০৯:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬
হাসিনার নির্দেশেই সালাহউদ্দিন আহমদকে গুম, টিএফআই সেলে নির্যাতনের তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য মোদি-যোগী বৈঠকে ২০২৭ উত্তরপ্রদেশ নির্বাচন: অযোধ্যা, পরীক্ষার ফাঁস ও তরুণদের ক্ষোভে চাপে বিজেপি ইরান যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন ট্রাম্পের শীর্ষ জেনারেল, বড় হামলা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনে উদ্বেগ ইরানের হামলায় হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারে আগুন, ওমানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্তের পথে ভারতে ইউপিআই লেনদেন থাকবে বিনা খরচে, সীমিত ব্যবসায়িক পেমেন্টে বসতে পারে নামমাত্র ফি ‘ডিগ্রির কোনো মূল্য নেই’ ভারতে, তরুণদের ‘দুঃখ-তথ্য-সম্পদ’ নিয়ে রাহুল গান্ধীর বিস্ফোরক বক্তব্য চীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাপট, মানুষের চাকরি কি রোবটের দখলে যাচ্ছে? হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে: ইসলামী আন্দোলন নেতা পাকিস্তানে জামায়াতের দেশব্যাপী বিক্ষোভ, মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি দামের প্রতিবাদে মহাসড়ক অবরোধ ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক দুনিয়ায় আমেরিকার নতুন বাজি, ঐকমত্য নয়—উদ্ভাবনেই ভবিষ্যৎ

ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক দুনিয়ায় আমেরিকার নতুন বাজি, ঐকমত্য নয়—উদ্ভাবনেই ভবিষ্যৎ

বিশ্বের আর্থিক বাজারে শুরু হয়েছে নতুন এক যুগ। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে ডেরিভেটিভস বা এমন আর্থিক চুক্তির বাজার, যার মূল্য নির্ধারিত হয় কোনো পণ্য, মুদ্রা, শেয়ার, সুদের হার বা অন্য সম্পদের দামের ওপর ভিত্তি করে—সেই বাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মতে, ভবিষ্যতের আর্থিক ব্যবস্থায় সবার মতৈক্যের চেয়ে দ্রুত উদ্ভাবন, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়মকানুন বদলানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশ্বের ডেরিভেটিভস বাজারের মোট নামমাত্র মূল্য এখন এক হাজার দুইশ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এর প্রায় অর্ধেকই যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যভিত্তিক ভবিষ্যৎ চুক্তি নিয়ন্ত্রক সংস্থার আওতায় পড়ে। কয়েক দশক ধরে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, প্রতিযোগিতামূলক বাজার, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এই বাজারে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।

চিৎকার করে দরদাম থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ

একসময় নিউইয়র্ক ও শিকাগোর বড় বড় বাণিজ্যকেন্দ্রে ব্যবসায়ীরা চিৎকার করে দরদাম করতেন। পরে সেই জায়গা নেয় কম্পিউটারনির্ভর পর্দায় লেনদেন। এখন সেই ব্যবস্থাও দ্রুত পুরোনো হয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান ডেরিভেটিভস বাজার ক্রমেই স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যালগরিদম, স্বয়ংক্রিয় লেনদেন এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রযুক্তি বাজারকে এমন গতিতে পরিচালনা করছে, যা মানুষের পক্ষে সরাসরি অনুসরণ করা প্রায় অসম্ভব।

একটি বাজারে তথ্য পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজারবার সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং লেনদেন সম্পন্ন করার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ফলে পুরোনো দিনের বাজার কাঠামো ও নিয়মকানুন দিয়ে নতুন বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রণ করা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।

আন্তর্জাতিক ঐকমত্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি

দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আর্থিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় একটি ধারণা ছিল—বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্যের ভিত্তিতে নতুন নীতিমালা তৈরি হবে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

