স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে রোগীর তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে আস্থা ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্যমন্ত্রী অং ইয়ে কুং। তিনি বলেন, যদি প্রতিটি তথ্য—এমনকি পরিচয়বিহীন বা বেনামী করা তথ্যও—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রশিক্ষণের আগে আলাদা করে রোগীর সম্মতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়, তাহলে স্বাস্থ্যখাতে এই প্রযুক্তির বাস্তব ব্যবহার কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
রোগীর তথ্য ব্যবহারে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির আহ্বান
পার্লামেন্টে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে পুরোপুরি অবিশ্বাস করলে স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। তাঁর মতে, রোগীর তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, তবে একই সঙ্গে প্রযুক্তির সম্ভাবনাকেও কাজে লাগাতে হবে।
তিনি জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত সব তথ্য থেকে ব্যক্তিগত পরিচয় অপসারণ করা হবে এবং তথ্য এমনভাবে প্রস্তুত করা হবে যাতে কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত করা না যায়। এই প্রক্রিয়া কয়েক বছর ধরেই অনুসরণ করা হচ্ছে এবং এ পর্যন্ত কোনো তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
স্থানীয় রোগীদের তথ্য দিয়ে উন্নত হবে চিকিৎসা সহায়তা
সম্প্রতি চালু হওয়া সিঙ্গাপুরের চিকিৎসাবিষয়ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলের লক্ষ্য হলো চিকিৎসকদের দীর্ঘমেয়াদি রোগ নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর সহায়তা প্রদান করা। প্রথম পর্যায়ে ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং চোখের বিভিন্ন রোগের মতো বহুল প্রচলিত অসুস্থতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাষ্য, বর্তমানে স্বাস্থ্যখাতে ব্যবহৃত অধিকাংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা পশ্চিমা জনগোষ্ঠীর তথ্যের ওপর প্রশিক্ষিত। ফলে সেগুলো সব সময় সিঙ্গাপুরের রোগীদের জন্য সমানভাবে কার্যকর হয় না। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তথ্য ব্যবহার করলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা আরও নির্ভুল হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ধাপে ধাপে বিস্তৃত হবে প্রকল্প
তিনি জানান, শুরুতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার কয়েকটি বিশেষায়িত বিভাগে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হবে। ফল ইতিবাচক হলে পরে আরও বিভিন্ন বিশেষায়িত বিভাগ এবং বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানেও এর ব্যবহার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
চিকিৎসকের সিদ্ধান্তই থাকবে চূড়ান্ত
পার্লামেন্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ঝুঁকি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এর জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি কখনো চিকিৎসকের বিকল্প নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে যাতে তা চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সব সময় চিকিৎসকরাই নেবেন।
তিনি আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমন কোনো সর্বজনীন সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়, যা সব সমস্যার উত্তর দিতে পারে। বরং এটি ব্যবহার করতে হবে দেশের চিকিৎসা নীতি, স্থানীয় বাস্তবতা এবং বিদ্যমান চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।
প্রযুক্তি নিয়ে বাস্তববাদী হওয়ার আহ্বান
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ ও আলোড়ন থাকলেও সময়ের সঙ্গে এই উচ্ছ্বাস আরও বাস্তবসম্মত পর্যায়ে পৌঁছাবে। তাঁর মতে, সেই সময়ের জন্য অপেক্ষা না করে এখন থেকেই বিচক্ষণ, দায়িত্বশীল ও সতর্কভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করা উচিত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও ঠিক সেই নীতিই অনুসরণ করছে।
স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা ও নিরাপত্তাই হবে মূল ভিত্তি
অং ইয়ে কুংয়ের মতে, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্যখাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে রোগীর তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রযুক্তির প্রতি জনআস্থা বজায় রাখা এবং চিকিৎসকদের সক্রিয় তত্ত্বাবধানের ওপর।
রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবায় কার্যকর সহায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।
রোগীর আস্থা ছাড়া স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সফল ব্যবহার সম্ভব নয় বলে সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্য। নিরাপদ তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে চিকিৎসায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















