এইডসের বিরুদ্ধে কয়েক দশকের বৈশ্বিক লড়াই এখন নতুন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থসহায়তা কমে যাওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এইচআইভি প্রতিরোধ ও চিকিৎসা কার্যক্রমে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বন্ধ হয়েছে কিছু স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ব্যাহত হয়েছে ওষুধ সরবরাহ এবং সংকটে পড়েছে রোগীদের সহায়তায় কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন। এর মধ্যেই বিজ্ঞানীরা এমন কিছু নতুন ওষুধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আশার কথা বলছেন, যা ভবিষ্যতে এইডস নিরাময়ের পথ খুলে দিতে পারে।
গত ২০ জানুয়ারি ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশটির বৈদেশিক সহায়তা নীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। এর প্রভাব পড়ে এইডস মোকাবিলার আন্তর্জাতিক কার্যক্রমেও। ২০১১ সালে বিশ্বব্যাপী এইডস মোকাবিলায় দেওয়া বৈদেশিক সহায়তার ৫৮ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলেও পরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৮১ শতাংশে। ফলে মার্কিন সহায়তায় পরিবর্তন আসতেই পুরো ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়।
অর্থসহায়তা কমায় বাড়ছে সংকট
কাইজার ফ্যামিলি ফাউন্ডেশনের ২৭ জুলাই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার কমেছে। ২০২৪ সালে এই খাতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছিল, তার তুলনায় এটি প্রায় ২৫ শতাংশ কম।
আরেকটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান এইডস কর্মসূচির সঙ্গে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় একটি অংশ প্রয়োজনীয় সামগ্রী পেতে সমস্যায় পড়েছে। প্রায় ২৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কনডম সংগ্রহ করতে পারেনি। ২০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এইচআইভি চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ পায়নি। আর ২২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান সংক্রমণ ঠেকাতে ব্যবহৃত প্রতিরোধমূলক ওষুধ সংগ্রহ করতে পারেনি।
তবে অর্থ কমলেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো এইডস মোকাবিলায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থদাতা। নতুন নীতিতে শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, অর্থ কীভাবে দেওয়া হবে—সেটিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে।
বদলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার কাঠামো
আগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন সরাসরি বিভিন্ন সংস্থার কাছে পৌঁছাত। নতুন ব্যবস্থায় সেই পথ বদলে দেওয়া হয়েছে। এখন অর্থ দেওয়া হবে মূলত সরকার থেকে সরকার পর্যায়ে। প্রতিটি দেশের সঙ্গে আলাদা সমঝোতার ভিত্তিতে অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে।
নতুন ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকেও এইডস মোকাবিলায় নিজেদের অর্থ দেওয়ার অঙ্গীকার করতে হচ্ছে। পাশাপাশি এসব সমঝোতার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ধীরে ধীরে অর্থ দেওয়ার পরিবর্তে প্রযুক্তিগত সহায়তার দিকে চলে যেতে পারে—এমন ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।
এই পরিবর্তনকে কেউ দীর্ঘদিনের একটি লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ধীরে ধীরে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিজেদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আবার সমালোচকদের কেউ মনে করছেন, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে এই খাতে অর্থনৈতিক দায় কমিয়ে আনার পথ তৈরি করছে।
এখন পর্যন্ত ৩৪টি দেশ নতুন সমঝোতায় সই করেছে। কেনিয়া এইডস কর্মসূচিতে ৮৫০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র দেবে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। নাইজেরিয়া দেবে ৩ বিলিয়ন ডলার, যুক্তরাষ্ট্র দেবে ২ বিলিয়ন ডলার।
তবে ঘানা, জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ের মতো কয়েকটি দেশ এখনো সমঝোতায় সই করেনি। এসব দেশ তথ্য আদান-প্রদানের কিছু শর্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে খনিজ সম্পদের অধিকার নিয়ে চাপ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি চাপ
এইডসের বৈশ্বিক সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ এখনো আফ্রিকায়। জাতিসংঘের এইডস-বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইডসের হিসাবে, গত বছর এইডসে প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার মানুষ মারা গেছে। তাদের সবচেয়ে বড় অংশই সাব-সাহারান আফ্রিকার বাসিন্দা।