আমেরিকার অবস্থান হলো, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এমন কোনো নিয়ম যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করতে চায় না, যা এমন বাজারের কথা মাথায় রেখে তৈরি হয়েছে যেখানে লেনদেনের সময় সীমিত, নির্দিষ্ট কয়েকটি বিনিময়কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বেশি এবং মানুষের মাধ্যমে পর্দাভিত্তিক লেনদেনই ছিল প্রধান ব্যবস্থা।

কারণ বর্তমান বাজার অনেক বেশি দ্রুত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বিশ্বব্যাপী সংযুক্ত।

America's $1 Trillion Investment Fund: The Birth of a U.S. Sovereign Wealth  Fund

বিটকয়েন থেকে মূলধারার আর্থিক বাজারে প্রবেশ

যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক উদ্ভাবনের বড় উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে বিটকয়েন।

ডেরিভেটিভস নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত বিটকয়েনের ভবিষ্যৎ চুক্তি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য নিয়ন্ত্রিত ও স্বচ্ছ উপায়ে ক্রিপ্টো সম্পদে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। এর ফলে একসময় প্রান্তিক বলে বিবেচিত বিটকয়েন ধীরে ধীরে বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করে।

২০১৬ সালে বিটকয়েনভিত্তিক বিনিয়োগ পণ্যের মালিকানায় উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি না থাকলেও বর্তমানে এসব পণ্যের মাধ্যমে ১২ লাখের বেশি বিটকয়েন ধারণ করা হচ্ছে।

এরই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রে নির্দিষ্ট মেয়াদবিহীন বিটকয়েন ভবিষ্যৎ চুক্তির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের চুক্তির নির্দিষ্ট শেষ তারিখ থাকে না। বরং নিয়মিত অর্থপ্রদানের ব্যবস্থার মাধ্যমে মূল সম্পদের বাজারদামের সঙ্গে চুক্তির মূল্যকে সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা করা হয়।

এটি শুধু ক্রিপ্টো বাজারের পরিবর্তন নয়; বরং ভবিষ্যতে প্রচলিত আর্থিক বাজারও কীভাবে ডিজিটাল কাঠামোর দিকে এগোতে পারে, তার একটি ইঙ্গিত।

স্থিতিশীল মুদ্রা নিয়েও নতুন পরিকল্পনা

ডলারভিত্তিক স্থিতিশীল মুদ্রার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে একটি বিস্তৃত ফেডারেল কাঠামো তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো অর্থপ্রদানের ক্ষেত্রে এসব ডিজিটাল সম্পদের ব্যবহারকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা এবং ভবিষ্যতে ক্রিপ্টো সম্পদকে বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এমন স্থিতিশীল মুদ্রাকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে।

এর ফলে আর্থিক বাজারের অবকাঠামো আরও আধুনিক করার পাশাপাশি বাজারের নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।

সোনার বাজারেও ২৪ ঘণ্টার লেনদেন

যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক উদ্ভাবন শুধু ক্রিপ্টো সম্পদে সীমাবদ্ধ নেই।

চলতি বছর দেশটিতে বড় একটি বিনিময়কেন্দ্রে সোনার ভবিষ্যৎ চুক্তির জন্য দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা লেনদেনের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ক্রিপ্টো সম্পদের বাইরে অন্যান্য সম্পদের জন্যও নির্দিষ্ট মেয়াদবিহীন ভবিষ্যৎ চুক্তি চালুর সম্ভাবনা নিয়ে কাজ চলছে।

অর্থাৎ আর্থিক বাজারকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে না রেখে সবসময় সক্রিয় রাখার প্রবণতা বাড়ছে।

পূর্বাভাসের বাজার নিয়েও বিতর্ক

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে পূর্বাভাসভিত্তিক বাজারে। এসব বাজারে ভবিষ্যতে কোনো ঘটনা ঘটবে কি না, তার সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে চুক্তি লেনদেন হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার আওতাধীন এই বাজারগুলোকে সমর্থকেরা তথ্য সংগ্রহ ও মূল্য নির্ধারণের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে দেখছেন।

