০৯:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬
চট্টগ্রামে আগুন নেভাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বিএনপির সাবেক নেতা নিহত ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্টে বড় পরিবর্তন, একসঙ্গে ১৫ দিনের স্লট রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম চূড়ান্ত, ২০ আগস্ট নির্বাচনের প্রস্তুতি পৃথিবীর বাইরে জীবনের খোঁজে নতুন আশার আলো, বায়ুমণ্ডলসহ সম্ভাবনাময় গ্রহের সন্ধান ইউক্রেনের যুদ্ধের মানবিক চিত্র বদলে দিচ্ছে মার্কিন ধর্মপ্রচারকদের মনোভাব পারি মনির ধর্ষণচেষ্টা মামলা: ৩০ নভেম্বর ফের জেরার মুখোমুখি অভিনেত্রী কিছুই ঘটবে না—এই বাজি কি ফেডের জন্য বিপজ্জনক? ৪৩ বছর বয়সেও ‘চিরকিশোর’ রাজনীতিক! জ্যাক পোলানস্কিকে ঘিরে ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক হরমুজ ও লোহিত সাগরের ঝুঁকি বাড়তেই বিশ্বজুড়ে তেল পাইপলাইনে বিনিয়োগের হিড়িক চাঁদের মাটিতে রকেট, পৃথিবীতে ধাক্কা—মাস্কের মহাকাশ সাম্রাজ্য নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নতুন শঙ্কা

জাপানকে ঘিরে চীনের আগ্রাসী চাপ, আসল লক্ষ্য কি যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় আধিপত্য?

চীন ও জাপানের সম্পর্ক আবারও এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একটি দেশের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বক্তব্য অন্য দেশের কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়াকে দ্রুত তীব্র করে তুলছে। সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ান নিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির অবস্থান এবং জাপানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ বেইজিংয়ের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে। চীন জাপানের বিরুদ্ধে তাইওয়ান ইস্যুতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছে এবং টোকিওর সামরিক নীতিকে ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

কিন্তু এই সংঘাতকে শুধু চীন ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় বিরোধ হিসেবে দেখলে এর গভীর কৌশলগত দিকটি হয়তো ধরা পড়বে না। কারণ পূর্ব এশিয়ায় জাপান যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদারদের একটি। ফলে টোকিওকে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখার অর্থ পরোক্ষভাবে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক ব্যবস্থাকেও চ্যালেঞ্জ করা।

তাইওয়ানই এখন সবচেয়ে বড় উত্তেজনার কেন্দ্র

তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চীন। দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো বিদেশি শক্তির সামরিক ভূমিকা বা নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতিকে বেইজিং অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে দেখে।

এই পরিস্থিতিতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি তাইওয়ানকে ঘিরে কোনো সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত জাপানের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করলে টোকিও আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিতে পারে—এমন অবস্থান প্রকাশ করেছেন। চীন এ বক্তব্যকে গুরুতর আপত্তিকর হিসেবে দেখেছে। জাপানের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা শ্বেতপত্রেও তাইওয়ান ঘিরে চীনের সামরিক কর্মকাণ্ড এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছ.,

বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধু জাপানের বক্তব্য নয়। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সামরিক সমন্বয় এবং তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য আঞ্চলিক জোটের প্রশ্নও জড়িত।

জাপান কেন চীনের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?

পূর্ব এশিয়ার মানচিত্রে জাপানের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন, কোরীয় উপদ্বীপ এবং তাইওয়ানের কাছাকাছি জাপানের অবস্থান দেশটিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত করেছে।

জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা জোট রয়েছে। জাপানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সেনা উপস্থিতি রয়েছে এবং দুই দেশ নিয়মিত সামরিক সহযোগিতা ও মহড়া পরিচালনা করে।

তাইওয়ানকে ঘিরে কোনো বড় ধরনের সংঘাত হলে জাপানকে পাশ কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। একইভাবে জাপান যদি নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও বাড়ায়, তাহলে পূর্ব এশিয়ায় চীনের সামরিক হিসাবও বদলে যেতে পারে।

এ কারণেই জাপানের প্রতিরক্ষা নীতির পরিবর্তন বেইজিংয়ের জন্য শুধু টোকিওর অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্ন।

জাপানের সামরিক শক্তি বাড়ানোও চীনের উদ্বেগের কারণ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের সামরিক ভূমিকা দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি দ্রুত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

জাপানের নতুন প্রতিরক্ষা নীতিতে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, মানববিহীন অস্ত্র এবং সামরিক শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রতিরক্ষা নীতিতেও চীনকে জাপানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। (Reuters)

চীনের চোখে এই পরিবর্তন একটি সম্ভাব্য সামরিক পুনরুত্থানের ইঙ্গিত। বেইজিং তাই জাপানের সামরিক সম্প্রসারণকে শুধু আত্মরক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না; বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আঞ্চলিক শক্তির কাঠামো বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা হিসেবেও বিবেচনা করছে।

কিন্তু এর আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব কোথায়?