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ নিয়মিত চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ গ্রহণ করছেন। অর্থাৎ এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন।
ব্রাজিল অবশ্য এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে। এইডস মহামারির শুরু থেকেই দেশটি আক্রান্ত মানুষের জন্য বিনামূল্যে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। স্থানীয়ভাবে ওষুধ উৎপাদনের জন্য বাধ্যতামূলক অনুমোদনের ব্যবস্থাও করেছে। কিন্তু আফ্রিকার অনেক দরিদ্র দেশের পক্ষে ব্রাজিলের মতো বড় পরিসরে অর্থ ব্যয় করা কঠিন।
নতুন ওষুধে আশার আলো
অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও এইডস প্রতিরোধে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি আশার জায়গা তৈরি করেছে। বর্তমানে বিশেষ নজর রয়েছে এমন কিছু ওষুধের দিকে, যা এইচআইভি সংক্রমণ ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রথম দিকে সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রতিদিন একটি করে বড়ি খেতে হতো। পরে দুই মাস পরপর দেওয়া যায় এমন ইনজেকশন এসেছে। এখন সবচেয়ে আলোচিত ওষুধগুলোর একটি হলো লেনাকাপাভির, যা বছরে মাত্র দুইবার ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া যায়।
আরেকটি সম্ভাবনাময় ওষুধ আলিমাট্রাভির মাসে একবার খাওয়ার বড়ি হিসেবে তৈরি হচ্ছে। এর পরীক্ষামূলক গবেষণা এখনো শেষ হয়নি। তবে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কম দামে ওষুধ সরবরাহের জন্য চুক্তি করেছে।
লেনাকাপাভিরের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ছে। একটি বৈশ্বিক তহবিল ইতোমধ্যে এর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কয়েক মিলিয়ন মানুষের জন্য ওষুধ কেনার ব্যবস্থা করেছে। শুরুতে ২০ লাখ মানুষের জন্য ওষুধ সংগ্রহের পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে ৩০ লাখ করা হয়েছে।
তবে বিশ্বে প্রায় ২ কোটি মানুষের সংক্রমণ প্রতিরোধমূলক ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে বলে ইউএনএইডসের হিসাব। তাই প্রয়োজনের তুলনায় বর্তমান সরবরাহ এখনো অনেক কম।

চিকিৎসা নয়, এবার কি নিরাময়ের পথ?
এইডসের চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় স্বপ্ন এখনো পুরোপুরি নিরাময়। কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা এমন একটি পদ্ধতি খুঁজছেন, যার মাধ্যমে শরীর থেকে এইচআইভিকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হবে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে এক ধরনের অ্যান্টিবডি, যাকে বলা হয় ব্যাপকভাবে কার্যকর নিরপেক্ষকারী অ্যান্টিবডি। সাধারণত এইচআইভির বিরুদ্ধে শরীর যে অ্যান্টিবডি তৈরি করে, তা ভাইরাসের নির্দিষ্ট একটি ধরনকে লক্ষ্য করে। ভাইরাসের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই অ্যান্টিবডির কার্যকারিতা কমে যায়।
কিন্তু নতুন ধরনের এই অ্যান্টিবডি ভাইরাসের এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশকে লক্ষ্য করে, যেগুলো পরিবর্তন করা ভাইরাসের জন্য তুলনামূলক কঠিন। ফলে এগুলো দীর্ঘ সময় কার্যকর থাকার সম্ভাবনা তৈরি করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এই অ্যান্টিবডি ব্যবহারের পর ভাইরাসের উপস্থিতি দীর্ঘ সময় শনাক্ত করা যায়নি। কয়েকজন রোগীর ক্ষেত্রে প্রায় দুই বছর পর্যন্ত ভাইরাসের মাত্রা শনাক্তযোগ্য পর্যায়ের নিচে ছিল।
গবেষকদের ধারণা, এই অ্যান্টিবডি শুধু সাময়িকভাবে ভাইরাস দমন করেনি; বরং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও এমনভাবে সক্রিয় করতে পারে, যাতে অ্যান্টিবডি শরীরে না থাকলেও প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ চালিয়ে যেতে পারে।
তবে এটিকে এখনই এইডসের নিরাময় বলা যাচ্ছে না। আরও গবেষণা ও বড় পরিসরের পরীক্ষা প্রয়োজন। তবু কয়েক দশক ধরে যে রোগের সম্পূর্ণ নিরাময় নিয়ে বিজ্ঞানীরা অপেক্ষা করছেন, সেখানে এমন ফলাফল নতুন আশার জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থসহায়তা কমে যাওয়ায় এইডস মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন অগ্রগতি পরিস্থিতিকে পুরোপুরি হতাশাজনক হতে দিচ্ছে না। সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—কম অর্থে কীভাবে বেশি মানুষকে চিকিৎসা ও প্রতিরোধের আওতায় আনা যায় এবং নতুন ওষুধগুলো দরিদ্র দেশগুলোর মানুষের কাছে কতটা সহজে পৌঁছে দেওয়া যায়। একই সঙ্গে বিজ্ঞানীরা খুঁজে চলেছেন সেই কাঙ্ক্ষিত পথ, যেখানে এইচআইভি নিয়ন্ত্রণ নয়, সত্যিকার অর্থে নির্মূল করা সম্ভব হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