তাদের যুক্তি, এখানে শুধু মানুষের অনুমান নয়; অসংখ্য মানুষের ধারণা, তথ্য ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত একত্রিত হয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা সম্পর্কে একটি বাজারভিত্তিক সংকেত তৈরি করে।

২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রেও এ ধরনের বাজারের সাফল্যের উদাহরণ সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবেষণাতেও দেখা গেছে, অর্থনৈতিক সূচক সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব বাজার অনেক সময় প্রচলিত অনুমান বা বিশেষজ্ঞ পূর্বাভাসের সমান কিংবা তার চেয়েও ভালো ফল দিতে পারে।

ইউরোপের সঙ্গে বাড়ছে নীতিগত পার্থক্য

তবে এই উদ্ভাবনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মতভেদও তৈরি হয়েছে।

ইউরোপের কয়েকটি আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা পূর্বাভাসভিত্তিক বাজারের কিছু চুক্তিকে আর্থিক পণ্য না ধরে জুয়ার সঙ্গে তুলনা করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত নয়। তাদের যুক্তি, এসব চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে বাজি ধরার মতো নয়। বরং এগুলো সংগঠিত বাজারে লেনদেন হয় এবং ভবিষ্যৎ ঘটনা সম্পর্কে তথ্য একত্রিত করে বাজারকে একটি মূল্যসংকেত তৈরি করতে সাহায্য করে।

এই মতপার্থক্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে, আগামী দিনে বৈশ্বিক আর্থিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে নীতিগত দূরত্ব আরও স্পষ্ট হতে পারে।

America's true innovation advantage: we don't just invent technologies — we  reinvent how innovation works | Fortune

ভবিষ্যতের নিয়ম কি পুরোনো বাজার দিয়ে তৈরি হবে?

বিশ্বের আর্থিক বাজার দ্রুত বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—নতুন বাজারের জন্য পুরোনো নিয়ম কতটা কার্যকর?

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, বাজারের গতি যত দ্রুত বদলাবে, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকেও তত দ্রুত পরিবর্তিত হতে হবে।

রেলপথ, বিমান চলাচল, ইন্টারনেট এবং ইলেকট্রনিক লেনদেনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই নতুন প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে বৈশ্বিক মানদণ্ড তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। এবারও সেই পথ অনুসরণ করতে চায় দেশটি।

তাদের লক্ষ্য অন্য দেশের নিয়ম অনুসরণ করে চলা নয়; বরং এমন নীতি তৈরি করা, যা নতুন উদ্ভাবনের পথ খুলে দেবে এবং অন্য দেশগুলো পরবর্তীতে অনুসরণ করতে পারে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থাকবে, তবে শর্তও থাকবে

যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছে না। সীমান্ত পেরিয়ে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে বিশ্বের সবচেয়ে গভীর ও আস্থাভাজন ডেরিভেটিভস বাজারে প্রবেশাধিকারকে তারা বিশেষ সুবিধা হিসেবে দেখছে। তাই আন্তর্জাতিক চুক্তি, বিদেশি বিনিময়কেন্দ্রের নিবন্ধন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পারস্পরিক তদারকি ব্যবস্থা নিয়মিত আধুনিক করার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র।

এর উদ্দেশ্য শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো নয়; একই সঙ্গে মার্কিন বাজারের স্বার্থ রক্ষা এবং বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সামনে কোন দেশের জয়?

বিশ্বের আর্থিক বাজার এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রযুক্তি আর কেবল লেনদেনের সহায়ক নয়—প্রযুক্তিই বাজারের কাঠামো বদলে দিচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় লেনদেন, ডিজিটাল সম্পদ, স্থিতিশীল মুদ্রা, ২৪ ঘণ্টার বাজার এবং পূর্বাভাসভিত্তিক লেনদেন—সব মিলিয়ে অর্থনীতির পুরোনো সংজ্ঞাগুলোও বদলে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের সময়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে, কে আগে নতুন বাস্তবতাকে বুঝতে পারছে এবং কে দ্রুত সেই অনুযায়ী নিয়ম তৈরি করতে পারছে।

যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, উদ্ভাবন ও বাজারের নিরাপত্তা একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়। বরং সঠিক নিয়ন্ত্রণ থাকলে দুটিই একসঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে।

বিশ্বের আর্থিক নেতৃত্ব ধরে রাখতে তাই ওয়াশিংটনের বার্তা স্পষ্ট—সবাই একমত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা নয়, বরং নতুন প্রযুক্তি ও নতুন বাজারের বাস্তবতাকে সামনে রেখে দ্রুত এগিয়ে যাওয়াই ভবিষ্যতের পথ।

আর সেই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী আর্থিক মানদণ্ড হিসেবে ধরে রাখতে চায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

হাসিনার নির্দেশেই সালাহউদ্দিন আহমদকে গুম, টিএফআই সেলে নির্যাতনের তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য

ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক দুনিয়ায় আমেরিকার নতুন বাজি, ঐকমত্য নয়—উদ্ভাবনেই ভবিষ্যৎ

০৮:৪৪:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

বিশ্বের আর্থিক বাজারে শুরু হয়েছে নতুন এক যুগ। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে ডেরিভেটিভস বা এমন আর্থিক চুক্তির বাজার, যার মূল্য নির্ধারিত হয় কোনো পণ্য, মুদ্রা, শেয়ার, সুদের হার বা অন্য সম্পদের দামের ওপর ভিত্তি করে—সেই বাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মতে, ভবিষ্যতের আর্থিক ব্যবস্থায় সবার মতৈক্যের চেয়ে দ্রুত উদ্ভাবন, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়মকানুন বদলানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশ্বের ডেরিভেটিভস বাজারের মোট নামমাত্র মূল্য এখন এক হাজার দুইশ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এর প্রায় অর্ধেকই যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যভিত্তিক ভবিষ্যৎ চুক্তি নিয়ন্ত্রক সংস্থার আওতায় পড়ে। কয়েক দশক ধরে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, প্রতিযোগিতামূলক বাজার, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এই বাজারে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।

চিৎকার করে দরদাম থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ

একসময় নিউইয়র্ক ও শিকাগোর বড় বড় বাণিজ্যকেন্দ্রে ব্যবসায়ীরা চিৎকার করে দরদাম করতেন। পরে সেই জায়গা নেয় কম্পিউটারনির্ভর পর্দায় লেনদেন। এখন সেই ব্যবস্থাও দ্রুত পুরোনো হয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান ডেরিভেটিভস বাজার ক্রমেই স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যালগরিদম, স্বয়ংক্রিয় লেনদেন এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রযুক্তি বাজারকে এমন গতিতে পরিচালনা করছে, যা মানুষের পক্ষে সরাসরি অনুসরণ করা প্রায় অসম্ভব।

একটি বাজারে তথ্য পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজারবার সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং লেনদেন সম্পন্ন করার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ফলে পুরোনো দিনের বাজার কাঠামো ও নিয়মকানুন দিয়ে নতুন বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রণ করা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।

আন্তর্জাতিক ঐকমত্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি

দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আর্থিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় একটি ধারণা ছিল—বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্যের ভিত্তিতে নতুন নীতিমালা তৈরি হবে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

আমেরিকার অবস্থান হলো, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এমন কোনো নিয়ম যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করতে চায় না, যা এমন বাজারের কথা মাথায় রেখে তৈরি হয়েছে যেখানে লেনদেনের সময় সীমিত, নির্দিষ্ট কয়েকটি বিনিময়কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বেশি এবং মানুষের মাধ্যমে পর্দাভিত্তিক লেনদেনই ছিল প্রধান ব্যবস্থা।

কারণ বর্তমান বাজার অনেক বেশি দ্রুত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বিশ্বব্যাপী সংযুক্ত।

America's $1 Trillion Investment Fund: The Birth of a U.S. Sovereign Wealth  Fund

বিটকয়েন থেকে মূলধারার আর্থিক বাজারে প্রবেশ

যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক উদ্ভাবনের বড় উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে বিটকয়েন।