এখানেই চীন-জাপান উত্তেজনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সামনে আসে।

এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বড় ভিত্তি হলো তার মিত্র ও অংশীদারদের নেটওয়ার্ক। জাপান সেই ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ফলে জাপানকে যদি চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনায় আটকে রাখা যায়, তাহলে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থানও আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

চীনের জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে তাদের কৌশলগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

জাপানের ক্ষেত্রে এই কৌশল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ টোকিও একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা অংশীদার এবং চীনের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার।

এই দ্বৈত সম্পর্কই জাপানকে চীনের চাপ প্রয়োগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র করে তুলেছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্কও হয়ে উঠতে পারে চাপের হাতিয়ার

চীন ও জাপানের অর্থনীতি গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। দুই দেশের শিল্প, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা ও বাণিজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে।

কিন্তু রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলে এই অর্থনৈতিক নির্ভরতাই দুর্বলতার জায়গায় পরিণত হতে পারে।

চীন যদি বাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ শিল্প উপকরণ বা বাজার প্রবেশাধিকারকে কূটনৈতিক চাপের সঙ্গে যুক্ত করে, তাহলে জাপানি ব্যবসার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। আবার জাপানও চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

এর ফলে দুই দেশের সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠছে।

How China's Japan-bashing is indirectly targeting Washington - Nikkei Asia

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের কাছে কী বার্তা যাচ্ছে?

চীনের জাপানবিরোধী কঠোর অবস্থানের একটি সম্ভাব্য কৌশলগত ফল হলো—এশিয়ার অন্যান্য দেশকে একটি বার্তা দেওয়া।

বার্তাটি হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যত বেশি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়া হবে, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তত বেশি চাপ তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতি দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশকেও নিজেদের কৌশল নতুন করে বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে।

চীন যদি আঞ্চলিক দেশগুলোকে বোঝাতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক তাদের অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তাগত ঝুঁকি বাড়ায়, তাহলে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক কাঠামো দুর্বল হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে চীনের কৌশলও ঝুঁকিমুক্ত নয়

জাপানের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে উল্টো ফলও হতে পারে।

চীনের সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ যত বাড়বে, জাপানের জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সমর্থন তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের নিরাপত্তা সম্পর্কও আরও শক্তিশালী হতে পারে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এমন প্রবণতার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। চীনের হুমকি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগকে সামনে রেখে জাপান নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ফলে বেইজিং যে চাপ দিয়ে টোকিওকে নরম করতে চাইছে, সেটিই কখনো কখনো জাপানকে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।

এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন

চীন-জাপান বিরোধ তাই এখন আর শুধু দুই দেশের সম্পর্কের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাইওয়ান, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি, জাপানের প্রতিরক্ষা সম্প্রসারণ, চীনের আঞ্চলিক প্রভাব এবং এশিয়ার ভবিষ্যৎ শক্তির ভারসাম্য।

চীন একদিকে নিজের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও গভীর করার চেষ্টা করছে। এই দুই প্রবণতার মাঝখানে জাপানের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

জাপান যদি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর আরও গভীরে প্রবেশ করে এবং একই সঙ্গে নিজের সামরিক সক্ষমতা বাড়ায়, তাহলে চীনের জন্য পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত পরিবেশ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

সামনে কী হতে পারে?

চীন ও জাপানের সম্পর্কের দ্রুত উন্নতি এখন সহজ নয়। তাইওয়ান প্রশ্ন, সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, পূর্ব চীন সাগরের বিরোধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতি—সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস গভীর।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।

চীন কি জাপানকে চাপে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় জোটকে দুর্বল করতে পারবে, নাকি এই চাপই জাপানকে ওয়াশিংটনের আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলবে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বেইজিং ও টোকিওর সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না। এর প্রভাব পড়বে তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া এবং গোটা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীন ও জাপানের বর্তমান দ্বন্দ্বকে কেবল দুই দেশের বিরোধ হিসেবে দেখলে এর আসল চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এর পেছনে রয়েছে এশিয়ায় প্রভাব, নিরাপত্তা কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য বৃহত্তর প্রতিযোগিতা।

