রতিদিন ছবি, বার্তা আর ছোট ছোট ভিডিওর মাধ্যমে মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন তিনি। কিন্তু একদিনের পর আর কোনো উত্তর আসেনি।
ভূমিকম্পের পর মেয়ের খোঁজে বারবার বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাননি তিনি। পরে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হয় তার ১৬ বছর বয়সী মেয়ের মরদেহ।
দীর্ঘ দূরত্বের সম্পর্কগুলোতে প্রযুক্তি অনেক সময় কাছাকাছি থাকার অনুভূতি দেয়, কিন্তু প্রিয় মানুষ হারানোর পর সেই স্মৃতিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে কষ্টের।
স্বজনের খোঁজে ছয় দিনের পথ
পেরুতে কাজ করা জন জাইরো পোর্টাল পিনো খবর পেয়েছিলেন, তার ১৯ বছর বয়সী মেয়ে ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকা পড়েছে। মেয়েকে খুঁজে পেতে তিনি নিজের ফোন ও মোটরসাইকেল বিক্রি করে দেশে ফেরার অর্থ জোগাড় করেন।
দীর্ঘ ছয় দিনের যাত্রার পর তিনি রাজধানীতে পৌঁছান। এরপর এক সপ্তাহের বেশি সময় ধ্বংসস্তূপের নিচে মেয়েকে খুঁজেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরতে হয়েছে সন্তানের মরদেহ নিয়ে।
কাঙ্ক্ষিত ফেরা যখন হয়ে ওঠে শোকের যাত্রা
অনেক অভিবাসী বছরের পর বছর দেশে ফেরার স্বপ্ন দেখেছেন। কেউ মায়ের রান্না খেতে চেয়েছেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু ভূমিকম্পের পর সেই স্বপ্ন বদলে গেছে মরদেহ শনাক্ত করা, ছাই বহন করা এবং হারানোর স্মৃতি বয়ে বেড়ানোর কঠিন বাস্তবতায়।
রাফায়েল আলবার্তো গোমেজ মুনোজ কলম্বিয়া থেকে ফিরে বোনের দাহের ছাই নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন, তবে এভাবে নয়।
অপরাধবোধ আর না-পাওয়া বিদায়ের কষ্ট
এই দুর্যোগ অনেক অভিবাসীর মনে নতুন করে অপরাধবোধ তৈরি করেছে। তারা ভাবছেন, যদি আরও আগে ফিরতেন, যদি প্রিয়জনকে সঙ্গে নিতে পারতেন, তাহলে হয়তো গল্পটা অন্য রকম হতে পারত।
লিলিয়ানা ফিগুয়েরোর কাছে মেয়ের পুরোনো ছবি, পাঠানো বার্তা আর কিছু ব্যক্তিগত জিনিসই এখন শেষ স্মৃতি। তিনি জানেন, অর্থ পাঠিয়ে তিনি মেয়ের জন্য যা কিছু করেছেন, তার সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিল সন্তানের ভালো ভবিষ্যৎ।
ভূমিকম্প শুধু ভবন ধ্বংস করেনি, এটি ভেঙে দিয়েছে অসংখ্য পরিবারের আশা, অপেক্ষা এবং বহু বছরের দূরত্বে গড়ে ওঠা সম্পর্কের নিরাপত্তা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