ডেরিভেটিভস নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত বিটকয়েনের ভবিষ্যৎ চুক্তি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য নিয়ন্ত্রিত ও স্বচ্ছ উপায়ে ক্রিপ্টো সম্পদে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। এর ফলে একসময় প্রান্তিক বলে বিবেচিত বিটকয়েন ধীরে ধীরে বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করে।

২০১৬ সালে বিটকয়েনভিত্তিক বিনিয়োগ পণ্যের মালিকানায় উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি না থাকলেও বর্তমানে এসব পণ্যের মাধ্যমে ১২ লাখের বেশি বিটকয়েন ধারণ করা হচ্ছে।

এরই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রে নির্দিষ্ট মেয়াদবিহীন বিটকয়েন ভবিষ্যৎ চুক্তির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের চুক্তির নির্দিষ্ট শেষ তারিখ থাকে না। বরং নিয়মিত অর্থপ্রদানের ব্যবস্থার মাধ্যমে মূল সম্পদের বাজারদামের সঙ্গে চুক্তির মূল্যকে সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা করা হয়।

এটি শুধু ক্রিপ্টো বাজারের পরিবর্তন নয়; বরং ভবিষ্যতে প্রচলিত আর্থিক বাজারও কীভাবে ডিজিটাল কাঠামোর দিকে এগোতে পারে, তার একটি ইঙ্গিত।

স্থিতিশীল মুদ্রা নিয়েও নতুন পরিকল্পনা

ডলারভিত্তিক স্থিতিশীল মুদ্রার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে একটি বিস্তৃত ফেডারেল কাঠামো তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো অর্থপ্রদানের ক্ষেত্রে এসব ডিজিটাল সম্পদের ব্যবহারকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা এবং ভবিষ্যতে ক্রিপ্টো সম্পদকে বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এমন স্থিতিশীল মুদ্রাকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে।

এর ফলে আর্থিক বাজারের অবকাঠামো আরও আধুনিক করার পাশাপাশি বাজারের নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।

সোনার বাজারেও ২৪ ঘণ্টার লেনদেন

যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক উদ্ভাবন শুধু ক্রিপ্টো সম্পদে সীমাবদ্ধ নেই।

চলতি বছর দেশটিতে বড় একটি বিনিময়কেন্দ্রে সোনার ভবিষ্যৎ চুক্তির জন্য দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা লেনদেনের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ক্রিপ্টো সম্পদের বাইরে অন্যান্য সম্পদের জন্যও নির্দিষ্ট মেয়াদবিহীন ভবিষ্যৎ চুক্তি চালুর সম্ভাবনা নিয়ে কাজ চলছে।

অর্থাৎ আর্থিক বাজারকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে না রেখে সবসময় সক্রিয় রাখার প্রবণতা বাড়ছে।

পূর্বাভাসের বাজার নিয়েও বিতর্ক

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে পূর্বাভাসভিত্তিক বাজারে। এসব বাজারে ভবিষ্যতে কোনো ঘটনা ঘটবে কি না, তার সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে চুক্তি লেনদেন হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার আওতাধীন এই বাজারগুলোকে সমর্থকেরা তথ্য সংগ্রহ ও মূল্য নির্ধারণের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে দেখছেন।

তাদের যুক্তি, এখানে শুধু মানুষের অনুমান নয়; অসংখ্য মানুষের ধারণা, তথ্য ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত একত্রিত হয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা সম্পর্কে একটি বাজারভিত্তিক সংকেত তৈরি করে।

২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রেও এ ধরনের বাজারের সাফল্যের উদাহরণ সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবেষণাতেও দেখা গেছে, অর্থনৈতিক সূচক সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব বাজার অনেক সময় প্রচলিত অনুমান বা বিশেষজ্ঞ পূর্বাভাসের সমান কিংবা তার চেয়েও ভালো ফল দিতে পারে।

ইউরোপের সঙ্গে বাড়ছে নীতিগত পার্থক্য

তবে এই উদ্ভাবনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মতভেদও তৈরি হয়েছে।

