রেস্তোরাঁর ‘সেরা’ বা ‘শ্রেষ্ঠ’ তালিকা দেখেই খাবারের মান বিচার করা কতটা যুক্তিসঙ্গত—এ প্রশ্ন তুলেছেন দীর্ঘদিনের খাদ্য লেখক জন ক্রিচ। এশিয়ার বৈচিত্র্যময় ও টেকসই খাদ্যসংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা এই লেখকের পরামর্শ, বিশেষ করে এশিয়ায় খাবারের ক্ষেত্রে বিখ্যাত র্যাঙ্কিংগুলোকে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে বরং যথেষ্ট সংশয় নিয়ে দেখা উচিত।
এশিয়ায় মিশেলিনের বিস্তার
ক্রিচের মতে, এশিয়ায় মিশেলিন গাইডের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু রেস্তোরাঁকে পরিচিতি এনে দিলেও এর মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ২০০৭ সালে টোকিওকে প্যারিসের চেয়েও বেশি মিশেলিন তারকা দেওয়ার মধ্য দিয়ে এশিয়ায় মিশেলিনের বিস্তার নতুন মাত্রা পায়।
জাপানের খাবারের সূক্ষ্মতা ও নান্দনিকতা মিশেলিনের মানদণ্ডের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে গেলেও পরবর্তী সময়ে গাইডটি এশিয়ার আরও অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সম্প্রতি ফিলিপাইনের খাবারও সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
কিন্তু ক্রিচ মনে করেন, স্থানীয় খাবারের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের কাজ এতটা সরল নয়। ফিলিপাইনের সেরা রেস্তোরাঁ খোঁজার নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, একসময় তাঁর পছন্দের তালিকায় ব্যবসায়ীদের জন্য পরিচিত সুশি বারগুলোর বাইরে একটি গাড়ির বডি মেরামতের দোকানও ছিল, যেখানে ব্যবহৃত তেলের ড্রামে আদোবো রান্না করা হতো।

পশ্চিমা মানদণ্ড বনাম এশিয়ার ঐতিহ্য
ক্রিচের আপত্তির বড় জায়গা হলো সাংস্কৃতিক পার্থক্য। মিশেলিনের গোপনীয় পরিদর্শকরা কোন সংস্কৃতির খাবার সম্পর্কে কী ধরনের মানদণ্ড বা সংবেদনশীলতা নিয়ে মূল্যায়ন করেন, তা পাঠকদের কাছে স্পষ্ট নয়। তাঁর দাবি, ফলাফলে অনেক সময় আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবিত রেস্তোরাঁ ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় খাবারের চেয়ে বেশি সুবিধা পায়।
থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বেশি তারকা পাওয়া ১০টি রেস্তোরাঁর মধ্যে মাত্র তিনটি থাই। সেখানে তিনটি ফরাসি এবং একটি জার্মান রেস্তোরাঁও রয়েছে। তাইওয়ানের ক্ষেত্রেও ১০টি সর্বোচ্চ তারকাপ্রাপ্ত রেস্তোরাঁর মধ্যে মাত্র একটি চীনা খাবারের। এক তারকা পাওয়া ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১০টি নিজেদের তাইওয়ানিজ হিসেবে পরিচয় দেয়। সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ১০ রেস্তোরাঁর একটিও চীনা নয়।
অর্থ ও স্বার্থের প্রশ্ন
মিশেলিনের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের পর্যটন সংস্থার আর্থিক অংশীদারত্বও প্রশ্ন তুলেছে। ২০১৫ সালে কোরিয়া ট্যুরিজম অর্গানাইজেশন দক্ষিণ কোরিয়ায় মিশেলিন গাইড আনতে প্রায় ১৮ লাখ ডলার দেওয়ার চুক্তি করে। ২০১৭ সালে থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষ পাঁচ বছরের জন্য মিশেলিনের সঙ্গে ৪৪ লাখ ডলারের অংশীদারত্বে যায়।
