রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত চলা এই সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। মঙ্গলবার সকালে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে এলেও উত্তেজনা পুরোপুরি কাটেনি।
সংঘর্ষের সূত্রপাত যেভাবে
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দিনব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির “জুলাই অ্যাগেইনস্ট অপপ্রেশন” শীর্ষক একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে। প্রদর্শনীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত কয়েকজন ব্যক্তির ছবি প্রদর্শন করা হয়, যাদের মধ্যে কয়েকজনকে “বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার” হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এ নিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আপত্তি জানান। বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছবিকে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করে তারা ব্যানারটি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হয় এবং তা দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নেয়।

তিন ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় সংঘর্ষ
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে শুরু হওয়া সংঘর্ষ প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে। এ সময় উভয় পক্ষ ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ, চেয়ার ছোড়াছুড়ি এবং লাঠিসোঁটা নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
সংঘর্ষ শেষে রাত প্রায় ১২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত দুই পক্ষ আলাদা অবস্থানে অবস্থান নেয়। ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এবং ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা পার্ক মোড় এলাকার একটি মসজিদের কাছে অবস্থান করেন। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
আহতদের চিকিৎসা
সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি সোহেল রানা, বর্তমান সেক্রেটারি ইমরান খান সৌরভ, মেহেদী হাসান, বায়েজিদ শিকদার, মুরসালিন এবং ছাত্রদল নেতা আশিকসহ অন্তত ১০ জন।
আহতদের সবাইকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরে তারা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যান।
দুই পক্ষের অভিযোগ
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের দপ্তর সম্পাদক শিবলী সাদিক দাবি করেন, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের ব্যানার সরিয়ে নিতে চাপ দেন। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হলেও ছাত্রদলের পক্ষ থেকে হামলা চালানো হয়। তার ভাষ্য, পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পরও আবার লাঠি ও ইট নিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ করা হয় এবং তারা আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. ইয়ামিন বলেন, প্রদর্শনীতে জামায়াতের নেতা গোলাম আযম, আবদুল কাদের মোল্লা ও মতিউর রহমান নিজামীর ছবির পাশাপাশি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছবিও রাখা হয়েছিল। এসব ছবি সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করলে শিবিরের কর্মীরা চেয়ার ছুড়ে মারেন এবং তাদের এক কর্মী আহত হন বলে তিনি দাবি করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পদক্ষেপ
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. ফেরদৌস রহমান জানান, ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে সংঘর্ষে জড়িতদের শনাক্ত করা হবে। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলীও বলেন, ভিডিও ফুটেজ যাচাই করে দোষীদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, নিষিদ্ধ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করে থাকতে পারে এবং সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তাজহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