ইউরোপের কয়েকটি আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা পূর্বাভাসভিত্তিক বাজারের কিছু চুক্তিকে আর্থিক পণ্য না ধরে জুয়ার সঙ্গে তুলনা করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত নয়। তাদের যুক্তি, এসব চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে বাজি ধরার মতো নয়। বরং এগুলো সংগঠিত বাজারে লেনদেন হয় এবং ভবিষ্যৎ ঘটনা সম্পর্কে তথ্য একত্রিত করে বাজারকে একটি মূল্যসংকেত তৈরি করতে সাহায্য করে।

এই মতপার্থক্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে, আগামী দিনে বৈশ্বিক আর্থিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে নীতিগত দূরত্ব আরও স্পষ্ট হতে পারে।

America's true innovation advantage: we don't just invent technologies — we  reinvent how innovation works | Fortune

ভবিষ্যতের নিয়ম কি পুরোনো বাজার দিয়ে তৈরি হবে?

বিশ্বের আর্থিক বাজার দ্রুত বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—নতুন বাজারের জন্য পুরোনো নিয়ম কতটা কার্যকর?

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, বাজারের গতি যত দ্রুত বদলাবে, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকেও তত দ্রুত পরিবর্তিত হতে হবে।

রেলপথ, বিমান চলাচল, ইন্টারনেট এবং ইলেকট্রনিক লেনদেনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই নতুন প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে বৈশ্বিক মানদণ্ড তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। এবারও সেই পথ অনুসরণ করতে চায় দেশটি।

তাদের লক্ষ্য অন্য দেশের নিয়ম অনুসরণ করে চলা নয়; বরং এমন নীতি তৈরি করা, যা নতুন উদ্ভাবনের পথ খুলে দেবে এবং অন্য দেশগুলো পরবর্তীতে অনুসরণ করতে পারে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থাকবে, তবে শর্তও থাকবে

যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছে না। সীমান্ত পেরিয়ে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে বিশ্বের সবচেয়ে গভীর ও আস্থাভাজন ডেরিভেটিভস বাজারে প্রবেশাধিকারকে তারা বিশেষ সুবিধা হিসেবে দেখছে। তাই আন্তর্জাতিক চুক্তি, বিদেশি বিনিময়কেন্দ্রের নিবন্ধন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পারস্পরিক তদারকি ব্যবস্থা নিয়মিত আধুনিক করার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র।

এর উদ্দেশ্য শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো নয়; একই সঙ্গে মার্কিন বাজারের স্বার্থ রক্ষা এবং বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সামনে কোন দেশের জয়?

বিশ্বের আর্থিক বাজার এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রযুক্তি আর কেবল লেনদেনের সহায়ক নয়—প্রযুক্তিই বাজারের কাঠামো বদলে দিচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় লেনদেন, ডিজিটাল সম্পদ, স্থিতিশীল মুদ্রা, ২৪ ঘণ্টার বাজার এবং পূর্বাভাসভিত্তিক লেনদেন—সব মিলিয়ে অর্থনীতির পুরোনো সংজ্ঞাগুলোও বদলে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের সময়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে, কে আগে নতুন বাস্তবতাকে বুঝতে পারছে এবং কে দ্রুত সেই অনুযায়ী নিয়ম তৈরি করতে পারছে।

যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, উদ্ভাবন ও বাজারের নিরাপত্তা একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়। বরং সঠিক নিয়ন্ত্রণ থাকলে দুটিই একসঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে।

বিশ্বের আর্থিক নেতৃত্ব ধরে রাখতে তাই ওয়াশিংটনের বার্তা স্পষ্ট—সবাই একমত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা নয়, বরং নতুন প্রযুক্তি ও নতুন বাজারের বাস্তবতাকে সামনে রেখে দ্রুত এগিয়ে যাওয়াই ভবিষ্যতের পথ।

আর সেই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী আর্থিক মানদণ্ড হিসেবে ধরে রাখতে চায়।