মিশেলিন দাবি করে, এসব অর্থ তার রেস্তোরাঁ নির্বাচনে প্রভাব ফেলে না। তবে ক্রিচের মতে, এমন আর্থিক সম্পর্ক থাকলে সিদ্ধান্তে প্রভাব না পড়লেও স্বার্থের সংঘাতের একটি ধারণা তৈরি হতে পারে।
‘৫০ বেস্ট’ নিয়েও সংশয়

মিশেলিনের পাশাপাশি বিশ্বের আরেক প্রভাবশালী র্যাঙ্কিং ‘ওয়ার্ল্ডস ৫০ বেস্ট রেস্তোরাঁ’ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ক্রিচ। তাঁর মতে, একসময় এই প্ল্যাটফর্ম বিভিন্ন দেশের শেফদের মধ্যে যোগাযোগ, বন্ধুত্ব ও সৃজনশীল বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু এখন এর পুরস্কার অনুষ্ঠান অনেকটা অভিজাত খাবারজগতের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে, যেখানে রান্নার পাশাপাশি পরিচিতি, প্রচার ও পারস্পরিক নেটওয়ার্কিংয়ের গুরুত্বও দৃশ্যমান।
২০২৫ সালের তালিকায় টোকিওর ডেন ৫৩ নম্বরে নেমে যায়। অথচ ২০২১ সালে এটি ১১ নম্বরে ছিল। নিউইয়র্কের লে বার্নার্দাঁ এবং স্পেনের মুগারিৎসের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রেস্তোরাঁও শীর্ষ ৫০ থেকে বাদ পড়েছে। এত অল্প সময়ে তাদের খাবারের মান কি সত্যিই এতটা কমে গেল—প্রশ্ন ক্রিচের।
ঐতিহ্যও শ্রেষ্ঠ রান্নার মানদণ্ড
ক্রিচের মূল বক্তব্য, পশ্চিমা বিশ্ব ও এশিয়ায় ‘ভালো রান্না’ বলতে একই বিষয় বোঝানো হয় না। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় উদ্ভাবনী রান্না, ব্যক্তিত্ব ও গণমাধ্যমে উপস্থিতির মাধ্যমে শেফরা তারকা হয়ে ওঠেন। এশিয়ার বহু দেশে আবার হাজার বছরের পুরোনো খাবার নিখুঁতভাবে পুনর্নির্মাণ করতে পারা শেফও ‘মাস্টার’ হিসেবে স্বীকৃতি পান।
নিজের পছন্দের কথাও অকপটে জানিয়েছেন ক্রিচ। ট্রাফল ও ইউজু-স্বাদের সি-আর্চিনের চেয়ে হক্কিয়েন শূকরের মস্তিষ্কের পায়েস, থাই পোমেলো সালাদ কিংবা সিচুয়ান স্টাইলের মাছের স্বাদের বেগুন তাঁর কাছে বেশি আকর্ষণীয়। প্রয়াত অ্যান্থনি বুর্দেইনসহ এশিয়ায় দীর্ঘদিন থাকা অনেকেই এমন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
ক্রিচের দাবি, ইন্টারনেট বিশ্বকে আরও উন্মুক্ত করলেও খাদ্য সমালোচনায় পশ্চিমকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি কমেনি; বরং তাঁর চোখে তা আরও বেড়েছে। তাঁর বিশ্বাস, চীন ও জাপানের বহু অখ্যাত স্থানীয় রেস্তোরাঁ এমন দক্ষতা ও উপকরণ ব্যবহারের নৈপুণ্য দেখায়, যা আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ের অনেক নামী প্রতিষ্ঠানের চেয়েও উন্নত। তাই রেস্তোরাঁর তারকা বা অবস্থান নয়, খাবারের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও স্বাদ দিয়েই তার প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
জন ক্রিচ এশিয়া নিকেই-এর কনট্রিবিউটিং রাইটার।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