জাপানকে ঘিরে চীনের চাপ তাই একই সঙ্গে টোকিও ও ওয়াশিংটনের উদ্দেশে একটি কৌশলগত বার্তা বহন করছে। বেইজিংয়ের লক্ষ্য যদি এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার ভিত দুর্বল করা হয়, তাহলে জাপানই সেই প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

আর তাই চীন-জাপান উত্তেজনার প্রতিটি নতুন অধ্যায় শুধু দুই দেশের সম্পর্কের খবর নয়—এটি এশিয়ার ভবিষ্যৎ শক্তির ভারসাম্যেরও ইঙ্গিত।

জনপ্রিয় সংবাদ

চট্টগ্রামে আগুন নেভাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বিএনপির সাবেক নেতা নিহত

জাপানকে ঘিরে চীনের আগ্রাসী চাপ, আসল লক্ষ্য কি যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় আধিপত্য?

০৭:৩১:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

চীন ও জাপানের সম্পর্ক আবারও এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একটি দেশের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বক্তব্য অন্য দেশের কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়াকে দ্রুত তীব্র করে তুলছে। সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ান নিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির অবস্থান এবং জাপানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ বেইজিংয়ের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে। চীন জাপানের বিরুদ্ধে তাইওয়ান ইস্যুতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছে এবং টোকিওর সামরিক নীতিকে ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

কিন্তু এই সংঘাতকে শুধু চীন ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় বিরোধ হিসেবে দেখলে এর গভীর কৌশলগত দিকটি হয়তো ধরা পড়বে না। কারণ পূর্ব এশিয়ায় জাপান যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদারদের একটি। ফলে টোকিওকে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখার অর্থ পরোক্ষভাবে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক ব্যবস্থাকেও চ্যালেঞ্জ করা।

তাইওয়ানই এখন সবচেয়ে বড় উত্তেজনার কেন্দ্র

তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চীন। দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো বিদেশি শক্তির সামরিক ভূমিকা বা নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতিকে বেইজিং অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে দেখে।

এই পরিস্থিতিতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি তাইওয়ানকে ঘিরে কোনো সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত জাপানের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করলে টোকিও আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিতে পারে—এমন অবস্থান প্রকাশ করেছেন। চীন এ বক্তব্যকে গুরুতর আপত্তিকর হিসেবে দেখেছে। জাপানের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা শ্বেতপত্রেও তাইওয়ান ঘিরে চীনের সামরিক কর্মকাণ্ড এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছ.,

বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধু জাপানের বক্তব্য নয়। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সামরিক সমন্বয় এবং তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য আঞ্চলিক জোটের প্রশ্নও জড়িত।

জাপান কেন চীনের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?

পূর্ব এশিয়ার মানচিত্রে জাপানের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন, কোরীয় উপদ্বীপ এবং তাইওয়ানের কাছাকাছি জাপানের অবস্থান দেশটিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত করেছে।

জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা জোট রয়েছে। জাপানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সেনা উপস্থিতি রয়েছে এবং দুই দেশ নিয়মিত সামরিক সহযোগিতা ও মহড়া পরিচালনা করে।

তাইওয়ানকে ঘিরে কোনো বড় ধরনের সংঘাত হলে জাপানকে পাশ কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। একইভাবে জাপান যদি নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও বাড়ায়, তাহলে পূর্ব এশিয়ায় চীনের সামরিক হিসাবও বদলে যেতে পারে।

এ কারণেই জাপানের প্রতিরক্ষা নীতির পরিবর্তন বেইজিংয়ের জন্য শুধু টোকিওর অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্ন।

জাপানের সামরিক শক্তি বাড়ানোও চীনের উদ্বেগের কারণ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের সামরিক ভূমিকা দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি দ্রুত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

জাপানের নতুন প্রতিরক্ষা নীতিতে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, মানববিহীন অস্ত্র এবং সামরিক শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রতিরক্ষা নীতিতেও চীনকে জাপানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। (Reuters)

চীনের চোখে এই পরিবর্তন একটি সম্ভাব্য সামরিক পুনরুত্থানের ইঙ্গিত। বেইজিং তাই জাপানের সামরিক সম্প্রসারণকে শুধু আত্মরক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না; বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আঞ্চলিক শক্তির কাঠামো বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা হিসেবেও বিবেচনা করছে।

কিন্তু এর আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব কোথায়?

