প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রামক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন গবেষণা উদ্যোগ নিয়েছে সিঙ্গাপুর। পোষা প্রাণী পালনের প্রবণতা বৃদ্ধি এবং মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে যোগাযোগ বাড়তে থাকায় দেশটির জাতীয় উদ্যান কর্তৃপক্ষ ছয়টি গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়নের ঘোষণা দিয়েছে। লক্ষ্য হলো প্রাণীবাহিত রোগ কীভাবে ছড়ায়, তা আরও ভালোভাবে বোঝা এবং ভবিষ্যতের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা।
এই প্রকল্পগুলোর জন্য প্রায় দেড় কোটি সিঙ্গাপুর ডলারের জৈব নজরদারি গবেষণা কর্মসূচি থেকে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় গবেষকদের সহায়তায় প্রাণীবাহিত রোগ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বাড়ানো এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রণের কার্যকর কৌশল তৈরি করা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক চলাচলের প্রভাব
গবেষণাগুলো পরিচালনা করবেন ডিউক-এনইউএস মেডিকেল স্কুল, সিঙ্গাপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং নানইয়াং প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ এবং মানুষ, প্রাণী ও রোগবাহকের সীমান্ত অতিক্রম করে চলাচলের কারণে ভবিষ্যতে নতুন জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। গবেষণাগুলো সেই ঝুঁকি আগাম শনাক্ত করতে সহায়তা করবে।
মোট সাতটি প্রস্তাব জমা পড়লেও তার মধ্যে ছয়টি প্রকল্প নির্বাচিত হয়েছে।
রোগ ছড়ানোর পথ খুঁজবে গবেষণা
সিঙ্গাপুর বর্তমানে জলাতঙ্কের মতো বড় প্রাণীবাহিত রোগ থেকে মুক্ত হলেও দেশটি পরিযায়ী পাখি ও প্রাণিজ পণ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কেন্দ্র। পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এমন একটি অঞ্চলে অবস্থান করছে, যেখানে বিভিন্ন প্রাণীবাহিত রোগের উপস্থিতি রয়েছে।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে গবেষকেরা নতুন আণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ, প্রাণী, রোগবাহক জীব এবং পরিবেশের মধ্যে রোগ ছড়ানোর জটিল সম্পর্ক বিশ্লেষণ করবেন। পাশাপাশি ভূমি ব্যবহার, নগরায়ণ এবং মানুষের আচরণ প্রাণীদের চলাচল ও রোগের বিস্তারে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হবে।
পোষা প্রাণী থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি
একটি গবেষণা প্রকল্পে কুকুরের খেলার মাঠ, পশুচিকিৎসা কেন্দ্র, প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে পরিবেশগত নমুনা সংগ্রহ করা হবে। পরিচিত রোগজীবাণুর পাশাপাশি কম পরিচিত ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ও ভাইরাসের উপস্থিতিও পরীক্ষা করা হবে।
গবেষকদের আশা, এর মাধ্যমে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে রোগজীবাণু কীভাবে স্থানান্তরিত হয়, তার একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট জীবাণুর বিস্তার কমাতে লক্ষ্যভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির মতো সহজ কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
একজন পশুচিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, যিনি এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত, বলেন বর্তমানে মানুষ পোষা প্রাণীর সঙ্গে আগের তুলনায় অনেক বেশি ঘনিষ্ঠভাবে বসবাস করছে। তাদের আদর করা, কোলে নেওয়া কিংবা চুম্বন করার মতো আচরণের ফলে কিছু রোগজীবাণু প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ ও গবেষণা বাড়ছে। এই গবেষণা পশুচিকিৎসা কর্মীদের পেশাগত ঝুঁকিও ভালোভাবে বুঝতে সহায়তা করবে।
ভোঁদড়, গন্ধগোকুল ও বাদুড়ের ওপর নজর
আরেকটি গবেষণায় শহরের পরিবেশে বসবাসকারী বন্য স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা হবে। এতে ভোঁদড়, গন্ধগোকুল, কাঠবিড়ালি এবং ফলখেকো বাদুড়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে, কারণ এসব প্রাণী সিঙ্গাপুরের আবাসিক এলাকা ও পার্কে নিয়মিত দেখা যায়।
গবেষকেরা সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং মানুষ ও বন্যপ্রাণীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ ঘটে এমন এলাকা থেকে বিভিন্ন জৈব নমুনা সংগ্রহ করবেন। তাদের লক্ষ্য কোনো একটি নির্দিষ্ট রোগজীবাণু নয়, বরং এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের রোগজীবাণু শনাক্ত ও বিশ্লেষণে ব্যবহার করা যাবে।
সমন্বিত জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার উদ্যোগ
এই গবেষণা কর্মসূচি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘এক স্বাস্থ্য’ ধারণার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে। এই ধারণায় মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশকে একটি অবিচ্ছিন্ন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সিঙ্গাপুরে দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় উদ্যান কর্তৃপক্ষ, সংক্রামক রোগ সংস্থা, পরিবেশ সংস্থা, খাদ্য সংস্থা এবং জাতীয় পানি সংস্থা যৌথভাবে কাজ করছে। নতুন গবেষণাগুলোর মাধ্যমে রোগ সংক্রমণ সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়া যাবে, যা ভবিষ্যতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকি সম্পর্কে বার্তা প্রদান এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়ক হবে।
গবেষণা প্রকল্পগুলো আগামী তিন বছরের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