এখানেই চীন-জাপান উত্তেজনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সামনে আসে।

এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বড় ভিত্তি হলো তার মিত্র ও অংশীদারদের নেটওয়ার্ক। জাপান সেই ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ফলে জাপানকে যদি চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনায় আটকে রাখা যায়, তাহলে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থানও আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

চীনের জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে তাদের কৌশলগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

জাপানের ক্ষেত্রে এই কৌশল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ টোকিও একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা অংশীদার এবং চীনের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার।

এই দ্বৈত সম্পর্কই জাপানকে চীনের চাপ প্রয়োগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র করে তুলেছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্কও হয়ে উঠতে পারে চাপের হাতিয়ার

চীন ও জাপানের অর্থনীতি গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। দুই দেশের শিল্প, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা ও বাণিজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে।

কিন্তু রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলে এই অর্থনৈতিক নির্ভরতাই দুর্বলতার জায়গায় পরিণত হতে পারে।

চীন যদি বাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ শিল্প উপকরণ বা বাজার প্রবেশাধিকারকে কূটনৈতিক চাপের সঙ্গে যুক্ত করে, তাহলে জাপানি ব্যবসার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। আবার জাপানও চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

এর ফলে দুই দেশের সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠছে।

How China's Japan-bashing is indirectly targeting Washington - Nikkei Asia

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের কাছে কী বার্তা যাচ্ছে?

চীনের জাপানবিরোধী কঠোর অবস্থানের একটি সম্ভাব্য কৌশলগত ফল হলো—এশিয়ার অন্যান্য দেশকে একটি বার্তা দেওয়া।

বার্তাটি হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যত বেশি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়া হবে, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তত বেশি চাপ তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতি দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশকেও নিজেদের কৌশল নতুন করে বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে।

চীন যদি আঞ্চলিক দেশগুলোকে বোঝাতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক তাদের অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তাগত ঝুঁকি বাড়ায়, তাহলে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক কাঠামো দুর্বল হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে চীনের কৌশলও ঝুঁকিমুক্ত নয়

জাপানের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে উল্টো ফলও হতে পারে।

চীনের সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ যত বাড়বে, জাপানের জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সমর্থন তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের নিরাপত্তা সম্পর্কও আরও শক্তিশালী হতে পারে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এমন প্রবণতার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। চীনের হুমকি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগকে সামনে রেখে জাপান নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ফলে বেইজিং যে চাপ দিয়ে টোকিওকে নরম করতে চাইছে, সেটিই কখনো কখনো জাপানকে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।

এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন

চীন-জাপান বিরোধ তাই এখন আর শুধু দুই দেশের সম্পর্কের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাইওয়ান, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি, জাপানের প্রতিরক্ষা সম্প্রসারণ, চীনের আঞ্চলিক প্রভাব এবং এশিয়ার ভবিষ্যৎ শক্তির ভারসাম্য।

চীন একদিকে নিজের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও গভীর করার চেষ্টা করছে। এই দুই প্রবণতার মাঝখানে জাপানের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

জাপান যদি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর আরও গভীরে প্রবেশ করে এবং একই সঙ্গে নিজের সামরিক সক্ষমতা বাড়ায়, তাহলে চীনের জন্য পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত পরিবেশ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

সামনে কী হতে পারে?

চীন ও জাপানের সম্পর্কের দ্রুত উন্নতি এখন সহজ নয়। তাইওয়ান প্রশ্ন, সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, পূর্ব চীন সাগরের বিরোধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতি—সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস গভীর।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।

চীন কি জাপানকে চাপে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় জোটকে দুর্বল করতে পারবে, নাকি এই চাপই জাপানকে ওয়াশিংটনের আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলবে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বেইজিং ও টোকিওর সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না। এর প্রভাব পড়বে তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া এবং গোটা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীন ও জাপানের বর্তমান দ্বন্দ্বকে কেবল দুই দেশের বিরোধ হিসেবে দেখলে এর আসল চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এর পেছনে রয়েছে এশিয়ায় প্রভাব, নিরাপত্তা কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য বৃহত্তর প্রতিযোগিতা।

জাপানকে ঘিরে চীনের চাপ তাই একই সঙ্গে টোকিও ও ওয়াশিংটনের উদ্দেশে একটি কৌশলগত বার্তা বহন করছে। বেইজিংয়ের লক্ষ্য যদি এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার ভিত দুর্বল করা হয়, তাহলে জাপানই সেই প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

আর তাই চীন-জাপান উত্তেজনার প্রতিটি নতুন অধ্যায় শুধু দুই দেশের সম্পর্কের খবর নয়—এটি এশিয়ার ভবিষ্যৎ শক্তির ভারসাম্যেরও ইঙ্গিত।